ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ জানালার পাশে বসে ভাবছিল কিভাবে অবলবাসাহীন জীবন কাটিয়ে দিল সুবর্ণা ।সেই কিশোরী বয়স থেকেই কানায় কানায় ভরে উঠেছিল সৌন্দর্য। কাটা কাটা চেহারায় চিবুকের ধার, বাদামী চোখ , বাদামামী লাল চুলের বাঁধনহারা এলোমেলো ভাব , অপ্ররিরোধ্য কামনায় ভরা একটি ইনোসেন্ট মন , যে কিনা আবুঝ , চঞ্চলা, মোহনীয় সৌন্দর্য স্কুলে থাকতে ইঙ্গিত দিতে শুরু করে তার শরীরে ............বেঁচে থাকার শুরু । মৃত্যুর সমাপ্তি ।
আপাতদৃষ্টিতে সুবর্ণা একটি জীবনকাহিনী, কিন্তু সেইটুকুই এই গল্পের শেষ কথা নয়। সুবর্ণা একটি বিশেষ কালের আলেখ্য। যে কাল সদ্যবিগত, যে কাল হয়তো বা আজও সমাজের এখানে সেখানে তার ছায়া ফেলে রেখেছে। সুবর্ণা সেই বন্ধন-জর্জরিত কালের মুক্তিকামী আত্মাৱ ব্যাকুল যন্ত্রণার প্রতীক।
আর একটি কথা মনে পড়ছে এই গল্পটির সঙ্গে কারো জীআনের একটি যোগসূত্র আছে। সে যোগসূত্র কাহিনীর প্রয়োজনে নয়, একটি চরিত্রকে পরবতী কালের চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনে।সমাজবিজ্ঞানীরা লিখে রাখেন সমাজ-বিবর্তনের ইতিহাস, আমি এই কাহিনীর মধ্যে সেই বিবর্তনের একটি রেখাঙ্কনের প্রয়াস দেখতে পাচ্ছি ।
মানব মনের মানব জীবনের সেকাল নিয়ে তর্ক তো চিরকালের, কিন্তু কেমন করে চিহ্নিত করা যায়। সেই কালকে? এক একটা কালের আয়ু শেষ হলেই কি এক-একবার যবনিকা পড়ে? যেমন যবনিকা পড়ে নাট্যমঞ্চে?
না, যবনিকার অবকাশ কোথায়? অবিচ্ছিন্ন স্রোত। তবু জীবনের ভাঙ্গা গড়া চলছেই । পারিবারিক জীবন মানুষের রীতিনীতি, চলন-বিলন, এরাই ধরে রাখে মানব জীবনের এক একটা টুকরোকে, ইতিহাস নাম দেয় মানব জীবনের কালপরিক্রমা।
কিন্তু কালকে অতিক্রম করতেও থাকে বৈকি কেউ কেউ, নইলে কারা এগিয়ে দেবে সেই প্রবহমাণ ধারাকে? সে ধারা মাঝে মাঝেই স্তিমিত হয়ে যায়, নিস্তরঙ্গ হয়ে যায়। তবু এরা বর্তমানের পূজো কদাচিৎ পায়, এরা লাঞ্ছিত হয়, উপহসিত হয়, বিরক্ত-ভাজন হয়।এদের জন্যে থাকে কাটার মুকুট।এদের জন্যে সমালোচনার জ্বালাপালা ।
বু এরা বেচে থাকে । হয়তো প্রকৃতির প্রয়োজনেই বাঁচে । তবে কোথা থেকে যে জীবনের গতিময়তা পায় তা তারা নিঝেরাই জানেনা । হয়তবা তাদের জীবনের গতিময়তা আসে রাজরক্তের নীল আভিজাত্য থেকে, কিংবা বিদ্যা বৈভবের প্রতিষ্ঠিত স্তর থেকে। আসে নামগোত্রহীন মূক মানবগোষ্ঠীর মধ্য থেকে, আসে আরো কোন ঘন অন্ধকার থেকে। তাদের অভ্যুদয় হয়তো বা রাজপথের বিস্তৃতিতে, হয়তো বা অন্তঃপুরের সঙ্কীর্ণতায়। কিন্তু সবাই
কি সফল হয়? সবাইয়েরই কি হাতিয়ার এক? না।
প্রকৃতি অকৃপন তাই কাউকে পাঠায় ধারালো তলওয়ার হাতে দিয়ে, কাউকে পাঠায় ধাঁরালো কলম হাতে দিয়ে , কাওকে পাঠায় ভোতা বল্লম হাতে দিয়ে , তাই কেউ সফল সার্থক, কেউ অসফল ব্যর্থ। তবু প্রকৃতির রাজ্যে জীবন যুদ্ধে কোনো কিছুই হয়তো ব্যর্থ নয়। আপাত-ব্যর্থতার গ্লানি হয়তো পরবর্তীকালের জন্য সঞ্চিত করে রাখে শক্তিসাহস।
সুবর্ণা এসব কথা জানতো না। সুবর্ণা তার মার করুনগাথার সম্বল নিয়ে সংসারে নেমেছিল!তাই সে জেনেছিল সে কেবল তার বৈচিত্রময় জীবনের গ্লানির বোঝা নিয়েই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সংগ্রামে একাই লড়বে নীজের প্রেমেই নীজে মঝবে, যেখান থেকে হবে বেঁচে থাকার শুরু। মৃত্যুর সমাপ্তি সেতো ভবিতব্যের হাতে!!! সুবর্ণার অভিনব জীবন দর্শন নিয়ে গল্পটি তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গঠনশৈলি নিয়ে চমতকার হয়েছে ।
পাঠে মুগ্ধ ।
শুভেচ্ছা রইল