Monday, September 28, 2026

জীবন যেন স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের মতো


ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ  কিছু গান শুধু শোনা হয় না তারা জীবনের কোনো এক বিশেষ মুহূর্তে এসে আমাদের ভেতরে চিরদিনের জন্য বাসা বাঁধে। ১৯৮৪-এর সেই স্কুলের অফিস রুম, বেতন দেওয়ার ভিড়, আর প্রিয় বন্ধুর হাঁটু গেড়ে বসে ক্যাসেটের কভারের পেছন থেকে লিরিক দেখানো স্মৃতির পাতায় যেন আজও তেমনি জীবন্ত। 

Islands in the Stream তাই আপনার কাছে শুধু একটি প্রেমের গান নয়; এটি হয়ে উঠেছে কৈশোরের নির্মল বিস্ময়, বন্ধুত্ব, প্রথম ভালোবাসার অনুভব এবং হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের দরজা। নদীর স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের উপমাটিও যেন জীবনের এক গভীর সত্য বলে স্রোত আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সময় আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়, তবু কিছু মানুষ আর কিছু গান আমাদের হৃদয়ের নিজস্ব দ্বীপ হয়ে থেকে যায়। 

শেষের আকাঙ্ক্ষাটিই সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে যায় কোথাও যদি চলে যেতে পারতাম, যেখানে সেই দ্বীপের দেখা মিলবে। হয়তো সেই দ্বীপ কোনো ভৌগোলিক স্থান নয়; সেটি আমাদের স্মৃতির ভেতরেই আছে যেখানে বয়স থেমে থাকে, প্রিয় মানুষগুলো হারিয়ে যায় না, আর একটি পুরোনো গান বাজলেই আমরা আবার ফিরে যাই সেই কিশোরী বিকেলে।

স্মৃতি আসলে এমনই জীবন স্রোতের মতো বয়ে যায়, কিন্তু কিছু গান আমাদের ভাসমান দ্বীপ হয়ে চিরকাল পাশে থাকে।

শুভেচ্ছা রইল 
২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২

Friday, September 25, 2026

ফোকলা জীবন

 ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ বেশ বড় আকারের গল্প । স্কুল জীবনে বড় সাইজের গল্পই খুঁজে খুঁজে পড়তাম । এখনো অবশ্য অবশ্য বড় গল্প পড়ি যদি প্রথম কয়েক লাইন পড়ে ভাল লাগে । যাহোক এই গল্পটি মনযোগ দিয়েই পাঠ করেছি।

পাঠে মনে হল ফোকলা জীবন’ যেন স্মৃতি, ক্ষত ও এক নারীর আত্মমর্যাদার আখ্যান।

এটি যেন একটি নারীর বিবাহিত জীবনের স্মৃতিচারণ নয়; এটি স্মৃতির ভেতর দিয়ে একটি ভয়ংকর পারিবারিক কাঠামোর মুখোশ খুলে দেওয়ার গল্প। রত্না যখন পুরোনো অ্যালবামের ছবি কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতে বসে, তখন পাঠক বুঝতে পারে, সে আসলে কেবল ছবি নষ্ট করছে না; নিজের জীবনের এক দুঃসহ অধ্যায় থেকে নিজেকে মুক্ত করারও চেষ্টা করছে। কিন্তু গল্পের গভীরতম বোধটি এখানেই: ছবি ছেঁড়া যায়, স্মৃতি ছেঁড়া যায় না।

গল্পটির সূচনা তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘এলবাম’ এখানে নিছক ছবি রাখার বস্তু নয়; এটি রত্নার অতীতের একেকটি স্তর। আকদ, হলুদ, বিয়ে, বৌভাত, প্রতিটি অ্যালবাম যেন জীবনের একটি সামাজিকভাবে স্বীকৃত আনন্দের মুহূর্তকে ধরে রাখে। অথচ সেই ছবিগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়, সন্দেহ, প্রতারণা, অপমান ও সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস। ফলে ছবির হাসি আর জীবনের সুখ এক হয়ে থাকে না। বরং ছবির হাসি যত উজ্জ্বল, তার পেছনের অন্ধকার ততই প্রকট হয়ে ওঠে।

গল্পের একটি শক্তিশালী দিক হলো অশুভ পূর্বাভাসের ধারাবাহিকতা। বিয়ের দিন উল্টো শাড়ি, গাড়ি থেকে নামার পর অদ্ভুতভাবে শাড়ির কুঁচি খুলে যাওয়া, বাসররাতে চুড়ি ভেঙে যাওয়া, প্রতিটি ঘটনাই রত্নার মনে অস্বস্তি তৈরি করে। এগুলোকে নিছক কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে পড়া যায়, আবার রত্নার পরবর্তী জীবনের প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। বিশেষ করে ‘উল্টো শাড়ি’ পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে একটি গভীর রূপক। যে জীবনকে স্বাভাবিক, সুন্দর ও দাম্পত্যের নিরাপদ আশ্রয় বলে কল্পনা করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত উল্টো পথে হাঁটে।

এখানে আপনি খুব সচেতনভাবেই লোকবিশ্বাস, অমঙ্গলের আশঙ্কা ও বাস্তব বিপদের সীমারেখা অস্পষ্ট করে দিয়েছেন। চুড়ি ভেঙে যাওয়া হয়তো কেবল বড় সাইজের চুড়ির ওপর হাতের চাপের ফল; শাড়ির কুঁচি খুলে যাওয়া হয়তো নিছক পোশাকের সমস্যা। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাবলি সেই ঘটনাগুলোকে রত্নার স্মৃতিতে অন্য অর্থ দেয়। মানুষের মন অতীতকে পরে গিয়ে নতুন অর্থে সাজায়। গল্পটি সেই মনস্তত্ত্বও ধারণ করে।

তবে গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি অলৌকিকতায় নয়; বরং অলৌকিক মনে হওয়া ঘটনাগুলোর আড়ালে থাকা বাস্তব নিষ্ঠুরতায়।

রত্নার শ্বশুর চরিত্রটি গল্পের সবচেয়ে অস্বস্তিকর এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একটি। তার বয়স, কর্তৃত্ব, কথাবার্তার ধরন, বউয়ের ব্যক্তিগত জীবনে অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং ছেলের ওপর অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ, সব মিলিয়ে সে শুধু একজন অত্যাচারী শ্বশুর নয়; একটি ক্ষমতাকাঠামোর প্রতীক। তার কাছে বউমা একজন স্বাধীন মানুষ নয়; বরং পরিবারের সম্পদ, পুত্রের পরিচর্যাকারী এবং বংশরক্ষার একটি উপকরণ।

‘তোমার বাপের সঙ্গে কথা বলবে না’, ‘বাপের বাড়ি যেতে পারবে না’, এই নির্দেশগুলো আপাতদৃষ্টিতে পারিবারিক নিয়মের মতো শোনালেও প্রকৃত অর্থে এগুলো বিচ্ছিন্নকরণ ও নিয়ন্ত্রণের কৌশল। একজন নারীকে তার নিজস্ব পরিবার, সামাজিক যোগাযোগ ও আশ্রয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। গল্পে এই বিষয়টি সরাসরি ব্যাখ্যা না করেও ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রত্নার স্বামী চরিত্রটিও এই গল্পে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সে সরাসরি প্রচলিত অর্থে খলনায়ক নয়। বরং সে নিজেও একটি বিকৃত পারিবারিক ব্যবস্থার শিকার। তার শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতা, বাবার প্রতি অন্ধ নির্ভরতা এবং নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বুঝতে না পারা তাকে একই সঙ্গে করুণ ও বিপজ্জনক চরিত্রে পরিণত করেছে। রত্নার প্রতি তার আচরণ অনেক ক্ষেত্রে নিরীহ; কিন্তু সেই নিরীহতা তাকে দায়মুক্ত করে না। কারণ সে এমন একটি ব্যবস্থার অংশ, যেখানে রত্নার স্বাধীনতা প্রতিনিয়ত সংকুচিত হয়েছে।

এই জায়গাতেই গল্পটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: অপরাধী কে, আর শিকারই বা কে?

শ্বশুর নিঃসন্দেহে ক্ষমতার কেন্দ্র। কিন্তু তার স্ত্রীও তার স্বামীর নিপীড়নের শিকার। আবার সেই নারীই পুত্রবধূর ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেন। অর্থাৎ নিপীড়ন এখানে সরলরৈখিক নয়; এক প্রজন্মের ওপর প্রয়োগ করা সহিংসতা আরেক প্রজন্মের মধ্যে অন্য রূপে সঞ্চারিত হয়। যে নারী নিজে অপমানিত, সে-ও অন্য একজন নারীকে অপমান করতে পারে। এই জটিলতাই গল্পটির শেষাংশকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়।

গল্পের শিরোনাম ‘ফোকলা জীবন’ মূলত শেষ অংশে এসে পূর্ণ অর্থ লাভ করে।

রত্না যখন ছবিগুলো কাটতে কাটতে দেখে, অসংখ্য টুকরোর মধ্যেও শাশুড়ির মুখটি অক্ষত থেকে গেছে, তখন বাস্তব ঘটনা একটি প্রতীকী স্তরে প্রবেশ করে। এই অক্ষত মুখ যেন ছবির কাগজের মুখ নয়; বরং একটি জীবনের অবশিষ্ট মুখ। বহু অপমান, বহু দাম্পত্য নির্যাতন, বহু বছরের অসহায়তা পেরিয়েও যে মুখটি অক্ষত আছে, সেটি একই সঙ্গে অপরাধী এবং শিকার, দুই পরিচয় বহন করে।

এই জায়গায় গল্পটি একমাত্রিক প্রতিহিংসার গল্প হয়ে ওঠে না। রত্না চাইলে তার শাশুড়িকে কেবল অত্যাচারী নারী হিসেবে স্মরণ করতে পারত। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সে উপলব্ধি করে, এই নারীও হয়তো একসময় একই ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে আটকে পড়েছিল। তার নিজের জীবনও ছিল ‘ফোকলা’। তার নিজের স্বামী তাকে অপমান করেছে, তার শরীর ও মাতৃত্বকে ব্যবহার করেছে, তার সম্মানকে ক্ষয় করেছে। অথচ সেই ক্ষত থেকে মুক্তি না পেয়ে সে আবার অন্য একজন নারীর ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে।

এই দ্বৈততা গল্পটিকে মানবিক গভীরতা দেয়।

গল্পের ভাষারও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। বর্ণনার মধ্যে কথ্যভাষা, ব্যঙ্গ, তীক্ষ্ণ মন্তব্য এবং কখনো প্রায় নাটকীয় সংলাপ একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘বাহ!’, ‘সেরেছে এবার’, ‘কি সুন্দর যুক্তি’, ‘ওরে বাবা’, এ ধরনের বাক্য গল্পের বর্ণনাকারী কণ্ঠকে অত্যন্ত ব্যক্তিগত করে তোলে। রত্নার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে আমরা ঘটনাগুলো দেখি বলে তার ক্ষোভ, বিস্ময়, বিদ্রূপ ও অসহায়তা আমার কাছেও সরাসরি পৌঁছে যায়।

বিশেষ করে ব্যঙ্গাত্মক বাক্যগুলো গল্পের বেদনাকে আরও তীব্র করেছে। যেখানে সরাসরি কান্না থাকলে পাঠক হয়তো শুধু দুঃখ পেতেন, সেখানে রত্নার তীক্ষ্ণ রসবোধ সেই দুঃখকে প্রতিরোধের ভাষায় রূপ দিয়েছে। সে কাঁদে, ভয় পায়, সন্দেহ করে; আবার একই সঙ্গে বিদ্রূপ করে। এই বিদ্রূপই তার আত্মরক্ষার অন্যতম অস্ত্র।

তবে গল্পটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় সম্ভবত রত্নার চরিত্রের ভিতরের পরিবর্তন।

২৪ বছরের একটি মেয়ে, যে বিয়ের আগে পার্লারে যায়নি, অচেনা পরিবারে গিয়ে প্রথমে অস্বস্তি ও আশঙ্কাকে নিজের ভেতরে চেপে রাখে। কিন্তু ধীরে ধীরে সে প্রশ্ন করতে শেখে। প্রতিবাদ করতে শেখে। একসময় ৭২ বছরের শ্বশুরের চোখে চোখ রেখে বলে, ‘বাপ না। বলেন আব্বা। আব্বা।’ এই সংলাপটি কেবল সম্বোধন সংশোধন নয়; এটি ক্ষমতার ভাষাকে প্রত্যাখ্যান।

এরপর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার শাশুড়িকে উদ্দেশ করে বলা কথাগুলো। রত্না বুঝতে পারে, যে নারী নিজে অপমানিত হয়েছেন, তার সন্তানরা পর্যন্ত তার সম্মানের পক্ষে দাঁড়ায়নি। একজন বাইরের নারী এসে সেই প্রশ্নটি তুলেছে। এখানেই রত্না কেবল নিজের অধিকারের জন্য লড়ছে না; সে আরেক নারীর অধিকারকেও চিনতে শুরু করছে।

গল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো শরীরের রাজনীতি। শাড়ি, চুড়ি, ব্রা, মাসিক, সন্তান ধারণ, বউয়ের শরীর, সবকিছুকে পুরুষতান্ত্রিক পরিবারের নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে। রত্নার শরীর যেন তার নিজের নয়।

কখন সে বাবার বাড়ি যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কখন সন্তান হবে, কীভাবে স্বামীকে দেখবে, সব কিছুতেই অন্যের সিদ্ধান্ত। ফলে গল্পটি কেবল মানসিক নির্যাতনের নয়; এটি একজন নারীর শরীর ও ব্যক্তিসত্তার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইও।

শেষ পর্যন্ত রত্না সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু গল্পের দৃষ্টিতে বেরিয়ে আসা মানেই মুক্তি নয়। কারণ শরীরকে বাড়ি থেকে বের করে আনা যায়, স্মৃতিকে নয়। সেই কারণেই গল্পের শুরুতে ফিরে আসে অ্যালবাম। রত্না ছবিগুলো কাটছে, কিন্তু স্মৃতির মুখগুলো বারবার ফিরে আসছে।

এখানে অ্যালবাম ও কাঁচি দুটি অসাধারণ প্রতীক।

অ্যালবাম ধরে রাখে। কাঁচি বিচ্ছিন্ন করে।

অ্যালবাম অতীতকে সংরক্ষণ করে, কাঁচি অতীতকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু কাঁচি যতই ধারালো হোক, স্মৃতির বিরুদ্ধে তার ক্ষমতা সীমিত। বরং ছবি কাটতে কাটতেই রত্না আবিষ্কার করে, যে মুখটি সে সবচেয়ে বেশি মুছে ফেলতে চেয়েছিল, সেই মুখই টুকরোগুলোর মাঝখানে অক্ষত রয়ে গেছে।এ যেন অতীতের এক নীরব প্রত্যাবর্তন।

আর সেখানেই ‘ফোকলা জীবন’ নামটি গভীর হয়ে ওঠে। ‘ফোকলা’ শুধু দাঁতহীনতার ইঙ্গিত নয়; এটি এমন একটি জীবনের প্রতীক, যার বাহ্যিক কাঠামো আছে কিন্তু ভেতরের পূর্ণতা নেই। সংসার আছে, স্বামী আছে, সন্তান আছে, সামাজিক পরিচয় আছে; কিন্তু নিরাপত্তা নেই, সম্মান নেই, ভালোবাসা নেই, স্বাধীনতা নেই।

বাইরে থেকে পূর্ণ, ভেতর থেকে ফাঁপা, এই দ্বৈততাই ‘ফোকলা জীবন’-এর মূল সুর।

গল্পের শেষ উপলব্ধিটি তাই প্রতিহিংসার নয়, বরং এক ধরনের বিষণ্ণ মানবিক স্বীকৃতির।

রত্না বুঝতে পারে, তার শাশুড়ি শুধু তার অত্যাচারী ছিলেন না; তিনিও কোনো এক সময় অত্যাচারের শিকার ছিলেন। কিন্তু সেই উপলব্ধি শাশুড়ির করা অন্যায়কে মুছে দেয় না। বরং দেখিয়ে দেয়, সহিংসতা কীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে এবং একজন শিকার কীভাবে কখনো কখনো অন্য একজনকে শিকার বানিয়ে ফেলে।

এই কারণেই গল্পটির শেষ দৃশ্যটি সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যগুলোর একটি: কাটা ছবির অসংখ্য টুকরোর মধ্যে শাশুড়ির মুখ অক্ষত।

রত্না যেন শেষ পর্যন্ত ছবিটি ফেলতে পারে না।

হয়তো ঘৃণার জন্য নয়।

হয়তো করুণার জন্যও নয়।

বরং এই উপলব্ধির জন্য যে, তাদের দুজনের জীবনই ভিন্নভাবে ক্ষতবিক্ষত। একজন সেই ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, আর অন্যজন সেই ক্ষত নিয়েই একটি ‘ফোকলা জীবন’ কাটিয়ে দিয়েছে।

‘ফোকলা জীবন’ তাই শেষ বিচারে শুধু একটি ব্যর্থ বিবাহের গল্প নয়। এটি স্মৃতির বিরুদ্ধে মানুষের অসম লড়াই, পারিবারিক ক্ষমতার নির্মমতা, নারীর আত্মমর্যাদার জেগে ওঠা এবং এক প্রজন্মের ক্ষত কীভাবে আরেক প্রজন্মের জীবনে ছায়া ফেলে, তার একটি তীব্র আখ্যান।

গল্পটির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি পাঠককে শেষ পর্যন্ত একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বরং একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কখনো কখনো অত্যাচারী এবং অত্যাচারিতের মাঝখানে যে দেয়ালটি আমরা আঁকি, তার ভেতরেও আরও বহু অদৃশ্য দরজা থাকে। আর সেই দরজাগুলোর ওপারে থাকে বহু বছরের না বলা কান্না।

রত্না ছবিগুলো কেটে ফেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে, ছবি কাটা যায়, জীবন কাটা যায় না। স্মৃতি ফেলা যায় না। আর কিছু মুখ, যতই কাঁচি চালানো হোক, অক্ষতই থেকে যায়। সেই অক্ষত মুখটিই হয়তো ‘ফোকলা জীবন’-এর সবচেয়ে দীর্ঘশ্বাসময় প্রতীক।

শুভেচ্ছা রইল

Thursday, September 24, 2026

বম রাজার পুত্র

 ড. এম এ আলীঃ বেশ মনযোগ দিয়ে পড়লাম ।পাঠান্তে মনে হল এটা বম রাজার পুত্র প্রেম, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার এক মর্মস্পর্শী আখ্যান।

‘বম রাজার পুত্র’ পড়তে পড়তে একজন পাঠক হিসেবে প্রথম যে অনুভূতিটি তৈরি হয়, তা হলো এটি শুধু একজন সংগীতশিল্পীর প্রেমকাহিনি নয়; বরং প্রেমের মোহ, আত্মবিসর্জন, পারিবারিক বিচ্ছেদ, দাম্পত্যের বাস্তবতা এবং দীর্ঘদিনের অপূর্ণতার মধ্য দিয়ে একজন মানুষের ভেতরে ভেঙে পড়ার গল্প।

পূর্ণ বম চরিত্রটির মধ্যে একই সঙ্গে রাজপুত্রের আদর, শিল্পীর সংবেদনশীলতা, প্রেমিকের আবেগ এবং একজন মানুষের দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে যে মানুষটি নিজের পরিবার, গোত্র, সমাজ এমনকি সংগীতজীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে অজানার পথে পাড়ি জমায়, পরবর্তী জীবনে সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি তাকে কীভাবে তাড়িয়ে বেড়ায় লেখাটির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাগুলোর একটি এটি।

আপনার লেখাটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রেমিকা ও স্ত্রী র সম্পর্কের পার্থক্যকে সামনে আনা। প্রেমের সময়ে যে মানুষটিকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে সম্পূর্ণ মনে হয়, সংসারের বাস্তবতায় সেই সম্পর্কই কীভাবে দায়িত্ব, প্রত্যাশা, অভিমান ও অপূর্ণতার ভারে ক্লান্ত হয়ে উঠতে পারে আপনি তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে ‘পূর্ণ’নামের মধ্যেই যে পূর্ণতার ইঙ্গিত, গল্পের শেষে সেটিই যেন গভীর ব্যঙ্গাত্মক অর্থ বহন করে। জীবনের এত কিছু পেয়েও মানুষটি শেষ পর্যন্ত মানসিকভাবে অপূর্ণ।

দুই দশক পর পূর্ণের ফিরে আসা অংশটি পাঠক হিসাবে মনে বিশেষ দাগ কাটে। বাইরে থেকে সে তখনও তারকা ভক্ত আছে, কনসার্ট আছে, নেতৃত্ব আছে, জনপ্রিয়তা আছে; কিন্তু অন্তরে বহন করছে এক পুরোনো ক্ষত। এই বৈপরীত্যটিই গল্পের সবচেয়ে মানবিক দিকগুলোর একটি। একজন মানুষের বাহ্যিক সাফল্য আর ভেতরের নিঃস্বতার মধ্যে যে বিপুল দূরত্ব থাকতে পারে, পূর্ণ চরিত্রের মধ্য দিয়ে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

লেখার ভাষা খুবই আবেগপ্রবণ এবং দৃশ্যধর্মী। বিশেষ করে বিমানযাত্রার দৃশ্য, দলের সদস্যদের সঙ্গে পূর্ণের আচরণ, বিদেশের মাটিতে থেকেও ভাতের সঙ্গে কাঁচা মরিচ চাওয়ার মতো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো চরিত্রটিকে পাঠক হিসাবে আমাদের কাছে জীবন্ত করে তোলে। এসব জায়গায় াআপনি গল্পের বৃহৎ আবেগের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সহজ বাস্তবতাকে সুন্দরভাবে মিলিয়েছেন।


তবে পাঠক হিসেবে মনে হল কিছু জায়গায় ভাষার পুনরাবৃত্তি এবং অতিরিক্ত আবেগঘন বর্ণনা কিছুটা কমানো গেলে গল্পের অভিঘাত আরও গভীর হতে পারত। বিশেষ করে শ্রাবণীর শারীরিক পরিবর্তন বর্ণনার পরিবর্তে তার মানসিক পরিবর্তন, সম্পর্কের ভাঙন এবং পূর্ণের অন্তর্দ্বন্দ্বকে আরও বিস্তৃত করা হলে চরিত্র দুটির জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত বলে মনে হয়। কারণ গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নটি আসলে পূর্ণ কি শ্রাবণীকে ভালোবেসেছিল, নাকি শ্রাবণীর প্রতি নিজের মোহকেই ভালোবাসা ভেবেছিল? এই প্রশ্নটি পাঠক হসাবে আমাদের মনে দীর্ঘসময় থেকে যায়।

সর্বোপরি বম রাজার পুত্র এমন একটি গল্প, যেখানে প্রেমের শুরু যতটা উজ্জ্বল, তার পরিণতি ততটাই বিষণ্ণ। পূর্ণের জীবনে শ্রাবণী একসময় প্রেমের প্রতীক, পরে অনুশোচনার প্রতীক এবং শেষ পর্যন্ত তার অপূর্ণতারই আরেক নাম হয়ে ওঠে। তাই গল্পের শেষ বাক্য এই নামটি পূর্ণ-র সকল অপূর্ণতা শুধু একজন নারীর নামকে নির্দেশ করে না এটি যেন পূর্ণের সমগ্র জীবনের এক করুণ সারাংশ।

গল্পটির পাঠ শেষ করার পর মনে হয় মানুষ জীবনে অনেক কিছু ফিরে পেতে পারে, কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু সম্পর্ক এবং কিছু হারানো সময় কখনোই আগের জায়গায় ফিরে আসে না। আর সেই না-ফেরার বেদনাই বম রাজার পুত্র এর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনুভূতি।

শুভেচ্ছা রইল

Wednesday, September 23, 2026

শেইপ শিফটার - বেজী

ড. এম আ আলীঃ হয়ত আর কিছুক্ষন মানুষ রূপে হেটে যাবে ওই রাস্তা ধরে ,তারপর কোন এক সময়ে
বাতাশে মিলিয়ে যাবে লোক চক্ষুর আড়ালে । তবে আড়ালে গিয়েই কী তার কার্কলাপ শেষ হবে । বরং রাতের অন্ধকার নামতেই অরণ্যের সীমানায় রহস্যময় কোন আচরণ শরু করবে । সেতো কোনো সাধারণ মানুষ নয়,এমনো হতে পারে সে একজন প্রাচীন বংশের শেষ 'শেইপ শিফটার' বা রূপ পরিবর্তনকারী। পরিস্থিতির প্রয়োজনে সে যেকোনো রূপ ধারণ করতে পারে, তবে তার সবচেয়ে প্রিয় এবং কার্যকর রূপটি যে একটি চটপটে 'বেজী' তাতে কোন সন্দেহ নেই আপনের পোস্টের প্রচ্ছদের ছবিটি দেখে ।

তার অনেক কাজ আছে লোক চক্ষুর অন্তরালে । শহরের কুখ্যাত চোরাকারবারী দল যখন অরণ্যের আদিম সম্পদ ও গোপন নকশা চুরি করে পালায়, শেইপ শিফটার তাদের পিছু নেয়। মানুষের রূপ নিয়ে তাদের কড়া পাহারার ভেতর ঢোকা অসম্ভব করে তুলে। সে চোখ বন্ধ করে নিজের শ্বাসের গতি পরিবর্তন করতে পারে। মুহূর্তের মধ্যে তার ত্বক ঘন ধূসর লোমে ঢেকে দিতে পারে, হাত-পা সংকুচিত করে চার পায়ে রূপ নিয়ে এবং চোখ দুটি করে তুলতে পারে প্রখর ও জ্বলজ্বলে। তাই সে সহজেই হতেপারে এক ক্ষিপ্র বেজী।

তার এই রূপের প্রধান সুবিধা অবিশ্বাস্য গতি এবং বিষাক্ত সাপের মতো শত্রুদের আক্রমণকে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা।

শত্রু শিবিরের সূক্ষ্ম তারের ফাঁক গলে এবং সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে সে অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারে। চোরেরা যখন মূল ভল্ট খোলার কোন প্রস্তুতি নেয় , ঠিক তখনই বেজী রূপে সে তাদের চোখের পলকে আক্রমণ করতে পারে। তার ধারালো দাঁত আর নখের আঘাতে শত্রুরা হয়ে যেতে পারে দিশেহারা । কেউ বুঝতেই পারবেনা না, সাধারণ একটি প্রাণী কীভাবে এত নিখুঁত এবং বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে তাদের পুরো পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে পারে।ডাইনী হোক যাই হোক এমন বেজীর মত তেজী এমন শেইপ শিফটার হলে ক্ষতি কী.সেতো সচরাচর ভাল ছাড়া ক্ষতি করেনা কারো , তাকে দেখে ডাইনী ভেবে ভয় পাবার এত কী আছে ।

আপনার গল্পের কাহিনী সুত্র ধরেই এই শেইপ সিফটারের সম্ভাব্য কিছু কর্মগাথা হলো বলা ।

আপনার গল্প সুন্দর হয়েছে ।

শুভেচ্ছা রইলো। 

Tuesday, September 22, 2026

Poetry - Graveyard

 Graveyard

~  Humaira Haroon ~

Don’t make my graveyard
I don’t want to be buried
I don’t want to be remembered
From my life nothing I took or I carried.

Neither I want to be recognized
Nor even to be remembered by you
I will rest in peace with myself
With colorless passionate hue.

I won’t try to find myself
I won’t try to think where am I
My passion of search with itself
Revert me when I will die.
~~ 30th Jan, 2007 Montreal
_______________________________________________________________________

Literary Review by Dr. M A Ali: About twenty years ago written this beautiful poem carries a haunting yet beautiful sense of detachment from life, memory, and identity. Graveyard feels less like a poem about death and more like a meditation on the desire to disappear quietly, without monuments, recognition, or the burden of being remembered. The repeated rejection of remembrance gives the poem a deeply melancholic and philosophical atmosphere.

I particularly love the contrast between rest in peace with myself and the restless passion of search. It suggests that even in death, the speaker’s search for meaning and self-understanding continues. The final lines leave a lingering impression, as though the journey inward is endless and death itself becomes another part of that search.

There is something strikingly vulnerable in the poem, it does not ask to be celebrated or remembered. It asks simply to exist, and eventually to return to silence. The imagery of a colourless passionate hue beautifully captures that paradox of feeling deeply while wishing to leave no trace.

A quiet, introspective, and haunting poem, one that stays with us long after the final line.

Thank you very much for furnishing this beautiful poem here that enriches my blog as well.

My well wish is aways with you.

22nd Sept. 2026

Wednesday, September 16, 2026

রাগ ইমনের তৃষ্ণা


 ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:০০০


ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ ভারতীয় রাগসংগীতকে পাশ্চাত্যের বাদ্যযন্ত্রের ভাষায় উপস্থাপন করে বিশ্বসংগীতের পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস খুবই সুন্দর করে তুলে ধরেছেন।

লিংকে গিয়ে ইয়ানী পিয়ানো মুর্ছনা , রাগ ইমন ,রাগ মেঘ, পিয়ানোতে রাগ মালকোশের মুর্ছনা শুনলাম । লেখাটিতে ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রশ্ন উঠে এসেছে ভারতীয় রাগসংগীতের সূক্ষ্ম সৌন্দর্য ও স্বরভাষাকে পাশ্চাত্যের বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে বৃহত্তর বিশ্বশ্রোতার কাছে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়। পিয়ানোতে রাগ ইমন, মেঘ বা মালকোশের স্বররূপ তুলে ধরার এই প্রয়াস সেই দিক থেকে নিঃসন্দেহে আগ্রহের বিষয়।

তবে পিয়ানোতে কোনো নির্দিষ্ট স্বরক্রম বা কয়েক সেকেন্ডের সুরাংশ রাগের সঙ্গে মিলে গেলেই সেটিকে সম্পূর্ণ রাগের পরিবেশনা বলা যায় কী না তা ভাবার বিষয়। রাগের স্বরসংগঠন ছাড়াও তার চলন, পকড়, অলংকার, মীর, সময়ভাব, ন্যাস ও সামগ্রিক রাগধর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখাটির শেষাংশে মীর প্রসঙ্গটি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

একই সঙ্গে, পাশ্চাত্যের যন্ত্রে ভারতীয় রাগের রূপান্তরকে কেবল মূল রাগকে অন্য যন্ত্রে বাজানো হিসেবে না দেখে দুই ভিন্ন সংগীতভাষার মধ্যে একটি সৃজনশীল সংলাপ হিসেবেও দেখা যায়। পিয়ানোর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রাগের আবহ, স্বরচরিত্র ও নান্দনিকতা কতটা বিশ্বস্তভাবে প্রকাশ করা সম্ভব এই অনুসন্ধানই হয়তো এই উদ্যোগের একটি আকর্ষণীয় দিক।

ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে শুরু হওয়া এই প্রয়াস যদি স্বরলিপি, রাগের ব্যাকরণ, বাদ্যযন্ত্রের সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আরও বিস্তৃতভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে তা ভারতীয় রাগসংগীতকে নতুন শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করার একটি সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে।সে জন্য এই উদ্যোগের প্রতি রইল প্রাণঢালা অভিনন্দন ।

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
লেখক বলেছেন: পকড় দিয়ে শুধুই পরিচিতি দিয়েছি। তবে বিস্তারিত পরিবেশনাও সম্ভব।

আমি পিয়ানো সঠিক ভাবে জানি না। শেখার সুযোগ ছিল না। আর এখন সুযোগ আছে কিন্তু মাথা আর কাজ করে না। 

বাদ্য যন্ত্র বিশারদ গণ সেতার -কে গীটারে নিয়ে এসেছেন। সেতারে ঝংকার সৃষ্টির জন্য 'তার' সংখ্যা বেশী। তাই গিটারে ঐরকম ঝঙকার আসে না । কিন্তু যতটুকু সম্মভব তা তুলে ধরে যায়।

আদনান সামীর পিয়ানোতে রাগ সংগীত সবিস্তারে এসেছে। লিংকে ওনার বাজানো রাগ বাগেশ্রীর পরিবেশনা। আদনান সামী ১৯৮৯, রাগ বাগেশ্রী

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৯০


ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ আপনার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তির পাশাপাশি সেতার ও গিটারের বাদনগত পার্থক্য এবং রাগসংগীতকে পিয়ানোতে উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন।  বিশেষ করে সেতারের অধিক তারের কারণে যে স্বাভাবিক ঝংকার তৈরি হয়, গিটারে তা হুবহু পুনর্নির্মাণ করা কঠিন ,এটি বাদ্যযন্ত্রের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে

সম্পর্কিত একটি যথার্থ পর্যবেক্ষণ। তবে একই সঙ্গে গিটারের নিজস্ব টিম্বার ও বাজানোর কৌশল ব্যবহার করে রাগের আবহ কতটা সফলভাবে প্রকাশ করা যায়, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

লিংকসহ আদনান সামীর পিয়ানোয় রাগ বাগেশ্রীর পরিবেশনার উল্লেখটি আলোচনাটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। কারণ, রাগসংগীত সাধারণত মীড়, গমক ও স্বরের সূক্ষ্ম অলংকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, পিয়ানোর মতো নির্দিষ্ট-স্বরের যন্ত্রে সেগুলো অন্যভাবে রূপ দিতে হয়। তাই এখানে সঠিক বা ভুল এর চেয়ে কোন বাদ্যযন্ত্রে রাগের স্বরভাষা কীভাবে নতুনভাবে প্রকাশ পাচ্ছে সেই দৃষ্টিতে শুনলে আলোচনাটি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।

ভাল লাগল বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত দাবি না করে নিজের সাধ্য ও সীমারেখার মধ্যে একটি সংগীত-অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার প্রবনতা দেখে ।

শুভেচ্ছা রইল

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আমার মন্তব্যঃ অনেক ধন্যবাদ আলী ভাই। আমার ইচ্ছা আছে ইমন দিয়ে প্রথমে কাজ করা। যেহেতু ইমন একটু বিস্তারিত শিখেছিলাম। এর ওপর ৮ টি স্টাইলের গীত, গজল, রাগ সঙ্গীতের, ধরণ জানি। আমি তা পিয়ানোতে তুলে ধরবো । হারমোনিয়ামে  কিছু করেছিলাম।  এবার পিয়ানোতে আনতে চাই। 



Monday, September 14, 2026

তাঁত - জান্নাতুল ফেরদৌস

নানু বলতেন, “ছেঁড়া শাড়ির সুতো কখনো দাঁত দিয়ে কাটতে নেই। আর রাইত-বিরেতে ভুল করেও তাঁত ঘরে উঁকি দিতে নেই।” কারন, নানুর মতে, “রাইতে মাকু (তাঁত বোনার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রবিশেষ) যখন একা হাঁটে, তখন জ্বিনেরা কাপড় বোনে। ওই কাপড় মানুষের গায় সয় না।” এহেন কথা শুনে আমরা ভাইবোনেরা বেশ হাসাহাসি করতাম, তবে নানু কখনোই রাগ করতেন না।

নানু মারা গেছেন প্রায় পনেরো বছর হলো। আমি এখন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। দেশের প্রথম সারির একটা ফাস্ট-ফ্যাশন ব্র্যান্ডের প্রোডাকশন হেড। সাভারে আমাদের বিশাল ফ্যাক্টরিতে দিনে লাখ লাখ মিটার কাপড় বোনা হয় অটোমেটিক পাওয়ার লুমে। কানের পর্দা ফাটানো শব্দের ভেতরে হাজার হাজার নিডল আর মাকু মেশিনের নির্দেশে ওঠানামা করে। সুতো আর সিনথেটিক ফাইবার দিয়ে আমরা সস্তায় ফ্যাশন বানাই। এটাই আমার পেশা, এবং আজ, এই লেখাটা লিখতে বসেছি এই কারণেই যে নানু হয়তো সেসময় ঠিকই বলতেন!

ঘটনার শুরু আমার মায়ের একটা পুরোনো বিয়ের শাড়ি থেকে। সত্যিকারের আড়াই প্যাঁচের ঢাকাই মসলিন, প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো, পারিবারিক উত্তরাধিকার। গত বছর আলমারি গোছাতে গিয়ে দেখি শাড়ির পাড়ের কাছটায় সুতো ফেঁসে গেছে, জায়গায় জায়গায় বুনন আলগা। ফ্যাক্টরির এক পুরোনো মাস্টারকে দেখালাম। সে শাড়িটা ছুঁয়েই হাত সরিয়ে নিলো। বলল, “স্যার, এই জিনিসে আমি হাত দিমু না। এইটা মেশিনের কাম না। আপনে সোনারগাঁয়ের পানাম নগরের পেছনের এক গলিতে যান। ‘মাকু ঘর’। রহমত কারিগররে খুঁইজা বাইর করেন। তয় একটা কথা,” মাস্টার একটু থামল, তারপর বললো, “কারিগর মিয়ার কথাবার্তা একটু অন্যরকম। সব কথায় সায় দিয়েন না, আবার সব কথা উড়াইয়াও দিয়েন না।”

পানাম নগরের পুরোনো ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে সেই গলিটা এত সরু যে রোদ ঠিকমতো ঢোকে না। শেওলা ধরা পুরোনো ইট সুরকির দেয়াল, তার ফাঁকে একটা কাঠের দরজা। ওপরে খোদাই করা সাইনবোর্ড: "মাকু ঘর"; প্রোপ্রাইটর: রহমত আলী। নিচে ছোট করে লেখা: "এখানে সুতোয় ভাগ্য বোনা হয়।" "ভাগ্য? কাপড় না বলে ভাগ্য?" মনে মনে হাসলাম। লোকটা কি দরজি নাকি পীর?

ভেতরে ঢুকে মনে হলো পুরোনো দিনের কোনো জাদুকরের ডেরায় ঢুকেছি। বাতাসে মাড় দেওয়া সুতোর গন্ধ, পুরোনো কাঠের গন্ধ আর কেমন একটা স্যাঁতস্যাঁতে আর্দ্রতা। ঘরের মাঝখানে মাটির গর্তে পা রেখে বিশাল এক কাঠের তাঁত। আর তার সামনে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। মাথায় কিস্তি টুপি, গায়ে একটা আধময়লা ফতুয়া। চোখে ছানি পড়া ঘোলাটে দৃষ্টি। কিন্তু হাত দুটো চলছে জাদুর মতো।

আমার পায়ের শব্দে উনি হাত থামালেন। “কেডা?” আমি পরিচয় দিলাম। শাড়ির প্যাকেটটা এগিয়ে দিলাম। উনি প্যাকেট না খুলেই শাড়িটার ওপর হাত রাখলেন। চোখ বন্ধ করে কাপড়ের বুননের ওপর আঙুল বোলালেন, ঠিক যেভাবে অন্ধ মানুষ ব্রেইল পড়ে।

“আহারে,” উনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “এই শাড়ি যে বুনছিল, তার মনে বড় কষ্ট আছিল বাজান।” আমি চমকে উঠলাম। “কষ্ট মানে? এটা তো বিয়ের শাড়ি।” “বিয়ের শাড়ি হইলেই কি মন ভালো থাকে? বুনন দেখো নাই? সুতার টান বড় বেশি। প্রতিটা টানে একটা কইরা দীর্ঘশ্বাস আছিল। এইটা পরলে তো শইল্যে বিষন্নতা আসবো।”

“শাড়ি ঠিক করা যাবে?” আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলাম। “যাবে।” উনি ঘোলাটে চোখে আমার দিকে তাকালেন। “তয় আমি তোমাগো পাওয়ার লুমের মতো জোড়াতালি দিই না। আমি সুতোয় সুতোয় গিঁট দিই না, আমি আত্মায় আত্মায় গিঁট দিই। রাইখা যাও।”

আমি একটু তাচ্ছিল্যের হেসেই বললাম, “কারিগর সাব, আমি নিজেই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। কাপড়ে আত্মা বলে কিছু নেই। লুমের টানা আর পোড়েনের (Warp and Weft) ম্যাথমেটিক্যাল ক্যালকুলেশন আছে। আমাদের ফ্যাক্টরিতে দিনে লাখ মিটার কাপড় বেরোয় একদম জিরো ডিফেক্টে। আর আপনারা হাতে বোনেন বলে সুতোর টেনশন ঠিক থাকে না, কাপড়ে খুঁত থাকে।”

“জানি।” উনি শান্ত গলায় বললেন। “তোমাগো মেশিনে নিখুঁত কাপড় বাইর হয়। তয় মেশিনের কাপড়ে তো জান নাই বাজান। সুতো জিনিসটারে তুমি কি মনে করো? খালি তুলা আর পলিয়েস্টার? সুতো হইলো কাঁপন, সুতো হইলো মেমোরি।”

“মেমোরি?” “হ। তুলা গাছটা যখন মাঠে আছিল, সে রোদ খাইছে, বৃষ্টি খাইছে, মাটির রস খাইছে। তার ভিতরে প্রকৃতির একটা কাঁপন আছে। যখন একজন তাঁতি হাতে মাকু চালায়, তার হাতের ঘাম, তার নিঃশ্বাসের তাল, তার বুকের ধুকপুকানি - সব ওই সুতার ভিতরে গুইঁথা যায়। তুমি যখন হাতে বোনা কাপড় পরো, তুমি আসলে প্রকৃতির কাঁপন আর একজন মানুষের আয়ু পরো। আর মেশিনের কাপড়ে কি পরো? বিদ্যুৎ আর লোহার ঘষানির শব্দ। তোমাগো ফাস্ট ফ্যাশনের কাপড় পইড়া মাইনষের এত চর্মরোগ ক্যান, মাইনষের মেজাজ এত খিটখিটে ক্যান, ভাইবা দেখছো কোনোদিন?”

আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম। উনি শাড়িটা পাশে রাখলেন। “দুনিয়াটা হইলো একটা বিশাল মাকু ঘর। উপরওয়ালা সারাক্ষণ বুনতাছেন। দিন আর রাইত, আলো আর আঁধার এই দুইটা হইলো উনার টানা আর পোড়েন। আমরা সবাই এক একটা সুতো। তুমি কি জানো, প্রতিটা মানুষের একটা নিজস্ব বুননের প্যাটার্ন আছে?”

আমি কিছু বলার আগে ভেতর থেকে এক তরুণী বেরিয়ে এল। হাতে চায়ের কাপ। পরনে একটা সাধারণ সুতির শাড়ি, কিন্তু কি অপূর্ব তার বুনন! মেয়েটার চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত, যেন অনেক পুরোনো কোনো দীঘির জল। “বসেন। দাদাজান ওষুধ খাবেন এখন।” মেয়েটা চা এগিয়ে দিল।

মেয়েটার নাম নূরী। রহমত কারিগরের নাতনি আর এই মাকু ঘরের একমাত্র উত্তরাধিকারী। চা খাওয়ার ফাঁকে নূরী হঠাৎ বলল, “আপনি ফ্যাক্টরিতে যে কাপড় বানান, সেই কাপড় কারা বোনে জানেন?” “মেশিন বোনে। আর ওয়ার্কাররা অপারেট করে।” “না।” নূরীর গলাটা ভারী শোনাল। “অভাবী, ক্লান্ত, ঘুমহীন কিছু মানুষ বোনে। মাসের পর মাস ওভারটাইম করা, মাস শেষে বেতন না পাওয়া কিছু রাগী মানুষ যখন মেশিনের সামনে দাঁড়ায়, তাদের ওই রাগ, ওই ক্লান্তি, ওই অভিশাপ মেশিনের সুতোয় ঢোকে। আপনারা শোরুমে সুন্দর আলো ফেলে সেই কাপড় বেচেন। মানুষ সেই রাগ আর ক্লান্তি গায়ে জড়িয়ে ঘোরে। আর দিন শেষে ভাবে, জীবনটা এত অস্থির লাগে ক্যান!”

আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। একটা মেয়ে, যে কোনোদিন হয়তো ঢাকার বড় শপিং মলে যায়ওনি, সে আমার পুরো ক্যারিয়ারটাকে এক কথায় ধুলোয় মিশিয়ে দিল। যাওয়ার সময় নূরী নিচু গলায় বলল, “একটা কথা। দাদাজানের সব কথা বিশ্বাস করবেন না। তবে, অবিশ্বাসও করবেন না।”

এরপর থেকে আমি প্রায়ই যেতাম। কাজ থাকুক বা না থাকুক। কারিগর কাজ করতেন আর কথা বলতেন। নূরী পাশে বসে চরকায় সুতো কাটত। এক সন্ধ্যায় আমি কারিগরকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি বলেছিলেন সব মানুষের একটা প্যাটার্ন থাকে। মানে কি?” উনি মাকু থামালেন। “দুনিয়ার সব সুতো তো আর এক লগে জোড়া লাগে না। কিছু সুতো আছে, যাদের একসাথে বোনা হওয়ার কথা। যখন সেই দুই সুতো এক কাপড়ে আসে, তখন নকশা পূর্ণ হয়। আর যখন ভুল সুতো একলগে মেশে, তখন কাপড়ে জট পাকায়। মানুষের সম্পর্কগুলাও ঠিক অমন।”

কারিগর একটা পুরোনো কাঠের বাক্স বের করলেন। ভেতরে অদ্ভুত একটা সাদা সুতোর লাটিম। সুতোটা চকচক করছে, যেন রেশম, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কিছু। “আমার দাদাজান এই সুতা বানাইছিলেন। চাঁদের আলো আর পদ্মপাতার শিশির দিয়া। কইতেন, এই সুতায় বোনা কাপড় গায়ে দিলে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। আমি জীবনে ওই সুতায় হাত দিই নাই। কারণ, সব সুতো মানুষের লাইগা না।” “মানে?” “মানে, কিছু বুনন আছে যা রাইতে শুরু হয়। জ্বিনেরা বোনে। যেই কাপড় পরলে মানুষ আর দুনিয়ায় থাকতে চায় না। তারে ডাইকা নিয়া যায়।”

কথাটা শুনে আমার নানুর কথা মনে পড়ে গেল।

ঘটনার ক্লাইম্যাক্স মাস দুয়েক পরের এক বৃহস্পতিবার রাতে। সোনারগাঁওয়ে কাজ শেষ করতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। মাকু ঘরে শাড়িটা আনতে গেলাম। রাত তখন প্রায় বারোটা। গলিটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। শুধু নিস্তব্ধ না, মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবীর শব্দ কেউ মিউট করে দিয়েছে। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর থেকে ভেসে আসছিল একটা ছান্দিক শব্দ। খট... খট... খট... খট।

তাঁত চলছে। খুব দ্রুত। এত দ্রুত কোনো মানুষের হাত চলতে পারে না। আমি সন্তর্পণে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলাম। ঘরের ভেতরে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। আর সেই আলোয় দেখলাম, কাঠের বিশাল তাঁতটা একা একা চলছে। মাকুটা এপাশ থেকে ওপাশ ছুটে যাচ্ছে বাতাসের বেগে। কিন্তু কারিগরের আসনে কেউ বসে নেই। না, কেউ বসে নেই বলাটা ভুল হবে। একটা ছায়ার মতো কিছু বসে আছে। যার কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই, শুধু হাতের মুভমেন্ট বোঝা যাচ্ছে। আর ঘরের চারপাশের সমস্ত মাকড়সা, টিকটিকি এমনকি ইঁদুরগুলো গোল হয়ে বসে সেই বুনন দেখছে। একটা অদ্ভুত গুনগুন শব্দ ভেসে আসছিল। কোনো গান না, শুধু একটা রিদম। যা শুনলে মনে হয়, এই রিদমটাই আমার হার্টবিট হওয়া উচিত। আমার মনে হচ্ছিল দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে যাই, ওই কাপড়ের একটা অংশ হয়ে যাই।

হঠাৎ আমার কাঁধে একটা হাত পড়ল। নূরী। “পিছে ঘোরেন। তাকাইয়েন না।” নূরীর গলা কাঁপছিল। আমি ঘোরের মধ্যে ওর সাথে বেরিয়ে এলাম।

পরদিন কারিগর মারা যান। সকালে উনাকে তাঁতের ওপরেই শোয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। উনার সামনে রাখা ছিল আমার মায়ের সেই শাড়িটা। নিখুঁতভাবে সারানো। আর শাড়ির আঁচলে নতুন করে বোনা একটা ছোট্ট নকশা - একটা মাকু আর একটা পদ্মফুল।

কারিগর আমাকে একটা চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিলেন নূরীর কাছে। “বাজান, মেশিনের শব্দে নিজের গলার আওয়াজ ভুইলো না। সুতো যখন ডাক দেয়, তখন যাইতে হয়। রাইত বারোটার পরে দুনিয়া যখন চুপ হয়, তখন আসল বুনন শুরু হয়। আমি আমার বুনন শেষ কইরা গেলাম। তোমার মায়ের শাড়িতে আমি নতুন একটা সুতো জুইড়া দিছি। ওই সুতো আর নূরীর জীবনের সুতো একলগে বান্ধা। প্যাটার্নটা মিলাইয়া নিও।”

এই গল্পের বাকি অংশে একটা বিয়ে আছে। নূরীর সাথে আমার। আমি এখন আর ফাস্ট ফ্যাশনে কাজ করি না। চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। আমি আর নূরী মিলে নিজস্ব একটা হ্যান্ডলুম ব্র্যান্ড দাঁড় করিয়েছি। আমরা দিনে মাত্র কয়েকটা কাপড় বুনি। কিন্তু প্রতিটা কাপড়ে আমরা সময় দিই, যত্ন দিই।

গত মাসে আমাদের একটা ছেলে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে আনার পর, নূরী তাকে একটা সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দিল। আমি চমকে উঠলাম। এটা সেই সুতো - চাঁদের আলো আর শিশির দিয়ে বোনা সেই জাদুকরী সুতো, যেটা কারিগর সেই রাতে বুনেছিলেন। বাচ্চাটা কাঁদছিল খুব। কিন্তু ওই কাপড়ে জড়ানোর সাথে সাথে সে একদম শান্ত হয়ে গেল। সে এমনভাবে চারদিকে তাকাচ্ছিল, যেন সে সব বুঝতে পারছে। যেন সে তার নিজের প্যাটার্ন চিনে গেছে।

আমি এখন আর রাইতে ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন চার্ট দেখি না। আমি এখন কাপড় বাছি। মানুষ যেমন খাবার বাছে। আপনি গায়ে কি জড়াচ্ছেন তার হিসাব কবে করেছেন শেষবার? যেই কাপড় পরলে ভেতরটা অস্থির লাগে, ঘাম হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়, সেটা স্টাইল হতে পারে, কিন্তু আরাম না। আর যেই কাপড় পরলে ভেতরটা শান্ত হয়, মায়ের হাতের ছোঁয়ার মতো লাগে সেটার দাম লাখ টাকার ব্র্যান্ডের চেয়েও বেশি। প্রকৃতি সারাক্ষণ আমাদের বুনছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কার সুতোয় নিজেদের জড়াচ্ছি।

তবে নানুর নিয়মটা আমি এখনো মানি। রাত বারোটার পর আমাদের ঘরে কেউ সুতো কাটে না। সমস্যা একটাই। মাঝে মাঝে, খুব গভীর রাতে, যখন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে যায়, আমাদের স্টোররুম থেকে একটা শব্দ ভেসে আসে। খট... খট... খট... খট। মাকু একা একা হাঁটে। তবে আমি আর ভয় পাই না। কারণ ততদিনে আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি। কিছু বুনন শেষ হওয়ার নয়।

৬ সেপ্টেমবর, ২০২৬ 

উদয় রহমানের “সুর” থেকে অনুপ্রাণিত!

[N.B. বুনন ~ Matrix]

মহাজগত বিষয়ে আমার গবেষণায় এআই সহায়তা - ফরিদ আহমেদ চৌধুরী

: কোন কিছু না থাকা শূন্য অসীম ছিল।  কারণ তাতে তাকে সীমা দেওয়ার মত কিছুই ছিল না।  সেই শূন্যে কোন কিছু হতে কোন বাধা ছিল না। কে বাধা দিবে কেউ ত...