Tuesday, December 30, 2025

অমিত্রার চিঠি

সাহিত্য পর্যালোচনা
ডঃ এম এ আলী

অমিত্রার চিঠিটি  পড়লাম । চিঠিতে মিত্রা সুন্দর করে সুমনের সাথে তার যোগাযোগ কাহিনী থেকে মৃত্যুপর্যন্ত বিষয়াবলি কল্পনার প্রতিমূর্তিতে সুস্দর করে এঁকেছে । চিত্রা তার সকল জাগতিক কাজ ফেলে রেখে শুধুমাত্র সুমনের কথা ভেবে চিরন্তন আনন্দ ও প্রেমের সুধা পান করার ধ্যানে মগ্ন , যেখানে চেতনা বেদনাবন্ধন ভুলে গিয়ে শুধু প্রেম আর সৌন্দর্যে মগ্ন থাকা যায়। জাগতিক বন্ধনমুক্তির চিন্তায় দেখা যায় মিত্রার যেন আজ কোনো কাজ নয়, ছন্দ, বন্ধ, গ্রন্থ, বা গান সবকিছু ভুলে যেতে হবে।

কল্পনার মিলনে ব্যস্ত সে, সাধন ধন মন মানস সবকিছু দিয়েই অমিত্রা কল্পনায় শুধু সুমনকেই ভাবছে।
সে চায় শুধু একবার প্রিয়তমের কাছে বসতে, শুধু কূজন গুঞ্জন করতে, সন্ধ্যার সোনালি কিরণকে মদিরা হিসেবে পান করতে।যতক্ষণ না অন্তরের শিরা উপশিরা লাবণ্যে ভরে উঠছে, যতক্ষণ না চেতনার বন্ধন টুটে যাচ্ছে, ততক্ষণ এই নীরব আনন্দ উপভোগ করতে চাচ্ছে এ যেন তার চেতনার মুক্তি। লেখাটিতে সুন্দরভাবে প্রেম, সৌন্দর্য, এবং সৃষ্টির এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির প্রকাশ পেয়েছে যেখানে অমিত্রা তাঁর কল্পনার জগৎকে বাস্তবতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে চেয়েছে।

এই পোস্টের লেখাটিতে অমিত্রার ভাবনা আর চিন্তা গুলিকে লেখকের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে চিহ্নিত করে যাচ্ছে বলে অনুভুত হচ্ছে। সোনার তরীতে থাকা রবীন্দ্র নাথের মানসসুন্দরী কবিতার চরণের উদ্ধৃতি লেখটিকে একটি উচ্চমাত্রা দিয়েছে ।

আমিতো ইয়র্কশায়ারের কাছিকাছিতেই থাকছি । আত্মীয় স্বজন থাকার কারণে মনট্রিয়ল এলাকায় মাঝে মধ্যে যেতে হয় । খোদা না করুন সেখানে চেরীফল বাগানের কাছে যেন চিরনিবাস হয়ে না যায়, কেননা সেখানে এমন কেও নেই যে মিত্রার মত করে চিঠি লিখবে।

********

৩০ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:২০০

লেখক বলেছেন: আপনার এই সুগভীর ও হৃদয়স্পর্শী মন্তব্যের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। অমিত্রার মনোজগতকে আপনি যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তা সত্যিই অসাধারণ। 
"সাধন ধন মন মানস সবকিছু দিয়েই" - এই কল্পনার জগতে বিভোর হওয়ার যে আধ্যাত্মিক মাত্রা, সেটা আপনি নিখুঁতভাবে ধরতে পেরেছেন।

অমিত্রা শুধু প্রেমে নয়, সে তার চেতনার মুক্তি খুঁজছে - এই উপলব্ধিটি গল্পের গভীরতম স্তর।
রবীন্দ্রনাথের "মানসসুন্দরী" কবিতার উদ্ধৃতি নিয়ে আপনার মন্তব্য আমাকে আনন্দিত করেছে। সত্যিই, সেই চরণগুলো অমিত্রার ভাবনার সাথে এক অপূর্ব সংযোগ তৈরি করেছে।

রবিঠাকুরের সমগ্র রচনাতে এইটুকু অংশ কেন জানি আমার একদম মুখস্থ। কারণ, জানি না। যেহেতু আমার কোন কিছু মুখস্থ হয়না।আর আপনার শেষ মন্তব্যটি হাসিয়ে দিলো! ইয়র্কশায়ার থেকে মন্ট্রিয়ল - বেশ ভালো দূরত্ব তো! চেরিফল বাগানের কাছে চিরনিবাস নিয়ে আপনার রসিকতা চমৎকার।
তবে মিত্রার মতো চিঠি লেখার মানুষ দুর্লভ হলেও, হয়তো সেখানে অন্য কোনো সুন্দর গল্প অপেক্ষা করছে! 
আপনার মতো সংবেদনশীল পাঠক যখন এভাবে লেখার প্রতিটি স্তর উন্মোচন করেন, তখন লেখক হিসেবে মনে হয় - লেখা সার্থক হয়েছে। আপনার জন্য শুভকামনা। মন্ট্রিয়লে যাওয়ার সময় সাবধানে থাকবেন - চেরিফল বাগান বড়ই মোহময়!

অনেক শুভেচ্ছা রইলো।

Monday, December 29, 2025

বেঁচে থাকার শুরু

 

ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ   জানালার পাশে বসে ভাবছিল কিভাবে অবলবাসাহীন জীবন কাটিয়ে দিল সুবর্ণা ।সেই কিশোরী বয়স থেকেই কানায় কানায় ভরে উঠেছিল সৌন্দর্য। কাটা কাটা চেহারায় চিবুকের ধার, বাদামী চোখ , বাদামামী লাল চুলের বাঁধনহারা এলোমেলো ভাব , অপ্ররিরোধ্য কামনায় ভরা একটি ইনোসেন্ট মন , যে কিনা আবুঝ , চঞ্চলা, মোহনীয় সৌন্দর্য স্কুলে থাকতে ইঙ্গিত দিতে শুরু করে তার শরীরে ............বেঁচে থাকার শুরু । মৃত্যুর সমাপ্তি ।

আপাতদৃষ্টিতে সুবর্ণা একটি জীবনকাহিনী, কিন্তু সেইটুকুই এই গল্পের শেষ কথা নয়। সুবর্ণা একটি বিশেষ কালের আলেখ্য। যে কাল সদ্যবিগত, যে কাল হয়তো বা আজও সমাজের এখানে সেখানে তার ছায়া ফেলে রেখেছে। সুবর্ণা সেই বন্ধন-জর্জরিত কালের মুক্তিকামী আত্মাৱ ব্যাকুল যন্ত্রণার প্রতীক।

আর একটি কথা মনে পড়ছে এই গল্পটির সঙ্গে কারো জীআনের একটি যোগসূত্র আছে। সে যোগসূত্র কাহিনীর প্রয়োজনে নয়, একটি চরিত্রকে পরবতী কালের চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনে।সমাজবিজ্ঞানীরা লিখে রাখেন সমাজ-বিবর্তনের ইতিহাস, আমি এই কাহিনীর মধ্যে সেই বিবর্তনের একটি রেখাঙ্কনের প্রয়াস দেখতে পাচ্ছি ।

মানব মনের মানব জীবনের সেকাল নিয়ে তর্ক তো চিরকালের, কিন্তু কেমন করে চিহ্নিত করা যায়। সেই কালকে? এক একটা কালের আয়ু শেষ হলেই কি এক-একবার যবনিকা পড়ে? যেমন যবনিকা পড়ে নাট্যমঞ্চে?

না, যবনিকার অবকাশ কোথায়? অবিচ্ছিন্ন স্রোত। তবু জীবনের ভাঙ্গা গড়া চলছেই । পারিবারিক জীবন মানুষের রীতিনীতি, চলন-বিলন, এরাই ধরে রাখে মানব জীবনের এক একটা টুকরোকে, ইতিহাস নাম দেয় মানব জীবনের কালপরিক্রমা।

কিন্তু কালকে অতিক্রম করতেও থাকে বৈকি কেউ কেউ, নইলে কারা এগিয়ে দেবে সেই প্রবহমাণ ধারাকে? সে ধারা মাঝে মাঝেই স্তিমিত হয়ে যায়, নিস্তরঙ্গ হয়ে যায়। তবু এরা বর্তমানের পূজো কদাচিৎ পায়, এরা লাঞ্ছিত হয়, উপহসিত হয়, বিরক্ত-ভাজন হয়।এদের জন্যে থাকে কাটার মুকুট।এদের জন্যে সমালোচনার জ্বালাপালা ।

বু এরা বেচে থাকে । হয়তো প্রকৃতির প্রয়োজনেই বাঁচে । তবে কোথা থেকে যে জীবনের গতিময়তা পায় তা তারা নিঝেরাই জানেনা । হয়তবা তাদের জীবনের গতিময়তা আসে রাজরক্তের নীল আভিজাত্য থেকে, কিংবা বিদ্যা বৈভবের প্রতিষ্ঠিত স্তর থেকে। আসে নামগোত্রহীন মূক মানবগোষ্ঠীর মধ্য থেকে, আসে আরো কোন ঘন অন্ধকার থেকে। তাদের অভ্যুদয় হয়তো বা রাজপথের বিস্তৃতিতে, হয়তো বা অন্তঃপুরের সঙ্কীর্ণতায়। কিন্তু সবাই

কি সফল হয়? সবাইয়েরই কি হাতিয়ার এক? না।

প্রকৃতি অকৃপন তাই কাউকে পাঠায় ধারালো তলওয়ার হাতে দিয়ে, কাউকে পাঠায় ধাঁরালো কলম হাতে দিয়ে , কাওকে পাঠায় ভোতা বল্লম হাতে দিয়ে , তাই কেউ সফল সার্থক, কেউ অসফল ব্যর্থ। তবু প্রকৃতির রাজ্যে জীবন যুদ্ধে কোনো কিছুই হয়তো ব্যর্থ নয়। আপাত-ব্যর্থতার গ্লানি হয়তো পরবর্তীকালের জন্য সঞ্চিত করে রাখে শক্তিসাহস।

সুবর্ণা এসব কথা জানতো না। সুবর্ণা তার মার করুনগাথার সম্বল নিয়ে সংসারে নেমেছিল!তাই সে জেনেছিল সে কেবল তার বৈচিত্রময় জীবনের গ্লানির বোঝা নিয়েই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সংগ্রামে একাই লড়বে নীজের প্রেমেই নীজে মঝবে, যেখান থেকে হবে বেঁচে থাকার শুরু। মৃত্যুর সমাপ্তি সেতো ভবিতব্যের হাতে!!! সুবর্ণার অভিনব জীবন দর্শন নিয়ে গল্পটি তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গঠনশৈলি নিয়ে চমতকার হয়েছে ।

পাঠে মুগ্ধ ।

শুভেচ্ছা রইল

Sunday, December 28, 2025

প্রার্থনা - The Prayer

 ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ১১:৩৭০

সাহিত্য পর্যালোচনা
ডঃ এম এ আলী 

লেখাটি আজ হাতে সময় নিয়ে পড়লাম । ঝর্ণার করুণ গাথাময় জীবন অভিজ্ঞতায়
সঞ্চারিত তার প্রার্থনার কথাগুলো হদয়কে ছুঁয়ে যায় । জীবনের এই লগনে এসে
ঝর্ণার মত এমন আবেগময়ী প্রার্থনা হয়ত করতে পারবনা তবু লেখাটির কল্যানে
হৃদয়মুলে বিধাতার প্রতি যে প্রার্থনা গীতি উঠেছে বেজে তা এখানে ছোটকরে
লিখে গেলাম ।



প্রার্থনা
হে পরম করুণাময় ! তোমার বন্দনা করি।
তুমিই ইষ্ট, হৃদয়-আনন্দ, দিব্য সৃজনকারী
বৈশিষ্ট্যের তুমি পুরুষকারী, সমষ্টির জীবন বুদ্ধিকারী
একাচারী সর্বদাই তুমি!
সৃষ্টির উৎস তুমি, তুমিই ঈশ্বর, ব্যক্ত পরম আশ্রয়,
নিখিল জগত ও জীবনে, জীবন তরঙ্গ তোমাতে স্পন্দিত
ব্যক্ত-অব্যক্তের স্বরূপ তুমি, পরম আরাধ্য,
সৃষ্টির সর্বত্রই তোমার অস্তিত্ব !
শাশ্বত তুমি, তুমিই বর্ণমান!

ব্যক্তি দশপ্রাণ গৃহ সমাজ রাষ্ট্রের হবে উন্নয়ন
যখন যাজন ইষ্টভূতি স্বধর্মানীর তাই কর প্রবর্ধন,
প্রাচ্য পাশ্চাত্য নিয়ন্ত্রণে অনুশাসন দাও বর্ণাশ্রমের
আধ্যপথই তুমি সর্বকালের!

সকল শিল্প বিজ্ঞান যুক্ত পূর্ণতায় তুমিই সর্ব প্রাচীন
শ্রেষ্ঠ হতেও চির শ্রেষ্ঠতর!
ধর্মের বাণীতে প্রকাশ, প্রজ্ঞাবলে আবর্তিত জগতের বুকে
সকল বাদ্যের মোহহারী, সর্বধর্মের স্থাপনকারী
সর্বতোভাবে সকলের ইচ্ছা পুরণে রত ইষ্ট এক ও অদ্বিতীয়,
চিরঞ্জিব তুমিই সর্বোত্তম!

আরাধনাকারীর প্রেমে উচ্ছল, আশেকের মন মুগ্ধকারী,
নবীন প্রবীণ আধ্যত্ম্যাকার, বিচিত্র লীলার প্রকাশ তোমার,
বিশ্বমিলন যজ্ঞের তুমি ‌একক বেদ দাতা
বিভিন্ন পথের তুমিই চালক নুরের তেজতায়!

রণতাণ্ডবের হিংসায় কাতর পীড়িত বিচ্ছিন্ন ভুবনে
পরিব্যাপ্ত শ্রেষ্ঠ আচার পরিপূর্ণ করে চরিধার,
জীবনবৃদ্ধিই লক্ষ্য তোমার, মিত্র-অমিত্রেরও হও আপনার
উপসনার তরে তুমি হে মহান!

নমি আমি হে বিশ্বময়ী হে প্রিয়! হে পরম!
করুণাময় তুমি , তবে পাপীর তরে ভয়ালও চরম!
বাধ্য অবাধ্য ক্ষমা করে সকলেরে চালাও সত্যপথে
এই মোর কামনা এই মোর প্রার্থনা তব সমীপে।

শুভেচ্ছা রইল 

Thursday, October 30, 2025

অহল্যা দেবীর কাহিনি


 অহল্যা দেবীর কাহিনি — অবাধ্যতার প্রতীক থেকে মুক্তির প্রতীক পর্যন্ত

অহল্যার পরিচয়ঃ 
অহল্যা ছিলেন মহর্ষি গৌতম ঋষির পত্নী — এক অতুল সুন্দর, বুদ্ধিমতী ও তপস্বিনী নারী। সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা নিজে তাকে সৃষ্টি করেছিলেন দেবতাদের মধ্যেও অতুলনীয় সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে। ব্রহ্মা অহল্যাকে গৌতম ঋষির সঙ্গে বিবাহ দেন, কারণ গৌতম ছিলেন একান্ত ধার্মিক, তপস্যাশীল ও পবিত্রচিত্ত ঋষি।

অহল্যা ছিলেন মহর্ষি গৌতম ঋষির পত্নী — এক অতুল সুন্দর, বুদ্ধিমতী ও তপস্বিনী নারী। সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা নিজে তাকে সৃষ্টি করেছিলেন দেবতাদের মধ্যেও অতুলনীয় সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে। ব্রহ্মা অহল্যাকে গৌতম ঋষির সঙ্গে বিবাহ দেন, কারণ গৌতম ছিলেন একান্ত ধার্মিক, তপস্যাশীল ও পবিত্রচিত্ত ঋষি।

ইন্দ্রের প্রলোভন ও অহল্যার পরীক্ষাঃ
একদিন ইন্দ্র দেবতা অহল্যার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে প্রলুব্ধ করার ইচ্ছা করেন। গৌতম ঋষি প্রতিদিন ভোরে নদীতে স্নান করতে যেতেন। ইন্দ্র সেই সুযোগে গৌতমের রূপ ধারণ করে অহল্যার কুটিরে প্রবেশ করেন।অহল্যা প্রথমে কিছুটা সন্দেহ করলেও, ইন্দ্রের চতুর কৌশলে তিনি প্রতারিত হন। কিছু পুরাণ মতে, অহল্যা বুঝতে পেরেছিলেন এটি ইন্দ্র, কিন্তু কৌতূহল ও অহংকারবশত নীরব থাকেন — এই জায়গাটিতেই তাঁর “অবাধ্যতা” বা “নুশূজ” প্রকাশ পায়, কারণ তিনি স্বামীর প্রতি সতীত্বের নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন।

গৌতম ঋষির অভিশাপঃ
গৌতম ঋষি তপস্যা শেষে ফিরে এসে সত্য জানতে পারেন। তিনি ক্রোধে ইন্দ্রকে অভিশাপ দেন — “তোমার পুরুষত্ব নষ্ট হোক!” এবং অহল্যাকে বলেন — “তুমি মায়া ও কামনায় বিভ্রান্ত হয়েছ। তাই তুমি পাথরে পরিণত হবে, যতদিন না রামচন্দ্র তোমার উপর পদার্পণ করবেন।” অহল্যা তৎক্ষণাৎ পাথরে পরিণত হন এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধৈর্যসহ সেই শাস্তি ভোগ করেন।

রামচন্দ্রের আগমন ও মুক্তিঃ
অনেক যুগ পরে রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ ঋষি বিশ্বামিত্রের সঙ্গে তপোবনে প্রবেশ করেন। তারা সেই স্থানে পৌঁছান যেখানে অহল্যা পাথর হয়ে ছিলেন। রামচন্দ্র তাঁর পায়ের স্পর্শে অহল্যাকে পুনর্জীবিত করেন। তখন অহল্যা গভীর অনুতাপ প্রকাশ করে বলেন — “আমি কামনা ও বিভ্রান্তির কারণে স্বামীর কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়েছিলাম, প্রভু, আপনি আমাকে মুক্ত করেছেন।”
এভাবে অহল্যা অবাধ্যতার প্রতীক থেকে ক্ষমা, শুদ্ধতা ও মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন।

ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাঃ
১. অহংকার ও প্রলোভন থেকে সাবধান থাকা উচিত।
২. ভুল স্বীকার ও অনুতাপ মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়।
৩. নারী বা পুরুষ — উভয়ের জন্য সতীত্ব, সংযম ও ধর্মনিষ্ঠা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ঈশ্বরের করুণা ও অনুতাপের শক্তি পাপ থেকেও পরিশুদ্ধি এনে দেয়।

অহল্যাঃ এক বহুমাত্রিক প্রতীক

দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যাঃ
নৈতিক দৃষ্টিতে অবাধ্য স্ত্রীর উদাহরণঃ যিনি প্রলোভনে পরাজিত হন।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে অবাধ্য স্ত্রীর উদাহরণঃ পাপের পর শুদ্ধতার প্রতীক; অনুতাপ ও ক্ষমার বার্তা।
নারীবাদী ব্যাখ্যায় (আধুনিক দৃষ্টিকোণ)অবাধ্য স্ত্রীর উদাহরণঃ তিনি সমাজের শাস্তির শিকার, যিনি শেষে নিজের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করেন।

উপসংহার
অহল্যার কাহিনি কেবল “অবাধ্য স্ত্রীর শাস্তি” নয়, বরং মানবীয় ভুল, অনুতাপ ও ঈশ্বরের করুণার এক চিরন্তন শিক্ষা।
তিনি একদিকে সতর্কবার্তা — আবার অন্যদিকে মুক্তির আলোকবর্তিকা।

অবাধ্য স্ত্রী

প্রাচীন পুরাণ ও হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুসারে “অবাধ্য স্ত্রী” — এমন এক নারীর প্রতীক যিনি স্বামীর আদেশ, কর্তব্য, ও ধর্মীয় নিয়ম অমান্য করেন। এই ধারণাটি প্রাচীন সমাজে গভীর নৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করত, কারণ স্ত্রীকে তখন শুধু সংসারের সহধর্মিণী নয়, বরং ধর্মরক্ষার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে দেখা হতো।

অবাধ্য স্ত্রীর সংজ্ঞা (পুরাণ অনুসারে)

“অবাধ্য স্ত্রী” বা “অপতিব্রতা” স্ত্রী বলতে বোঝানো হয়েছে সেই নারীকে —
যিনি স্বামীকে ঈশ্বররূপে মানেন না,
তার প্রতি অবিশ্বস্ত বা অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ করেন, এবং
ধর্ম,সংসার বা সতীত্বের পথ থেকে বিচ্যুত হন।

মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে —
“যে নারী স্বামীর আদেশ অমান্য করে,
যে স্বামীর ধর্ম অনুসরণ করে না,
সে এ জন্মে লাঞ্ছিত হয় এবং পরজন্মে নরকে পতিত হয়।”
— মনুস্মৃতি ৫/১৬৪

অবাধ্য স্ত্রীর বৈশিষ্ট্যঃ

পুরাণ ও স্মৃতিশাস্ত্রে অবাধ্য স্ত্রীর কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে, যেমনঃ
স্বামীকে অসম্মান করা বা তার আদেশ অমান্য করা।
অপর পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া বা অবিশ্বাসী হওয়া।
সংসারের কাজ ও কর্তব্যে উদাসীন থাকা।
ধর্মীয় আচরণে অবহেলা করা।
রাগ, অহংকার ও অলসতায় ভোগা।

পুরাণে অবাধ্য স্ত্রীর উদাহরণ



১. অহল্যা (রামায়ণ):
অহল্যা ঋষি গৌতমের স্ত্রী ছিলেন। ইন্দ্র দেবতার প্ররোচনায় তিনি প্রতারিত হন। এর ফলে গৌতম ঋষি তাকে অভিশাপ দেন — তিনি পাথরে পরিণত হন। এই কাহিনির মাধ্যমে সতীত্ব ভঙ্গ ও অবাধ্যতার ফল হিসেবে অপমান ও অভিশাপের দৃষ্টান্ত দেখা যায়।











২. পাণ্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদী (মহাভারতে):
যদিও দ্রৌপদী ছিলেন মহীয়সী ও ধর্মনিষ্ঠা নারী, তবুও কখনো কখনো স্বামীর আদেশ অমান্য করে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যা প্রাচীন ব্যাখ্যায় “নারীর অতিরিক্ত যুক্তিবাদিতা বা অবাধ্যতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে দ্রৌপদীর চরিত্রকে সাধারণত ন্যায় ও ধর্মের পক্ষে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।






৩. সুরভি ও চিত্রাঙ্গদার মতো উদাহরণ (বিভিন্ন পুরাণে):
কিছু কাহিনিতে দেব বা রাজাদের স্ত্রীরা অহংকার বা কামনায় বিভ্রান্ত হয়ে স্বামীকে অবমাননা করেন, ফলে তারা অভিশপ্ত হন বা স্বর্গ থেকে পতিত হন — যা “অবাধ্য স্ত্রীর ফল” হিসেবে বর্ণিত।

প্রাচীন পুরাণের উদ্দেশ্য ছিল নারীদের দমন নয়, বরং সংসার ও ধর্মের ভারসাম্য রক্ষা করা। এখানে “অবাধ্য স্ত্রী”র কাহিনিগুলো ছিল সতর্কবাণীস্বরূপ — যাতে পরিবারে ধর্ম, সতীত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মূল্য অক্ষুণ্ণ থাকে।

সার সংক্ষেপ
বাধ্য স্ত্রী চরিত্রঃ অনুগত, সতী, পতিব্রতা
অবাধ্য স্ত্রী চরিত্রঃ অহংকারী, অবিশ্বস্ত, স্বামীর আদেশ অমান্যকারী
ফলাফলঃ স্বর্গলাভ, সম্মান,লজ্জা, অভিশাপ, নরকগমন
উদাহরণঃ সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী অহল্যা, চিত্রাঙ্গদা

বাধ্য স্ত্রী


প্রাচীন পুরাণ অনুযায়ী “বাধ্য স্ত্রী” বা অনুগত স্ত্রীর ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক ছিল। হিন্দু পুরাণ, বিশেষ করে মনুস্মৃতি, রামায়ণ, মহাভারত, এবং পুরাণসমূহে এমন নারীর প্রশংসা করা হয়েছে যিনি স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত, শ্রদ্ধাশীল, ধর্মপরায়ণা ও কর্তব্যনিষ্ঠা প্রদর্শন করেন।

‘বাধ্য স্ত্রী’ মানে কী (পুরাণ অনুসারে):

প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে “বাধ্য স্ত্রী” বলতে বোঝায় এমন নারী— যিনি স্বামীকে ঈশ্বরের সমতুল্য সম্মান দেন, তার আদেশ মান্য করেন, এবং সংসার ও ধর্ম রক্ষার জন্য নিজের ইচ্ছা ও স্বার্থ ত্যাগ করেন।


মনুস্মৃতিতে স্ত্রীর কর্তব্যঃ

“যে নারী তার স্বামীকে দেবতার মতো সম্মান করে, সে এই জীবনেই স্বর্গ লাভ করে।”

— (মনুস্মৃতি, অধ্যায় ৫, শ্লোক ১৫৫–১৬০)

এখানে স্ত্রীকে বলা হয়েছে, স্বামীই তার জন্য “পতি-দেবতা”। তাকে শ্রদ্ধা করা, যত্ন নেওয়া, ও সেবা করা — স্ত্রীর ধর্ম হিসেবে ধরা হয়েছে।

রামায়ণে উদাহরণঃ

সীতা দেবী বাধ্য স্ত্রীর সর্বোত্তম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য। তিনি রামচন্দ্রের আদেশে বনবাসে গিয়েছিলেন, সব কষ্ট সহ্য করেও স্বামীর প্রতি অনুগত ও বিশ্বস্ত ছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল “পতিব্রতা নায়িকা” — অর্থাৎ স্বামীভক্তা স্ত্রী।

মহাভারতে দৃষ্টান্তঃ

সত্যবতী, দময়ন্তী, সাবিত্রী প্রমুখ নারীদের কাহিনিতেও স্ত্রীর আনুগত্য, সতীত্ব, ও আত্মত্যাগের মহান উদাহরণ পাওয়া যায়। বিশেষত, সাবিত্রী তার স্বামী সত্যবানের প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য যমের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন — যা এক “আদর্শ স্ত্রী”র প্রতীক হয়ে আছে।

পুরাণে বাধ্য স্ত্রীর গুণাবলিঃ

স্বামীকে ঈশ্বররূপে মানা।
সংসার ও ধর্ম রক্ষায় নিবেদিত থাকা।
স্বামীর আনন্দ ও দুঃখে সমানভাবে পাশে থাকা।
নিজের ইচ্ছার উপরে স্বামীর কর্তব্য ও ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া।
সতীত্ব, নম্রতা ও ধৈর্য ধারণ করা।

সার সংক্ষেপঃ

প্রাচীন পুরাণে “বাধ্য স্ত্রী” হলো — একজন সতী, পতিব্রতা ও ধর্মনিষ্ঠ নারী, যিনি স্বামীর প্রতি অবিচল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রদর্শন করেন।

Thursday, November 26, 2020

সনেট ও ‘চতুর্দশপদী কবিতা’

ম্যাগাজিন ভার্সন

সনেট ও ‘চতুর্দশপদী কবিতা’ 

হুমায়রা হারুন

বাংলা সনেট রচনার সূত্রপাত হয় ১৮৬০ সালে। অধ্যাপক নীল রতন সেনের আধুনিক বাংলা ছন্দ গ্রন্থে উল্লেখিত, ‘মধুসূদন ভবিষ্যদবাণী করেছিলেন,  if cultivated by men of genius, our sonnet in time would rival the Italian. – ভাবের দিক দিয়ে মধুসূদন যতিপ্রান্তিক ‘মিত্রাক্ষর’ ছন্দের শৃংখল ছিন্ন করেছেন বটে তবু চোদ্দমাত্রার পয়ার পংক্তিবন্ধ রক্ষা করে চলেছেন। মধুসূদনের আর কোনও কাব্য আদর্শ বা রচনারীতি পরবর্তী কবিরা ঠিক ভাবে অনুকরণ করেননি। একমাত্র সনেটের ক্ষেত্রেই দেখা যায় তিনি উত্তরসূরীদের মধ্যে আরও প্রাণবন্তভাবে বেঁচে রয়েছেন। সেদিক থেকে বিচারে মধুসূদনের সনেট রচনা বাংলা ছন্দের এবং কাব্যেরও বটে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।’

প্রমথ চৌধুরী তার ‘সনেট কেন চতুর্দশপদী’ প্রবন্ধে বাংলা কাব্যে চতুর্দশপদের আগমনের কারণ ও চতুর্দশপদের চয়ন বিশ্লেষণে বলেছেন,‘চৌদ্দ কেন? এ – প্রশ্নে সনেটের মতো বাংলা পয়ার সম্বন্ধেও জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে। এর একটি সমস্যার মীমাংসা করতে পারলে অপরটির মীমাংসার পথে আমরা অনেকটা অগ্রসর হতে পারব। আমার বিশ্বাস,বাংলা পয়ারের প্রতি চরণে অক্ষরের সংখ্যা চতুর্দশ হবার একমাত্র কারণ এই যে,বাংলা ভাষায় প্রচলিত অধিকাংশ শব্দ হয় তিন অক্ষরের নয় চার অক্ষরের। পাঁচ –ছয় অক্ষরের শব্দ প্রায়ই হয় সংস্কৃত নয় বিদেশী। সুতরাং সাত অক্ষরের কমে সকল সময়ে দুটি শব্দের একত্র সমাবেশের সুবিধে হয় না। সেই সাতকে দ্বিগুন করে নিলেই শ্লোকের প্রতি চরণ যথেষ্ট প্রশস্ত হয়,এবং অধিকাংশ প্রচলিত শব্দই ঐ চৌদ্দ অক্ষরের মধ্যেই খাপ খেয়ে যায়। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে,আমাদের ভাষায় দু’অক্ষরের শব্দের সংখ্যাও কিছু কম নয়। কিন্তু সে সকল শব্দকে চার অক্ষরের শব্দের শামিল ধরে নেওয়া যেতে পারে,যেহেতু দুই স্বভাবতই চারের অন্তর্ভুক্ত।

এই চৌদ্দ অক্ষর থাকবার দরুনই বাংলা ভাষায় কবিতা লেখার পক্ষে পয়ারই সর্বপেক্ষা প্রশস্ত। একটানা লম্বা কিছু লিখতে হলে,অর্থাৎ যাতে অনেক কথা বলতে হবে এমন কোন রচনা করতে গেলে,বাঙালি কবিদের পয়ারের আশ্রয় অবলম্বন ছাড়া উপায়ন্তর নেই। কৃত্তিবাস থেকে আরম্ভ করে শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত বাংলার কাব্যনাটক রচয়িতা মাত্রই পূর্বোক্ত কারণে অসংখ্য পয়ার লিখতে বাধ্য হয়েছেন এবং চিরদিনের জন্য বাঙ্গালির প্রতিভা ঐ পয়ারের চরণের উপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে রয়েছে।

পয়ারে চতুর্দশ অক্ষরের মত সনেট চতুর্দশ পদের একত্র সংঘটন,আমার বিশ্বাস,অনেকটা একই কারণে একই রকমের যোগাযোগে সিদ্ধ হয়েছে। আমি পূর্বেই বলেছি যে,দ্বিপদী ত্রিপদী ও চতুষ্পদীই পদ্যের মূল উপাদান। বাদবাকি যত প্রকার পদ্যের আকার দেখতে পাওয়া যায়,সেসবই দ্বিপদী,ত্রিপদী এবং চতুষ্পদীকে হয় ভাংচুর করে নয় জোড়াতাড়া দিয়ে গড়া। এই সত্য প্রমাণ করবার জন্য বোধহয় উদাহরণ দেবার আবশ্যক নেই।

কবিতার পূর্ববর্ণিত ত্রিমূর্তির সমন্বয়ে একমূর্তি গড়বার ইচ্ছে থেকেই সনেটের সৃষ্টি। সেই কারণেই সনেট আকৃতিতে সমগ্রতা একাগ্রতা এবং সম্পূর্ণতা লাভ করেছে। ত্রিপদীর সঙ্গে চতুষ্পদীর যোগ করলে সপ্ত পদ পাওয়া যায় এবং সেই সপ্ত পদকে দ্বিগুণিত করে নেওয়াতেই সনেট চতুর্দশ পদ লাভ করেছে। এই চতুর্দশ পদের ভিতর দ্বিপদী ত্রিপদী এবং চতুষ্পদী তিনটিরই স্থান আছে এবং তিনটিই সমান খাপ খেয়ে যায়।’

আধুনিক বাংলা ছন্দে অধ্যাপক নীলরতন সেন এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন,

‘প্রাচীন এবং মধ্যযুগের পদ্যে আঠারো মাত্রিক পংক্তি বিক্ষিপ্তভাবে কদাচিত ব্যবহৃত হলেও পূর্ণাবয়ব মহা – পয়ারবন্ধের কবিতা ইতিপূর্বে কোনও কবিই রচনা করেননি। এ ছন্দের বাকধর্মী ভাবপ্রকাশক শক্তি সম্পর্কেও ইতিপূর্বে কোন কবিই সচেতন হননি।’

কিন্তু কবি আল মাহমুদ ইতালিয়ান সনেট ও শেক্সপিরিয়ান সনেট –এর রীতিকে অনুসরণ না করে  নতুনরূপে  অক্ষরবৃত্ত ছন্দের আঠার মাত্রার পংক্তি রচনা করে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন তার রচিত ‘সোনালি কাবিন’ গ্রন্থে। এ টি এম মোস্তফা কামালের সুখ -৬ তেমনি একটি রচনা।

সুখ-৬

এ টি এম মোস্তফা কামাল

 

ভাবের সুতায় দেখি ধরা পড়ে কতো আকূলতা,

হৃদয় অতলে ঢাকা ভালো মন্দ যতো আর্তি আছে

বের হতে চায় শুধু কথা হয়ে তুমি এলে কাছে।

আমার জমানো কথা,আসো যদি,শোনাবো সুলতা।

একা একা বলে বলে শিখে রাখি সেই সব কথা;

বিমুগ্ধ মোড়কে ঢাকা কথামালা ভুলে যাই পাছে।

সুখের নরোম ঘুমে ডুবে যাবো,ভেতরে যা আছে

সব যদি বলা যায় একে একে তোমাকে সুলতা।

 

হঠাৎ জোছনা রাতে তুমি এসে আমার সমুখে

নীরবে দাঁড়ালে আর চোখ তুলে চোখেই তাকালে।

পলকে অনেক কথা বলা হলো,কথা নেই মুখে !

নীরব ভাষায় হলো কথকতা কথার আকালে !

সব কথা বলা হলো ভেবে মন বাজে রিনি ঝিনি!

তুমি গেলে মনে হলো,কী অবাক,কিছুই বলিনি !

মিত্রাক্ষর ছন্দ সম্পর্কে মধুসূদনের মনোভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে  শ্রীযুক্ত নীলরতন সেন তার আধুনিক বাংলা ছন্দ গ্রন্থে বলেছেন,

‘মধুসূদন কৈশোরকাল থেকেই এক ভিন্নতর আবহাওয়ায় বড় হয়ে উঠেছেন। দীর্ঘকাল ধরে তিনি শেক্সপীয়র মিল্টনের নাটক কবিতার অনুশীলন করেছেন। ক্লাসিক গ্রীক ল্যাটিন সংস্কৃত কাব্যের রসাস্বাদন করেছেন। প্রাচ্য পাশ্চাত্য ক্লাসিক সাহিত্য এবং Blank -verse ছন্দোবন্ধে মিল্টনের মহিমান্বিত কাব্য পাঠের ফলে,মিত্রাক্ষর ছন্দের পঙক্তি – প্রান্তিক যতি – শৃংখল মোচন করে কাব্যের ভাবমুক্তির পথ প্রশস্ত করতে গিয়ে তিনি এই heroic Blank –verse এর আদর্শ গ্রহণ একান্ত স্বাভাবিক পন্থা রূপেই মনে করেছেন। The words came unsought floating in the stream of inspiration. যতিপ্রান্তিক মিত্রাক্ষর ছন্দকে মধুসূদন যে মনোভাব নিয়ে দেখেছেন একটি সনেটে তা সুন্দর প্রকাশ করেছেন।’

মিত্রাক্ষর

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

বড়ই নিষ্ঠুর আমি ভাবি তারে মনে,

 লো ভাষা, পীড়িতে তোমা গড়িল যে আগে

 মিত্রাক্ষর রূপ বেড়ি! কত ব্যথা লাগে

 পর’ যবে এ নিগড় কোমল চরণে–

 স্মরিলে হৃদয় মোর জ্বলি উঠে রাগে !

 ছিল না কি ভাবধন,কহ,লো ললনে,

 মনের ভাণ্ডারে তার,যে মিথ্যা সোহাগে

 ভুলাতে তোমারে দিল এ তুচ্ছ ভূষণে?

 কি কাজ রঞ্জনে রাঙি কমলের দলে?

 নিজ –রূপে শশিকলা উজ্জ্বল আকাশে!

 কি কাজ পবিত্রি মন্ত্রে জাহ্নবীর জলে?

 কি কাজ সুগন্ধ ঢালি পারিজাত বাসে?

 প্রকৃত কবিতা রূপী কবিতার বলে,–

 চীন-নারী-সম পদ কেন লৌহ –ফাঁসে?

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত পয়ারের সংজ্ঞা নির্দেশে বলেছিলেন, আট –ছয় আট –ছয়। পয়ারের ছাঁদ কয়। পয়ার ছন্দের ওপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ছন্দের অর্থ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন,‘পয়ার ছন্দের  বিশেষত্ব হচ্ছে এই যে, তাকে প্রায় গাঁঠে গাঁঠে ভাগ করা চলে,এবং প্রত্যেক ভাগেই মূল ছন্দের একটা আংশিক রূপ দেখা যায়। কড়ি ও কোমল কাব্য গ্রন্থের তেমনি একটি সনেট ‘চুম্বন।’ 

চুম্বন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 অধরের কানে যেন অধরের ভাষা ।

দোহার হৃদয় যেন দোহে পান করে।

গৃহ ছেড়ে নিরুদেশ দুটী ভালবাসা

তীর্থযাত্রা করিয়াছে অধর-সঙ্গমে !

দুইটি তরঙ্গ উঠি প্রমের নিয়মে

ভাঙ্গিয়া মিলিয়া যায় দুইটা অধরে।

ব্যাকুল বাসনা দুটী চাহে পরস্পরে

দেহের সীমায় আসি দুজনের দেখা !

 

প্রেম লিখিতেছে গান কোমল আখরে

অধরতে থরে থরে চুম্বনের লেখা।

দুখানি অধর হতে কুসুম চয়ন,

মালিকা গাঁথিবে বুঝি ফিরে গিয়ে ঘরে ?

দুটি অধরের এই মধুর মিলন

দুইটি হাসির রাঙা বাসর শয়ন।

শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য তার গীতিকবি শ্রীমধুসূদন গ্রন্থের ‘উত্তর সাধক’ রচনায় বলেছেন,

“রবীন্দ্রনাথ তাঁহার নিজস্ব ভঙ্গিতে মৌলিক প্রতিভার প্রেরণায় যে চতুর্দশপদ বিশিষ্ট কবিতা পরবর্তী কালে রচনা করিয়াছেন,তাহাও যেমন ‘সনেট’ নহে,তেমনই মধুসূদনের আঙ্গিকগত অনুকরণ হইলেও ভাবগত অনুকরণ –জাত  রচনাও নহে। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা অন্যকে অনুকরণ করিবার প্রতিভাই নহে; সুতরাং রবীন্দ্রনাথের মধ্যে মধুসূদনের ভাবগত প্রভাব অনুসন্ধান করা বৃথা।”

শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তার লেখা দেবেন্দ্রনাথ সেন স্মরণে উল্লেখ করেছেন,‘রবীন্দ্রনাথের প্রতিভায় যখন সকলেই মুগ্ধ ও আত্মবিস্মৃত সেই যুগেও দেবেন্দ্রনাথ স্বকীয় স্বাতন্ত্র্য সম্পূর্ণ বজায় রাখিয়াছেন।’ অপরদিকে শ্রী অধীশ চন্দ্র সাহাও তার ‘দেবেন্দ্রনাথ সেনঃ জীবনী ও কাব্য বিচার’ অভিসন্দর্ভে বলেছেন,

‘সনেট রচয়িতা রূপে দেবেন্দ্রনাথ বাংলা কাব্যে একটি গৌরবের স্থান অধিকার করে আছেন। তার সমগ্র রচনার অর্ধেকেই চতুর্দশপদী কবিতা। মধুসূদনের চতুর্দশপদী কবিতা এবং রবীন্দ্রনাথের কড়ি ও কোমল কাব্যের সনেটগুলো দেবেন্দ্রনাথ সেনের নিকট আদর্শ রূপে প্রতীয়মান হয়। এছাড়াও দেবেন্দ্রনাথ সেন অক্ষয় কুমারের সনেটের সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন। সংখ্যার দিক থেকে দেবেন্দ্রনাথের সমগ্র রচনার অর্ধাংশই সনেট বা সনেট – কল্প চতুর্দশপদী কবিতা। অক্ষয়কুমারের প্রথম দিকের সনেটগুলির উপজীব্য প্রেম;তাঁর প্রধান কৃতিত্ব এই যে, পেত্রার্কা সনেটের দৃঢ় রূপবন্ধের মধ্যে রোমান্টিক প্রেম চেতনার অভিব্যাক্তি যে কত সহজ  ও স্বচ্ছন্দে সম্ভব,কয়েকটি চমৎকার সনেট লিখে তিনি তার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। বেদনার গীতোচ্ছ্বাস যে সনেটের সংহত কঠিন কাঠামোর মধ্যে আড়ষ্ট হয় না, বরং ‘শুক্তির মধ্যে মুক্তার মত’ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাঁর ‘সন্ধ্যায়’ সনেটটি এর প্রকৃষ্ট নিদর্শন।”

অক্ষয়কুমারের প্রথম দিকের  রচনা ‘হৃদয় সমুদ্র সম’ ও ‘শত নাগিনীর পাকে’ এবং দেবেন্দ্রনাথ সেনের রচনা ‘অদ্ভুত অভিসার’ চমৎকার চতুর্দশপদী রচনা।

অদ্ভুত অভিসার

দেবেন্দ্রনাথ সেন

 

মাধবের মন্ত্রসিদ্ধ মোহন মুরলী

ধ্বনিল রাধার চিত্ত –নিকুঞ্জ –মোহনে,

অমনি রাধার আত্মা দ্রুত গেল চলি

শ্যামতীর্থে, শ্যামাঙ্গিনী –যমুনা –সদনে!

গেল রাধা; তবে ঐ মন্থর গমনে

মঞ্জুল –বকুল –কুঞ্জে ,কে যায় গো চলি?

আকুল দুকূল,ম্লান কুন্তল,কাঁচলি;

ঘুম যেন লেগে আছে নিঝুম লোচনে!

 

নাহি জ্ঞান, নাহি সাড়া! টানে তরুদল

লুন্ঠিত অঞ্চল ধরি ! মুখ –পদ্মোপরি

উড়িয়া বসিছে অলি গুঞ্জরি গুঞ্জরি;

বিহবলা মেখলা চুম্বে চরণের তল!

আগে আত্মা,পরে দেহ,যাইছে তুহার

রাধিকা রে,বলিহারি তোর অভিসার!

শ্রী অধীশ চন্দ্র সাহা তার গবেষণা কর্মে আরোও বলেছেন,

“অক্ষয় কুমারের হৃদয় সমুদ্র সম কবিতাটি পেত্রার্কা সনেটের আদর্শে রচিত। অষ্টকে যে ভাবের বন্ধন, ষটকে সেই ভাবের মুক্তিলীলা এবং অষ্টক ষটক মিলে একটি পরিপূর্ণ একক ভাবের নিটোল রসরূপায়ন। তবে সর্বত্র কবি এ কৃতিত্ব দেখাতে পারেন নি। ‘তাহার সনেটগুলি ভাবে ও ভাষায় যেমন সু সমৃদ্ধ, গীতিরসে তেমন সমুজ্জ্বল নয়।[১]’ আসলে অক্ষয় কুমারের কাব্য প্রেরণার মধ্যে একপ্রকার অসমতা ছিল। ‘তাঁহার সনেট সমূহে গাঢ়তা ও শিথিলতায় যুগপৎ অবস্থিতিও তাঁহার কাব্য প্রেরণার অসমত্বের পরিচায়ক।[২]’ দেবেন্দ্রনাথ যখন সনেট রচনায় ব্রতী হন তখন অক্ষয় কুমারের এই সনেটগুলির আদর্শও তাঁর সামনে ছিল। ‘দেবেন্দ্রনাথ সেনের এবং অক্ষয় কুমার বড়ালের চতুর্দশপদীতে পরিণততর রূপ সৌকর্য দেখা গেছে।অবশ্য চতুর্দশপদীর নিখুঁত ভাব– শাসন দেবেন্দ্রনাথের লেখাতেই বেশি চোখে পড়ে।[৩]”     

শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য তার উত্তর সাধক রচনায় বলেছেন,“মধুসূদনের অন্যান্য বিষয়ক রচনার যেমন উত্তর সাধকের সন্ধান পাওয়া যায়,তাঁহার ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’রও উত্তর সাধক আছে। বহিরঙ্গের দিক দিয়াই হউক,কিংবা অন্তঃপ্রকৃতির দিক দিয়াই হউক,তাঁহার ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’র অনেকে অনুকরণ করিয়াছেন। মধুসূদন পয়ারের অনুরূপ চৌদ্দটি অক্ষর যুক্ত পদ অবলম্বন করিয়াই তাঁহার ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ আদ্যোপান্ত রচনা করিয়াছেন। ইহার মধ্যেও মধুসূদনের বিদ্রোহী মনোভাবের পরিবর্তে রক্ষণশীল  মনোভাবেরই পরিচয় প্রকাশ পাইয়াছে। ইহাতে পেত্রার্কীয় আদর্শে বাংলা কবিতা রচনা করিতে গিয়াও যে বাংলার প্রচলিত পয়ারের চৌদ্দটি অক্ষরের পদের উপরেই তাঁহার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল,তাহা লক্ষ্য করিবার বিষয়।”

শৃঙ্গার – রস

শ্রী মধুসূদন দত্ত

 শুনিনু নিদ্রায় আমি,নিকুঞ্জ-কাননে,

মনোহর বীণা-ধ্বনি; – দেখিনু সে স্থলে

রূপস পুরুষ এক কুসুম – আসনে,

ফুলের চৌপর শিরে,ফুল –মালা গলে।

হাত ধরাধরি করি নাচে কুতূহলে

চৌদিকে রমণী-চয়,কামাগ্নি-নয়নে, –

উজলি কানন –রাজি বরাঙ্গ –ভূষণে,

ব্রজে যথা ব্রজাঙ্গনা রাস–রঙ্গ–ছলে।

সে কামাগ্নি-কণা লয়ে সে যুবক,হাসি

জ্বালাইছে হিয়াবৃন্দে; ফুল-ধনুঃ – ধরি

হানিতেছে চারি দিকে বাণ রাশি রাশি

কি দেব কি নর উভে জর জর করি!

"কামদেব অবতার রস-কুলে আসি,

শৃঙ্গার রসের নাম।" জাগিনু শিহরি।

চতুর্দশপদী এবং সনেট রচনার ক্ষেত্রে আজ অব্দি বাংলাভাষায় কাব্যরচনার ক্ষেত্রে মধুসূদনের উত্তর সাধক যেমন আছেন,ভবিষ্যতেও তেমন থাকবেন। কবিমন তার চিন্তায় চেতনায় স্পন্দিত ছন্দের প্রলেপ চৌদ্দ বা আঠারো অক্ষরের মধ্যদিয়ে প্রকাশ করবেন অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথেই।

[১] মোহিতলাল মজুমদারঃ বাংলা কবিতার ছন্দ

[২] শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ধারা

[৩] হরপ্রসাদ মিত্রঃ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা ও কাব্যরূপ

...

মহাজগত বিষয়ে আমার গবেষণায় এআই সহায়তা - ফরিদ আহমেদ চৌধুরী

: কোন কিছু না থাকা শূন্য অসীম ছিল।  কারণ তাতে তাকে সীমা দেওয়ার মত কিছুই ছিল না।  সেই শূন্যে কোন কিছু হতে কোন বাধা ছিল না। কে বাধা দিবে কেউ ত...