Thursday, August 13, 2026

যে বয়সে এসে আর কারও অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না- রয়া চৌধুরী

জীবনের একটা সময় আসে—যখন মানুষ আর কাউকে বোঝাতে চায় না যে সে ভালো, সে যোগ্য, সে সফল কিংবা সে সুখী। কারণ তখন মানুষ বুঝে যায়—নিজের মূল্য বোঝার জন্য অন্যের স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই। শুরুতে সবাই validation খুঁজে।কে কী বলল, কে প্রশংসা করল, কে পাশে থাকল, কে তার সাফল্যে খুশি হলো—এসবের ওপর অজান্তেই নিজের আত্মমূল্যকে দাঁড় করিয়ে দেয়। বিশেষ করে অল্প বয়সে, কৈশোরে কিংবা তারুণ্যের শুরুতে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, গ্রহণযোগ্যতা এবং কারও জীবনে বিশেষ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি তীব্র থাকে। তখন মনে হয়—কেউ একজন থাকতেই হবে, যে বুঝবে, আগলে রাখবে, পাশে থাকবে। ভালোবাসাকে তখন অনেক সময় জীবনের পূর্ণতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সময় মানুষকে ভালোবাসার আরেকটি গভীর অর্থ শেখায়।

প্রতিটি মানুষেরই ভালোবাসা প্রয়োজন। সঙ্গ প্রয়োজন। একজন আপন মানুষের প্রয়োজন। মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে বাঁচার জন্য তৈরি নয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, নিজের অস্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে কোনো সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র। প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, চিন্তা, স্বাধীনতা, স্বপ্ন এবং নিজস্ব এক পৃথিবী আছে।

দুটি মানুষ একে অপরকে ভালোবাসতে পারে, অথচ তাদের পৃথিবী একেবারে একই রকম নাও হতে পারে। সঙ্গ মানে একে অপরের অস্তিত্বকে গ্রাস করে ফেলা নয়; বরং পাশাপাশি থেকেও একে অপরের স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করা। যে সম্পর্ক কারও অস্তিত্বের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, যে ভালোবাসা কারও স্বাধীনতা, আত্মসম্মান কিংবা মানসিক শান্তিকে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করে—সেই ভালোবাসা যত গভীরই হোক, তার আশ্রয়ের মূল্য একসময় ফুরিয়ে যায়।

ভালোবাসা কখনো এমন হওয়া উচিত নয় যেখানে একজনকে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে হয়।

ভালোবাসা পাওয়াই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। কখনও কখনও দূরত্বের মধ্যেও ভালোবাসা বেঁচে থাকে। কখনও কাছে না থেকেও কারও জন্য মঙ্গল কামনা করা যায়।
কখনও কাউকে না পেয়েও তার প্রতি অনুভূতিটুকু সুন্দর থেকে যেতে পারে। কারণ সব ভালোবাসার পরিণতি একসঙ্গে থাকা নয়। কিছু ভালোবাসার পরিণতি হয় শান্তভাবে দূরে সরে যাওয়া।
আর আশ্চর্যের বিষয়—সময় পেরোতে পেরোতে মানুষ এটাও বুঝতে শেখে যে, না পাওয়ার মধ্যেও এক ধরনের শান্তি আছে। সব অনুভূতিকে অধিকার করতে হয় না। কিছু অনুভূতিকে শুধু অনুভব করেও বেঁচে থাকা যায়।

আজকের সমাজে এই উপলব্ধিটা আরও জরুরি। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনে তুলনা, প্রতিযোগিতা এবং validation-এর প্রয়োজনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কে কতটা সফল, কে কতটা জনপ্রিয়, কার সম্পর্ক কতটা সুন্দর, কার জীবন কতটা আকর্ষণীয়—মানুষ প্রায় প্রতিদিন অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করছে।

কেউ একটু এগিয়ে গেলে তাকে অভিনন্দন জানানোর পরিবর্তে তার ভুল খোঁজা হচ্ছে। কেউ আলোয় এলে তাকে টেনে নামানোর চেষ্টা হচ্ছে। কারও সৌন্দর্য, প্রতিভা কিংবা সাফল্য অন্য কারও ভেতরে অনুপ্রেরণার বদলে অস্বস্তি তৈরি করছে। কারণ অন্যের সাফল্য অনেক সময় মানুষের নিজের অপূর্ণতাকে সামনে এনে দাঁড় করায়। সেখান থেকেই জন্ম নেয়—হিংসা, অসহিষ্ণুতা, কটাক্ষ, প্রতিযোগিতা এবং অকারণ বিদ্বেষ। আর এই পরিবেশের মধ্যেই মানুষ একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন সে বুঝতে শেখে—সবাইকে কাছে রাখার প্রয়োজন নেই। সব কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সব ভুল বোঝাবুঝি পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। সব সম্পর্ককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। যে সম্পর্ক প্রতিনিয়ত আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, যে সঙ্গ মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়, যে মানুষ অন্যের আনন্দে আনন্দিত হতে পারে না—তার থেকে দূরত্ব তৈরি করা নিষ্ঠুরতা নয়।
কখনও কখনও দূরত্বই আত্মসম্মানের সবচেয়ে শান্ত রূপ। পরিণত বয়সে এসে মানুষ তাই সঙ্গী বেছে নেওয়ার অর্থও নতুন করে বুঝতে শেখে। সঙ্গী মানে এমন কেউ নয় যার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হবে। বরং এমন একজন, যার পাশে থেকেও একজন মানুষ নিজের মতো থাকতে পারে। নির্ভরতা থাকবে, কিন্তু আত্মপরিচয় হারিয়ে নয়। ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু অধিকারবোধে শ্বাসরুদ্ধ করে নয়। সঙ্গ থাকবে, কিন্তু স্বাধীনতার বিনিময়ে নয়। সুস্থ ভালোবাসা মানুষকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও বেশি নিজের মতো হয়ে উঠতে সাহায্য করে। হয়তো এ কারণেই বয়সের সঙ্গে ভালোবাসার সংজ্ঞাটাও বদলে যায়।
একসময় ভালোবাসা মানে মনে হয়—“কেউ আমাকে চাইবে।”
আর একসময় এসে ভালোবাসার অর্থ হয়ে দাঁড়ায়:
“যে মানুষটির সঙ্গে থাকব, তার পাশে থেকেও যেন দুজনেই নিজেদের মতো থাকতে পারি।”
এই পার্থক্যটাই হয়তো পরিণত হওয়ার সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষা।
একটা সময় আসে, যখন মানুষ আর জিজ্ঞেস করে না—
“মানুষ আমাকে কীভাবে দেখছে?”
বরং নিজেকে প্রশ্ন করে—
“আমি নিজেকে কীভাবে দেখছি?”
কারণ শেষ পর্যন্ত কেউ যখন একা থাকবে, তখন তার পাশে থাকবে তার নিজের বিবেক, তার আত্মসম্মান এবং নিজের সঙ্গে তার সম্পর্ক। তখন আর কারও পেছনে ছুটতে ইচ্ছে করে না। কারও স্বীকৃতি ভিক্ষা করতে ইচ্ছে করে না। অকারণ প্রতিযোগিতায় নামতে ইচ্ছে করে না। এমনকি ভালোবাসাকেও আঁকড়ে ধরে রাখতে ইচ্ছে করে না। শুধু মনে হয়—
আমি আমার পথে হাঁটছি।
তুমি তোমার পথে হাঁটো।
তোমার আলো আমার আলো কমায় না,
আর আমার আলো তোমার আলো নিভিয়ে দেয় না।
জীবনটা প্রতিযোগিতা নয়। জীবনটা নিজের ভেতরের মানুষটিকে একটু একটু করে আরও সুন্দর করে তোলার যাত্রা। আর যে মানুষটি একদিন সত্যিই নিজের মূল্য বুঝে ফেলে — সে আর ভিড়ের করতালির জন্য বাঁচে না। সে ভালোবাসে, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে নয়। 
সে সঙ্গ চায়, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের বিনিময়ে নয়।
সে দূরত্ব মেনে নিতে শেখে, না-পাওয়াকেও শান্তিতে গ্রহণ করতে শেখে। এবং শেষ পর্যন্ত—সে নিজের ভেতরের শান্তির জন্য বাঁচতে শেখে।

১৩ই সেপ্টেম্বর,২০২৬

Copy_right_reserved

Friday, August 7, 2026

পুস্তক সমালোচনা

পুস্তক সমালোচনা – জীবনেরে কে রাখিতে পারে, লেখক ফিরোজা হারুন

মহিলা বিষয়ক অনুষ্ঠান – অংগনা, বাংলাদেশ বেতার,ঢাকা

পাঠক – নাজনীন তৌহিদ

রেকর্ডিং ১৬/১১/২০১১, প্রচার ১৮/১১/২০১১

 

মানুষ কেবল যাপিত জীবন নিয়েই ব্যস্ত হয়। হাস-ফাস করা জীবনেও কখনো তার মন গেয়ে ওঠে, নেচে ওঠে। নিজের ভুবনে সে একাকী বিচরণ করতে চায় কিছুক্ষণ।এই ‘একান্ত কিছুক্ষণ’ সময়টাতে সে কোন এক নিঃস্বার্থ বন্ধুকে সাথী হিসাবে খুঁজে নিতে পারে, যে কেবল নিজেকে বিলিয়ে দিতেই জানে। ধারণা করতে পারেন এমন বন্ধু কে? হ্যা, আমি সেই বন্ধুটির কথা বলছিলাম – বই!

বই– ই  আমাদের নিত্যসংগী।আমাদের বন্ধু!

বই-ই হতে পারে নিরানন্দ জীবনের এতটুকু আনন্দের উপকরণ। আর এক্ষেত্রে  সময়োপযোগী বই পারে মনের ক্ষুধা নিবারণ করতে। শ্রোতা বন্ধুদের সবার মনের অবস্থা যেহেতু আমার অজানা,তাই নিত্যকার মতো আমার পছন্দের একটি বই নিয়ে এলাম আজকের আলোচনায়। এটি একটি উপন্যাস।উপন্যাসটির নাম ‘জীবনের কে রাখিতে পারে।’ লিখেছেন ফিরোজা হারুন।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে মম প্রকাশনা থেকে।এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন রফিক উল্লাহ্‌। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা –৬০ এবং এর মূল্য হাতের নাগালে, মাত্র ৪৫ টাকা।

বইটির ভেতরকার বিষয়বস্তু জানবার আগে জেনে নেয়া যাক লেখকের পরিচিতি।

লেখিকা ফিরোজা হারুনের জন্ম ময়মনসিংহ জেলার, ত্রিশাল উপজেলার, হরিরামপুর গ্রামে।লেখাপড়া প্রথমে ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয় এবং কুমুদিনী কলেজ টাঙ্গাইল হতে।এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে ইতিহাসে এম.এ.সম্পন্ন করেন।তারপর ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ফর উইমেন থেকে বি.এড. ডিগ্রী অর্জন করেন।পরবর্তীতে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে সিনিয়র জিওগ্রাফি টিচার হিসাবে শিক্ষকতা করলেও তিনি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাঁর লেখা বেশ ক’টি উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ, ৭১ এর স্মৃতিকথা, গল্প ও প্রবন্ধ সংকলন ও শিশু–কিশোর সংকলন  ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে এবং পাঠক মহলে বেশ সাড়া জাগিয়েছে লেখিকার প্রথম উপন্যাস ‘জীবনেরে কে রাখিতে পারে।’

ফেরা যাক এই উপন্যাসটির বিষয়বস্তুর দিকে। এখানে দু’টি গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। একটির প্রধান চরিত্র একজন নারী যিনি একজন স্ত্রী। অন্য গল্পটির প্রধান চরিত্র একজন পুরুষ, যিনি প্রথম গল্পের নায়িকার স্বামী।লেখিকার ভাষায় গল্পের চরিত্র দু’টি কল্পনা ভিত্তিক তবে বাস্তবতা নির্ভর।  

নায়িকা নীলা সংসার জীবনে আবদ্ধে থেকেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আবিষ্কার করে গেছে মানুষ কখনোই পরিপূর্ণ নয়।জীবনে অনেক পাওয়ার মাঝেও থাকে না পাওয়ার হা হা–কার, যা তাকে কুড়ে কুড়ে ছিঁড়ে ফেলে। তবে এ না পাওয়াকে যে জয় করতে পারে, সেই জয়ী । সেই-ই জীবনের সত্যিকারের স্বাদ পায়।কল্পনা ভিত্তিক গল্প ছেড়ে যদি বাস্তব জীবনে তাকাই,তবু কি দেখব না সুখ খুঁজতে খুঁজতে একসময় অসুখের অসুখে ভুগে জীবনের যবনিকার পতন হয় !এখানেও তাই। সুখ হাতের নাগালে পেয়েও তাকে ছুঁতে পারেনি নীলা। এক হা হা–কার নিয়ে জীবন শেষ হয়ে যায় তার।অন্যদিকে তার স্বামী ইলিয়াস খান স্ত্রীর প্রতি অবিচার করেননি। ভালবেসেছেন। অথচ ভালবাসার কথা বলে তাকে প্রতারিত করতে চাননি। এই অভিব্যক্তি তার দ্বিতীয় গল্পে ফুটে উঠেছে।

উপন্যাসে স্বামী স্ত্রী আর সংসার জীবনের এক জটিল বিষয় ফুটে উঠেছে।যেখানে বিশ্বাস, অবিশ্বাস, মান–অভিমান, পরস্পর বোঝাপড়া কিংবা ভালবাসা, দুঃখবোধ সব কিছুই রয়েছে, যা হয়তো কারো কারো জীবনে চরম বিপর্যয় বয়ে আনে।তবে বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে একে জয় করাই এর মুখ্য বিষয়।গল্পের নীলা চরিত্র খুবই বুদ্ধিদীপ্ত এক নারী চরিত্র। একটি পরিচ্ছন্ন গল্প হিসেবে পাঠক হৃদয়ে গেঁথে যাবে অনায়াসে। হয়ত অনেকে এ গল্পের মাঝে জীবনের সমাধানও খুঁজে পাবেন। আর সে ক্ষেত্রে লেখক তার লেখনিতে সার্থক হবেন তখনই।     

     

মহাজগত বিষয়ে আমার গবেষণায় এআই সহায়তা - ফরিদ আহমেদ চৌধুরী

: কোন কিছু না থাকা শূন্য অসীম ছিল।  কারণ তাতে তাকে সীমা দেওয়ার মত কিছুই ছিল না।  সেই শূন্যে কোন কিছু হতে কোন বাধা ছিল না। কে বাধা দিবে কেউ ত...