সনেট ও ‘চতুর্দশপদী কবিতা’
হুমায়রা হারুন
বাংলা সনেট রচনার সূত্রপাত হয় ১৮৬০ সালে। অধ্যাপক নীল রতন সেনের আধুনিক বাংলা ছন্দ গ্রন্থে উল্লেখিত, ‘মধুসূদন ভবিষ্যদবাণী করেছিলেন, if cultivated by men of genius, our sonnet in time would rival the Italian. – ভাবের দিক দিয়ে মধুসূদন যতিপ্রান্তিক ‘মিত্রাক্ষর’ ছন্দের শৃংখল ছিন্ন করেছেন বটে তবু চোদ্দমাত্রার পয়ার পংক্তিবন্ধ রক্ষা করে চলেছেন। মধুসূদনের আর কোনও কাব্য আদর্শ বা রচনারীতি পরবর্তী কবিরা ঠিক ভাবে অনুকরণ করেননি। একমাত্র সনেটের ক্ষেত্রেই দেখা যায় তিনি উত্তরসূরীদের মধ্যে আরও প্রাণবন্তভাবে বেঁচে রয়েছেন। সেদিক থেকে বিচারে মধুসূদনের সনেট রচনা বাংলা ছন্দের এবং কাব্যেরও বটে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।’
প্রমথ চৌধুরী তার ‘সনেট
কেন চতুর্দশপদী’
প্রবন্ধে বাংলা কাব্যে চতুর্দশপদের আগমনের কারণ ও চতুর্দশপদের চয়ন বিশ্লেষণে
বলেছেন,‘চৌদ্দ কেন? এ – প্রশ্নে সনেটের মতো বাংলা পয়ার সম্বন্ধেও জিজ্ঞাসা করা যেতে
পারে। এর একটি সমস্যার মীমাংসা করতে পারলে অপরটির মীমাংসার পথে আমরা অনেকটা অগ্রসর
হতে পারব। আমার বিশ্বাস,বাংলা
পয়ারের প্রতি চরণে অক্ষরের সংখ্যা চতুর্দশ হবার একমাত্র কারণ এই যে,বাংলা ভাষায় প্রচলিত অধিকাংশ শব্দ হয় তিন অক্ষরের নয় চার অক্ষরের। পাঁচ –ছয় অক্ষরের শব্দ প্রায়ই হয় সংস্কৃত নয়
বিদেশী। সুতরাং সাত অক্ষরের কমে সকল সময়ে দুটি শব্দের একত্র সমাবেশের সুবিধে হয়
না। সেই সাতকে দ্বিগুন করে নিলেই শ্লোকের প্রতি চরণ যথেষ্ট প্রশস্ত হয়,এবং অধিকাংশ প্রচলিত শব্দই ঐ চৌদ্দ অক্ষরের
মধ্যেই খাপ খেয়ে যায়। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে,আমাদের
ভাষায় দু’অক্ষরের
শব্দের সংখ্যাও কিছু কম নয়। কিন্তু সে সকল শব্দকে চার অক্ষরের শব্দের শামিল ধরে
নেওয়া যেতে পারে,যেহেতু
দুই স্বভাবতই চারের অন্তর্ভুক্ত।
এই চৌদ্দ অক্ষর থাকবার দরুনই বাংলা ভাষায় কবিতা লেখার পক্ষে পয়ারই সর্বপেক্ষা
প্রশস্ত। একটানা লম্বা কিছু লিখতে হলে,অর্থাৎ যাতে অনেক কথা বলতে হবে এমন কোন রচনা করতে গেলে,বাঙালি কবিদের পয়ারের আশ্রয় অবলম্বন ছাড়া উপায়ন্তর নেই। কৃত্তিবাস থেকে
আরম্ভ করে শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত বাংলার কাব্যনাটক রচয়িতা মাত্রই
পূর্বোক্ত কারণে অসংখ্য পয়ার লিখতে বাধ্য হয়েছেন এবং চিরদিনের জন্য বাঙ্গালির
প্রতিভা ঐ পয়ারের চরণের উপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে রয়েছে।
পয়ারে চতুর্দশ অক্ষরের মত সনেট চতুর্দশ পদের একত্র সংঘটন,আমার বিশ্বাস,অনেকটা
একই কারণে একই রকমের যোগাযোগে সিদ্ধ হয়েছে। আমি পূর্বেই বলেছি যে,দ্বিপদী ত্রিপদী ও চতুষ্পদীই পদ্যের মূল উপাদান। বাদবাকি যত প্রকার পদ্যের
আকার দেখতে পাওয়া যায়,সেসবই দ্বিপদী,ত্রিপদী
এবং চতুষ্পদীকে হয় ভাংচুর করে নয় জোড়াতাড়া দিয়ে গড়া। এই সত্য প্রমাণ করবার জন্য
বোধহয় উদাহরণ দেবার আবশ্যক নেই।
কবিতার পূর্ববর্ণিত ত্রিমূর্তির সমন্বয়ে একমূর্তি গড়বার ইচ্ছে থেকেই সনেটের
সৃষ্টি। সেই কারণেই সনেট আকৃতিতে সমগ্রতা একাগ্রতা এবং সম্পূর্ণতা লাভ করেছে।
ত্রিপদীর সঙ্গে চতুষ্পদীর যোগ করলে সপ্ত পদ পাওয়া যায় এবং সেই সপ্ত পদকে দ্বিগুণিত
করে নেওয়াতেই সনেট চতুর্দশ পদ লাভ করেছে। এই চতুর্দশ পদের ভিতর দ্বিপদী ত্রিপদী
এবং চতুষ্পদী তিনটিরই স্থান আছে এবং তিনটিই সমান খাপ খেয়ে যায়।’
আধুনিক বাংলা ছন্দে অধ্যাপক নীলরতন সেন এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন,
‘প্রাচীন এবং মধ্যযুগের পদ্যে আঠারো
মাত্রিক পংক্তি বিক্ষিপ্তভাবে কদাচিত ব্যবহৃত হলেও পূর্ণাবয়ব মহা – পয়ারবন্ধের কবিতা ইতিপূর্বে কোনও কবিই
রচনা করেননি। এ ছন্দের বাকধর্মী ভাবপ্রকাশক শক্তি সম্পর্কেও ইতিপূর্বে কোন কবিই
সচেতন হননি।’
কিন্তু কবি আল মাহমুদ ইতালিয়ান সনেট ও শেক্সপিরিয়ান সনেট –এর রীতিকে অনুসরণ না করে নতুনরূপে
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের আঠার মাত্রার পংক্তি রচনা করে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন
করেন তার রচিত ‘সোনালি
কাবিন’
গ্রন্থে। এ টি এম মোস্তফা কামালের সুখ -৬ তেমনি একটি রচনা।
সুখ-৬
এ
টি এম মোস্তফা কামাল
ভাবের
সুতায় দেখি ধরা পড়ে কতো আকূলতা,
হৃদয়
অতলে ঢাকা ভালো মন্দ যতো আর্তি আছে
বের
হতে চায় শুধু কথা হয়ে তুমি এলে কাছে।
আমার
জমানো কথা,আসো
যদি,শোনাবো সুলতা।
একা
একা বলে বলে শিখে রাখি সেই সব কথা;
বিমুগ্ধ
মোড়কে ঢাকা কথামালা ভুলে যাই পাছে।
সুখের
নরোম ঘুমে ডুবে যাবো,ভেতরে
যা আছে
সব
যদি বলা যায় একে একে তোমাকে সুলতা।
হঠাৎ
জোছনা রাতে তুমি এসে আমার সমুখে
নীরবে
দাঁড়ালে আর চোখ তুলে চোখেই তাকালে।
পলকে
অনেক কথা বলা হলো,কথা
নেই মুখে !
নীরব
ভাষায় হলো কথকতা কথার আকালে !
সব
কথা বলা হলো ভেবে মন বাজে রিনি ঝিনি!
তুমি
গেলে মনে হলো,কী
অবাক,কিছুই বলিনি !
মিত্রাক্ষর ছন্দ সম্পর্কে মধুসূদনের মনোভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে শ্রীযুক্ত নীলরতন সেন তার আধুনিক বাংলা ছন্দ
গ্রন্থে বলেছেন,
‘মধুসূদন কৈশোরকাল থেকেই এক ভিন্নতর
আবহাওয়ায় বড় হয়ে উঠেছেন। দীর্ঘকাল ধরে তিনি শেক্সপীয়র মিল্টনের নাটক কবিতার
অনুশীলন করেছেন। ক্লাসিক গ্রীক ল্যাটিন সংস্কৃত কাব্যের রসাস্বাদন করেছেন। প্রাচ্য
পাশ্চাত্য ক্লাসিক সাহিত্য এবং Blank -verse ছন্দোবন্ধে মিল্টনের মহিমান্বিত কাব্য পাঠের ফলে,মিত্রাক্ষর ছন্দের পঙক্তি – প্রান্তিক যতি – শৃংখল
মোচন করে কাব্যের ভাবমুক্তির পথ প্রশস্ত করতে গিয়ে তিনি এই heroic Blank
–verse এর আদর্শ গ্রহণ
একান্ত স্বাভাবিক পন্থা রূপেই মনে করেছেন। The words came unsought floating in the stream of
inspiration. যতিপ্রান্তিক
মিত্রাক্ষর ছন্দকে মধুসূদন যে মনোভাব নিয়ে দেখেছেন একটি সনেটে তা সুন্দর প্রকাশ
করেছেন।’
মিত্রাক্ষর
মাইকেল
মধুসূদন দত্ত
বড়ই
নিষ্ঠুর আমি ভাবি তারে মনে,
লো ভাষা, পীড়িতে তোমা গড়িল যে আগে
মিত্রাক্ষর রূপ বেড়ি! কত ব্যথা লাগে
পর’ যবে এ নিগড় কোমল চরণে–
স্মরিলে হৃদয় মোর জ্বলি উঠে রাগে !
ছিল না কি ভাবধন,কহ,লো ললনে,
মনের ভাণ্ডারে তার,যে মিথ্যা সোহাগে
ভুলাতে তোমারে দিল এ তুচ্ছ ভূষণে?
কি কাজ রঞ্জনে রাঙি কমলের দলে?
নিজ –রূপে শশিকলা উজ্জ্বল আকাশে!
কি কাজ পবিত্রি মন্ত্রে জাহ্নবীর জলে?
কি কাজ সুগন্ধ ঢালি পারিজাত বাসে?
প্রকৃত কবিতা রূপী কবিতার বলে,–
চীন-নারী-সম পদ কেন লৌহ –ফাঁসে?
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত পয়ারের সংজ্ঞা নির্দেশে বলেছিলেন, আট –ছয় আট –ছয়। পয়ারের ছাঁদ কয়। পয়ার ছন্দের ওপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ছন্দের অর্থ
প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন,‘পয়ার ছন্দের বিশেষত্ব হচ্ছে এই যে, তাকে প্রায় গাঁঠে গাঁঠে ভাগ করা চলে,এবং প্রত্যেক ভাগেই মূল ছন্দের একটা আংশিক রূপ দেখা যায়। কড়ি ও কোমল কাব্য
গ্রন্থের তেমনি একটি সনেট ‘চুম্বন।’
চুম্বন
রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর
দোহার
হৃদয় যেন দোহে পান করে।
গৃহ
ছেড়ে নিরুদেশ দুটী ভালবাসা
তীর্থযাত্রা
করিয়াছে অধর-সঙ্গমে
!
দুইটি
তরঙ্গ উঠি প্রমের নিয়মে
ভাঙ্গিয়া
মিলিয়া যায় দুইটা অধরে।
ব্যাকুল
বাসনা দুটী চাহে পরস্পরে
দেহের
সীমায় আসি দুজনের দেখা !
প্রেম
লিখিতেছে গান কোমল আখরে
অধরতে
থরে থরে চুম্বনের লেখা।
দুখানি
অধর হতে কুসুম চয়ন,
মালিকা গাঁথিবে বুঝি ফিরে গিয়ে
ঘরে ?
দুটি
অধরের এই মধুর মিলন
দুইটি
হাসির রাঙা বাসর শয়ন।
শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য তার গীতিকবি শ্রীমধুসূদন গ্রন্থের ‘উত্তর সাধক’ রচনায় বলেছেন,
“রবীন্দ্রনাথ তাঁহার নিজস্ব ভঙ্গিতে মৌলিক
প্রতিভার প্রেরণায় যে চতুর্দশপদ বিশিষ্ট কবিতা পরবর্তী কালে রচনা করিয়াছেন,তাহাও যেমন ‘সনেট’ নহে,তেমনই মধুসূদনের আঙ্গিকগত অনুকরণ হইলেও ভাবগত অনুকরণ –জাত
রচনাও নহে। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা অন্যকে অনুকরণ করিবার প্রতিভাই নহে; সুতরাং রবীন্দ্রনাথের মধ্যে মধুসূদনের
ভাবগত প্রভাব অনুসন্ধান করা বৃথা।”
শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তার লেখা দেবেন্দ্রনাথ সেন স্মরণে উল্লেখ
করেছেন,‘রবীন্দ্রনাথের প্রতিভায় যখন সকলেই মুগ্ধ ও আত্মবিস্মৃত সেই
যুগেও দেবেন্দ্রনাথ স্বকীয় স্বাতন্ত্র্য সম্পূর্ণ বজায় রাখিয়াছেন।’ অপরদিকে শ্রী অধীশ চন্দ্র সাহাও তার ‘দেবেন্দ্রনাথ সেনঃ জীবনী ও কাব্য বিচার’ অভিসন্দর্ভে বলেছেন,
‘সনেট রচয়িতা রূপে দেবেন্দ্রনাথ বাংলা
কাব্যে একটি গৌরবের স্থান অধিকার করে আছেন। তার সমগ্র রচনার অর্ধেকেই চতুর্দশপদী
কবিতা। মধুসূদনের চতুর্দশপদী কবিতা এবং রবীন্দ্রনাথের কড়ি ও কোমল কাব্যের সনেটগুলো
দেবেন্দ্রনাথ সেনের নিকট আদর্শ রূপে প্রতীয়মান হয়। এছাড়াও দেবেন্দ্রনাথ সেন অক্ষয়
কুমারের সনেটের সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন। সংখ্যার দিক থেকে দেবেন্দ্রনাথের সমগ্র রচনার
অর্ধাংশই সনেট বা সনেট – কল্প চতুর্দশপদী কবিতা। অক্ষয়কুমারের প্রথম দিকের সনেটগুলির উপজীব্য প্রেম;তাঁর প্রধান কৃতিত্ব এই যে, পেত্রার্কা সনেটের দৃঢ় রূপবন্ধের মধ্যে রোমান্টিক প্রেম চেতনার
অভিব্যাক্তি যে কত সহজ ও স্বচ্ছন্দে সম্ভব,কয়েকটি চমৎকার সনেট লিখে তিনি তার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। বেদনার
গীতোচ্ছ্বাস যে সনেটের সংহত কঠিন কাঠামোর মধ্যে আড়ষ্ট হয় না, বরং ‘শুক্তির
মধ্যে মুক্তার মত’
উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাঁর ‘সন্ধ্যায়’ সনেটটি এর প্রকৃষ্ট নিদর্শন।”
অক্ষয়কুমারের প্রথম দিকের রচনা ‘হৃদয় সমুদ্র সম’ ও ‘শত নাগিনীর পাকে’ এবং দেবেন্দ্রনাথ সেনের রচনা ‘অদ্ভুত অভিসার’ চমৎকার চতুর্দশপদী রচনা।
অদ্ভুত
অভিসার
দেবেন্দ্রনাথ
সেন
মাধবের
মন্ত্রসিদ্ধ মোহন মুরলী
ধ্বনিল
রাধার চিত্ত –নিকুঞ্জ
–মোহনে,
অমনি
রাধার আত্মা দ্রুত গেল চলি
শ্যামতীর্থে, শ্যামাঙ্গিনী –যমুনা –সদনে!
গেল
রাধা; তবে ঐ মন্থর গমনে
মঞ্জুল
–বকুল
–কুঞ্জে
,কে যায় গো চলি?
আকুল
দুকূল,ম্লান কুন্তল,কাঁচলি;
ঘুম
যেন লেগে আছে নিঝুম লোচনে!
নাহি
জ্ঞান, নাহি সাড়া! টানে তরুদল
লুন্ঠিত
অঞ্চল ধরি ! মুখ –পদ্মোপরি
উড়িয়া
বসিছে অলি গুঞ্জরি গুঞ্জরি;
বিহবলা
মেখলা চুম্বে চরণের তল!
আগে
আত্মা,পরে দেহ,যাইছে তুহার
রাধিকা
রে,বলিহারি তোর অভিসার!
শ্রী অধীশ চন্দ্র সাহা তার গবেষণা কর্মে আরোও বলেছেন,
“অক্ষয় কুমারের হৃদয় সমুদ্র সম কবিতাটি
পেত্রার্কা সনেটের আদর্শে রচিত। অষ্টকে যে ভাবের বন্ধন, ষটকে সেই ভাবের মুক্তিলীলা এবং অষ্টক ষটক মিলে একটি পরিপূর্ণ
একক ভাবের নিটোল রসরূপায়ন। তবে সর্বত্র কবি এ কৃতিত্ব দেখাতে পারেন নি। ‘তাহার সনেটগুলি ভাবে ও ভাষায় যেমন সু
সমৃদ্ধ, গীতিরসে তেমন সমুজ্জ্বল নয়।[১]’ আসলে অক্ষয় কুমারের কাব্য প্রেরণার মধ্যে
একপ্রকার অসমতা ছিল। ‘তাঁহার
সনেট সমূহে গাঢ়তা ও শিথিলতায় যুগপৎ অবস্থিতিও তাঁহার কাব্য প্রেরণার অসমত্বের
পরিচায়ক।[২]’ দেবেন্দ্রনাথ
যখন সনেট রচনায় ব্রতী হন তখন অক্ষয় কুমারের এই সনেটগুলির আদর্শও তাঁর সামনে ছিল। ‘দেবেন্দ্রনাথ সেনের এবং অক্ষয় কুমার বড়ালের চতুর্দশপদীতে
পরিণততর রূপ সৌকর্য দেখা গেছে।অবশ্য চতুর্দশপদীর নিখুঁত ভাব– শাসন দেবেন্দ্রনাথের লেখাতেই বেশি চোখে
পড়ে।[৩]”
শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য তার উত্তর সাধক রচনায় বলেছেন,“মধুসূদনের
অন্যান্য বিষয়ক রচনার যেমন উত্তর সাধকের সন্ধান পাওয়া যায়,তাঁহার ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’রও উত্তর সাধক আছে। বহিরঙ্গের দিক দিয়াই
হউক,কিংবা অন্তঃপ্রকৃতির দিক
দিয়াই হউক,তাঁহার ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’র অনেকে অনুকরণ করিয়াছেন। মধুসূদন পয়ারের অনুরূপ চৌদ্দটি
অক্ষর যুক্ত পদ অবলম্বন করিয়াই তাঁহার ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ আদ্যোপান্ত রচনা করিয়াছেন। ইহার মধ্যেও মধুসূদনের বিদ্রোহী
মনোভাবের পরিবর্তে রক্ষণশীল মনোভাবেরই
পরিচয় প্রকাশ পাইয়াছে। ইহাতে পেত্রার্কীয় আদর্শে বাংলা কবিতা রচনা করিতে গিয়াও যে
বাংলার প্রচলিত পয়ারের চৌদ্দটি অক্ষরের পদের উপরেই তাঁহার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল,তাহা লক্ষ্য করিবার বিষয়।”
শৃঙ্গার
–
রস
শ্রী
মধুসূদন দত্ত
মনোহর
বীণা-ধ্বনি; – দেখিনু সে স্থলে
রূপস
পুরুষ এক কুসুম –
আসনে,
ফুলের
চৌপর শিরে,ফুল
–মালা
গলে।
হাত
ধরাধরি করি নাচে কুতূহলে
চৌদিকে
রমণী-চয়,কামাগ্নি-নয়নে, –
উজলি
কানন –রাজি
বরাঙ্গ –ভূষণে,
ব্রজে
যথা ব্রজাঙ্গনা রাস–রঙ্গ–ছলে।
সে
কামাগ্নি-কণা
লয়ে সে যুবক,হাসি
জ্বালাইছে
হিয়াবৃন্দে; ফুল-ধনুঃ – ধরি
হানিতেছে
চারি দিকে বাণ রাশি রাশি
কি
দেব কি নর উভে জর জর করি!
"কামদেব অবতার রস-কুলে আসি,
শৃঙ্গার
রসের নাম।" জাগিনু শিহরি।
চতুর্দশপদী এবং সনেট রচনার ক্ষেত্রে আজ অব্দি বাংলাভাষায় কাব্যরচনার ক্ষেত্রে
মধুসূদনের উত্তর সাধক যেমন আছেন,ভবিষ্যতেও তেমন থাকবেন। কবিমন তার চিন্তায় চেতনায় স্পন্দিত ছন্দের প্রলেপ
চৌদ্দ বা আঠারো অক্ষরের মধ্যদিয়ে প্রকাশ করবেন অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথেই।
[১] মোহিতলাল মজুমদারঃ বাংলা কবিতার ছন্দ
[২] শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ বাংলা
সাহিত্যের বিকাশের ধারা
[৩] হরপ্রসাদ মিত্রঃ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের
কবিতা ও কাব্যরূপ
...
No comments:
Post a Comment