ড. এম এ আলীঃ বেশ মনযোগ দিয়ে পড়লাম ।পাঠান্তে মনে হল এটা বম রাজার পুত্র প্রেম, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার এক মর্মস্পর্শী আখ্যান।
‘বম রাজার পুত্র’ পড়তে পড়তে একজন পাঠক হিসেবে প্রথম যে অনুভূতিটি তৈরি হয়, তা হলো এটি শুধু একজন সংগীতশিল্পীর প্রেমকাহিনি নয়; বরং প্রেমের মোহ, আত্মবিসর্জন, পারিবারিক বিচ্ছেদ, দাম্পত্যের বাস্তবতা এবং দীর্ঘদিনের অপূর্ণতার মধ্য দিয়ে একজন মানুষের ভেতরে ভেঙে পড়ার গল্প।
পূর্ণ বম চরিত্রটির মধ্যে একই সঙ্গে রাজপুত্রের আদর, শিল্পীর সংবেদনশীলতা, প্রেমিকের আবেগ এবং একজন মানুষের দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে যে মানুষটি নিজের পরিবার, গোত্র, সমাজ এমনকি সংগীতজীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে অজানার পথে পাড়ি জমায়, পরবর্তী জীবনে সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি তাকে কীভাবে তাড়িয়ে বেড়ায় লেখাটির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাগুলোর একটি এটি।
আপনার লেখাটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রেমিকা ও স্ত্রী র সম্পর্কের পার্থক্যকে সামনে আনা। প্রেমের সময়ে যে মানুষটিকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে সম্পূর্ণ মনে হয়, সংসারের বাস্তবতায় সেই সম্পর্কই কীভাবে দায়িত্ব, প্রত্যাশা, অভিমান ও অপূর্ণতার ভারে ক্লান্ত হয়ে উঠতে পারে আপনি তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে ‘পূর্ণ’নামের মধ্যেই যে পূর্ণতার ইঙ্গিত, গল্পের শেষে সেটিই যেন গভীর ব্যঙ্গাত্মক অর্থ বহন করে। জীবনের এত কিছু পেয়েও মানুষটি শেষ পর্যন্ত মানসিকভাবে অপূর্ণ।
দুই দশক পর পূর্ণের ফিরে আসা অংশটি পাঠক হিসাবে মনে বিশেষ দাগ কাটে। বাইরে থেকে সে তখনও তারকা ভক্ত আছে, কনসার্ট আছে, নেতৃত্ব আছে, জনপ্রিয়তা আছে; কিন্তু অন্তরে বহন করছে এক পুরোনো ক্ষত। এই বৈপরীত্যটিই গল্পের সবচেয়ে মানবিক দিকগুলোর একটি। একজন মানুষের বাহ্যিক সাফল্য আর ভেতরের নিঃস্বতার মধ্যে যে বিপুল দূরত্ব থাকতে পারে, পূর্ণ চরিত্রের মধ্য দিয়ে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
লেখার ভাষা খুবই আবেগপ্রবণ এবং দৃশ্যধর্মী। বিশেষ করে বিমানযাত্রার দৃশ্য, দলের সদস্যদের সঙ্গে পূর্ণের আচরণ, বিদেশের মাটিতে থেকেও ভাতের সঙ্গে কাঁচা মরিচ চাওয়ার মতো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো চরিত্রটিকে পাঠক হিসাবে আমাদের কাছে জীবন্ত করে তোলে। এসব জায়গায় াআপনি গল্পের বৃহৎ আবেগের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সহজ বাস্তবতাকে সুন্দরভাবে মিলিয়েছেন।
তবে পাঠক হিসেবে মনে হল কিছু জায়গায় ভাষার পুনরাবৃত্তি এবং অতিরিক্ত আবেগঘন বর্ণনা কিছুটা কমানো গেলে গল্পের অভিঘাত আরও গভীর হতে পারত। বিশেষ করে শ্রাবণীর শারীরিক পরিবর্তন বর্ণনার পরিবর্তে তার মানসিক পরিবর্তন, সম্পর্কের ভাঙন এবং পূর্ণের অন্তর্দ্বন্দ্বকে আরও বিস্তৃত করা হলে চরিত্র দুটির জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত বলে মনে হয়। কারণ গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নটি আসলে পূর্ণ কি শ্রাবণীকে ভালোবেসেছিল, নাকি শ্রাবণীর প্রতি নিজের মোহকেই ভালোবাসা ভেবেছিল? এই প্রশ্নটি পাঠক হসাবে আমাদের মনে দীর্ঘসময় থেকে যায়।
সর্বোপরি বম রাজার পুত্র এমন একটি গল্প, যেখানে প্রেমের শুরু যতটা উজ্জ্বল, তার পরিণতি ততটাই বিষণ্ণ। পূর্ণের জীবনে শ্রাবণী একসময় প্রেমের প্রতীক, পরে অনুশোচনার প্রতীক এবং শেষ পর্যন্ত তার অপূর্ণতারই আরেক নাম হয়ে ওঠে। তাই গল্পের শেষ বাক্য এই নামটি পূর্ণ-র সকল অপূর্ণতা শুধু একজন নারীর নামকে নির্দেশ করে না এটি যেন পূর্ণের সমগ্র জীবনের এক করুণ সারাংশ।
গল্পটির পাঠ শেষ করার পর মনে হয় মানুষ জীবনে অনেক কিছু ফিরে পেতে পারে, কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু সম্পর্ক এবং কিছু হারানো সময় কখনোই আগের জায়গায় ফিরে আসে না। আর সেই না-ফেরার বেদনাই বম রাজার পুত্র এর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনুভূতি।
শুভেচ্ছা রইল
