Monday, February 21, 2011

ভুল বানান হাফিজ আহমেদ

পাঠ্য পুস্তুকে ও স্বনামধন্য লেখকদের বইতে অসংখ্য ভুল বানান দেখতে পাওয়া যায়। এগুলো অনেকদিন পরপর পুনর্মুদ্রিত হয়। কিন্তু সম্পাদিত হয় না। সেখানে আমাদের মতো নগণ্য পাঠকদের মতামত প্রকাশের সুযোগ খুবই সীমিত। অপরদিকে অগ্রসর দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোতে প্রতিদিন ও প্রতিসপ্তাহেই আধুনিক ও ব্যাকরণ সম্মত বানান অনুসরণ করে সম্পাদিত হয় বলে, ভুল বানান খুব কম দেখা যায়। এখানে আমাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ ব্যাপক। আমরা যা লিখি প্রকাশকগণ তাদের পত্রিকায় তা প্রকাশ করেন। আমরা তখন বাধিত হই। আর সেজন্য প্রকাশকদের সাধুবাদ জানাই। স্বাধীনতার পর থেকেই এসব বিষয়ে আমরা লিখে আসছি। ফলে ভুল বানান ধীরে ধীরে  কমে আসছে। এখনও যেসব শব্দ ভুল বানানে প্রতিদিন পত্রিকায় মুদ্রিত হয় তা দেখে ব্যথিত হই। সেসব শব্দের প্রতি সম্পাদকদের দৃষ্টি চাই। অফিস, প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ও বিজ্ঞাপনে শুদ্ধ বানান আসবে, তাও আমরা চাই। সবাইকে সবিনয়ে জানাতে চাই যে, ভুল বানান নির্মূল করার লক্ষ্যে আমরা যে সরব ও কলম অভিযান চালাচ্ছি, তা চলতে থাকবে।  বর্তমানে যেসব শব্দ ভুল বানানে মুদ্রিত দেখি সেসব নিয়েই এখন আলোচনা করবো।


১।‘যদু’ লিখতে য ব্যবহার করা হয় ঠিকই। কিন্তু ‘জাদুকর’ বা ‘জাদুঘর’ লিখতে ‘য’ ব্যবহার করা যায় না।
২।‘ঘোষণা’ লিখতে ‘ষ’ ব্যবহার করা হয় ঠিকই। কিন্তু ‘ঘুস’, লিখতে ‘ষ’ ব্যবহার করা যায় না।
৩।‘পোষণ’ লিখতে ‘ষ’ ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু ‘পোশাক’ লিখতে ‘শ’ এবং ‘আপস’ লিখতে ‘স’ ব্যবহার করতে হবে।
৪।‘বসন’, ‘আসন্ন’ লিখতে ‘স’ ও ‘ন’ ব্যবহার করা হয় ঠিকই। কিন্তু ‘ভাষণ’, ভীষণ’, ভূষণ’, ‘দূষণ’, ‘শোষণ’, ‘পোষণ’, বিষন্ন’ ‘পাষাণ’ ‘ঘোষণা’ ও ‘প্রশিক্ষণ’ লিখতে ‘ষ’ ও ‘ণ’ ব্যবহার করতে হবে। আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, ‘ষ’ এর পর অবশ্যই ‘ণ’ হবে।
৫।‘মুহূর্ত’, মুমূর্ষু’, শুশ্রূষা’ লিখতে অনেকেই প্রথম বর্ণেই  ূ - কার দিয়ে ফেলেন। তা ঠিক নয়। প্রথম বর্ণে  ু- কার, দ্বিতীয় বর্ণে  ূ-কার আসবে।
৬।‘ভূগোল’ ও ‘দূরান্ত’ লিখতে  ূ-কার হবে। কিন্তু ‘ভুবন’ও ‘দুরন্ত’ লিখতে  ু-কার হবে।
৭। অনেকেই ‘উচিত’ ও ‘খদ্যোত’ লিখতে ‘ৎ’ ব্যবহার করে থাকেন। শব্দ দুটোতে ‘ত’ ব্যবহার করতে হবে।
৮।দেখা যায় বিদেশি শব্দ লিখতে কখনও কখনও ‘ৎ’ ব্যবহার করেন। তা ঠিক নয়। শব্দ গুলোর বানান হবে, ‘সোভিয়েত’, ইয়েলতসিন’, ‘সানইয়েত সেন’, ভিয়েতনাম’, ‘নাতসি’, ‘ব্লিতসক্রিগ’, ‘ইবাদত’, ‘হেমায়েত’, ‘সাহাদাত’, ‘হায়াত’, লুতফর’, ইত্যাদি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোন বিদেশি শব্দ লিখতে ‘ৎ’ ব্যবহার করা যায় না।
৯। কোন কোন সম্পাদকীয়তে দেখেছি ‘মেডিকেল’। তা ঠিক নয়। শুদ্ধ বানান হবে ‘মেডিক্যাল’। যেমন  ‘সার্জিক্যাল’, ‘অপটিক্যাল’, ‘কেমিক্যাল’, ‘ফার্মাসিউটিক্যাল’, ‘অ্যাকাডেমিক্যাল’, ‘ক্যালসিয়াম’ ইত্যাদি।
১০। অনেকেই ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ ও ‘গীতাঞ্জলি’ লিখতে  ী-কার দিয়ে বসেন। এটি অনেকেরই ভুল অভ্যাস। অর্থ্যাৎ কলমের টানে শব্দ শেষ হলেই একটা ী-কার দিয়ে ফেলেন। আমাদের মনে রাখা দরকার যে স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যতীত প্রায় সকল শব্দ শেষে আজকাল  ী-কার এর পরিবর্তে  -িকার ব্যবহার করা হচ্ছে।
১১। কোন কোন পত্রিকায় ‘নোটিস’ ‘শ’ দিয়ে মুদ্রিত হয়। তা ঠিক নয়। যেসব ইংরেজী শব্দের শেষে CE আছে সেসব CE-র স্থলে বাংলায় অবশ্যই ‘স’ হবে। যেমন ‘পুলিস’, ‘অফিস’, ‘ডিফেন্স’, ‘কমার্স’, ‘প্র্যাকটিস’ ইত্যাদি। এ নিয়মের কোন ব্যতিক্রম নেই।
১২। বাংলা শব্দেই কেবল  ৃ-কার ব্যবহৃত হয়। বিদেশি শব্দে নয়। যেমন ‘পৃথিবী’, ‘বৃত্ত’, ‘নৃত্য’ ইত্যাদি। কিন্তু কোনো বিদেশি শব্দে যেমন ‘ব্রিটেন’, ‘ব্রিটিশ’, ‘ফ্রিজ’, ‘ব্রিজ’, ‘ব্রিগেডিয়ার’, ‘ব্রিস্টল’, ‘খ্রিস্টাব্দ’ লিখতে কখনও  ৃ-কার ব্যবহার করা যায় না।
১৩। ‘রেফ’, উপরে থাকলে বর্ণ কখনও দ্বিত হয় না। যেমন ‘আচার্য’, ‘কার্যালয়’, ‘ধৈর্য্’,  ‘আয়ুবের্দ’, ‘আশীর্বাদ’, ফার্মাসি’, চক্রবর্তি’, ‘বর্ষপূর্তি’ ইত্যাদি।
১৪। উপরে ‘রেফ’ থাকলে নিচে অবশ্যই ‘ণ’ হবে। যেমন ‘স্বর্ণ’, ‘কর্ণ’, ‘বর্ণ’, ‘পূর্ণিমা’ ইত্যাদি। এই নিয়মে অনেকে ‘ঝর্ণা’ লিখে থাকেন। তা ঠিক নয়। ‘ঝরনা’ লিখতে  রেফ লাগে না। তাই ‘ণ’ আসতে পারে না। এটি মনে রাখার মতো একটি চমৎকার ব্যতিক্রম।
১৫। অনেকেই ‘হর্ন’, জার্নাল, কর্নার, মর্ডান, কর্নেল,  লিখতে ‘ণ’ ব্যবহার করে থাকেন। তা ঠিক নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে কোনো বিদেশি শব্দ লিখতে কখনই ‘ণ’ ব্যবহার করা যায় না।
১৬। অনেকেই ‘স্লোগান’, ‘ক্লাস’, ‘পাস’ লিখতে ‘শ’ ব্যবহার করে থাকেন। তা ঠিক নয়। ইংরেজী 'S' এবং ‘SS’ এর স্থলে বাংলায় অবশ্যই ‘স’ হবে। তবে ‘শুগার’, ও ‘ইশ্যু’ লিখতে ‘শ’ ব্যবহৃত হয়। এ দুটি ব্যতিক্রম মাত্র।
১৭। ইংরেজী ‘ST’ র স্থলে বাংলায় সর্বদাই ‘স্ট’ হবে। যেমন ‘অগাস্ট’, ‘স্টার’, স্টোর’, ‘স্টিকার’, ‘ইস্টার্ন’, ‘স্টুডিও’, ‘ডেনটিস্ট’, ‘খ্রিস্টাব্দ’, ‘ফোটোস্ট্যাট’, ‘ইনডাস্ট্রিজ’ ইত্যাদি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোনো বিদেশি শব্দ লিখতে কখনও ‘ষ’ বা ‘ষ্ট’ ব্যবহার করা যায় না। ওসব ক্ষেত্রে সর্বদাই ‘স’ বা ‘স্ট’ ব্যবহার করতে হবে।
১৮।‘অন্বেষা’  ও ‘স্বদেশ’ ইংরেজিতে লিখতে অনেকেই Annesha ও Shadesh লিখে থাকেন। শব্দ দুটির শুদ্ধ বানান হবে  Anwesha ও Swadesh.
১৯। ‘West End School’ বাংলায় ‘ওয়েস্ট এনড স্কুল’ হবে। ‘End’ -এর জন্য ‘এনড’, ঠিকই আছে। কিন্তু ‘And’ এর জন্য ‘অ্যানড’ হবে।
২০। ইংরেজি A-র জন্য বাংলায় অনেক ক্ষেত্রেই ‘অ্যা’ হয়। যেমন ‘অ্যানড’, ‘অ্যাসিড’, ‘অ্যালকোহল’, ‘অ্যাপেক্স’, ‘অ্যানজেল’, ‘অ্যাডভোকেট’, ‘অ্যাভিনিউ’, ‘অ্যাকাডেমি’ ইত্যাদি।
২১। অনেক সাইন বোর্ডে দেখা যায়, ‘কোম্পানী’, ‘কোতায়ালী’, ও ‘ফটোষ্ট্যাট’। এসব ক্ষেত্রে সঠিক বানান হবে, ‘কম্পানি’, ‘কোতোয়ালি’ ও ‘ ফোটোস্ট্যাট’।
২২। বাংলা বর্ণমালায় ‘ঞ’, ‘ন’ ও ‘ণ’-এর জন্যে ইংরেজির ‘N’ হবে। কিন্তু ইংরেজির ‘N’ এর জন্যে বাংলায় কেবলই ‘ন’ হবে। ‘ঞ’ বা ‘ণ’ হবে না। ‘ন’ তার পরবর্তি বর্ণের সাথে যুক্ত হয়ে যুক্তাক্ষর তৈরি করবে না। যেমন, ‘ক্লিনটন’ (ক্লিন্টন নয়), ‘ক্যানটনমেনট’, ‘কনটিনেনটাল’, ‘লনডন’, ‘অ্যানড’, ‘ফ্রেনচ’, ‘বেনচ’, ‘সেনচুরি’, ‘অ্যানজেল’, ‘চ্যালেনজ’, ‘লাউনজ’, ‘মনজুর’ ইত্যাদি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোন বিদেশি শব্দ লিখতে ‘ঞ’ বা ‘ণ’ কোনটাই ব্যবহার করা যায় না।
২৩। অনেকেই  শব্দ সংকোচনে ‘ং’ ব্যবহার করে থাকেন। যেমন ‘কোং’ ‘তাং’, ‘নং’ ইত্যাদি। এ বিধি ব্যাকরণ সম্মত নয়। তাই সংকোচন না করে পুরো শব্দটাই লিখতে হবে। যেমন ‘কম্পানি’, ‘তারিখ’ এবং ‘নম্বর’।
২৪। শব্দ সংক্ষিপ্ত করতে আবার অনেকেই  ইচ্ছেমতো ‘ঃ’ ব্যবহার করে থাকেন। যেমন ‘ডাঃ’ ‘অবঃ’, ‘মোঃ’, ‘লিঃ’ ইত্যাদি। কিন্তু ব্যাকরণে এরকম কোনো বিধান নেই। তাই বিদগ্ধ সম্পাদকগণ এসব ক্ষেত্রে ‘.’ বিন্দুর আবির্ভাব ঘটিয়েছেন। শব্দগুলো মুদ্রিতাকারে দেখতে খুবই সুন্দর। যেমন ‘ডা.’, ‘অব.’, ‘মো.’, এবং ‘লি.’।

বাংলাভাষায় ‘.’ বিন্দুর আগমন, শুভেচ্ছা, স্বাগতম!  সম্পাদকগণ একটি অঘোষিত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ‘.’ বিন্দুর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে কোন ফাঁকে বিন্দু যে বিসর্গের স্থান দখল করে নিয়েছে, তার বিন্দু বিসর্গও আমরা টের পাইনি। যখন টের পেয়েছি, বিন্দুর অবস্থান তখন সুগভীরে সুপ্রোথিত। এ বিন্দুই বিন্দু বিন্দু করে দিনদিনই ভাষার শ্রী বৃদ্ধি করে চলেছে। এর কৃতিত্ব সবটাই সম্পাদকদের।

তিনটি বিষয় এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে।
      ১. বিদেশি শব্দে কখনও ী- কার ূ-কার ও ৃ-কার ব্যবহার করা যায় না।
      ২. বিদেশি শব্দে কখনও ছ, ঞ, ষ, ণ,ও ৎ বর্ণগুলো ব্যবহৃত হয় না।
      ৩. স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যতীত শব্দশেষের ী-কার এর ব্যবহার আজকাল অনেক কমে এসেছে।  

ভাষাবিদগণ আগ্রহ দেখালে শব্দশেষে ী-কার এর ব্যবহার আরও কমে আসবে। লেখার এ অংশটুকু  কপি করে টেবিলের উপর রাখলে, ভাষা প্রেমিকদের বানান সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে বানান ভুল দ্রুত কমে আসবে। ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’, এটা কবির কবিতা! ভালোভাষার প্রতি ভালোবাসার কথা! সে কি কম আনন্দের কথা?

*****

No comments:

Post a Comment

জল পড়ে পাতা নড়ে -ফিরোজা হারুন

জল আর পাতা মিলে দুজনে সুজন, ছন্দের হাত ধরে দাঁড়ালো দু’জন। ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে পাতায় পাতায় নৃত্যের তালে তালে পাতা দোল খায়। বৃষ্টির ধারা নামে ব...