২২ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩৪০
আমার মন্তব্যঃ কোরানের ৫৭ নম্বর সূরার ২৫ নং আয়াতে বলেছে। সূরার নাম Surah Hadeed যার অর্থ লৌহ। এবং লৌহের atomic number -ও ৫৭
জাকারিয়া কামাল সাহেব তাঁর 'সাইন্টিফিক তাফসিরে' আলাপ করেছিলেন। সেই কত আগে। আশা করি তাঁর লেকচার সিরিজ শুনেছেন। ওনার লেকচার খুঁজে পেতে দেরী হবে বিধায় আমি এই লিঙ্ক খানা পাঠালাম। https://www.iqrasense.com/quranic-tafsir/surah-hadeed-iron-miracle-in-the-quran.html
******************
২২ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫০
লেখক বলেছেনঃ ধন্যবাদ আবার এসে প্রাসঙ্গিক লিংকটি যুক্ত করে দেয়ার জন্য । লিংকটি ফলো করে তা মনযোগ দিয়ে পাঠ করে এলাম। আমরা সকলেই জানি কুরআন মানবজাতির জন্য নৈতিক ও আত্মিক নির্দেশনার সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।
সূরা হাদীদ ( কোরানে থাকা৫৭ তম সুরা) বিশেষভাবে লোহা এবং তার সামাজিক ও নৈতিক প্রভাবকে নির্দেশ করে। সূরা হাদীদ এর ২৫ নম্বর আয়াতাংশে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ...আর আমরা লোহা নাযিল করেছি; এতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহু উপকার…(সূরা হাদীদ: ২৫)
আধুনিক সময়ে আপনার দেয়া লিংকে থাকা তাফসির সহ অনেকেই এই আয়াতকে ভিত্তি করে বলেন যে, কুরআন এখানে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা প্রকাশ করেছে; কারণ আধুনিক বিজ্ঞান মতে পৃথিবীর লোহা নাকি সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাকাশ থেকে এসেছে, আর কুরআনে একে ‘নাযিল করা বা “sent down” শব্দ ব্যবহার করেছে।
অলোচ্য বিজ্ঞ তাফসিরকারের প্রতি যথাযোগ্য সস্মান দিয়েই বলছি এই দাবিটি বিশ্লেষণ করার সময় আমাদের আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি।
প্রথমত sent down তথা নাযিল করা শব্দটি শুধু আকাশ থেকে ভৌত বস্তু নামানোর অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বরং এটি বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে নিয়ামত দান করা বোঝাতে,ব্যবস্থার সূচনা করা বোঝাতে, মানুষের জন্য উপযোগী করে দেওয়া বোঝাতে।উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কুরআনে বলা হয়েছে, -আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি ( সূরা আল আ‘রাফ আয়াতঃ ২৬ , অথচ পোশাক আকাশ থেকে পড়েনি।
বলা হয়েছে, -চতুষ্পদ জন্তু নাযিল করেছি-( সূরা আজ জুমার আয়াত ৬ ) পশুও আকাশ থেকে আসেনি। অতএব, লোহা নাযিল করেছি মানে এই দাবি করা বাধ্যতামূলক নয় যে লোহা আক্ষরিক অর্থে আকাশ থেকে পতিত হয়েছে; বরং অর্থ হতে পারে লোহাকে মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি ও প্রাপ্য করে দিয়েছেন।
লোহা বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞান বলে যে- ভারী মৌল (যেমন লোহা) সুপারনোভা বিস্ফোরণে তৈরি হয় ,পরে তা পৃথিবীর গঠনের অংশ হয়েছে ।এটি বর্তমানে একটি স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, কিন্তু বিজ্ঞান নিজেই পরিবর্তনশীল। ইতিহাসে বহু নিশ্চিত তত্ত্ব পরে সংশোধিত বা বাতিল হয়েছে।
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন আমরা কুরআনের আয়াতকে কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সঙ্গে একেবারে একীভূত করে ফেলি। যদি বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে ভবিষ্যতে সেই তত্ত্ব বদলে যায়, তবে মানুষ ভাবতে পারে কুরআন ভুল! অথচ ভুল ছিল আমাদের ব্যাখ্যায়।
সূরা হাদীদের মূল উদ্দেশ্য বা আলোচ্য বিষয় বিজ্ঞান নয়, বরং নবীদের প্রেরণ,ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, শক্তি ও ক্ষমতার নৈতিক ব্যবহার, লোহার মাধ্যমে সভ্যতা, প্রতিরক্ষা ও ইনসাফ কায়েম। লোহা এখানে ক্ষমতা ও শক্তির প্রতীক; এটি দিয়ে যেমন জুলুম হয়, তেমনি এটি দিয়েই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হয়। আল্লাহ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন,এই শক্তির উৎস মানুষ নয়, বরং আল্লাহ।
তবে এ কথা বলাও ঠিক নয় যে এখানে কোনো বিস্ময় নেই। বিস্ময় হলো কুরআন ১৪০০ বছর আগে লোহাকে মানুষের সভ্যতার কেন্দ্রে স্থাপন করেছে,শক্তি ও কল্যাণ দুই দিকই একসঙ্গে উল্লেখ করেছে, বস্তুগত শক্তির সঙ্গে নৈতিক দায়িত্বকে যুক্ত করেছে কিন্তু এই বিস্ময়কে বৈজ্ঞানিক মিরাকলে রূপ দেওয়া কুরআনের গভীর উদ্দেশ্যকে আড়াল করে ।মুল কথা হল কুরআন কোনো বিজ্ঞান বই নয়, কুরআনের ভাষা বহুমাত্রিক Sent down বা নাযিল করা শব্দটি কেবল আকাশ থেকে পতনের অর্থে সীমাবদ্ধ নয়।
বিজ্ঞান কুরআনের সত্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড নয় বরং কুরআন মানুষকে চিন্তা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধে উন্নীত করার গ্রন্থ ,আসল মিরাকল হলো কুরআন নীজেই ।
আলোচনার সাথে প্রামাণ্য ইসলামী তাফসির (ইবন কাসীর, ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী, কুরতুবী প্রমুখ) যুক্ত করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি । এতে স্পষ্ট বোঝা যাবে ক্লাসিক্যাল স্কলাররা এই আয়াতকে কীভাবে বুঝেছেন এবং scientific miracle দাবির সাথে তার সম্পর্ক কোথায় সীমাবদ্ধ।
সূরা হাদীদ এর সম্পুর্ণ ২৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে ---নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রাসূলদের পাঠিয়েছি সুস্পষ্ট প্রমাণসহ, এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মীযান, যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। আর আমরা লোহা নাযিল করেছি তাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহু উপকার; এবং যাতে আল্লাহ প্রকাশ করে দেন কে তাঁকে ও তাঁর রাসূলদের অদৃশ্য অবস্থায় সাহায্য করে।(সূরা হাদীদ- ২৫)
প্রখ্যাত তাফসিরকার ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) তাঁর তাফসিরুল কুরআনিল আযীম-এ বলেন লোহা নাযিল করা বলতে বোঝানো হয়েছে; আল্লাহ লোহাকে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের ব্যবহারযোগ্য করে দিয়েছেন লোহার প্রচণ্ড শক্তি বলতে তিনি উল্লেখ করেন অস্ত্র,যুদ্ধসামগ্রী প্রতিরক্ষা ও শাস্তি কার্যকর করার উপকরণ হিসাবে।
ইবন কাসীর স্পষ্টভাবে বলেন, লোহা দ্বারা আল্লাহ ইনসাফ প্রতিষ্ঠার উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, যেমন তলোয়ার যা কখনো ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম, আবার কখনো মানুষের জন্য পরীক্ষা।
লক্ষ্যণীয় বিষয় ইবন কাসীর কোথাও বলেননি যে লোহা আক্ষরিকভাবে আকাশ থেকে নেমে এসেছে। তাঁর দৃষ্টি ছিল সামাজিক ও নৈতিক ব্যবস্থার দিকে।
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) তাঁর মাফাতিহুল গাইব (তাফসিরে কাবীর)-এ এই আয়াত নিয়ে অত্যন্ত দার্শনিক আলোচনা করেছেন।তিনি বলেন কিতাব ও মীযান (বিধান ও ন্যায়নীতি) যথেষ্ট না হলে সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ক্ষমতা (লোহা) অপরিহার্য । রাযী বলেন মানুষ কেবল যুক্তি দিয়ে নয়,কখনো কখনো শক্তি দিয়েও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়।
তিনি লোহার দুটি দিক উল্লেখ করেন যথাবাহ্যিক শক্তি (যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা),উপকারিতা (কৃষি, নির্মাণ, সভ্যতা), রাযীর দৃষ্টিতে আয়াতটি মূলত রাজনীতি, সমাজ ও ন্যায়বিচারের দর্শন।
ইমাম কুরতুবী (রহ.) তাঁর আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন-এ বলেন, লোহা হচ্ছে মানুষের জন্য এক বিশেষ নিয়ামত,এর দ্বারা: যুদ্ধ হয়,শাস্তি কার্যকর হয়, কৃষি ও নির্মাণ সম্ভব হয়।তিনি বলেন, আল্লাহ কিতাব দ্বারা হৃদয় সংশোধন করেন, আর লোহা দ্বারা সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন। এখানে নাযিল শব্দকে তিনি নিয়ামত দান অর্থে নিয়েছেন।
ক্লাসিক্যাল তাফসিরে নাযিল শব্দের অর্থ বিষয়ে আলোচনায় সব প্রধান মুফাসসিরগন একমত । সুরাটিতে থাকা نَزَّلْنَا / أَنزَلْنَا” শব্দটি কেবল ভৌত অবতরণ বোঝায় না, বরং বোঝায়:সৃষ্টি করা,নিয়ামত হিসেবে দান করা মানুষের আয়ত্তে আনা কেউই একে মহাকাশগত উৎসের দাবি হিসেবে ব্যাখ্যা করেননি।
এখন প্রশ্ন আসে তাহলে আধুনিক বিজ্ঞান যেটা বলছে, সেটা কি এই আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক?
উত্তর হল সাংঘর্ষিক নয়, কিন্তু আয়াতের মূল উদ্দেশ্যও নয়।কুরআন এখানে বিজ্ঞান শেখাতে আসেনি, বরং বলছে শক্তি ও ক্ষমতার উৎস আল্লাহ, এবং তা মানুষের জন্য পরীক্ষা। আধুনিক তত্ত্বকে আয়াতের একটি সম্ভাব্য সামঞ্জস্য হিসেবে দেখা যেতে পারে, তবে চূড়ান্ত তাফসির হিসেবে মেনে নেয়ার বিষয়টি বিজ্ঞ তাফসিরকারদের উপরই না হয় ছেড়ে দিলাম ।
শুভেচ্ছা রইল
...। ... ।
২২ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৩৩০
হুমায়রা হারুন বলেছেন: চমৎকার আলোচনা।
অনেক ধন্যবাদ।
এই লেখাটি দিয়েই তো একটি পোস্ট হয়ে যায়। আর 'হাজরে আসওয়াদ' এর কথা বললে আরো ভাল হবে। এই পাথরটি ও out of our planet থেকে আসা শুনেছি।
...
২৩ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৫০০
লেখক বলেছেনঃ আবার এসে কথা বলার জন্য ধন্যবাদ ।
মন্তব্যের ঘর থেকে কথা তুলে নিয়ে পৃথক পোষ্ট দিলে আমি গদ্যে পদ্যে প্রায় হাজার দশেক পোস্ট দিতে পারতাম । তবে মন্তব্য কোন ভাবে খুব বড় হয়ে গেলে তা মন্তব্যের ঘরে না লিখে পৃথক পোষ্ট দিয়ে দেই যেমনটি নির্বাচন নিয়ে আমার সামপ্রতিক পোস্ট । এটা নতুন নকিবের পোস্টে মন্তব্য লিখতে গিয়ে লেখার ফল ।
তাই সেটা সেখানে না দিয়ে পৃথক পোস্ট আকারে দিয়েছি ।
হাজরে আসোয়াদ এর উপরে আমার একটি বেশ বড় আকারের পোস্ট আছে । সেটা ব্লগে দিলে অনেকেই তার উপর বিরুপ মন্তব্য দিতে পারেন । তাই লেখাটিকে আরো ভাল করে কাটাঘসা করতে হবে বলে মনে হচ্ছে ।
শুভেচ্ছা রইল ।
...
কলাবাগান১ বলেছেন: পৃথিবীর সকল মেডিক্যাল গবেষনা বন্ধ করে কোদাল এর লোহা দিয়ে বাকা গাল সোজা করার পদ্ধতি নিয়ে গবেষনা আরম্ভ করার জোর দাবী জানালাম..লোহা দিয়ে এনার্জী ফিল্ড কে সোজা করার তরিকা পৃথিবীর তাবৎ বিজ্ঞানীদের জানা দরকার।
হায়রে মানব মনন এর এমন অবনতি অলৌলিক বিশ্বাসে
...
২৩ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৩০
লেখক বলেছেনঃ সম্মান রেখেই বলছি, আপনি হয়তো মন্তব্যগুলি পড়েছেন, কিন্তু প্রেক্ষাপটটা পড়েননি বা বুঝতে চাননি। পুরো আলোচনাই ছিল গল্পচ্ছলে বলা একটি রসিকতার ভেতরে আরেকটি রসিক মন্তব্য। এখানে কোথাও এটাকে মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট, গবেষণাযোগ্য পদ্ধতি বা পেটেন্টযোগ্য বিজ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
রসিকতায় বলা ভূত, এনার্জি ফিল্ড, আর গরম লোহা–কে যদি আক্ষরিক বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরিতে টেনে আনা হয়, তাহলে দোষ রসিকতার নয়, রসিকতা বোঝার ঘাটতির। সব কথার উত্তর গবেষণার দাবিতে দিতে গেলে আগে জানতে হবে কথাটা সিরিয়াস ছিল, নাকি নিছক গল্প আর হাসির খোরাক।
বিজ্ঞান যেমন যুক্তির জায়গা, তেমনি সমাজে গল্প, উপকথা আর রসিকতারও আলাদা জায়গা আছে। দুটো গুলিয়ে ফেললে একজন বিজ্ঞানী হলেও উপলব্ধিটা দুর্বলই থেকে যায়।
আশা করি পরের বার মন্তব্য করার আগে কথার ভঙ্গি আর উদ্দেশ্য এই দুটো বিষয়ও বিবেচনায় আসবে।
শুভেচ্ছা রইল


