Thursday, January 7, 2016

অতিপ্রাকৃত গল্প: শিরিন

ইমন জুবায়ের

আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে যে মেয়েটির বিয়ে হতে চলেছে সেই মেয়েটি একটি পরী। যদিও ব্যাপারটা আমারই বিশ্বাস করতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমার বড় ভাইয়ের অনেক কিছুই খুব স্বাভাবিক না।আমার মায়ের মুখে শুনেছি, আমার বড় ভাই নাকি ছেলেবেলায় মাঝে-মাঝে হারিয়ে যেত। কখনও তিনদিনের জন্য, কখনও সাত দিনের জন্য। পুলিশে খবর দিয়ে কিংবা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন ছাপিয়েও নাকি কোনও লাভ হত না। অনেক পরে আমার বাবা-মা বুঝতে পেরেছিলেন আমার ভাইকে কারা যেন নিয়ে যেত, আবার দিয়েও যেত। ওই ভৌতিক ঘটনায় আমার মা ভীষন ঘাবড়ে গেলেও আমার বাবা কেন যেন নিশ্চিন্ত থাকত। ছেলে নিখোঁজ, অথচ বাবা টেনশন করছে না-এই ব্যাপারটিও ভারী রহস্যময়। এসবই আমি আমার মায়ের মুখে শুনেছি।

আমার বড় ভাইয়ের নাম রোকন। দেখতে একেবারেই আমাদের মত না। আমার মা-বাবার গায়ের রং শ্যামলা। আমারও। মেয়ে বলেই এই নিয়ে আমার মনে যে কত কষ্ঠ! অথচ রোকন ভাইয়া ফরসা, লম্বা। কেবল ফরসা আর লম্বাই না- রোকন ভাইয়া ভীষণ হ্যান্ডসাম। প্রথম দর্শনেই সবাই মুগ্ধ হয়ে যায়। আমার বান্ধবী ফরিদা তো রোকন ভাইয়াকে দেখে... কী বলব ... সত্যিই রোকন ভাইয়া আমাদের পরিবারে একেবারেই বেমানান।

রোকন ভাইয়ার জন্ম ঠাকুরগাঁও শহরে। বাবা তখন ওই শহরেই প্রাকটিস করতেন। ডাক্তার হিসেবে বাবার নাকি খুব নামডাক হয়েছিল। আমি তখনও হইনি। এসবই আমি আমার মায়ের মুখে শুনেছি। রোকন ভাইয়াকে একটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্লাস ফাইভে ওঠার পর প্রথম হারিয়ে গেল ভাইয়া ...

রোকন ভাইয়া এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর আব্বা ঢাকা চলে এলেন। ভাইয়াকে নিযে বেশ ঝামেলা হচ্ছিল। ঘন ঘন হারিয়ে যাচ্ছিল। ঘরে ফল, মিষ্টি, গোলাপ ফুল- এসব পাওয়া যাচ্ছিল। ভাইয়া নাকি খেতে চাইত না। খেতে বললে বলত খেয়েছি। কি খেয়েছো-জিজ্ঞেস করলেবলত, আপেল, রসগোল্লা আর দুধ ...

আব্বা ঢাকার কলাবাগানে বাড়ি কিনলেন। একতলায় চেম্বার। আমি নতুন স্কুলে ভর্তি হলাম। পুরনো স্কুল ছেড়ে আসতে আমার রীতিমতো কষ্টই হচ্ছিল।রুমা, সালমা, দীপ্তি এদের মুখগুলি সারাক্ষণ মনে পড়ত। সে যাক। রোকন ভাইয়া পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। এসএসসি পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হল ভাইয়া।

হটাৎ করেই আব্বা মারা গেলেন। রোকন ভাইয়া তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আমাদের ছোট্ট সংসারে শোকের ছায়া ঘনালো। মা স্তব্দ হয়ে গেলেন।বাবার জন্য আমারও খুব খারাপ লাগত।বাবা যে আমার সঙ্গে খুব গল্প করত তা নয়। আমি বরং বাবাকে ভয়ই পেতাম। তবে বাবা যে আমায় খুব ভালোবাসত তা বুঝতে পারতাম ...বাবাকে আমার ভারি গম্ভীর মনে হত। ঘরে থাকলে বাবা সারাক্ষণ বই পড়ত। বাবার লাইব্রেরিতে যে কত বই! মনে হয় বই পড়ার অভ্যেস আমি আমার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছি।

ধীরে ধীরে আমরা শোক সামলে নিলাম। দোতলায় থাকি। একতলার চেম্বারটা উঠিয়ে ভাড়া দিয়েছি। পরিবারটি চমৎকার । আতিক আঙ্কেল ব্যাঙ্কার। তার মেয়ে ফরিদা, আমারই সমবয়েসি, ক্লাস টেনে পড়ে, আমার বান্ধবী। বেশ বুঝতে পারলাম- ফরিদা ভাইয়াকে মনে মনে পছন্দ করে।ফরিদা আমাকে একদিন জড়িয়ে ধরে বলল, উফঃ তোর ভাইয়াটা যা সুন্দর না আফরিন! এই কথা শুনে আমার ফরিদার জন্য খারাপই লাগল। রোকন ভাইয়া ওর দিকে মুখ তুলে তাকালে তো। ভাইয়া যা গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। কথা এত কম বলে। আর ভীষণ নামাজী। ফজরের নামাজ পড়ে কী সুন্দর সুর করে কোরান তেলায়াৎ করে। ভাইয়া বাসায় যতক্ষণ থাকে নিজের ঘরেই থাকে।মাঝেমাঝে ছাদে পায়চারী করে। খাওয়ার সময় অবশ্য খাওয়ার টেবিলে আমরা তিনজনই খাই। আমি টিভির সাউন্ড কমিয়ে দেখি। অবশ্য ভাইয়া আমাকে কখনও বকে-টকে না। ভাইয়া কলেজে থাকলে আমি ভাইয়ার ঘর গুছিয়ে দিই।ভাইয়া রাগ করে না।( মা ভাইয়ার ঘরে ঢুকলে কী কারণে ভাইয়া রাগ করে।) ভাইয়ার ঘরে ঢুকলেই কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ পাই। মিষ্টি গন্ধটা অনেকটা আতরের গন্ধের মতন। একদিন ভাইয়া বাসায় ছিল না। ঘর গোছাতে ভাইয়ার ঘরে ঢুকেছি ... দেখি টেবিলের ওপর একটা রূপার থালায় আঙুর, (থালাটা আমাদের না ...আমি সিওর ) অন্য একটি চিনেমাটির প্লেটে (এই প্লেটটা আমাদের না) দুটি বড় বড় সাইজের রসগোল্লা আর চিনেমাটির প্লেটের ঠিক পাশে গোলাপের ছোট একটি ডাল; ডালে লাল টকটকে ফুল। কে যেন রিনরিনে মিষ্টি গলায় বলল: কেমন আছ আফরিন? আমি চমকে উঠলাম। মাথা কেমন টলে উঠল। হিম- হিম ঠান্ডা অসার শরীর নিয়ে কোনওমতে পায়ে পায়ে ঘর ছেড়ে চলে আসি। কথাটা মাকে আর বললাম না ...

এর পর থেকে ভাইয়ার ঘরে আর ঢুকি না। রান্না আর টিভি দেখার ফাঁকে মায়ের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটে। মা কত যে গল্প জানে। ছেলেবেলার গল্প। মার ছোটবেলা কেটেছিল ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গির তলমাল নদীর পাড়ে। নানার সঙ্গে শীতকালে তলমাল নদীর চরে পাখি শিকারের গল্প শুনতে আমার সবচে ভালো লাগে । একবার ভোরবেলা কুয়াশা ফুঁড়ে এক দুধওয়ালা এল।দুধওয়ালা সবাইকে নাকি গরম দুধ খাইয়েছিল। টাকাপয়সা কিছু নেয়নি। দুধওয়ালা চলে যেতেই নানা বলেছিল, দুধওয়ালাটা ছিল জিন। তোর নানা ছোট থাকতে শীতকালে তলমাল নদীর চরে একবার দুধওয়ালাকে দেখেছিল। দুধওয়ালা তখনও গরম দুধ খাইয়েছিল।আমি অবাক হয়ে মাকে বলি মা জিনরাও কি মানুষের মতই মানুষের মধ্যেই থাকে ?

মা বলে, থাকে তো। একবার শোন কী হল। ঠাকুরগাঁও থাকতে তোর বাবা রাতবিরাতে রোগী দেখতে ছুটতেন। একবার ঠাকুরগাঁওয়ের উলির বিলের পাশে রহিমনপুর জিনবাড়িতে তোর আব্বা রোগী দেখতে গিয়েছিল।

জিনবাড়িতে মানে! আমি অবাক।

তোর বাবা চেম্বার থেকে বাসায় ফিরছিল। কনকনে শীতের রাত।হঠাৎ কুয়াশা ফুঁড়ে লম্বাচওড়া এক তরুণ এসে উপস্থিত।তরুণটি তার নাম বলল, জিলানী।তার বউ নাকি প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছে।বাড়ি নাকি কাছেই এখনই একবার যেতে হবে।তো, তোর বাবা রাজি হল যেতে ।হঠাৎ দেখে একটা ঘোড়াগাড়ি। জিলানী ঘোড়াগাড়িতে তোর বাবাকে উঠতে বলল। ঘোড়াগাড়ি চলছে তো চলছে। কুয়াশায় ভালো দেখা যায় না। কোথায় যাচ্ছি জিজ্ঞেস করতেই জিলানী বলল, উলির বিলের পাশে রহিমনপুর উলির বিলের পাশে রহিমনপুর। সে তো অনেক দূর। জিলানী কিছু বলল না। বরং বলল, তার বউয়ের নাম আঞ্জুমান। শরীর নাকি ভালো না। সে যাই হোক। আরও কিছুক্ষণ চলার পরে থামল ঘোড়াগাড়ি।

তোর বাবা চেয়ে দেখে পুরাতন দূর্গের মতন দালান। বড় একটা চাতাল পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে জিলানী তোর বাবাকে একটি ঘরে নিয়ে এল । মশালের আলোয় দেখল একটা পালঙ্কে একটি রূপসী মেয়ে শুয়ে। অবস্থা সত্যিই ক্রিটিকাল। যাক। শেষমেশ তোর বাবার কল্যাণে রক্ষা পেল। ফুটফুটে এক ছেলে হল। তোর বাবার ওপর জিলানী অনেক খুশি হয়েছিল। তোর বাবাকে অনেক রূপার টাকা দিয়েছিল।

রূপার টাকা?

হ্যাঁ রে আফরিন। রূপার টাকা।

রূপার টাকা ওরা কেন দিল মা?

ওরা ছিল জিন।

জিন!

হ্যাঁ। জ্বীন।

আশ্চর্য! সেই রূপার টাকা কই মা? জ্বীনের টাকা নাকি ঘরে রাখতে নেই। সে টাকা তোর বাবা আউলিয়াপুর জামে মসজিদে দান করেছেন।

ওহ্ । পরে ওই জ্বীনদের আর দেখেনি বাবা?

হ্যাঁ, দেখেছে। পরে একবার নাকি জিলানী মিষ্টি-টিষ্টি নিয়ে তোর বাবার চেম্বারে এসেছিল। ছেলের নাম রেখেছে আদনান।

আদনান!

হ্যাঁ। আদনান ।

আশ্চর্য!

একদিন দুপুরে একটা ভারী অদ্ভূত ঘটনা ঘটল...তাতে আমি রোকন ভাইয়া সম্বন্ধে সত্য ঘটনা জানতে পারলাম। ভাইয়া তখন ঢাকা ইউনিভারসিটিতে পড়ে। অর্থনীতি বিভাগে। এইচএসসিতে ভাইয়া দারুণ রেজাল্ট করেছিল। ততদিনে আমি এসএসসি দিয়েছি। রেজাল্ট তখনও বের হয়নি।রান্না করে, টিভি দেখে আর বই পড়ে সময় কাটছিল। এক দুপুরবেলা। মা ঘুমিয়ে ছিল। মায়ের শরীর ভালো ছিল না।কিছুদিন হল মায়ের হার্টের সমস্যা ধরা পড়েছে। গতমাসে বাথরুমে মা মাথা ঘুরে পড়েও গিয়েছিল একবার। আমি পড়ার জন্য কিছু খুঁজছিলাম। আব্বার লাইব্রেরিতে গেলাম। খুঁজতে খুঁজতে ওপরের তাকে বইয়ের ভাঁজে কালো রঙের রেক্সিনের জ্যাকেটের একটা ডায়েরি পেয়ে গেলাম। দেখেই চিনলাম ... বাবার হাতের লেখা, ঝরঝরে বাংলায়- সাধু ভাষায় । পড়ব কিনা তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। হঠাৎই পাতা ওল্টাতে ‘উলির বিলের পাশে রহিমনপুর’ লেখাটায় চোখ আটকে গেল। চোখ বুলিয়ে দেখলাম: বাবা যা লিখেছে সেসব আমি আমার মায়ের মুখে শুনেছি। আমি পড়তে শুরু করলাম। ...

অনেক রাত্রে জিলানী আমাকে ঘোড়াগাড়ি করিয়া উলির বিলের পাশে রহিমনপুরের সেই পরিত্যক্ত দূর্গবাড়ি হইতে আমার ঠাকুরগাঁও শহরের বাসায় পৌঁছাইয়া দিল। রেহনুমা (আমার মায়ের নাম) গর্ভবতী হইয়া ছিল। তাহার প্রসব বেদনা আরম্ভ হইলে পড়ে পরের দিনই তাহাকে আমি ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে ভর্তি করাইয়া দিলাম। আমার দুর্ভাগ্যই বলিতে হয়, প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিল।হাসপাতালের গাইনি বিভাগের আমার একজন সিনিয়র কলিগ ডা. সুমিতা দস্তিদার আমাকে এই ইঙ্গিতে বলিলেন যে, রেহনুমা বাঁচিলেও তাহার অনাগত সন্তান বাঁচিবে নাও পারে। আমি উৎকন্ঠিত হইয়া নির্জন করিডোরে পায়চারী করিতেছিলাম। গভীর শীতের রাত্র। ঠিক তখনই জিলানী আর আঞ্জুমান কে দেখিতে পাইয়া আমি বিস্মিত হইলাম।আমি জানিতাম যে তাহারা জিন প্রজাতির এবং ইহারা যে কোনও সময়ে যে কোনও স্থানে উপস্থিত হইতে পারে। আমি বিপদের সময়ে অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী জীবদের দেখিয়া এক প্রকারের স্বস্তিও পাইলাম।আমি জিলানী আর আঞ্জুমান কে রেহনুমার সর্বশেষ অবস্থার কথা খুলিয়া বলিলাম। আঞ্জুমান আমাকে শান্ত্বনা দিয়া বলিল যে, ভাই, আপনি চিন্তা করিবেন না। আল্লাহই সমস্ত ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন। সন্তান বাঁচিয়া নাই শুনিলে আপনার স্ত্রী মানসিক আঘাত পাইবেন। সেইরকম কিছু হইলে আমি আমার পুত্র আদনানকে আপনার স্ত্রীর কোলে রাখিয়া যাইব। (বুঝিলাম আঞ্জুমান তাহার ছেলের নাম রাখিয়াছে আদনান।) আপনি আমাকে বাঁচাইয়াছেন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনার ঘরে আমার ছেলে বাঁচিয়া থাকিবে। ... আমি আর কী বলিব। আমার তখন তরুণ বয়স। যথাযথ সিদ্ধান্ত লইতে কার্পণ্য করিতাম। রেহনুমার মুখের দিকে চাহিয়া আমি নীরব থাকিলাম। যথাসময়ে রেহনুমা মৃত এক কন্যাসন্তান প্রসব করিল। অবশ্য সে ফুটফুটে এক পুত্রসন্তান লইয়াই আনন্দিত মনে হাসপাতাল হইতে ঘরে ফিরিল। আমিই কেবল শিশুটির প্রকৃত পরিচয় জানিলাম। আর কেহ জানিল না, এমন কী হাসপাতালের নার্সও না। আমি জানি রোকন আমাদের সন্তান নয়, সে আঞ্জুমান- এর সন্তান।বিস্ময়কর হইলেও সত্য যে সে উলির বিলের জিন পরিবারের একজন।

... পড়তে পড়তে আমার শরীর হিম হয়ে এল। আশ্চর্য! রোকন ভাইয়া জিন। আর বাবা সেটা জানত। কথাটা বাবা মাকেও কখনও বলেনি। এখন সব মিলে যাচ্ছে। ভাইয়া ছেলেবেলায় মাঝে-মাঝে হারিয়ে যেত।

পুলিশে খবর দিয়ে কিংবা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন ছাপিয়েও নাকি কোনও লাভ হত না। আমি এখন জানি কেন লাভ হত না। আঞ্জুমান মনে হয় ওর ছেলেকে নিয়ে যেত? কোথায়? উলির বিলে? ওই ভৌতিক ঘটনায় মা ভীষন ভয় পেলেও বাবা কেন যেন নিশ্চিন্ত ছিল। আমি এখন জানি বাবা কেন নিশ্চিন্ত ছিলেন। বাবা আরও লিখেছে ...

জিলানী ইহার পরেও আবার একদিন আমার কাছে আসিয়াছিল। সে মিষ্টি লইয়া আসিয়াছিল। আদনান- এর আকিকার মিষ্টি। সে আরও একটি আনন্দের সংবাদ দিয়া সে বলিল, ফাহমিদা নামে আঞ্জুমান -এর এক বোন আছে। আজই ফাহমিদার একটি কন্যা সন্তান হইয়াছে। ফাহমিদা তাহার কন্যা সন্তানের নাম রাখিয়াছে শিরিন।

এই পর্যন্ত লেখার পর অনেক গুলি পৃষ্ঠা ফাঁকা। অন্য বিষয়ে লেখা। ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট এর হিসাব আর ডাক্তার বন্ধুদের নিয়ে একটা নাসিংহোম দেওয়ার বর্ণনা। ব্যাঙ্ক লোন আর বিনিয়োগের টাকার জন্য ঠাকুরগাঁওয়ের জমি বিক্রির কথা। হঠাৎ একটি পৃষ্ঠায় আমার চোখ আটকে গেল। তারিখ মিলিয়ে দেখলাম বাবার সাত দিন আগে। বাবা লিখেছে:

গতকাল চেম্বারে বসিয়াছিলাম। জিলানী আর তার স্ত্রী আঞ্জুমান আসিল। আঞ্জুমান কে অনেক বৎসর পরে দেখিলাম। এতকাল পরেও মেয়েটি অনিন্দ্য সুন্দরীই রহিয়া গিয়াছে দেখিলাম। আঞ্জুমান সালাম দিয়া আমাকে বলিল ... তাহার বোন ফাহমিদার ইচ্ছা সে তাহার কন্যা শিরিনের সঙ্গে তাহার ছেলে আদনান- এর বিবাহ দিবে। এই কথা শুনিয়া আমি হতভম্ভ হইয়া গেলাম। আমি বিস্ফারিত নয়ানে আঞ্জুমানের দিকে চাহিয়া রহিলাম। আমি বিড়বিড় করিয়া বলিলাম: ইহা কী করিয়া হয়? আঞ্জুমান আমাকে বলিল, আপনি ভাবিবেন না। ফাহমিদারা এখন ঢাকায় থাকে। উয়ারি। আর আল্লাহর ইচ্ছায় শিরিন এই বৎসর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ভর্তি হইয়াছে। এই বলিয়া আমাকে কিছু বলিবার অবকাশ না- দিয়াই জিলানী আর আঞ্জুমান অদৃশ্য হইয়া গেল।আমার স্মরণ হইল বহু বৎসর পূর্র্বে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে আঞ্জুমান আমাকে শান্ত্বনা দিয়া বলিয়াছিল যে, ভাই, আপনি চিন্তা করিবেন না। আল্লাহই সমস্ত ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন। আল্লাহই যখন সমস্ত ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন তখন আমি জানি যে এই বিবাহ হইবেই।জানিনা সমস্ত শুনিলে এত বৎসর পরে রেহনুমার মানসিক অবস্থা কিরূপ হইবে। যাহা হউক, আল্লাহ আমাকে বিবাহ পর্যন্ত বাঁচিয়া থাকিবার তৌফিক দিন ...

না, আল্লাহ, বাবার দোয়া কবুল করেন নি।আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমি কি ডায়েরির কথা মাকে জানব? নাহ্, ঠিক হবে না। মার শরীরের যা অবস্থা।মাকে জানাবো না বলে ঠিক করলাম। আমার ঘরে ডায়েরিটা লুকিয়ে রাখব ঠিক করলাম।

একরাতে খেতে বসে রোকন ভাইয়া বলল, মা, কাল তুমি দুপুরে কাচ্চি

বিরানি রেঁধ।

কেন রে? বলে মা ভাইয়ার প্লেটে রুটি তুলে দিল। ভাইয়া রাতে ভাত খায় না।রুটি আর দুধ খায়।কখনও এক টুকরো ফল।

দুধের বাটিটা টেনে ভাইয়া বলল, কাল ইউনিভার্সিটি থেকে আমার এক ক্লাসমেটকে নিয়ে আসব।ও দুপুরে খাবে।

বেশ তো। বলে চিনির কৌটা খুলতে লাগল মা।

আমার বুক ধক করে উঠল। ভাইয়া ‘ক্লাসমেট’ বলল।ইস্ কতদিন পর আমার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে! আমি কতদিন স্বপ্ন দেখেটি ভাইয়া একদিন ওর এক বন্ধুকে বাসায় নিয়ে আসবে। খুব সুন্দর। লম্বা আর ফরসা। (এত সুন্দর যে ফরিদা দেখে জ্বলে পুড়ে মরবে) তার সঙ্গে আমার পরিচয় হবে। ভাইয়ার ক্লাসমেট ছেলেটা কি খুব সুন্দর? কাল তাহলে আমি শাড়ি পড়ব।আর বোরহানি আর ফিরনিটাও আমিই রাঁধব।

মা আপেল কাটতে কাটতে বলল, তা তোর বন্ধুর নাম কি রে রোকন?

শিরিন।

ওহ্ । মা আমার দিকে তাকালো। মাকে কেমন হতভম্ব দেখাচ্ছে। মুখচোরা ছেলের যে মেয়েবন্ধু থাকতে পারে তা সম্ভবত মায়ের বিশ্বাস হচ্ছিল না। মা জিজ্ঞেস করল, তা মেয়েটা কই থাকে রে? ঢাকায়? না হোস্টেলে থেকে পড়ে?

না মা, শিরিনরা ঢাকায় থাকে।

ঢাকায় কোথায়?

উয়ারি।

Monday, February 21, 2011

রক্ত মোছা রুমাল


একুশ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২।

বিকেল বেলা। শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে ছাত্ররা চতুর্দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এসে রশিদ বিল্ডিং এর কাছ দিয়ে, খন্ড খন্ড মিসিল নিয়ে এগিয়ে চলেছে। পোগোজ হস্টেল থেকে আমরা ক’জন ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মুখ দিয়ে এসে বর্তমান মেডিক্যাল কলেজের সামনে মিসিলে অংশ নিলাম। বর্তমানে যেখানে শহিদ মিনার, সেখানে ছিল ব্যারাক। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা সেখানে থাকতো। খন্ড খন্ড মিসিল একত্রে এসে, একটি বড়ো মিসিলের রূপ নিল। স্লোগান ছিল, ' রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই '।

এরই মধ্যে পুলিস-এর গাড়ি এসে মিসিলের উপর টিয়ার গ্যাস ছুড়তে শুরু করলো। আমি চোখে রুমাল (সবুজ রং-এর) ধরে ব্যারাকের দিকে যেতে চেষ্টা করলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমরা মাটিতে শুয়ে পড়লাম। তখন দেখি একজনের মাথা ও শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে। বোধহয় ছাত্র হবে। গুলি খেয়ে পড়ে গিয়ে ছটফট করছে। আমার হাতের সবুজ রুমাল দিয়ে ছাত্রটির গায়ের রক্ত মুছে দেবার চেষ্টা করলাম। রক্ত বন্ধ হয়না। তার গায়ের রক্ত এসে আমার জামা কাপড়ে লাগলো। তারপরই ক’জন লোক এসে মৃতপ্রায় ছাত্রটিকে উঠিয়ে নিয়ে গেল।

সবুজ ঘাসের উপর দেখলাম ছোপ ছোপ রক্তের বৃত্তাকার ছাপ। আজকে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার যে রঙ, ঠিক তাই। তখন কে জানতো, এই ভাষা আন্দোলনই একদিন স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ নেবে? কে জানতো, সবুজ ঘাসের উপর শহিদের রক্তের লাল দাগ একদিন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় স্থান পাবে? সেদিনের রক্ত মোছা সবুজ রুমাল, হারিয়ে গেছে আজ কতকাল! কিন্তু সবুজের বুকে লাল, সে তো উড়বেই চিরকাল!

লে. কর্নেল অব. ডা. হাফিজ আহমেদ

ময়মনসিংহ, ২২২০
২১  ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২

বাংলা ভাষা ও বানান হাফিজ আহমেদ

অনেকেই মনে করেন, যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত বানানবিধি অনুসরণ না করা এক প্রকার ধৃষ্টতা। তিরিশের দশকের বাঙালিদের ধারণা তাই ছিল। কারণ তখন আসাম ও বাংলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও ভাষা নিয়ন্ত্রিত হত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে। সেই অবস্থা এখন আর নাই। সেই ধারণাও আর নাই। সেইখানেও ভাষার উপর কলকাতার প্রভাব দিনদিনই হালকা হয়ে আসছে। দেশ বিভক্তির পর  হিন্দি রাষ্ট্রভাষা হবার পর সেখানকার বাঙালিদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টির পরিধি সংকুচিত না হলেও প্রসারিত হয় নাই। 

দূরদর্শন-এ নাটকাভিনয়ে, সংবাদ পাঠে ও বিজ্ঞাপন প্রচারে এই বাস্তবতার প্রমাণ পাওয়া যায়। উচ্চারণ আর আগের মত মধুর নয়। সাজসজ্জা উচ্চমানের নয় আর বানান ভুল আছেই। সুতরাং সত্তর বৎসর আগে প্রচলিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ভাষারীতি ও বানাননীতি এই দেশে অনুসৃত হবার কথা বার বার সুপারিশ করা হলেও আমরা তেমন অনুপ্রাণিত হতে পারছি না। আমরা আমাদের স্বদেশের লেখক ও সম্পাদকদের লেখা হতে জ্ঞাতসারে নিত্যই অনুপ্রাণিত হচ্ছি। আমরা ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছি। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছি। ফলে আবির্ভাব হয়েছে এক নতুন জাতির। রক্তাক্ত সংগ্রাম ও জাতীয় সত্তার নূতন উপলব্ধি দারুণভাবে প্রভাব ফেলেছে ভাষা, বানান ও গোটা সাহিত্যের উপর। তাই আমাদের লেখকদের সৃষ্ট সাহিত্যে দেশের কথা আছে, আছে আধুনিক জীবনযাত্রার কথা। আর আছে সংগ্রামের কথা, আছে গ্রামের কথা। তাই হুমায়ুন আহমেদ-এর নাটক সীমা ছাড়িয়ে ঐপারের বাঙালিদের চিত্তকে আকর্ষণ করে। অনুমান করতে পারি যে, তারা অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। আধুনিক বাংলাভাষা এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ঢাকা হতে। গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, সাহিত্যে সমৃদ্ধ আমাদের মাতৃভাষা ক্রমপরিবর্জন ও ক্রমপরিবর্ধনের পথ ধরে দিন দিনই সম্মুখের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এইসব ভেবে আমরা যদি নিজেদের সাহিত্যের জন্য নিজেরা গর্বিত হই, তা কোনমতেই দোষের হতে পারে না। সেই সময় বর্ণমালায় ‘৯’ (লি) বর্ণ ছিল। আজ আর তা নাই। বর্গীয় ‘ব’ ও অন্তস্থ ‘ব’- এর আকৃতি ও উচ্চারণে কোন পার্থক্য নাই বলে, শিশুদের বর্ণ বইতে এখন একটি ‘ব’ই মুদ্রিত হচ্ছে। তখনকার অনেক রীতিই আজকাল ধীরে ধীরে অচল হতে চলেছে। ভাষার গতি সময়ের গতিকে দ্রুত অতিক্রম করে যে নীতিগত পরিবর্তন এনেছে তা আমাদের চেতনাকে শাণিত করছে। বুঝতে পারছি যে, এই পরিবর্জন ও পরিবর্ধনের গতিতে আর যতি আসবে না, চলতে থাকবে।

আজকে ভাষার আরও সংস্কার প্রয়োজন, বিজ্ঞানসম্মত বানান ব্যাকরণভুক্ত  হওয়া প্রয়োজন। আমাদের একটা অভ্যাস আছে যে, একটি শব্দ লেখা শেষ হলেই একটি  ী-কার কলমের টানেই শব্দশেষে লাগিয়ে দেয়া। চেতনার তাড়নায় মানুষ এখন  বুঝতে পেরেছে যে, সকল শব্দ শেষে  ী-কার দেওয়া একটি ভুল অভ্যাস। সেইজন্য শব্দশেষে অপ্রয়োজনীয় ও ব্যাকরণসম্মত নয়, এমন ী-কারকে বিদায় দেওয়া প্রয়োজন। 

বাংলাবাসি ও বাংলাভাষি যারাই মনযোগ দিয়ে সাহিত্যচর্চা করেন, তাদের প্রায় সকলেই এই পরিবর্ধিত বানানরীতি অনুসরণ করে আসছেন। এই ব্যাপারে পুস্তক প্রণেতাদের হতে পত্র-পত্রিকার সম্পাদকগণই অগ্রণি ভূমিকা রেখে আসছেন। তারাই আজ অগ্রসর। আজ প্রায় লেখকই সাগ্রহে সানন্দে শব্দশেষে  ি -কার ব্যবহার করছেন। তাদের আগ্রহ আমাদেরকে আকৃষ্ট করছে।

একসময় আমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ তুলে ধরতাম। আর আজ বাংলাদেশের আধুনিক লেখকদের লেখা তুলে  ধরবার মত দৃষ্টান্তের অভাব নাই। কলকাতায় বলা হয়, আকাদেমি। আর আমরা বলি ‘অ্যাকাডেমি’। আমাদেরটাই ব্যাকরণ সম্মত। কারণ আমরা শব্দের মূল উচ্চারণের বিকৃতি হতে দেই নাই। ভাষার উৎকর্ষ সাধনে এখন আমরা কলকাতা হতে অগ্রগামি। এর কারণ বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করবার আন্দোলনে, অমর একুশেতে বাঙালি যুবকদের অকাতরে প্রাণদান আর ভাষা ও স্বাধীনতার মূল্য পরিশোধে শেখ মুজিবের অকালে আত্মদান।

পশ্চিম বংগে বাংলাভাষা বাঙালিদের মাতৃভাষা এবং ভারতে তা প্রাদেশিক ভাষা। এইখানে বাংলা আমাদের মাতৃভাষা এবং এই ভাষা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। পশ্চিম বংগে বানানে শব্দের রূপান্তর ঘটেছে ধীরে ধীরে। বাংলাদেশে শব্দের শ্রী এসেছে দ্রুত গতিতে। আধুনিক সাহিত্যে এসেছে আধুনিক বানান। অর্থাৎ শব্দের স্বর ও সুর ক্রমশ সরল হয়ে এসেছে। তা আসতে থাকবে আগামি দিনেও। ‘শ্রেণী’ ও ‘কর্মসূচী’-তে আধুনিকতার স্রোতে আজকাল  ি - কার এসেছে। এতে আমরা খুশি। তবে শত লেখালেখিতেও পুলিস বানানে কেউই ‘স’ ব্যবহার করছেন না।  সেই দুঃখে আমরা মুহ্যমান। আমাদের বিশ্বাস, ‘পুলিস’ বানানটি অদূর ভবিষ্যতে সকলেই ‘স’ দিয়া লিখতে উৎসাহিত হবেন। কারণ বানানটি অভিধানে আছে এবং তা অবশ্যই ব্যাকরণের বিধান মত।

দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত আমাদের প্রথিতযশা লেখকদের নিবন্ধে আধুনিক বানানের প্রতি আমরা গভীর মনযোগের সাথে দৃষ্টি দেই। কোথায় কোথায় ী-কারের পরিবর্তে  ি-কারের আর্বিভাব ঘটেছে তা লক্ষ্য করি। সেই দেখার খানিকটা এইখানে তুলে ধরতে চাই।

১। স্ত্রীবাচক শব্দের অন্তে ী-কার হয়। এইসব শব্দে লিঙ্গ পার্থক্য বুঝবার কারণেই শব্দশেষে ী-কার দিতে হয়। মনে এরূপ ভাবনা আসে যে, হয়তবা পঁচিশ বৎসর পর স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে এই  ী-কার নাও থাকতে পারে। ‘নদি’ ি-কার দিয়ে লিখলে, যদি শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গই বুঝায় তা হলে এই ী-কারের ব্যবহার এইখানে নাও থাকতে পারে। কিছু কিছু শব্দ আজকাল ি-কার দিয়ে লেখা হয়। শব্দগুলি যে স্ত্রীলিঙ্গ তা বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না। যেমন গিন্নি, বৌদি, দিদি, বিবি, রানি, দাদি, নানি, মামি, মাসি, পিসি, মুরগি ইত্যাদি।

২। জাতি বাচক শব্দের অন্তে আজকাল কেবলই  ি-কার ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকা হতে প্রকাশিত অগ্রসর দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলিতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন পাকিস্তানি, জাপানি, মাদ্রাজি, সৌদি, কুয়েতি, বিহারি, বাঙালি ইত্যাদি। 

৩। ব্যক্তিবাচক অনেক শব্দের অন্তে  ি-কার ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন বন্দি, বাদি, কেরানি, আসামি, ফেরারি, সিপাই, কৌসুলি ইত্যাদি।

৪। সংস্কৃত বা প্রাকৃত হতে আসে নাই এমন সকল বংশগত শব্দের অন্তে আজকাল ি-কার ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন কাজি, গাজি, ফরাজি, নিয়াজি, জিলানি, কোরেশি, রিজভি, আলভি, গিরি, রেড্ডি, চৌধুরি ইত্যাদি।

৫। সংস্কৃত বা প্রাকৃত হতে আসে নাই এমন সকল নামবাচক শব্দের সকল জায়গায় কেবল ি- কার ব্যবহৃত হয়। যেমন চার্চিল, ক্লিনটন, কেনিডি, ইয়েলতসিন, রহিম, রশিদ, শহিদ, শফিক, মুসলিম, কামালউদ্দিন ইত্যাদি। তবে অর্ধ শতাব্দি পূর্বে রাখা নামগুলিতে ী-কার ও  ূ-কার ছিল। তা আজও আছে। যেমন কাজী, সাহাবউদ্দীন, নূরউদ্দীন, আয়ূব, হুমায়ূন, ওয়াদূদ ইত্যাদি। এইসব নামে ি- কার ও  ু-কার থাকলে ভাল হত।

৬। অর্জিত খেতাবেও ি-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন ক্বারি, কবি, মৌলভি, হাজি, বয়াতি ইত্যাদি।

৭। সংস্কৃত বা প্রাকৃত হতে এসেছে এমন সকল নামের অন্তে ী-কার ব্যবহৃত হতে দেখা গিয়েছে। তা অর্ধশত বৎসর আগের কথা। আজকাল অনেকেই ঐ সকল শব্দে ি-কার ব্যবহার করছেন। যেমন চক্রবর্তি, পূজারি, সন্ন্যাসি ইত্যাদি। আরও লক্ষ্য করা যায় যে, কতিপয় উচ্চবর্ণ হিন্দু নামের অন্তে  ি-কার ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন চ্যাটার্জি,ব্যানার্জি, গাংগুলি, ব্রহ্মচারি ইত্যাদি।

৮। ভাষাবাচক শব্দের অন্তে নির্দ্বিধায় ি-কার ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন ইংরেজি, ফরাসি, আরবি, হিন্দি, মারাঠি, সিংহলি, পালি, নেপালি ইত্যাদি।

৯। প্রাণিবাচক কতিপয় শব্দের অন্তে  ি-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন পাখি, হাতি ইত্যাদি।

১০। বস্তুবাচক শব্দের অন্তে  ি-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন বাড়ি, গাড়ি, শাড়ি, কড়ি, ঢেঁকি, কাঁচি ইত্যাদি।

১১। স্থানবাচক সকল শব্দের অন্তে আজকাল সানন্দে  ি-কার ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন করাচি, কান্ডি, রাওয়ালপিন্ডি, দিল্লি, চিলি, মালি, নাগাসাকি, পিকিং, হেলসিংকি ইত্যাদি। আমাদের দেশেও এইসব শব্দের অন্তে সাগ্রহে ি-কার ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন মহাখালি, নোয়াখালি, ধানমন্ডি, ফেনি, রাজবাড়ি, ঝালকাঠি, নলসিটি ইত্যাদি। এটা শুভ লক্ষণ। স্থানবাচক শব্দের শুধু অন্তে নয়, আদিতে ও মধ্যে সর্বত্রই ি-কার ব্যবহৃত হয়। যেমন সান্তিয়াগো, হো চিমিন সিটি, চিন, ব্রিস্টল, মতিঝিল, গচিহাটা ইত্যাদি। এইসব স্থানে ি-কার ব্যবহার করলে ধ্বনি কোমল থাকবে, শুনতে ভাল লাগবে, দেখতে সুন্দর ও লিখতে সহজ হবে।

১২। বিশেষণবাচক শব্দের অন্তে আজকাল ী-কার ব্যবহার ব্যাপক হারে কমে গেছে। ি-কার ব্যবহারের হিড়িক পড়ে গিয়েছে। আধুনিক লেখকদের নিবন্ধে, প্রায় সকল সংবাদপত্রের সংবাদের শিরোনামের দিকে লক্ষ্য করলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। যেমন দেশি, বিদেশি, বেশি, খুশি, সরকারি, কারিগরি, কর্মচারি, বহুমুখি ইত্যাদি। তবে ব্যাংকগুলির নামের অন্তে পূর্ব হতেই সরকারিভাবে ী-কার আছে বলেই ‘সোনালী’, ‘রূপালী’, শব্দগুলিতে ি- কার ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সোনালি, রূপালি, ও পূবালি লিখতে পারলে সুন্দর হত।

১৩। কতিপয় বাংলা শব্দের অন্তে ী-কার হয়। আবার ঐ সকল শব্দ পরিবর্তিত অবস্থানে ী-কার বর্জন করে ি-কার অর্জন করে। যেমন  প্রতিযোগী, সহযোগী, স্থায়ী, প্রাণী, মন্ত্রী ইত্যাদি শব্দগুলি ী-কার হারিয়ে হয় প্রতিযোগিতা, সহযোগিতা, স্থায়িত্ব, প্রাণিবিদ্যা বা প্রাণিবাচক, মন্ত্রিসভা। মূল শব্দে ী-কারের পরিবর্তে ি-কার আনা যায় কিনা তা এখনই ভেবে দেখা দরকার। ‘জাতি’ কি করে ‘জাতীয়’ হয় তার ব্যাখ্যা কোথাও পাই না।

১৪। শব্দটি কিন্তু ‘কম্পানি’। আমরা লিখি ‘কোম্পানী’। আর একটি শব্দ ‘ফটোগ্রাফী’। এটিও ভুল, হবে ‘ফটোগ্রাফি’। ‘ফোন’ যেইভাবে উচ্চারিত হয় সেইভাবে। একটি মজার নিয়ম আছে যা সকলেই অনুসরণ করেন। কিন্তু এটাই যে নিয়ম তা হয়ত অনেকেই জানেন না।

বাংলায় ব্যবহৃত সকল বিদেশি শব্দের আদিতে, মধ্যে ও অন্তে কখনও ী-কার হয় না। বিদেশি হলেই শব্দটিতে কেবল ি-কার হবে। ছাত্র ছাত্রীদের এই নিয়মটি সহজ বলে সহজেই মনে থাকবে। যেমন মিলিটারি, আর্টিলারি, ইস্টার্ন, স্ট্রিট, লিমিটেড, কম্পানি, জিওগ্রাফি, ফোটোগ্রাফি, প্যাথলজি (শব্দশেষে যত-জি আছে)। ডিকশনারি , জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, প্রাইমারি, লাইব্রেরি, ব্যাটারি, নোটারি, নার্সারি, গ্যালারি, জুয়েলারি,  কনফেকশনারি, সার্জারি, লটারি, ল্যাবরেটরি (শব্দের শেষে যত রি আছে)। এজেনসি, ফার্মাসি, কোতোয়ালি, অ্যাভিনিউ, অ্যাকাডেমি ইত্যাদি।

১৫। ইংরেজী অনেক শব্দের বাংলায় ‘অ্যা’ হয়। যেমন অ্যাসিড, অ্যাপোলো, অ্যাপেক্স, অ্যারোম্যাটিক, অ্যান্ড, অ্যানজেলিক, অ্যানাটমি, অ্যাস্ট্রলজি, অ্যাডভোকেট, অ্যাকাউন্টস, অ্যাকাডেমি, অ্যাভিনিউ ইত্যাদি।

১৬। বাংলায় বিদেশি শব্দ লিখতে ৃ-কার কখনও ব্যবহৃত হবে না। যেমন ব্রিষ্টল, ব্রিসবেন, ব্রিটিশ, ব্রিটেন, খ্রিস্টাব্দ, ফ্রি, প্রিটোরিয়া, গ্রিনল্যান্ড ইত্যাদি।

১৭। ইংরেজি ‘S’ বা ‘SS’ র  স্থলে বাংলায় কেবলই ‘স’ হয়। যেমন স্টেশন, মাস্টার, স্টোর, স্টোন, ক্লাস, গ্লাস ইত্যাদি। দুইটি শব্দ ব্যতিক্রম আছে। শুগার ও ইশ্যু লিখতে ‘শ’ হবে।

১৮। যে সকল ইংরেজি শব্দের শেষে ‘CE’ আছে সেই সকল শব্দ শেষে বাংলায় অবশ্যই ‘স’ হবে । এটি  ব্যাকরণের বিধান। যেমন পুলিস, নোটিস, অফিস, জাষ্টিস ইত্যাদি ।

১৯। বিদেশী শব্দ লিখতে ‘ষ’ ও ‘ণ’ বর্ণ দুইটি ব্যবহার করা যায় না। যেমন  পোষ্ট হবে পোস্ট, ইষ্টার্ণ হবে ইস্টার্ন, হর্ণ হবে হর্ন, মডার্ণ হবে মডার্ন, কর্ণার হবে কর্নার, কর্ণেল হবে কর্নেল ইত্যাদি।

২০। ইংরেজি ST-র স্থলে বাংলায় কেবলই ‘স্ট’ হয়। যেমন স্টাফ, স্টার, অগাস্ট, স্টুডিও ফোটোস্ট্যাট ইত্যাদি।

২১। শহরের প্রায় সাইনবোর্ডগুলিতে ভুল বানানে অনেক শব্দ দেখতে পাওয়া যায়। শব্দগুলির শুদ্ধ বানান হবে স্টুডিও, স্টোর, স্টেশন, হর্ন, কর্নার, কর্নেল, অগাস্ট, ফোটোস্ট্যাট, অ্যাডভোকেট, অ্যাভিনিউ, অ্যাকাডেমি, কোতোয়ালি, পুলিস ইত্যাদি। শুদ্ধ বানানে এই সকল শব্দ লিখলে ভাষার প্রতি আমাদের ভালবাসাই প্রকাশ পাবে।

বাংলা ভাষাকে আরবি এবং পরে ইংরেজী বর্ণমালায় লিখবার এমনকি মাতৃভাষার উপর গুলি চালাবার নির্মম আদেশ এসেছিল বর্ধমান হাউজ হতে। পশ্চিমা শাসকবর্গের সেই চেষ্টা সফল হয় নাই। পরবর্তিতে বাঙালি সংস্কৃতির ও ভাষার উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যেই জন্ম হয়েছিল  'বাংলা একাডেমী'র। সেই বর্ধমান হাউজই হচ্ছে আজকের বাংলা অ্যাকাডেমির সকল কর্মকান্ডের পাদপীঠ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে, তাদের প্রকাশিত অভিধানগুলিতে অনেক বানান ভুল দেখতে পাওয়া যায়। সময়ের সাথে মিল রেখে ভাষাকে বৈজ্ঞানিক ভাবে ব্যাকরণ-নির্ভরশীল করে তুলবার কোন পদক্ষেপ এখনও নেয়া হয় নাই। আমাদের বিরাট ভলিউমের ব্যাকরণ বই ও অভিধানগুলি বহু বৎসর পর পর কেবল পুনর্মুদ্রিত হয়, কখনও সম্পাদিত হয় না। রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘আমাদের স্কুল-কলেজগুলোতে ট্রাম চলে, মন চলে না’। সেই কথাগুলি এখন আমাদের বেলায় খাটছে। আমরা সুন্দর টাই পরে, বঙ্গবন্ধুর দেওয়া উদীয়মান রক্তিম সূর্যখচিত সবুজ পতাকা লাগিয়ে ‘বাংলা একাডেমী’-তে অনুপ্রবেশ করি, বাংলা অ্যাকাডেমিতে প্রবেশ করতে আমাদের মন চায় না। দুই তিন বৎসর পরপর বাংলা অ্যাকাডেমির প্রশাসনে পরিবর্তন আসে। এইবারও এসেছে। ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, স্বদেশের বিশিষ্ট লেখক এবং পত্রিকা সম্পাদকের সাথে পরামর্শ করে বাংলাভাষা উন্নয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। বাংলা অ্যাকাডেমির বর্তমান কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে উদ্যোগ নিলে জাতি একটি যুক্তিসংগত বাংলা ব্যাকরণ এবং একটি ব্যাকরণসম্মত আধুনিক অভিধান উপহার পেতে পারে। তখন এই কথা কেউ বলতে পারবে না যে, ভাষার প্রতি আমাদের আদর নাই। ভাষার প্রতি ভালবাসা দেখালে কে না খুশি হবে?

*****

ভুল বানান হাফিজ আহমেদ

পাঠ্য পুস্তুকে ও স্বনামধন্য লেখকদের বইতে অসংখ্য ভুল বানান দেখতে পাওয়া যায়। এগুলো অনেকদিন পরপর পুনর্মুদ্রিত হয়। কিন্তু সম্পাদিত হয় না। সেখানে আমাদের মতো নগণ্য পাঠকদের মতামত প্রকাশের সুযোগ খুবই সীমিত। অপরদিকে অগ্রসর দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোতে প্রতিদিন ও প্রতিসপ্তাহেই আধুনিক ও ব্যাকরণ সম্মত বানান অনুসরণ করে সম্পাদিত হয় বলে, ভুল বানান খুব কম দেখা যায়। এখানে আমাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ ব্যাপক। আমরা যা লিখি প্রকাশকগণ তাদের পত্রিকায় তা প্রকাশ করেন। আমরা তখন বাধিত হই। আর সেজন্য প্রকাশকদের সাধুবাদ জানাই। স্বাধীনতার পর থেকেই এসব বিষয়ে আমরা লিখে আসছি। ফলে ভুল বানান ধীরে ধীরে  কমে আসছে। এখনও যেসব শব্দ ভুল বানানে প্রতিদিন পত্রিকায় মুদ্রিত হয় তা দেখে ব্যথিত হই। সেসব শব্দের প্রতি সম্পাদকদের দৃষ্টি চাই। অফিস, প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ও বিজ্ঞাপনে শুদ্ধ বানান আসবে, তাও আমরা চাই। সবাইকে সবিনয়ে জানাতে চাই যে, ভুল বানান নির্মূল করার লক্ষ্যে আমরা যে সরব ও কলম অভিযান চালাচ্ছি, তা চলতে থাকবে।  বর্তমানে যেসব শব্দ ভুল বানানে মুদ্রিত দেখি সেসব নিয়েই এখন আলোচনা করবো।


১।‘যদু’ লিখতে য ব্যবহার করা হয় ঠিকই। কিন্তু ‘জাদুকর’ বা ‘জাদুঘর’ লিখতে ‘য’ ব্যবহার করা যায় না।
২।‘ঘোষণা’ লিখতে ‘ষ’ ব্যবহার করা হয় ঠিকই। কিন্তু ‘ঘুস’, লিখতে ‘ষ’ ব্যবহার করা যায় না।
৩।‘পোষণ’ লিখতে ‘ষ’ ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু ‘পোশাক’ লিখতে ‘শ’ এবং ‘আপস’ লিখতে ‘স’ ব্যবহার করতে হবে।
৪।‘বসন’, ‘আসন্ন’ লিখতে ‘স’ ও ‘ন’ ব্যবহার করা হয় ঠিকই। কিন্তু ‘ভাষণ’, ভীষণ’, ভূষণ’, ‘দূষণ’, ‘শোষণ’, ‘পোষণ’, বিষন্ন’ ‘পাষাণ’ ‘ঘোষণা’ ও ‘প্রশিক্ষণ’ লিখতে ‘ষ’ ও ‘ণ’ ব্যবহার করতে হবে। আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, ‘ষ’ এর পর অবশ্যই ‘ণ’ হবে।
৫।‘মুহূর্ত’, মুমূর্ষু’, শুশ্রূষা’ লিখতে অনেকেই প্রথম বর্ণেই  ূ - কার দিয়ে ফেলেন। তা ঠিক নয়। প্রথম বর্ণে  ু- কার, দ্বিতীয় বর্ণে  ূ-কার আসবে।
৬।‘ভূগোল’ ও ‘দূরান্ত’ লিখতে  ূ-কার হবে। কিন্তু ‘ভুবন’ও ‘দুরন্ত’ লিখতে  ু-কার হবে।
৭। অনেকেই ‘উচিত’ ও ‘খদ্যোত’ লিখতে ‘ৎ’ ব্যবহার করে থাকেন। শব্দ দুটোতে ‘ত’ ব্যবহার করতে হবে।
৮।দেখা যায় বিদেশি শব্দ লিখতে কখনও কখনও ‘ৎ’ ব্যবহার করেন। তা ঠিক নয়। শব্দ গুলোর বানান হবে, ‘সোভিয়েত’, ইয়েলতসিন’, ‘সানইয়েত সেন’, ভিয়েতনাম’, ‘নাতসি’, ‘ব্লিতসক্রিগ’, ‘ইবাদত’, ‘হেমায়েত’, ‘সাহাদাত’, ‘হায়াত’, লুতফর’, ইত্যাদি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোন বিদেশি শব্দ লিখতে ‘ৎ’ ব্যবহার করা যায় না।
৯। কোন কোন সম্পাদকীয়তে দেখেছি ‘মেডিকেল’। তা ঠিক নয়। শুদ্ধ বানান হবে ‘মেডিক্যাল’। যেমন  ‘সার্জিক্যাল’, ‘অপটিক্যাল’, ‘কেমিক্যাল’, ‘ফার্মাসিউটিক্যাল’, ‘অ্যাকাডেমিক্যাল’, ‘ক্যালসিয়াম’ ইত্যাদি।
১০। অনেকেই ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ ও ‘গীতাঞ্জলি’ লিখতে  ী-কার দিয়ে বসেন। এটি অনেকেরই ভুল অভ্যাস। অর্থ্যাৎ কলমের টানে শব্দ শেষ হলেই একটা ী-কার দিয়ে ফেলেন। আমাদের মনে রাখা দরকার যে স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যতীত প্রায় সকল শব্দ শেষে আজকাল  ী-কার এর পরিবর্তে  -িকার ব্যবহার করা হচ্ছে।
১১। কোন কোন পত্রিকায় ‘নোটিস’ ‘শ’ দিয়ে মুদ্রিত হয়। তা ঠিক নয়। যেসব ইংরেজী শব্দের শেষে CE আছে সেসব CE-র স্থলে বাংলায় অবশ্যই ‘স’ হবে। যেমন ‘পুলিস’, ‘অফিস’, ‘ডিফেন্স’, ‘কমার্স’, ‘প্র্যাকটিস’ ইত্যাদি। এ নিয়মের কোন ব্যতিক্রম নেই।
১২। বাংলা শব্দেই কেবল  ৃ-কার ব্যবহৃত হয়। বিদেশি শব্দে নয়। যেমন ‘পৃথিবী’, ‘বৃত্ত’, ‘নৃত্য’ ইত্যাদি। কিন্তু কোনো বিদেশি শব্দে যেমন ‘ব্রিটেন’, ‘ব্রিটিশ’, ‘ফ্রিজ’, ‘ব্রিজ’, ‘ব্রিগেডিয়ার’, ‘ব্রিস্টল’, ‘খ্রিস্টাব্দ’ লিখতে কখনও  ৃ-কার ব্যবহার করা যায় না।
১৩। ‘রেফ’, উপরে থাকলে বর্ণ কখনও দ্বিত হয় না। যেমন ‘আচার্য’, ‘কার্যালয়’, ‘ধৈর্য্’,  ‘আয়ুবের্দ’, ‘আশীর্বাদ’, ফার্মাসি’, চক্রবর্তি’, ‘বর্ষপূর্তি’ ইত্যাদি।
১৪। উপরে ‘রেফ’ থাকলে নিচে অবশ্যই ‘ণ’ হবে। যেমন ‘স্বর্ণ’, ‘কর্ণ’, ‘বর্ণ’, ‘পূর্ণিমা’ ইত্যাদি। এই নিয়মে অনেকে ‘ঝর্ণা’ লিখে থাকেন। তা ঠিক নয়। ‘ঝরনা’ লিখতে  রেফ লাগে না। তাই ‘ণ’ আসতে পারে না। এটি মনে রাখার মতো একটি চমৎকার ব্যতিক্রম।
১৫। অনেকেই ‘হর্ন’, জার্নাল, কর্নার, মর্ডান, কর্নেল,  লিখতে ‘ণ’ ব্যবহার করে থাকেন। তা ঠিক নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে কোনো বিদেশি শব্দ লিখতে কখনই ‘ণ’ ব্যবহার করা যায় না।
১৬। অনেকেই ‘স্লোগান’, ‘ক্লাস’, ‘পাস’ লিখতে ‘শ’ ব্যবহার করে থাকেন। তা ঠিক নয়। ইংরেজী 'S' এবং ‘SS’ এর স্থলে বাংলায় অবশ্যই ‘স’ হবে। তবে ‘শুগার’, ও ‘ইশ্যু’ লিখতে ‘শ’ ব্যবহৃত হয়। এ দুটি ব্যতিক্রম মাত্র।
১৭। ইংরেজী ‘ST’ র স্থলে বাংলায় সর্বদাই ‘স্ট’ হবে। যেমন ‘অগাস্ট’, ‘স্টার’, স্টোর’, ‘স্টিকার’, ‘ইস্টার্ন’, ‘স্টুডিও’, ‘ডেনটিস্ট’, ‘খ্রিস্টাব্দ’, ‘ফোটোস্ট্যাট’, ‘ইনডাস্ট্রিজ’ ইত্যাদি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোনো বিদেশি শব্দ লিখতে কখনও ‘ষ’ বা ‘ষ্ট’ ব্যবহার করা যায় না। ওসব ক্ষেত্রে সর্বদাই ‘স’ বা ‘স্ট’ ব্যবহার করতে হবে।
১৮।‘অন্বেষা’  ও ‘স্বদেশ’ ইংরেজিতে লিখতে অনেকেই Annesha ও Shadesh লিখে থাকেন। শব্দ দুটির শুদ্ধ বানান হবে  Anwesha ও Swadesh.
১৯। ‘West End School’ বাংলায় ‘ওয়েস্ট এনড স্কুল’ হবে। ‘End’ -এর জন্য ‘এনড’, ঠিকই আছে। কিন্তু ‘And’ এর জন্য ‘অ্যানড’ হবে।
২০। ইংরেজি A-র জন্য বাংলায় অনেক ক্ষেত্রেই ‘অ্যা’ হয়। যেমন ‘অ্যানড’, ‘অ্যাসিড’, ‘অ্যালকোহল’, ‘অ্যাপেক্স’, ‘অ্যানজেল’, ‘অ্যাডভোকেট’, ‘অ্যাভিনিউ’, ‘অ্যাকাডেমি’ ইত্যাদি।
২১। অনেক সাইন বোর্ডে দেখা যায়, ‘কোম্পানী’, ‘কোতায়ালী’, ও ‘ফটোষ্ট্যাট’। এসব ক্ষেত্রে সঠিক বানান হবে, ‘কম্পানি’, ‘কোতোয়ালি’ ও ‘ ফোটোস্ট্যাট’।
২২। বাংলা বর্ণমালায় ‘ঞ’, ‘ন’ ও ‘ণ’-এর জন্যে ইংরেজির ‘N’ হবে। কিন্তু ইংরেজির ‘N’ এর জন্যে বাংলায় কেবলই ‘ন’ হবে। ‘ঞ’ বা ‘ণ’ হবে না। ‘ন’ তার পরবর্তি বর্ণের সাথে যুক্ত হয়ে যুক্তাক্ষর তৈরি করবে না। যেমন, ‘ক্লিনটন’ (ক্লিন্টন নয়), ‘ক্যানটনমেনট’, ‘কনটিনেনটাল’, ‘লনডন’, ‘অ্যানড’, ‘ফ্রেনচ’, ‘বেনচ’, ‘সেনচুরি’, ‘অ্যানজেল’, ‘চ্যালেনজ’, ‘লাউনজ’, ‘মনজুর’ ইত্যাদি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোন বিদেশি শব্দ লিখতে ‘ঞ’ বা ‘ণ’ কোনটাই ব্যবহার করা যায় না।
২৩। অনেকেই  শব্দ সংকোচনে ‘ং’ ব্যবহার করে থাকেন। যেমন ‘কোং’ ‘তাং’, ‘নং’ ইত্যাদি। এ বিধি ব্যাকরণ সম্মত নয়। তাই সংকোচন না করে পুরো শব্দটাই লিখতে হবে। যেমন ‘কম্পানি’, ‘তারিখ’ এবং ‘নম্বর’।
২৪। শব্দ সংক্ষিপ্ত করতে আবার অনেকেই  ইচ্ছেমতো ‘ঃ’ ব্যবহার করে থাকেন। যেমন ‘ডাঃ’ ‘অবঃ’, ‘মোঃ’, ‘লিঃ’ ইত্যাদি। কিন্তু ব্যাকরণে এরকম কোনো বিধান নেই। তাই বিদগ্ধ সম্পাদকগণ এসব ক্ষেত্রে ‘.’ বিন্দুর আবির্ভাব ঘটিয়েছেন। শব্দগুলো মুদ্রিতাকারে দেখতে খুবই সুন্দর। যেমন ‘ডা.’, ‘অব.’, ‘মো.’, এবং ‘লি.’।

বাংলাভাষায় ‘.’ বিন্দুর আগমন, শুভেচ্ছা, স্বাগতম!  সম্পাদকগণ একটি অঘোষিত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ‘.’ বিন্দুর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে কোন ফাঁকে বিন্দু যে বিসর্গের স্থান দখল করে নিয়েছে, তার বিন্দু বিসর্গও আমরা টের পাইনি। যখন টের পেয়েছি, বিন্দুর অবস্থান তখন সুগভীরে সুপ্রোথিত। এ বিন্দুই বিন্দু বিন্দু করে দিনদিনই ভাষার শ্রী বৃদ্ধি করে চলেছে। এর কৃতিত্ব সবটাই সম্পাদকদের।

তিনটি বিষয় এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে।
      ১. বিদেশি শব্দে কখনও ী- কার ূ-কার ও ৃ-কার ব্যবহার করা যায় না।
      ২. বিদেশি শব্দে কখনও ছ, ঞ, ষ, ণ,ও ৎ বর্ণগুলো ব্যবহৃত হয় না।
      ৩. স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যতীত শব্দশেষের ী-কার এর ব্যবহার আজকাল অনেক কমে এসেছে।  

ভাষাবিদগণ আগ্রহ দেখালে শব্দশেষে ী-কার এর ব্যবহার আরও কমে আসবে। লেখার এ অংশটুকু  কপি করে টেবিলের উপর রাখলে, ভাষা প্রেমিকদের বানান সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে বানান ভুল দ্রুত কমে আসবে। ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’, এটা কবির কবিতা! ভালোভাষার প্রতি ভালোবাসার কথা! সে কি কম আনন্দের কথা?

*****

Tuesday, March 17, 2009

মহানীলে মহাখেলা


 এ লেখায় আপনার বৈজ্ঞানিক বিষয়বস্তুকে সহজ ভাষায় তুলনা (বিলিয়ার্ড বলের খেলা) দিয়ে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা চোখে পড়ে। জটিল ধারণা (mass segregation, গ্লোবিউলার ক্লাস্টার) পাঠকের কাছে বোধগম্য করে তোলার জন্য আপনি চিত্রকল্প ও তুলনা ব্যবহার করেছেন, যা একজন দক্ষ ব্লগারের বৈশিষ্ট্য। তথ্যসূত্র (নাসা, হাবল স্পেস টেলিস্কোপ) উল্লেখ করাও লেখাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

আরও উন্নতির জন্যঃ

পাঠকের কৌতূহল বাড়াতে প্রশ্ন রেখে শেষ করতে পারেন।

তথ্যের সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বা কল্পনা যোগ করলে (যেমন: “এত নক্ষত্রের মাঝে আমাদের রাত কেমন হতো?”) পাঠকের সম্পৃক্তি বাড়ে।

বানান ও বাক্য গঠনে একটু মনোযোগ দিলে পাঠের গতি আরও সুন্দর হবে।

সামগ্রিকভাবে, আপনি জ্ঞান-বিজ্ঞানের জটিলতা সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে পারছেন—এটি একজন ব্লগারের বড় শক্তি।  

মন্তব্যগুলো থেকে দেখা যায়, পাঠকেরা আপনার বৈজ্ঞানিক লেখাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, বিষয়বস্তুকে উপভোগ করেছেন এবং আরও এ ধরনের লেখা চেয়েছেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগত আলাপেও যুক্ত হয়েছেন, যা পাঠকের সাথে আপনার সংযোগকে আরও দৃঢ় করে।

এটি স্পষ্ট, আপনি পাঠকেরা দ্বারা উৎসাহিত হচ্ছেন এবং ব্লগার হিসেবে ইতিবাচক প্রভাব রাখছেন।

AI এর রেটিং -

আপনার ব্লগ পোস্টের ভাষা, বিষয় নির্বাচন, উপস্থাপন ও পাঠক প্রতিক্রিয়া বিচার করে ব্লগার হিসেবে আপনাকে ১০-এর মধ্যে ৮ দেবো।

মূল্যায়নের কারণঃ

লেখনীঃ বিজ্ঞানের জটিল বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। তুলনা ও চিত্রকল্প ব্যবহার পাঠকের জন্য বিষয়টি সহজবোধ্য করেছে। পাঠকেরা উৎসাহিত মন্তব্য করেছেন ও আরও লেখা চেয়েছেন। তথ্যসূত্র দিয়ে লেখার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছেন।

ভবিষ্যত পদক্ষেপঃ

বানান ও বাক্য গঠনে আরও একটু যত্ন নিলে লেখার গতি ও সৌন্দর্য বাড়বে। লেখার শেষে পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের জন্য প্রশ্ন বা আহ্বান যোগ করা যেতে পারে। মাঝে মাঝে আরও ব্যক্তিগত অনুভূতি বা গল্প যোগ করলে পাঠকের সম্পৃক্তি বাড়তে পারে।

সারসংক্ষেপঃ আপনার লেখার বিষয় নির্বাচন ও ব্যাখ্যা খুবই ভালো। পাঠকেরা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন এবং নিয়মিত অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন। চলতে থাকুন—আপনি নিঃসন্দেহে একজন দক্ষ ও সম্ভাবনাময় ব্লগার! আরও ভালো করতে বানান-ব্যাকরণ ও উপস্থাপনায় সামান্য মনোযোগ দিলে আপনি ১০-এর মধ্যে ৯-১০ও পেতে পারেন। 

১৭/০৩/২০০৯ ট্যালাহাসি
০৭/১০/২০২৬ নায়াগ্রা ফলস্‌

Friday, August 31, 2007

কাব্যের ঘোর

 ~~ অনাম্নী স্বাক্ষর  

বয়সটা তখন নিতান্তই ছোট। পা ছড়িয়ে কান্না জুড়লে আকাশ তাকে ছুঁতেই হবে। ওইযে মাঠের শেষে আকাশ নেমে আসে, দিগন্ত যায় ছুঁয়ে, ওইখানেতেই আকাশ ছোঁয়া যায়। সারাবাড়ীতে উঠলো ভীষণ সোরগোল। কেউ মুখ বাঁকায়, কেউ বা করে করুণা। তবে একটা ব্যাপারে সব্বাই একমত দাদুর আদরে  বাঁদর হয়েছেমেয়েটা। ছোট্ট পায়ে আকাশমুখো হয়ে এক পা এক পা করে পৌঁছে গেলি তুই যৌবনবেলায়। 

ফেলেআসা কিশোরীবেলা তখনও ডাকে দুপুরের নির্জন ক্ষণে। বৃন্দার জ্বোরো–কপালে হাতখানি  রেখে কতগুলো দুপুর পার করেছিলি?  দূরন্ত কাশির দমকে রক্ত উঠে গড়িয়ে পড়েছিল তোরহাতে। সেই রক্তের মধ্যে কিলবিল করা জীবাণুগুলো তোকে ভয় পেয়েছিল। কিছুতেই ভাঙ্গতে পারেনি তোর ফুসফুসের দুয়ার। শুধু প্রসারিত করেছিল হৃদয়ের অলিন্দখানি। আজও একটুএকটু করে চলেছে সেই প্রসারণ।

সপ্তদশী তখননায়িকার ঘোরে। চলতে ফিরতে মুখ দেখে নেওয়া মুকুরে। শরৎ কিম্বা রবির নায়িকাদের সঙ্গে মিল খুঁজে হয়রান। আর তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নায়কের আসা যাওয়া। কেউ বা গোরারআর্ধেক শারিরীক, কেউ বা শচীশের আর্ধেক মানসিক। পুরোপুরি হয় না কেউ। তবু তারই মাঝেআধাআধি মন দেওয়া – নেওয়া খেলা। কখনো মৌনবটের নীচে স্তব্ধ দুপুর নিরালায়।কখনও শ্যাওলার দুখঘেরা একলা পুকুরঘাটে। নির্জন কাকচক্ষু জলে নিজেরই মুখখানি দেখেভালবেসে ফেলা। আকাশের ডানামেলা গভীর ছায়ায় খেয়ালী পানকৌড়ির অকারণ ডুব। অথচ নায়কেরবৃথা মান অভিমান। প্রতিসৃত সাত রঙে রামধনু মন নিয়ে নিজেকেই ভালবাসা, ওরা শুধু আয়নার স্বচ্ছতা  নিয়ে অপেক্ষায় থাকে।সত্যিটা ঢাকা পড়ে মিথ্যের ফাঁদে। প্রেম ঘুরে মরে মদনের শরে। তবু আমূল বিধঁলো নাকোন শর তোর প্রাণে। ডুব দিলি তুই প্রেমসায়রে তবু মৃত্যু হলো না তোর। নিভৃত প্রাণমরণ কামনায় জারিত করে আপনাকে। আশ্লেষে স্পর্শ করার অঙ্গীকার নিয়ে ডুব দেয় অবুঝ উদাসীনতায়। ও মেয়ে তোর বেলা যে পড়ে এলো জলকে চল। 

পরিযায়ীপাখি উড়ে যায় সময়ের ফেরে। সপ্তদশ কখন যে বিশের কোঠা পেরিয়ে যায়, যেতে যেতে দেখে যায় তোর মুখখানি। তখনও সারা মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ। মহুয়া মাতাল মন খুঁজে ফেরেআপনাকে। রোদ্দুর শরীর ছায়া ছায়া মন, একটু সবুজ অলিন্দের খোঁজ। কস্তুরিমৃগ তুইপাগলপারা হে। 

মনের মানুষ খুঁজতে গেলি অচিনপুরে তবু তার নাগাল পেলি নে। 

সময়টা তখন অসময়ের গন্ডি পেরিয়ে যাবার পণ করে বসেছে, হঠাৎ দেখা হয়ে গেল সুজনের সঙ্গে। সু টাযদি হয় সুন্দর তবে জন অর্থে মানুষ। মানে পুরোটা জুড়ে একটা সুন্দর মানুষ। তবে ওই যেদেখার কথা বললুম ওইখানে আছে কিছু গোড়ায় গলদ। সুজন যে অশরীরী, তাকে কি শরীরে ধরাযায়? মন দিয়ে ছোঁয়া যায়। প্রেমজুরি তার ঝলকে উঠে মনের আবেগে। মারবি যখন মরবি তখন,তবু মরার কথা জানবি না। অথচ মেয়েটা সেইখানেই মরল। চোখের আলোয় দেখা হলো না শুধুশুনে শুনেই মরণ হলো চোখের বাহিরে।

প্রেম কিদেয়, বিনিময়ে কি বা চায়? সমস্ত প্রাত্যহিকতার বাইরে সে নিয়ে যেতে চায় বটে কিন্তুদামও সে কিছু ধরে। ব্যক্তি স্বরূপের পরীক্ষা হয় সেখানে।  সুজনের আয়নায় নিজেরই চিন–পরিচয়। নির্মেদ প্রেমে রাতভেজা শিশিরের স্পর্শ নিয়ে প্রেমের সংজ্ঞা ফাঁদলিমেয়ে। তবু তুই ঘ্রাণ নিলি নে শরীরে অবুঝ যন্ত্রণার। অস্ফুট চুম্বন স্ফুরণ পেল না কোনদিন। অথচ ন হন্যতে তখনও আঁচড় কাটে ঠোঁটের কিনারায়। আলিঙ্গনের আকাঙ্ক্ষাপৃষ্ঠাবদ্ধ হয়ে যায় জীবনের পাতায়।

প্রকৃতির হাটেবাটে অনেকগুলো বসন্ত পার হয়ে আসে মেয়েটা।জীবনের পাতাগুলো ক্রমশ হলুদ। সেদিন রাতে আকাশ মেতেছে প্রলাপে। বর্ষার ঘনঘোর রাতকুহকে জাগিয়ে রাখে তোকে।  সহসা শরীর  মন্থন করে উঠে আসে অদম্য ইচ্ছা। একবার যাচাইকরে নিতে চায় নিজেকে। সুজনের প্রেমজুরিতে ঝঙ্কার ওঠে নিভৃতে।  থৈথৈ আকাঙ্ক্ষার ঘূর্ণিতে নিঃশব্দ বিগব্যাং ঘটেযায়। ক্রমশঃ প্রসারিত হতে থাকে ব্রহ্মান্ডের মতো। দূর থেকে আরো দূরে অশরীরী মন্থনে। ভেসে যায় যত সু যত কুআর সমাজের কঠিন বন্ধন। রাতের গভীরে নামে অঝোর বৃষ্টি। ভিজে যায় জীবন যৌবন অকারণ।গোপন প্রেম রাতের অন্ধকারে ঝাড় লন্ঠন জ্বালিয়ে দেয়। অশরীরী প্রেম তবু ছুঁয়ে যায় শরীরের কানায় কানায়। প্রেমের অলখ দুয়ার খুলে কাব্য ওঠে ঝলকে। প্রেমজুরি বেয়ে উঠেআসে নতুন জগৎ, কাব্যের জগৎ।  

একসিন্ধু শরীরী আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অকাল সন্ধিক্ষণ বিষ উদ্‌গিরণে বিহবল তবু মন্থনে অচঞ্চল। অবুঝপ্রেমের দারুণ দাহে বল্গাবিহীন তৃষ্ণা জ্বালায় পোড়ায় তবু সবুজাভ অব্যয়। অশ্রুরবৃষ্টিকাহিনী আঁচড় কাটে, ফোঁটা ফোঁটা হৃদয়ের গ্রন্থন তবু উদাসী অকারণ কাব্যের ঘোর।

মেয়ে তুই কাব্য করিস? চোদ্দটা আকাঙ্ক্ষাজুড়ে লাইন সাজাস। এরে তুই কাব্য বলিস? ছি ! হেতু দিয়ে জীবনখানা মাপ। অহেতুক কথা সাজিয়ে ধোঁয়াশা  লাগাস প্রাণে। লিখবি যদি খাড়া লাইনে লেখ। সমাজের সমস্যাটা বোঝ, তারপরেতে লেখ না কেন যত ইচ্ছে তোর। 

কাব্যের মোহ ভেঙে ভেঙেযায়। জীবনের সহজপাঠের পাতাখানি আবার উল্টে দেখা। কবি তো কেউ চায় না, সবাই যেন সমাজ সংস্কারক! মিথ্যে হৃদয়, মিথ্যে হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা। অথচ আমার হৃদয় তোমার হৃদয়দিয়েই তো সমাজের হৃদয়খানি গড়া। 

ধুত্তোরিতোর নিকুচি করেছে আকাঙ্ক্ষায়। অ – হেতুবাদী হৃদয়মার্কা মতবাদখানা আস্তাকুঁড়ে ফেল রে মেয়ে। একটু বাস্তববাদী হ। নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে পৃথিবীটাকে দুচোখ মেলেদেখ্‌, কাব্যের জগতে বাজিমাৎ।

অমন অবুঝ চোখে তাকাস কেন মেয়ে? 

আমিও বুঝি রে বিজ্ঞানের প্রথম সূত্রটা বাইরে থেকে আসেনি,এসেছে মানুষের ভেতরের জটিল আবর্তের উদ্‌ঘাটন থেকে। বাইরে থেকে কি কেউ যাত্রা করে? ভেতর থেকে যাত্রা করতে হয়। দেখিস নিজের ভেতরের জটিল আবর্তের জট খুলতে খুলতে আমরাএকদিন পৌঁছে যাব মানবতার দ্বারে। সেদিন তোকে ছেড়ে সমাজের অস্তিত্ব থাকবে না।সুজনের প্রেমজুরিতে কাব্য গেঁথে মেয়ে তুই পথে নামিস। গলা ছেড়ে তোর পেটেন্ট ছাড়িস ‘প্রেমজুরিতে প্রেম বাজেনা, প্রেমেতে বাজে প্রেমজুরি।’

Wednesday, March 23, 1988

জীবন যেমন - ফিরোজা হারুন


 ‘জীবন যেমন’ কবিতার বিষয়বস্তু, ভাষা, অলংকার, ছন্দ, প্রতিপাদ্য ও শিল্পমূল্য বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা —

কবিতার সারাংশ ও বিষয়বস্তু

‘জীবন যেমন’ কবিতায় কবি শৈশবের সরলতা ও আনন্দ থেকে জীবনের জটিল, অজানা যাত্রায় প্রবেশের রূপক চিত্র তুলে ধরেছেন। নদীর ধারে রান্নাবাটি খেলার মাধ্যমে শুরু হয় জীবনের সহজ সময়, যেখানে নানা দেশের নৌকা, নানা পণ্য, নানা মুখ এসে ঘাটে ভিড় করে। এখানে বৈচিত্র্যময় জীবন, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা—সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

প্রতীক ও রূপক

নদী এবং নৌকা এখানে জীবনের প্রতীক। নদী প্রবাহিত—এভাবেই জীবনও চলমান। রান্নাবাটি খেলা শৈশবের নিষ্পাপ সময়ের প্রতীক। নানা দেশের নৌকা ঘাটে ভিড় করা বোঝায় জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, মানুষের আগমন-প্রস্থান। কেউ আনে সুখ (শাড়ি, সিঁদুর), কেউ দুঃখ (বিষের বাঁশি), কেউবা সংগ্রাম (অগ্নিবীণা)।

‘অচিনপুরে গেলাম চলে ভাসিয়ে আপন ভেলা’— এখানে অচিনপুর মানে অজানা গন্তব্য, অর্থাৎ মৃত্যু বা ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তা।

ভাষা ও অলংকার

কবিতায় ভাষা সহজ, সাবলীল ও চিত্রময়। রূপক ও প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করে কবি জীবনের নানা পর্যায় তুলে ধরেছেন। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’—এখানে অনুপ্রাস ও রূপক অলংকার লক্ষণীয়। ‘ঘাটের পাড়ে পাগলি মেয়ে কেঁদেই হল সারা’—এটি জীবনের বেদনা ও অসহায়ত্বের চিত্রায়ণ।

ছন্দ ও কাঠামো

কবিতাটি ছন্দোবদ্ধ হলেও মুক্ত ছন্দের অনুরণন রয়েছে। প্রতি চরণে চিত্রকল্প ও শব্দের ছন্দময় বিন্যাস কবিতার আবেগকে গভীরতা দিয়েছে।

প্রতিপাদ্য

জীবন এক অবিরাম যাত্রা, যেখানে শৈশবের খেলা, নানা অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখ, বিচ্ছেদ, কষ্ট—সব কিছুই মিলেমিশে থাকে। সময়ের স্রোতে শৈশব হারিয়ে যায়, মানুষ অজানার পথে এগিয়ে চলে—এটাই জীবনের স্বাভাবিকতা।

শিল্পমূল্য

‘জীবন যেমন’ কবিতায় কবি ফিরোজা হারুন অত্যন্ত সংবেদনশীল ভাষায় জীবনের বহুমাত্রিকতা ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রতীকী উপস্থাপন, চিত্রকল্প ও আবেগঘন বর্ণনা কবিতাটিকে শিল্পগুণে ঋদ্ধ করেছে।

উপসংহার

এই কবিতার মূল বক্তব্য—জীবন কখনোই একরৈখিক নয়। এখানে রয়েছে বৈচিত্র্য, পরিবর্তন, অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলা। কবিতা পাঠকের মনে গভীর ভাবনার জন্ম দেয় এবং জীবনের গতিময়তাকে উপলব্ধি করতে সহায়তা করে।

------------------------------------------------------------------------

নিম্নোক্ত পঙ্‌ক্তি দুটি —

‘কোথায় রইলো রান্নাবাটি কোথায় রইল খেলা
অচিনপুরে গেলাম চলে ভাসিয়ে আপন ভেলা।’

বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা

এখানে কবি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে জীবনের পরিবর্তন ও অজানা যাত্রার কথা প্রকাশ করেছেন। নিচে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো—

১. শৈশবের সরলতা ও হারিয়ে যাওয়া সময়

‘কোথায় রইলো রান্নাবাটি কোথায় রইল খেলা’—এই চরণে কবি শৈশবের নিষ্কলুষ আনন্দ, সরলতা ও খেলার দিনগুলোর কথা স্মরণ করেছেন। একসময় নদীর ধারে রান্নাবাটি খেলা ছিল তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। এখানে ‘রান্নাবাটি’ ও ‘খেলা’ শৈশবের প্রতীক, যা সময়ের স্রোতে আর ফিরে আসে না।

২. জীবনের অজানা পথে যাত্রা


‘অচিনপুরে গেলাম চলে ভাসিয়ে আপন ভেলা’—এই চরণে কবি জীবনের অজানা, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ‘অচিনপুর’ মানে অজানা দেশ বা গন্তব্য, যা জীবনের শেষপ্রান্ত বা মৃত্যুর প্রতীকও হতে পারে। ‘আপন ভেলা’ বলতে বোঝায় নিজের জীবন, নিজের নিয়তি। জীবনের স্রোতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে কবি অজানার পথে যাত্রা করছেন।

৩. রূপক ও প্রতীক

এই দুই চরণে কবি নদী ও ভেলার প্রতীকী ব্যবহার করেছেন। নদী জীবনের প্রবাহ, আর ভেলা নিজের নিয়ন্ত্রণ, যাকে সময়ের স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। শৈশবের আনন্দ (রান্নাবাটি ও খেলা) সময়ের ব্যবধানে অদৃশ্য হয়ে যায়; মানুষ এগিয়ে চলে ভবিষ্যতের অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে।

৪. মানবজীবনের সার্বজনীন সত্য

এই পঙ্‌ক্তিগুলো দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন—শৈশব, আনন্দ ও খেলা একদিন ফুরিয়ে যায়; সবাইকেই জীবনের অজানা পথে এগিয়ে যেতে হয়। এটাই মানবজীবনের চিরন্তন বাস্তবতা।


উপসংহার:

এই দুইটি পঙ্‌ক্তি শুধুমাত্র শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশ নয়, বরং সময়ের প্রবাহে হারিয়ে যাওয়া আনন্দ ও জীবনের অনিশ্চিত যাত্রার গভীর রূপক চিত্র। কবি অনন্য দক্ষতায় জীবনের এই রূপান্তর ও অনিবার্য যাত্রাকে প্রকাশ করেছেন।

মহাজগত বিষয়ে আমার গবেষণায় এআই সহায়তা - ফরিদ আহমেদ চৌধুরী

: কোন কিছু না থাকা শূন্য অসীম ছিল।  কারণ তাতে তাকে সীমা দেওয়ার মত কিছুই ছিল না।  সেই শূন্যে কোন কিছু হতে কোন বাধা ছিল না। কে বাধা দিবে কেউ ত...