Friday, August 7, 2026

পুস্তক সমালোচনা

পুস্তক সমালোচনা জীবনেরে কে রাখিতে পারে, লেখক ফিরোজা হারুন

মহিলা বিষয়ক অনুষ্ঠান অংগনা, বাংলাদেশ বেতার,ঢাকা

পাঠক নাজনীন তৌহিদ

রেকর্ডিং ১৬/১১/২০১১, প্রচার ১৮/১১/২০১১

 

মানুষ কেবল যাপিত জীবন নিয়েই ব্যস্ত হয়। হাস-ফাস করা জীবনেও কখনো তার মন গেয়ে ওঠে, নেচে ওঠে। নিজের ভুবনে সে একাকী বিচরণ করতে চায় কিছুক্ষণ।এই একান্ত কিছুক্ষণসময়টাতে সে কোন এক নিঃস্বার্থ বন্ধুকে সাথী হিসাবে খুঁজে নিতে পারে, যে কেবল নিজেকে বিলিয়ে দিতেই জানে। ধারণা করতে পারেন এমন বন্ধু কে? হ্যা, আমি সেই বন্ধুটির কথা বলছিলাম বই!

বই আমাদের নিত্যসংগী।আমাদের বন্ধু!

বই-ই হতে পারে নিরানন্দ জীবনের এতটুকু আনন্দের উপকরণ। আর এক্ষেত্রে  সময়োপযোগী বই পারে মনের ক্ষুধা নিবারণ করতে। শ্রোতা বন্ধুদের সবার মনের অবস্থা যেহেতু আমার অজানা,তাই নিত্যকার মতো আমার পছন্দের একটি বই নিয়ে এলাম আজকের আলোচনায়। এটি একটি উপন্যাস।উপন্যাসটির নাম জীবনের কে রাখিতে পারে।লিখেছেন ফিরোজা হারুন।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে মম প্রকাশনা থেকে।এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন রফিক উল্লাহ্‌। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৬০ এবং এর মূল্য হাতের নাগালে, মাত্র ৪৫ টাকা।

বইটির ভেতরকার বিষয়বস্তু জানবার আগে জেনে নেয়া যাক লেখকের পরিচিতি।

লেখিকা ফিরোজা হারুনের জন্ম ময়মনসিংহ জেলার, ত্রিশাল উপজেলার, হরিরামপুর গ্রামে।লেখাপড়া প্রথমে ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয় এবং কুমুদিনী কলেজ টাঙ্গাইল হতে।এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে ইতিহাসে এম.এ.সম্পন্ন করেন।তারপর ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ফর উইমেন থেকে বি.এড. ডিগ্রী অর্জন করেন।পরবর্তীতে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে সিনিয়র জিওগ্রাফি টিচার হিসাবে শিক্ষকতা করলেও তিনি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাঁর লেখা বেশ কটি উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ, ৭১ এর স্মৃতিকথা, গল্প ও প্রবন্ধ সংকলন ও শিশুকিশোর সংকলন  ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে এবং পাঠক মহলে বেশ সাড়া জাগিয়েছে লেখিকার প্রথম উপন্যাস জীবনেরে কে রাখিতে পারে।

ফেরা যাক এই উপন্যাসটির বিষয়বস্তুর দিকে। এখানে দুটি গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। একটির প্রধান চরিত্র একজন নারী যিনি একজন স্ত্রী। অন্য গল্পটির প্রধান চরিত্র একজন পুরুষ, যিনি প্রথম গল্পের নায়িকার স্বামী।লেখিকার ভাষায় গল্পের চরিত্র দুটি কল্পনা ভিত্তিক তবে বাস্তবতা নির্ভর।  

নায়িকা নীলা সংসার জীবনে আবদ্ধে থেকেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আবিষ্কার করে গেছে মানুষ কখনোই পরিপূর্ণ নয়।জীবনে অনেক পাওয়ার মাঝেও থাকে না পাওয়ার হা হাকার, যা তাকে কুড়ে কুড়ে ছিঁড়ে ফেলে। তবে এ না পাওয়াকে যে জয় করতে পারে, সেই জয়ী । সেই-ই জীবনের সত্যিকারের স্বাদ পায়।কল্পনা ভিত্তিক গল্প ছেড়ে যদি বাস্তব জীবনে তাকাই,তবু কি দেখব না সুখ খুঁজতে খুঁজতে একসময় অসুখের অসুখে ভুগে জীবনের যবনিকার পতন হয় !এখানেও তাই। সুখ হাতের নাগালে পেয়েও তাকে ছুঁতে পারেনি নীলা। এক হা হাকার নিয়ে জীবন শেষ হয়ে যায় তার।অন্যদিকে তার স্বামী ইলিয়াস খান স্ত্রীর প্রতি অবিচার করেননি। ভালবেসেছেন। অথচ ভালবাসার কথা বলে তাকে প্রতারিত করতে চাননি। এই অভিব্যক্তি তার দ্বিতীয় গল্পে ফুটে উঠেছে।

উপন্যাসে স্বামী স্ত্রী আর সংসার জীবনের এক জটিল বিষয় ফুটে উঠেছে।যেখানে বিশ্বাস, অবিশ্বাস, মানঅভিমান, পরস্পর বোঝাপড়া কিংবা ভালবাসা, দুঃখবোধ সব কিছুই রয়েছে, যা হয়তো কারো কারো জীবনে চরম বিপর্যয় বয়ে আনে।তবে বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে একে জয় করাই এর মুখ্য বিষয়।গল্পের নীলা চরিত্র খুবই বুদ্ধিদীপ্ত এক নারী চরিত্র। একটি পরিচ্ছন্ন গল্প হিসেবে পাঠক হৃদয়ে গেঁথে যাবে অনায়াসে। হয়ত অনেকে এ গল্পের মাঝে জীবনের সমাধানও খুঁজে পাবেন। আর সে ক্ষেত্রে লেখক তার লেখনিতে সার্থক হবেন তখনই।     

     

Wednesday, July 15, 2026

কথোপকথন -২ -কিন্নর

ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ কিন্নর, নৃত্য ও মানুষের ভবিষ্যৎ সত্তার অনুসন্ধান মুলক গল্পটি বেশ মনযোগ সহকারে দীর্ঘক্ষন লাগিয়ে পাঠ করলাম। পাঠান্তে আমার দৃষ্টিতে কিছু পর্যালোচনা নীচে তুলে দিলাম ।
আপনি একটি আপাত সাধারণ ঘটনাকে একজন নৃত্যশিল্পীকে দেখা উপলক্ষ করে মানুষের পরিচয়, সৌন্দর্যবোধ এবং অস্তিত্ব সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। গল্পের শুরুতে একজন দর্শক নৃত্যশিল্পীকে দেখে মুগ্ধ হন, কিন্তু অন্যজন প্রশ্ন তোলেন তিনি কি নারী, না পুরুষ? এই প্রশ্ন থেকেই গল্পটি ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে পৌরাণিক কল্পনা এবং পরে আধ্যাত্মিক ও অধিবিদ্যাগত আলোচনায় প্রবেশ করে।
এখানে মালবিকা কেবল একজন শিল্পী নন; তিনি দ্বৈততার প্রতীক। তাঁর মধ্যে পুরুষ ও নারীর বৈশিষ্ট্যের সহাবস্থান আপনার কাছে মানুষের সীমাবদ্ধ পরিচয়ের উর্ধ্বে এক সমন্বিত সত্তার ইঙ্গিত বহন করে।
গল্পে আপনি ভারতীয় পুরাণের কিন্নরদের আধুনিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পুরাণে কিন্নরদের দেবলোকের সংগীতজ্ঞ ও নৃত্যশিল্পী হিসেবে বর্ণনা করা হলেও এখানে তাদেরকে মানুষের ভবিষ্যৎ বিবর্তনের সম্ভাব্য রূপ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। এই কল্পনার সঙ্গে আপনি 5D, 7D, উচ্চমাত্রিক চেতনা, DNA, ক্রোমোজোম এবং বহুমাত্রিক অস্তিত্বের ধারণা যুক্ত করেছেন।
এই অংশগুলো মূলত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ নয়; বরং কল্পবিজ্ঞান, আধ্যাত্মিক দর্শন ও প্রতীকের মিশ্রণ। ফলে গল্পটি এর পাঠককে এগুলোকে তথ্যগত সত্য হিসেবে নয়, সাহিত্যিক রূপক হিসেবে পড়তে হয়। গল্পের সবচেয়ে ভাল দিক হলো, এটি সৌন্দর্যকে কেবল নারী বা পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না। আপনি বলতে চেয়েছেন, প্রকৃত সৌন্দর্য মানুষের লিঙ্গে নয়, তার শিল্প, সত্তা এবং চেতনায়।
গল্পটি সংলাপনির্ভর হওয়ায় পাঠকও সহজেই আলোচনার অংশ হয়ে ওঠেন। প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গিতে জটিল দর্শনও তুলনামূলকভাবে সহজভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
আপনি পুরাণ, দর্শন, আধ্যাত্মিকতা এবং আধুনিক শব্দাবলীর সমন্বয় ঘটিয়ে একটি অভিনব ভাষাশৈলী নির্মাণ করেছেন। অনেক জায়গায় এটি প্রবন্ধের মতো, আবার অনেক জায়গায় দার্শনিক আলাপচারিতার মতো।
গল্পে নৃত্যকে কেবল বিনোদন নয়, এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভাষা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রচলিত লিঙ্গ-ধারণার বাইরে সৌন্দর্যকে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে । ভারতীয় পুরাণের কিন্নর ধারণাকে নতুনভাবে কল্পনা করার প্রয়াস দেখা যাচ্ছে । গল্পটি পাঠককে চিন্তা করতে বাধ্য করে মানুষ আসলে কে?
তবে গল্পটিতে কিছুটা সীমাবদ্ধতাও রয়েছে । গল্পে DNA, ক্রোমোজোম, 5D, 7D, বহুমাত্রিক সত্তা, দেবলোক, ET ইত্যাদি বিষয়কে একই ধারায় যুক্ত করা হয়েছে। এগুলোর অনেকগুলোই প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য নয়; বরং বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বা নিউ এজ দর্শনের ধারণা। ফলে পাঠক যদি এগুলোকে বৈজ্ঞানিক দাবি হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকে। সাহিত্যিক কল্পনা হিসেবে এগুলো গ্রহণ করলে গল্পের রূপকধর্মিতা বেশি স্পষ্ট হয়।এছাড়া গল্পের শেষাংশে ধারণার ঘনত্ব এত বেশি যে, কাহিনির প্রবাহ কিছুটা শিথিল হয়ে দার্শনিক বক্তৃতার রূপ নিয়েছে।

গল্পের অন্তর্নিহিত বার্তা বিশ্লেষণ করলে মনে হয় আপনি কয়েকটি বিষয় তুলে ধরতে চেয়েছেন;
১. মানুষকে কেবল নারী-পুরুষ পরিচয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়; মানুষের গভীরে আরও বিস্তৃত এক সত্তা রয়েছে।
২. শিল্প, সংগীত ও নৃত্য মানুষের চেতনাকে উচ্চতর স্তরে উন্নীত করতে পারে।
৩. পুরাণের প্রতীকগুলিকে আধুনিক ভাষায় নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
৪. মানবসভ্যতা হয়তো ভবিষ্যতে আরও সমন্বিত, বৈচিত্র্যগ্রহণকারী এবং উচ্চতর চেতনার দিকে অগ্রসর হতে পারে
এটি আপনার কল্পনামূলক দার্শনিক ভাবনা।
৫. সৌন্দর্যের প্রকৃত উৎস বাহ্যিক লিঙ্গ নয়; বরং অন্তর্নিহিত সত্তা, শিল্পীসুলভ প্রকাশ এবং চেতনার বিকাশ।
মোট কথা এই রচনা দার্শনিক কল্পসাহিত্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি তথ্যভিত্তিক বিজ্ঞান বা পুরাণের ব্যাখ্যা নয়; বরং পুরাণ, আধ্যাত্মিকতা এবং কল্পবিজ্ঞানের উপাদান ব্যবহার করে মানুষের পরিচয়, সৌন্দর্য, চেতনা ও বিবর্তন সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। গল্পটির মূল শক্তি তার কল্পনাশক্তি, প্রতীকী ভাষা এবং চিন্তার উদ্রেক করার ক্ষমতায়; আর এর সবচেয়ে বড় বার্তা হলো মানুষের প্রকৃত পরিচয় কেবল তার শরীর বা লিঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার চেতনা, শিল্পবোধ এবং মানবিকতার মধ্যেই নিহিত।
বহু অর্থ ও ভাববোধক গল্পটির জন্য ধন্যবাদ শুভেচ্ছা রইল ।
******
১৯/০৭/২০২৬
আমার মন্তব্যঃ প্লেটোর  লেখা পড়ছিলাম। ডায়ালগ ভিত্তিক রচনার প্রভাবে এই রূপ হয়েছে, আমার লেখাটি। আমি সবসময় ভাবি, আসলেই মানুষের পরিচয় কিসে? কেবল শরীর, লিঙ্গ, জাতি বা সংস্কৃতিতে, নাকি তার চেয়েও গভীর কোনো মানবিক অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মার প্রকাশে? অবশ্যই শেষে এসে দাঁড়ায় আত্মার প্রকাশে। ফলে দেহের বহিঃরূপ অর্থহীন হয়ে যায়।
আর আত্মা যেহেতু আমাদের রিয়্যালিটি বা 3D  তে সীমাবদ্ধ নয়, সুতরাং  অজানায় –ই এর বিস্তৃতি। আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, সাধারণ জ্ঞানের অভাব এই রিয়্যালিটির বাইরে পদচারণায় সাহায্য করে না। কিন্তু প্রযুক্তিগত না হোক অন্তত দিব্যজ্ঞানের যেদিন প্রাপ্তি ঘটবে, সেদিন অবশ্যই সকলের চেতনা আরেক ধাপে উত্তীর্ণ হবে। আর সেই বছরটি এখন সামনে এসেছে। ২০২৬. এনার্জেটিকালি আমারা  এখন 4D তে আছি। যন্ত্রপাতির অভাবে তা প্রমাণ সম্ভব নয়। তাছাড়া কসমিক এনার্জি নাড়াচাড়া করা অত সহজও নয়, যা কিনা ‘বোধদয় প্রাপ্ত আত্মা’ অনায়াসে করে যেতে পারে।       

Thursday, July 9, 2026

মানিনী ঝেপেছে মুখ নিশীথিনী কেশে

 
“অভিমানিনী ঝেপেছে মুখ নিশীথিনী কেশে” can be translated poetically as:

“The sulking maiden has veiled her face with the tresses of the midnight night.”

or more naturally:

“The hurt-hearted woman hides her face behind the dark locks of night.”

A closer literary rendering:

“The aggrieved beloved has covered her face with the midnight’s flowing hair.”

Here:

  • অভিমানিনী = a woman filled with অভিমান — a tender mix of hurt, pride, wounded affection, and emotional withdrawal (English has no perfect single-word equivalent)

  • ঝেপেছে মুখ = has covered/hidden/veiled her face

  • নিশীথিনী কেশে = in the hair/tresses of the night (night personified as feminine)

“Sulking” captures part of অভিমান, but Bengali অভিমানিনী is much softer and more romantic — closer to a beloved who has withdrawn because her feelings were hurt.

----------------------

“মানিনী ঝেপেছে মুখ নিশীথিনী কেশে” is a very poetic line. A natural English rendering would be:

“The proud maiden has veiled her face with the tresses of the night.”

or more lyrically:

“The dignified lady hides her face beneath the flowing hair of midnight.”

Word meanings:

  • মানিনী = a proud/self-respecting/dignified woman (often a beloved woman in poetry)

  • ঝেপেছে মুখ = has covered/veiled her face

  • নিশীথিনী কেশে = with the hair/tresses of the night (personifying night as a woman)

The imagery suggests a woman hiding her face behind dark hair, comparing the hair to the deep darkness of midnight. Very classical Bengali romantic symbolism.

--------------------------------------

The phrase “মানী ছেয়ে গেছে নিশিথিনী নিভৃতে” appears poetic, but I think there may be a typo in “মানী” (possibly “মণি,” “মাটি,” “মায়া,” etc.). Translating the words as written:

“The night has been covered in silence and seclusion.”

More poetic rendering:

“In the quiet solitude, the night has been gently veiled.”

  • নিশিথিনী = the night (personified as a woman/lady of the night; a poetic word)

  • নিভৃতে = in solitude, quietly, privately

  • ছেয়ে গেছে = has covered / has spread over / has been enveloped

If you meant “মায়া ছেয়ে গেছে নিশিথিনী নিভৃতে”, it would be closer to:

“A veil of enchantment has spread over the silent night.” (very Tagore-like imagery)


Wednesday, June 3, 2026

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির আদিকথা

 প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকাতে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামক প্রদীপটির সলতে হল ঠাকুর পরিবার। তাই রবীন্দ্রনাথকে জানার আগে ঠাকুর পরিবারকে জানতেই হয়।

রবীন্দ্রনাথের জন্মের আগে থেকেই বাংলার আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের নাম ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন বা প্রিন্স দ্বারকানাথের ব্যবসা উদ্যোগের ইতিবৃত্ত অনেকেরই জানা। কিন্তু ঠাকুর পরিবারের ইতিহাস আরও পুরনো। কৃষ্ণ কৃপালনী তাঁর “দ্বারকানাথ ঠাকুর: বিস্মৃত পথিকৃত” গ্রন্থে ঠাকুর পরিবারের আদি ইতিহাসের যে চিত্র এঁকেছেন তা রীতিমতো বিস্ময়কর।

মনে করা হয়, ঠাকুর পরিবারের আদিপুরুষ ছিলেন শাণ্ডিল্য গোত্রীয় বেদজ্ঞ পণ্ডিত ভট্টনারায়ণ। সংস্কৃত সাহিত্যে তাঁর প্রসিদ্ধি “বেণীসংহার” নাটকের রচয়িতা রূপে। ভট্টনারায়ণের সঠিক সময়কাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, মোটামুটিভাবে তিনি খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে বর্তমান ছিলেন।

ভট্টনারায়ণের বংশধর ধরণীধর ছিলেন “মনু সংহিতা”-র টীকাকার। ধরণীধরের পৌত্র ধনঞ্জয় ছিলেন বল্লালসেনের রাজ্যের একজন ন্যায়াধীশ এবং বৈদিক শব্দের ‘নির্ঘণ্ট’-এর সংকলক। তাঁর বংশধর হলায়ুধ লক্ষ্মণসেনের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনিও অনেক সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই সকল কিংবদন্তীর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে নানা মত থাকলেও, একথা সকলেই মনে করেন যে ভট্টনারায়ণের বংশধরেরা অনেকেই বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জনে সক্ষম হন।

নগেন্দ্রনাথ বসু ও ব্যোমকেশ মুস্তাফি “বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস” গ্রন্থে ঠাকুর পরিবারকে ভট্টনারায়ণের চতুর্দশ পুত্র দীনের সাক্ষাৎ বংশধর বলে উল্লেখ করেছেন। মহারাজ ক্ষিতিশূর দীনকে বর্ধমানের নিকটবর্তী কুশ নামক একটি গ্রাম দান করেছিলেন। এই গ্রামের নামানুসারে দীন ও তাঁর বংশধরেরা ‘কুশারী’ পদবীতে ভূষিত হন। পরবর্তীকালে কুশারীরা বর্ধমান থেকে চলে আসেন যশোহর-খুলনা অঞ্চলে।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ পারিবারিক শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠানে উর্ধ্বতন দশ পুরুষের যে নামাবলি আবৃত্তি করতেন, তাতে প্রথমেই থাকত পুরুষোত্তম অর্থাৎ পুরুষোত্তম বিদ্যাবাগীশের নাম। তিনি ছিলেন ভট্টনারায়ণের অধস্তন পঞ্চবিংশতিতম (২৫) পুরুষ। পুরুষোত্তমের সময়েই ঠাকুর পরিবারের পারিবারিক কৌলিন্য বিনষ্ট হয়। পুরুষোত্তম অথবা তাঁর পিতা পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারী যশোহরের চেঙুটিয়ার পিরালি ব্রাহ্মণ শুকদেবের কন্যাকে বিবাহ করে পিরালী থাকভুক্ত হন।

পুরুষোত্তমের অধস্তন পঞ্চম পুরুষ ছিলেন দুই ভাই মহেশ্বর ও শুকদেব। এঁরা যশোহরেই বাস করতেন। পারিবারিক বিবাদের কারণে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে মহেশ্বরের পুত্র পঞ্চানন কাকা শুকদেবকে নিয়ে চলে আসেন গঙ্গাতীরে গোবিন্দপুর গ্রামে (অধুনা কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম ও ময়দান অঞ্চল)। এই পঞ্চানন কুশারীই হলেন ঠাকুর পরিবারের ইতিহাসসিদ্ধ আদিপুরুষ।

পঞ্চানন কুশারী ছিলেন বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। জাতসংস্কার তাঁর মনে ছিল। কলকাতায় এসে জাহাজওয়ালাদের মাল সরবরাহের কাজ শুরু করলেন। বসতি স্থাপন করলেন জেলেদের পাড়ায়। এই পাড়ায় ইতিপূর্বে কোনো ব্রাহ্মণের আগমন হয়নি। তাই মহা আনন্দে তারা অভ্যর্থনা জানালেন পঞ্চাননকে। তাঁদের মুখে পঞ্চানন কুশারী হলেন ‘ঠাকুরমশাই’। ইংরেজরাও তাঁকে ‘ঠাকুর’ নামেই ডাকতে শুরু করল; কেবল নামটি তাদের মুখে বিকৃত হয়ে দাঁড়াল ‘টেগোর’। এরপর কুশারী পদবী উঠে গেল – তাঁরা নিজেরাও ঠাকুর পদবী ব্যবহার শুরু করলেন।

১৭০৭ সালে রালফ সেলডন কলকাতার প্রথম কালেক্টর নিযুক্ত হলে কোম্পানির উপর নিজ প্রভাব খাটালেন পঞ্চানন। সেলডন তাঁর দুই পুত্র জয়রাম ও সন্তোষরামকে বহাল করলেন আমিন পদে। এরপর জরিপ, জমিজমা কেনাবেচা ও গৃহনির্মাণে দালালি করে দুজনেই বেশ দুপয়সা কামালেন। ধর্মতলা অঞ্চলে নিজস্ব বসতবাটী তুললেন জয়রাম। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ ও মারাঠা খাত (যার বর্তমান রূপ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড-আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড) নামক পরিখা খননের তদারকিও করেছিলেন জয়রাম।

জয়রামের চার ছেলের মধ্যে নীলমণি ঠাকুর ও দর্পনারায়ণ ঠাকুর ছিলেন যথাক্রমে জোড়াসাঁকো ও পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুর পরিবারের আদিপুরুষ। ১৭৬৫ সালে কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করলে, উড়িষ্যার কালেক্টর হন নীলমণি। দর্পনারায়ণ কলকাতায় বসেই নানা উপায়ে অর্থ উপার্জন করে ধনী হয়ে ওঠেন। দুই ভাই মিলে সুতানুটির পাথুরিয়াঘাটায় নির্মাণ করলেন বিরাট বসতবাটী। পরে পারিবারিক বিবাদের ফলে পাথুরিয়াঘাটার বাড়ি ও কিছু ভূসম্পত্তি দর্পনারায়ণকে দিয়ে গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দনকে সঙ্গে নিয়ে পাথুরিয়াঘাটার বাস ওঠালেন নীলমণি। চিৎপুর রোডের পূর্বে মেছোবাজারে জমি কিনে তুললেন নিজের আলাদা বসতবাটী। এই মেছোবাজারই পরে পরিচিত হয় জোড়াসাঁকো নামে। আর নীলমণি ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত এই বাড়িটিই হল আজকের জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি।

নীলমণি ঠাকুর ছিলেন গোঁড়া বৈষ্ণব ও ধর্মভীরু মানুষ। সে সংস্কার তাঁর পুত্র রামলোচন ঠাকুরের মনে কিছুমাত্র ছিল না। মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় রাজধানী স্থানান্তরিত হলে বহু অভিজাত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি সেখানকার বাস উঠিয়ে চলে আসেন কলকাতায়। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে আসেন তাঁর পৃষ্ঠপোষতাপুষ্ট বহু গাইয়ে, বাজিয়ে, বাইজি ও বারাঙ্গণা। এঁরা আশ্রয় নেন জোড়াসাঁকোর উপকণ্ঠে চিৎপুর পাড়ায়। এইসব গাইয়ে-নাচিয়েদের একজন সমঝদার পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠেন রামলোচন।

নীলমণি ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র রামমণি ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরদাদা দ্বারকানাথ ঠাকুর। অপুত্রক রামলোচন দ্বারকানাথকে দত্তক নেন। ১৮৩৪ সালে উইলিয়াম কার নামে এক ইংরেজ অংশীদারকে নিয়ে তিনি স্থাপন করেন কার-টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি। ক্রমে দ্বারকানাথের হাত ধরে ঠাকুর পরিবারের আর্থিক সমৃদ্ধি চরমে ওঠে। দ্বারকানাথ পরিচিত প্রিন্স দ্বারকানাথ নামে। বাঙালি থেকে ইংরেজ সমাজ – সর্বত্রই ছিল তাঁর অবাধ প্রতিপত্তি। উপার্জন করতেন যেমন, দুহাতে ব্যয় ও অপব্যয়ও করতেন তেমনই। বাড়িতে নিয়মিত ভোজসভা ও নৃত্যগীতের আসর বসত। এইসব ভোজসভায় সামাজিকতার খাতিরে মদ্যমাংসও পরিবেশিত হত। দ্বারকানাথ নিজে সে সব কখনও গ্রহণ না করলেও, এই নিয়ে তাঁর গৃহে পারিবারিক অশান্তি উপস্থিত। তাঁর ধর্মপ্রাণা নিষ্ঠাবতী স্ত্রী দিগম্বরী দেবী তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ-সম্পর্ক পরিত্যাগ করেন। স্ত্রীর বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ না করে দ্বারকানাথ বাড়ির বৈঠকখানার একটি অংশে বসবাস শুরু করেন এবং বেলগাছিয়ায় একটি বাগানবাড়ি ক্রয় করে সেখানেই ভোজসভা ও নৃত্যগীতের আসর বসাতে শুরু করেন। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন তাঁর বন্ধু। কিন্তু দ্বারকানাথ নিজে সনাতন হিন্দু সংস্কার ত্যাগ করেননি, আবার বন্ধুর ধর্মসংস্কারের বিরোধিতাও করেননি। বরং সতীদাহ নিবারণে রামমোহনকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছিলেন দ্বারকানাথ। রামমোহনের মৃত্যুর পর যে ব্রাহ্মসভার অবলুপ্তি ঘটেনি, তার কারণ দ্বারকানাথের অর্থসাহায্য। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, “সুবিধার জন্য লোকাচার মানতেন, আবার সুবিধার জন্য সাহেবিয়ানাও করতেন, কিন্তু সাহেবি পোষাক পরিচ্ছদ কখনও পরেননি।”

১৮৪৩ সালে দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ পিতার অসম্মতি সত্ত্বেও ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলেন। এরপর দ্বারকানাথের মৃত্যু হলে পিতার ব্যবসার কাজকর্ম নিজে হাতে গ্রহণ করলেন দেবেন্দ্রনাথ। তাঁর ছত্রছায়ায় একেশ্বরবাদ ও নব্য চিন্তাকে পাথেয় করে সমাজের বিপরীত স্রোতে শুরু হল ঠাকুর পরিবারের নতুন এক যাত্রা। এই যাত্রার সূচনাপর্বেই জন্ম রবীন্দ্রনাথের।