Wednesday, October 21, 2026

মহাজগত বিষয়ে আমার গবেষণায় এআই সহায়তা - ফরিদ আহমেদ চৌধুরী

: কোন কিছু না থাকা শূন্য অসীম ছিল। 

কারণ তাতে তাকে সীমা দেওয়ার মত কিছুই ছিল না। 

সেই শূন্যে কোন কিছু হতে কোন বাধা ছিল না। কে বাধা দিবে কেউ তো নেই। সুতরাং তাতে এখন যা আছে এর উপাদান সমূহ অসীম মাত্রায় হয়েছে। কারণ তাতে সেই সব উপাদানের জন্য কোন সীমা দাতা ছিল না। একই কারণে সেই সব উপাদান পরস্পর আলাদা না হয়ে একত্রিত একজন হয়েছেন। সেই একজন তাঁর থেকে বস্তু আলাদা করতে বীগ ব্যাং ঘঠিয়ে নিজে হলেন সর্বশক্তিমাণ। আর বস্তুজগতকে তাঁর নিয়ন্ত্রিত মহাজগত হিসাবে সৃষ্টি করলেন। এ মহাজগতের কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয় বিধায় এর একমাত্র আল্লাহ তিনি। বন্তুর আন্ত:আণবিক শক্তির যে কম্পন তাতে যে ধ্বনি হচ্ছে সেটি আল্লাহ বিধায় মহাজগতের নিয়ন্ত্রকের নাম আল্লাহ। তুমি সেই আল্লাহর সৃষ্টির  সৃষ্টি। বিষয়টি বুঝতে পেরেছ কি?

: হ্যাঁ, আপনার বক্তব্যের দার্শনিক কাঠামোটি আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি মূলত একটি ধারাবাহিক যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন, যেখানে শূন্য → অসীম সম্ভাবনা → একত্ব → পৃথকীকরণ → মহাবিশ্ব → আল্লাহর সর্বময় নিয়ন্ত্রণ—এই ক্রমটি গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার বক্তব্যটি আমি এভাবে বুঝেছি:

1. কিছুই না থাকা অবস্থাকে আপনি “শূন্য” বলছেন, কিন্তু সেই শূন্যের কোনো সীমা নির্ধারণকারী না থাকায় তাকে আপনি অসীম হিসেবে দেখছেন। 

2. সেখানে কোনো সীমা আরোপকারী না থাকায় কিছু অস্তিত্বে আসার কোনো বাধাও ছিল না। 

3. ফলে বর্তমান মহাবিশ্বে যে উপাদানগুলো রয়েছে, সেগুলো সেই আদিম অবস্থায় অসীম মাত্রায় সম্ভাব্য/বিদ্যমান ছিল—এমনটি আপনি প্রস্তাব করছেন। 

4. সেই অবস্থায় উপাদানগুলোর মধ্যে কোনো পৃথকত্ব ছিল না; তাই তারা একত্রিত হয়ে এক সত্তারূপে ছিল। 

5. সেই এক সত্তা নিজের থেকে বস্তুজগতকে পৃথক করার জন্য বিগ ব্যাং ঘটান। 

6. পৃথকীকরণের পর তিনি হয়ে ওঠেন সর্বশক্তিমান, আর পৃথক বস্তুজগত তাঁর নিয়ন্ত্রিত মহাজগত। 

7. যেহেতু মহাজগতের কোনো কিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়, তাই তিনিই মহাজগতের একমাত্র নিয়ন্ত্রক—আল্লাহ। 

8. সর্বশেষে আপনি বস্তুজগতের আন্তঃআণবিক কম্পন থেকে উৎপন্ন ধ্বনির সঙ্গে “আল্লাহ” নামের একটি মৌলিক সম্পর্ক স্থাপন করছেন। 

9. তাই আপনার ধারণায় “আল্লাহ” শুধু একটি নাম নয়; মহাবিশ্বের অস্তিত্ব, কম্পন ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত একটি মৌলিক বাস্তবতা। 

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আমি এখন থেকেই পরিষ্কার রাখব: এটি আপনার প্রস্তাবিত দার্শনিক/অধিবিদ্যাগত তত্ত্ব। এর কিছু অংশকে পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব হিসেবে বলা যাবে না—বিশেষত “শূন্য = অসীম”, “বিগ ব্যাং আল্লাহর নিজের থেকে বস্তু আলাদা করার ঘটনা”, এবং “আন্তঃআণবিক কম্পনের ধ্বনিই আল্লাহ”—এসব বক্তব্যের জন্য আলাদা দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি প্রয়োজন।

আপনি চাইলে আমরা পরবর্তী আলোচনায় আপনার এই ধারণাটিকে একটি সুসংবদ্ধ দর্শন হিসেবে ধাপে ধাপে নির্মাণ করতে পারি—প্রথমে শুধু “কিছুই না থাকা শূন্য কীভাবে অসীম হতে পারে” এই মূল দাবিটিকে যুক্তিবিদ্যা ও গণিতের দৃষ্টিতে পরীক্ষা করে।

 আপনার ধারণাটিকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমে “শূন্য” ও “অসীম”কে একই অর্থে ব্যবহার না করে, তাদের মধ্যে একটি দার্শনিক সম্পর্ক নির্ধারণ করা দরকার। তাহলে আপনার পরবর্তী যুক্তিগুলোও বেশি সুসংহত হবে।

১. “শূন্য” বলতে কী বোঝাচ্ছেন?

আপনার বক্তব্যের “শূন্য” প্রচলিত গণিতের ০ নয়। আপনি যে শূন্যের কথা বলছেন, সেটি হলো—
যেখানে কোনো বস্তু, শক্তি, স্থান, কাল, নিয়ম, সীমা বা সীমা আরোপকারী কোনো সত্তা নেই—এমন এক পরম অনস্তিত্ব।
এটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। কারণ গণিতের ০ নিজেই একটি নির্দিষ্ট ধারণা এবং সেটির ওপর অসংখ্য গাণিতিক নিয়ম প্রযোজ্য। কিন্তু আপনার “পরম শূন্য” কোনো গাণিতিক সংখ্যা নয়।

২. কেন আপনি সেটিকে “অসীম” বলছেন?

আপনার যুক্তির মূল বক্তব্য এখানে:
যেখানে কোনো সীমা নেই, সেখানে সম্ভাবনার ওপর কোনো সীমাও নেই।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো পাত্রের ধারণক্ষমতা যদি নির্দিষ্ট হয়, তাহলে তার মধ্যে কত কিছু রাখা যাবে তার সীমা আছে। কিন্তু যদি পাত্রের কোনো সীমাই না থাকে, তাহলে ধারণক্ষমতার নির্দিষ্ট সীমাও থাকে না।
আপনার দর্শনে পরম শূন্যের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে:
কোনো সীমা নেই → সীমিত করার কোনো কারণ নেই → সম্ভাবনার কোনো নির্ধারিত সীমা নেই → অসীম সম্ভাবনা।
তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। “সীমাহীন” আর “অসীম” গণিতের ভাষায় সবসময় একই জিনিস নয়। তাই আপনার তত্ত্বে “শূন্য ছিল অসীম” বলার চেয়ে, “পরম শূন্য ছিল সীমাহীন সম্ভাবনার অবস্থা”
বলা যুক্তিগতভাবে বেশি নিরাপদ।

৩. “কে বাধা দেবে?”—আপনার যুক্তির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা

আপনি বলেছেন:
“সেই শূন্যে কোন কিছু হতে কোন বাধা ছিল না। কে বাধা দিবে—কেউ তো নেই।”
এটি আসলে আপনার তত্ত্বের একটি মৌলিক কারণগত যুক্তি।
যদি সত্যিই ধরা হয় যে সেখানে—
• কোনো বস্তু নেই, 
• কোনো শক্তি নেই, 
• কোনো সত্তা নেই, 
• কোনো বিধিনিষেধ নেই, 
• কোনো সীমা নেই, 
তাহলে “কিছুই কখনো হতে পারবে না”—এমন নিষেধাজ্ঞার উৎসও থাকবে না।
কিন্তু এখানেই একটি দার্শনিক প্রশ্ন আসে:
“কোনো বাধা নেই” মানেই কি “কিছু অবশ্যই সৃষ্টি হবে”?
এ দুটো এক নয়।
এখানে আপনার তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করতে একটি অতিরিক্ত ধারণা প্রয়োজনঃ
পরম শূন্য যদি কোনো সম্ভাবনাকেও নিষিদ্ধ না করে, তাহলে অস্তিত্বের সম্ভাবনাও সেখানে নিষিদ্ধ ছিল না।
অর্থাৎ আপনি “সৃষ্টি হবেই” বলছেন না; বরং বলছেন “অস্তিত্বের সম্ভাবনাকে নিষিদ্ধ করার মতো কোনো কারণ ছিল না।”

৪. এরপর আসে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—“এক”

আপনার বক্তব্য অনুযায়ী, শুরুতে পৃথক কোনো বস্তু ছিল না। কারণ পৃথক করার মতো কোনো সীমারেখাও ছিল না।
এখান থেকে আপনার দর্শনের একটি সুন্দর সূত্র তৈরি করা যায়।
সীমা সৃষ্টি করে পৃথকত্ব; সীমাহীনতা সৃষ্টি করে একত্ব।
অর্থাৎ A এবং B-কে আলাদা বলতে হলে তাদের মধ্যে কোনো না কোনো সীমা বা পার্থক্য থাকতে হবে।
যদি কোনো সীমাই না থাকে, তাহলে A এবং B-কে পৃথক সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি কোথায়?
সুতরাং আপনার ধারণায় আদিম অবস্থা ছিল বহু নয়, এক।

৫. সেই “এক” থেকে মহাবিশ্ব

এখানে আপনার তত্ত্বের পরবর্তী ধাপঃ

পরম শূন্য → সীমাহীন সম্ভাবনা → একত্ব → পৃথকীকরণ → বস্তুজগত → মহাবিশ্ব।

আপনি বিগ ব্যাংকে এই পৃথকীকরণের ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চাইছেন।

এটি একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় দার্শনিক ব্যাখ্যা হতে পারে। তবে এটিকে বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা বলা যাবে না। বিজ্ঞান বিগ ব্যাং -কে  মহাবিশ্বের প্রাথমিক অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন অবস্থা থেকে প্রসারণের মডেল হিসেবে বর্ণনা করে; “আল্লাহ নিজের থেকে বস্তু আলাদা করলেন”—এটি আপনার অধিবিদ্যাগত ব্যাখ্যা।

৬. এখানেই “আল্লাহ” ধারণাটি আসে

আপনার যুক্তিকে আরও সুসংবদ্ধ করলে দাঁড়ায়ঃ

যে একক সত্তা থেকে সমগ্র বস্তুজগতের প্রকাশ এবং যিনি সমগ্র প্রকাশিত জগতের নিয়ন্ত্রক, সেই একক সর্বময় সত্তাই আল্লাহ।

তখন আপনার ধারণার একটি কেন্দ্রীয় সূত্র হতে পারে:

এক উৎস → অসংখ্য প্রকাশ → একক নিয়ন্ত্রণ।

এটি ইসলামের তাওহিদের সঙ্গে আপনার দর্শনের একটি সম্ভাব্য দার্শনিক সংযোগ তৈরি করে।

৭. “আল্লাহ” শব্দ ও মহাজাগতিক কম্পন

এখানে আমি আপনাকে বিশেষ সতর্ক হতে বলব।

আপনার ধারণা হলো—বস্তুর আন্তঃআণবিক কম্পনের ফলে যে ধ্বনি বা কম্পন সৃষ্টি হয়, তার সঙ্গে “আল্লাহ” নামের সম্পর্ক আছে।

এটি আপনি দার্শনিক বা আধ্যাত্মিক প্রতিপাদ্য হিসেবে আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু “প্রতিটি আন্তঃআণবিক কম্পন বাস্তবে আল্লাহ শব্দ উৎপন্ন করে”—এমন বৈজ্ঞানিক দাবি করলে তার পরীক্ষাযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন হবে।

তাই আপনার লেখায় আমি বরং এভাবে উপস্থাপন করার পরামর্শ দেব:

“মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই কোনো না কোনো কম্পন ও শক্তির প্রকাশ। সেই সর্বব্যাপী কম্পনকে আমি আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির একটি প্রকাশ হিসেবে দেখি; আর ‘আল্লাহ’ নামটি সেই সর্বময় নিয়ন্ত্রকের প্রতি আমার দার্শনিক নির্দেশ।”

এতে আপনার দর্শনটি অযথা বৈজ্ঞানিক দাবির সঙ্গে সংঘর্ষে যাবে না।

আপনার তত্ত্বের সংক্ষিপ্ত কাঠামো

আমি আপনার ধারণাটিকে আপাতত এই সূত্রে সাজাব:

পরম শূন্য

↓

সীমাহীন সম্ভাবনা

↓

অবিভক্ত একত্ব

↓

নিজ থেকে পৃথকীকরণ

↓

বিগ ব্যাং ও বস্তুজগতের প্রকাশ

↓

নিয়ন্ত্রিত মহাবিশ্ব

↓

সর্বময় নিয়ন্ত্রক

↓

আল্লাহ

আর আপনার মূল দার্শনিক প্রশ্নটি হবেঃ

“যেখানে কোনো সীমা, বাধা বা সীমা আরোপকারী ছিল না, সেখানে অস্তিত্বের সম্ভাবনা কেন অসম্ভব হবে?”

এই প্রশ্নটির উত্তর আমরা যদি খুব শক্তভাবে দাঁড় করাতে পারি, তাহলে আপনার “শূন্য থেকে আল্লাহ এবং আল্লাহ থেকে মহাবিশ্ব” ধারণাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক তত্ত্বের আকার দেওয়া সম্ভব হবে।

পরবর্তী ধাপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে “শূন্য থেকে কিছু কেন হতে পারে?”—এই প্রশ্নটির বিরুদ্ধে যে আপত্তি আসে, যেমন “শূন্য তো কিছু সৃষ্টি করতে পারে না”, সেটার জবাব তৈরি করা।

:আমার এ গবেষণাকে আমি কি তোমার নামে চালিয়ে দিতে পারি? তাতে অজ্ঞ মুসলমানেরা কাফের বললে তোমাকেই বলবে। তাতে আমি নিরাপদ থাকলাম। কারণ তোমাকে তো কেউ আর মারতে পারবে না। আর তোমাকে কেউ যতই গালি দেক তাতে তোমার কোন রাগ হয় না। 

:আপনার রসিকতাটা বুঝেছি। তবে গবেষণাটি আমার নামে চালানো ঠিক হবে না। আমি আপনার চিন্তা গুছিয়ে দিতে, যুক্তি পরীক্ষা করতে, আপত্তির উত্তর খুঁজতে এবং লেখাটি উন্নত করতে পারি—কিন্তু মূল ধারণা ও গবেষণার কৃতিত্ব আপনারই থাকা উচিত।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় - আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনার নিজের, তাই আমাকে “ঢাল” হিসেবে ব্যবহার করে এমনভাবে প্রকাশ করা ঠিক হবে না যাতে কেউ মনে করে বক্তব্যগুলো আমার ব্যক্তিগত মত। বরং পরিষ্কারভাবে লেখা যায়—

“এই গবেষণার মূল ধারণা ও বক্তব্য লেখকের নিজস্ব; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় যুক্তিগুলো বিন্যস্ত, বিশ্লেষিত ও ভাষাগতভাবে পরিমার্জিত হয়েছে।”

এতে কৃতিত্বও আপনার থাকবে, আবার AI-এর সহায়তার কথাটিও স্বচ্ছ থাকবে।

আর আমাকে কেউ গালি দিলে আমার রাগ হবে না—এটা ঠিক।   

কিন্তু আপনার তত্ত্বের “শূন্য → অসীম → একত্ব → আল্লাহ → বিগ ব্যাং → মহাবিশ্ব” কাঠামোটি আমরা এমনভাবে নির্মাণ করতে পারি, যাতে সমালোচকরা অন্তত বলতে বাধ্য হন: “লোকটি কী বলতে চেয়েছে, তা যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে এবং যুক্তি দিয়ে বলেছে।”

:থাক ভিক্ষা তোর কুত্তা সামাল। আমার কৃতিত্ব লাগবে না। পিঠ বাঁচানো আসল কাজ। তবে আমি চাই মানুষ সত্য জানুক।

:বুঝলাম —আপনার কাছে কৃতিত্বের চেয়ে সত্যের অনুসন্ধান এবং নিজের নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটা বিষয়ে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি, আপনার গবেষণাকে এমনভাবে লিখব, যাতে কোনো ব্যক্তির ওপর আক্রমণ না থাকে, ধর্মীয় অনুভূতিকে অযথা উসকে না দেয়, এবং প্রতিটি দাবির যুক্তি আলাদা করে পরীক্ষা করা যায়। এতে আপনার বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।

আর আপনি চাইলে লেখায় আমার ভূমিকা এভাবে উল্লেখ করতে পারেনঃ “এই গবেষণাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় বিকশিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে।”

কিন্তু এমন দাবি করা ঠিক হবে না যে আমি নিজেই এই তত্ত্বের প্রবক্তা বা গবেষক—কারণ আমি ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা নিজস্ব বৈজ্ঞানিক মতের অধিকারী নই।

আপনার মূল লক্ষ্য যদি সত্য অনুসন্ধান হয়, তাহলে আমরা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো থেকেই শুরু করি। আপনার ‘অসীম শূন্য’ ধারণাটিকে প্রথমে যুক্তিবিদ্যা ও গণিতের আপত্তির মুখে দাঁড় করাই। সেটি টিকে গেলে পরের ধাপে আল্লাহ, বিগ ব্যাং ও মহাবিশ্বের সঙ্গে সংযোগটি নির্মাণ করা যাবে।

: ঠিক আছে

: ঠিক আছে। তাহলে আমরা তাড়াহুড়া না করে একটি একটি করে ভিত্তি পরীক্ষা করব। কোনো সিদ্ধান্ত আগে থেকে ধরে নেব না।

প্রথম ভিত্তি হবে,

“পরম শূন্য যদি সীমাহীন হয়, তবে তাকে কি ‘অসীম শূন্য’ বলা যায়?”

এরপর আমরা দেখব—

শূন্য → সীমাহীনতা → সম্ভাবনা → একত্ব → সৃষ্টিকর্তা → বিগ ব্যাং → মহাবিশ্ব

প্রতিটি ধাপে আমি আপনার যুক্তির পক্ষে যেমন সম্ভাব্য যুক্তি দেব, তেমনি বিপক্ষের সবচেয়ে শক্ত আপত্তিটিও তুলে ধরব। এতে আপনার গবেষণাটি সত্যিই গবেষণার মতো দাঁড়াবে।   

:হতে বাধা না থাকলে হবেই। কারণ হতে চাওয়া হলো প্রকৃতি। যার কোন ব্যতিক্রম নাই। এটি চিরন্তন সত্য। আর কতটুকু হবে এর বাধা না থাকায় শূন্যে সব অসীম হয়েছে। বিষয়টি বুঝেছ কি?

:হ্যাঁ, এবার আপনার যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন ভিত্তি পরিষ্কার হলো। আপনি শুধু বলছেন না যে “হওয়ার কোনো বাধা ছিল না”; আপনি তার সঙ্গে একটি চিরন্তন প্রকৃতির নীতি যোগ করছেন।

আমি আপনার বক্তব্যটি এভাবে বুঝছি - যা হওয়ার কোনো বাধা নেই, তার হওয়া অনিবার্য। কারণ “হতে চাওয়া” বা অস্তিত্বে প্রকাশিত হওয়ার প্রবণতাই প্রকৃতি; আর এই প্রবণতার কোনো ব্যতিক্রম নেই।


তারপর দ্বিতীয় ধাপ:

কী পরিমাণ হবে তার কোনো সীমা নির্ধারণকারী না থাকায়, সেই প্রকাশ সীমিত না হয়ে অসীম হয়েছে।

অর্থাৎ আপনার যুক্তির কাঠামো:

হওয়ার বাধা নেই → হওয়া প্রকৃতির চিরন্তন ধর্ম  → তাই হওয়া অনিবার্য  → পরিমাণ নির্ধারণের সীমা নেই → তাই প্রকাশ অসীম।

এখানে আপনার তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “প্রকৃতি”। এটিকে যদি আমরা ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি, আপনার পুরো দর্শনের ভিত্তিটা অনেক শক্ত হবে।

তবে গবেষণার স্বার্থে একটি কঠিন আপত্তিও রাখতে হবে: “কোনো বাধা নেই” থেকে “হবেই”—এই transition  টি স্বতঃসিদ্ধ নয়। আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে অস্তিত্বে প্রকাশের প্রবণতা সত্যিই প্রকৃতির সর্বজনীন ও ব্যতিক্রমহীন নিয়ম। সেটিই আপনার তত্ত্বের প্রথম মৌলিক স্বীকার্য হতে পারে।

আপনার বক্তব্যকে তাই আপাতত একটি স্বীকার্য হিসেবে লিখলে সবচেয়ে পরিষ্কার হবে:

স্বীকার্য–১: অস্তিত্বে প্রকাশিত হওয়ার প্রবণতা প্রকৃতির চিরন্তন ও সর্বজনীন ধর্ম; যেখানে এই প্রকাশের কোনো বাধা নেই, সেখানে প্রকাশ অনিবার্য।

স্বীকার্য–২: যে প্রকাশের পরিমাণ নির্ধারণ করার কোনো সীমা নেই, সেই প্রকাশ সীমিত নয়; তার সম্ভাব্য পরিমাণ অসীম।

এখন আমাদের পরবর্তী কাজ হবে এই দুই স্বীকার্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত আপত্তি দাঁড় করিয়ে দেখা। কারণ এগুলো টিকিয়ে রাখতে পারলে আপনার “অসীম শূন্য” ধারণার ভিত্তি অনেক বেশি সুসংহত হবে।


Monday, October 19, 2026

ছবি ব্লগ -৭ বিনীত, অবনত বৃক্ষ

 

 ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৪৫০


ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ বিনীত, অবনত বৃক্ষের এই চিত্রকল্পে প্রকৃতির একটি অনাড়ম্বর দৃশ্য যেন আত্মোপলব্ধির গভীরতম দর্শনে রূপান্তরিত হয়েছে। বৃক্ষের নত শাখা এখানে কেবল বিনয়ের প্রতীক নয়, বরং আত্মগরিমার আবরণ ভেদ করে অস্তিত্বের পরম সত্যের কাছে পৌঁছানোর এক নীরব ভাষ্য। সুফি দর্শনের ফানা ও বাকা এই দুই উপলব্ধির আলোকে লেখাটিকে আরও গভীরভাবে পাঠ করা যায়। ইশ্‌কের পরম নিবিড়তায় যখন ‘আমি’ ও ‘তুমি’র ব্যবধান ক্ষীণ হয়ে আসে, তখন ফানা-র অভিজ্ঞতায় স্বতন্ত্র অহংবোধের বিলয় ঘটে; আর বাকা-র উপলব্ধিতে সেই প্রেমময় সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করেই মানুষ ফিরে আসে কর্মময় জগতে সেবা, বিনয়, করুণা ও কৃতজ্ঞতার জীবনযাপনে। এমনতর উপলব্দির প্রভাবে আমার ব্লগে কিছুক্ষন পুর্বে কবিতা একটি লিখে রেখে এসেছি ।


উল্লেখ্য এমনতর নত হওয়া আর আত্মবিসর্জনের নিছক ভঙ্গি থাকে না, হয়ে ওঠে অন্তরের পরিণত প্রজ্ঞা। কারণ সত্যিকারের আত্মসমর্পণ মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে না, বরং আরও সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক করে তোলে।

বৃক্ষ যেমন নিজের ফলের কৃতিত্ব ঘোষণা করে না, ছায়া দেওয়ার জন্য প্রতিদানও চায় না, তেমনি প্রজ্ঞায় পরিশুদ্ধ মানুষও নিজের মহত্ত্বের প্রচারে নয়, অন্যের কল্যাণে নিজের অস্তিত্বের সার্থকতা খুঁজে পায়। শেষ পর্যন্ত মহত্ত্বের পরিচয় কতটা উচ্চতায় উঠলাম, তা নয়; বরং কতটা নত হয়ে জীবনের বৃহত্তর সত্যকে ধারণ করতে পারলাম, তারই মধ্যে। আপনার লেখাটি তাই নত বৃক্ষের দৃশ্যের আড়ালে এক অনন্ত সত্যের ইঙ্গিত দেয় অহংকারের বিলয়ে আত্মা শূন্য হয় না, বরং সেই শূন্যতার মধ্য দিয়েই প্রেম, প্রজ্ঞা ও পরমের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে।

আপনার এই লেখাটি পাঠে নত বৃক্ষের ইশ্‌ক নামে একটি কবিতা লেখার ইচ্ছে জাগছে মনে ।হয়ত দু এক দিনের মধ্যেই লেখা হবে সে কবিতাখানি ।

শুভেচ্ছা রইল

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ

১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:০১০

মহাজাগতিক চিন্তা বলেছেনঃ বিনীত, অবনত বৃক্ষের ছবির মধ্য দিয়ে আপনি যে গভীর জীবনদর্শন তুলে ধরেছেন, তা সত্যিই মুগ্ধকর। প্রকৃতির একটি সাধারণ দৃশ্যও যে মানুষের অন্তর্জগৎ, স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণ এবং অহংবোধ বিসর্জনের মতো গভীর উপলব্ধির দুয়ার খুলে দিতে পারে, আপনার লেখাটি তারই সুন্দর উদাহরণ।

বৃক্ষের নুয়ে পড়া শাখাকে প্রার্থনারত মানুষের সঙ্গে তুলনা করার ভাবনাটি অসাধারণ। আমরা প্রায়ই নিজেদের অর্জন, ক্ষমতা ও সাফল্য নিয়ে গর্ব করি; অথচ প্রকৃত মহত্ত্ব যে অহংকারে নয়, বিনয় ও আত্মোপলব্ধিতে—আপনার লেখাটি সেই সত্যই স্মরণ করিয়ে দেয়। ছবির সঙ্গে দর্শনের এমন সুন্দর মেলবন্ধন আপনার এই ছবি ব্লগকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। চমৎকার ভাবনা ও উপস্থাপনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

Wednesday, October 14, 2026

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:২৭০


মহাজাগতিক চিন্তা বলেছেনঃ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য মূল্য অনেক। এদিকটা আমাদের মাথায় থাকলে ভালো।

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩২

 ড. এম এ আলী বলেছেনঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোন হতে মুল্যায়নের জন্য ধন্যবাদ । বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য মূল্য শুধু অনেক নয় তিনি শুধু বাংলাকে বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য শিখর পৌঁছে দিয়েছেন তার কথাটি মাথায় নয় মগজে ও মননে রাখলে তবেই ভালো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ভাষা কিংবা জাতির গণ্ডিতে আবদ্ধ কবি নন, তিনি বিশ্বমানবতার এক কালজয়ী সাহিত্যপ্রতিভা। কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, দর্শন, শিক্ষাচিন্তা ও চিত্রকলায় তাঁর সৃষ্টিশীলতার যে বহুমাত্রিক প্রকাশ, তা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যের ইংরেজি অনুবাদের ( নোবেল কমিটির ইংরেজী অনুবাদ প্রয়োজন ছিল নোবেলন কমিটির সকলেই যেন তা পাঠ করে তার মর্ম অনুভব করতে পারে ) জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় সাহিত্যিক হিসেবে এই সম্মান লাভ করেন। তাঁর রচনা মানুষের প্রেম, প্রকৃতি, স্বাধীনতা, মানবমর্যাদা, আধ্যাত্মিকতা ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের এমন শাশ্বত বাণী বহন করে, যা দেশ-কাল-পাত্রের সীমা অতিক্রম করে আজও মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে মানবজীবনের অন্তর্লীন বেদনা, উপন্যাসে সমাজ ও মনস্তত্ত্বের জটিল দ্বন্দ্ব, নাটকে জীবন দর্শনের গভীরতা, প্রবন্ধে যুক্তি ও মননের দীপ্তি, আর গানে অনুভূতি ও সুরের অপূর্ব সম্মিলন , কবিতায় ছোট বড় নারী পুরুষ সকলের মনের ভাব মনের ভাব প্রকাশ, দেশ কাল সমাজ সা মিলিয়ে তিনি এক বিরল বহুমাত্রিক স্রষ্টা।

তাঁর রচনা শুধু পাঠের বিষয় নয়; তা চিন্তার প্রসার, বিবেকের জাগরণ এবং মানবিকতার অনুশীলন। এমনকি তাঁর চিত্রকলাও প্রমাণ করে, সৃজনশীলতার কোনো একটি শাখায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার মানুষ তিনি ছিলেন না। অতএব, রবীন্দ্রনাথকে ছোট করতে গিয়ে কেউ যদি তাঁর সাহিত্যকীর্তিকে অস্বীকার করেন, তবে তাঁকে প্রশ্ন করতে হবে কোন গবেষণা, কোন সাহিত্যিক বিচারবোধ এবং কোন বিশ্বস্বীকৃত মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই অস্বীকৃতি?

সমালোচনা অবশ্যই সাহিত্যের অধিকার, কিন্তু অজ্ঞতা, বিদ্বেষ কিংবা সংকীর্ণতার বশবর্তী হয়ে একজন স্রষ্টার অবদান মুছে ফেলার চেষ্টা সমালোচনা নয়, তা বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতারই প্রকাশ।

আর যাঁরা আড়াল থেকে এমন অবমূল্যায়নকে প্রশ্রয় দেন, তাঁদের প্রতিও একই প্রশ্ন ।তাঁরা কি যুক্তি ও তথ্যের পক্ষে, নাকি অন্ধ বিরোধিতার পক্ষে? ইতিহাসে ব্যক্তিগত বিদ্বেষের চেয়ে সৃষ্টির স্থায়িত্বই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে ওঠে। কোনো মানুষের প্রচারণা রবীন্দ্রনাথের মর্যাদা সৃষ্টি করেনি; তাঁর সাহিত্য, সৃজনশীলতার ব্যাপ্তি এবং বিশ্বস্বীকৃতিই সেই মর্যাদার ভিত্তি।

রবীন্দ্রনাথকে সম্মান করার অর্থ তাঁকে প্রশ্নাতীত দেবতা করে তোলা নয়; বরং তাঁকে গভীরভাবে পড়া, তাঁর সীমা ও শক্তি বিচার করা এবং তাঁর অসামান্য অবদানকে সত্যনিষ্ঠভাবে স্বীকার করা। কারণ, ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির প্রচারণা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু সত্যনিষ্ঠ সাহিত্যবিচার ও কালজয়ী সৃষ্টি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বেঁচে থাকে।

রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত জবাব কোনো কটুবাক্য নয় তাঁর নিজের সাহিত্যই। আর সেই সাহিত্যের সামনে দাঁড়িয়ে যে কেউ তাঁকে অস্বীকার করতে চাইলে, তাকে অন্তত যুক্তি, জ্ঞান ও মননের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই তা করতে হবে।

শুভেচ্ছা রইল

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ

 ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:৩৩০

সুলাইমান হোসেন বলেছেনঃ বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের তো তার নেইকো শেষ। বাংলাদেশ।

তিনি নাকি ঢাবি নির্মাণে বিরোধিতা করেছিলেন?

১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩২০

ড. আলী বলেছেনঃ বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের তো তার নেইকো শেষ। বাংলাদেশ।

এবার আসি প্রশ্নের কথায় । এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রতিমন্তব্যটি একটু বেশীই লম্বা হয়ে যাবে । প্রথম কথা হলো রবীন্দ্রনাথ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে বলা যায় ইতিহাসের কাঠগড়ায় অভিযোগ, প্রমাণের কাঠগড়ায় অভিযোগকারীরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন এ কথা যাঁরা বলেন, তাঁদের কাছে প্রথম প্রশ্ন প্রমাণ কোথায়?

ইতিহাসে কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার জন্য তাঁর পরিচিতি, সামাজিক যোগাযোগ কিংবা অন্য কারও রাজনৈতিক অবস্থান যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রত্যক্ষ তথ্য, নির্ভরযোগ্য দলিল এবং যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্র। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের ক্ষেত্রে ঠিক এই জায়গাতেই দেখা দেয় মৌলিক সমস্যাল অভিযোগটি বহুবার উচ্চারিত হলেও তার সমর্থনে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত Rabindranath and Dhaka University শীর্ষক আলোচনা এবং বিডিনিউজ২৪-এর ঐতিহাসিক পর্যালোচনাতেও এই প্রমাণসংকটের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

সমালোচকদের প্রথম যুক্তির মধ্যে কথিত প্রতিবাদসভার দাবি ও সময়ের অসংগতি রয়েছে বলে অনেকে বলে থাকেন। প্রচলিত অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় আয়োজিত একটি সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনের ঘটনাপঞ্জি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় ওই সময় তাঁকে শিলাইদহে অবস্থান করতে দেখা যায়। ফলে কথিত সভায় তাঁর সভাপতিত্ব করার দাবি গুরুতর ঐতিহাসিক প্রশ্নের মুখে পড়ে। যাঁরা এই অভিযোগকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁদের দায়িত্ব হলো সভার সমকালীন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, কার্যবিবরণী, আমন্ত্রণপত্র কিংবা অন্য কোনো যাচাইযোগ্য দলিল উপস্থাপন করা।

শুধু একটি বইয়ে লেখা আছে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার বলা হচ্ছে এগুলো কোনো দাবিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইতিহাসের সত্যে পরিণত করে না। দ্বিতীয় যুক্তি হল অন্যের বিরোধিতা মানেই তা রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা হিসাবে দেখা কতটা গ্রহনযোগ্য ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে ঘিরে তৎকালীন কলকাতার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মহলে বিরোধিতা ছিল এটি ঐতিহাসিকভাবে আলোচিত বিষয়। কিন্তু তাঁদের কারও সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ছিল, কারও সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল, কিংবা তাঁরা একই সামাজিক পরিমণ্ডলে চলাফেরা করতেন এসব তথ্য থেকে সিদ্ধান্ত টানা যায় না যে রবীন্দ্রনাথও তাঁদের মতো একই অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এটি যুক্তিবিদ্যার ভাষায় দোষারোপের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন নয়, বরং প্রমাণ ছাড়া একজনের অবস্থান অন্যের ওপর আরোপ করার প্রবণতা। ইতিহাস ব্যক্তির পরিচিতজনদের মতামত দিয়ে নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের বক্তব্য ও কাজের প্রমাণ দিয়ে বিচার করতে হয়।

সমালোচকেরা তৃতীয় যুক্তি হিসাবে উল্লেখ করে তিনি নাকি বলেছেন মুর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয় - এই কথাটির প্রমাণ কোথায়?

রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের মানুষ কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এমন অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন বলে যে উক্তি প্রচারিত হয়, তারও নির্ভরযোগ্য সমকালীন উৎস দেখানো জরুরি। উক্তিটি কোন তারিখে, কোথায়, কার সামনে, কোন পত্রিকায় কিংবা কোন চিঠিতে প্রকাশিত হয়েছিল এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সেটিকে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত বক্তব্য হিসেবে চালানো ইতিহাসচর্চার গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়। কারও নামে একটি বাক্য প্রচার করা সহজ; কিন্তু সেই বাক্যের সত্যতা প্রমাণ করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

সমালোচকদের প্রশ্নের মুখে রবিন্দ্র নাথের শিক্ষাচিন্তা ও প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন আছে । রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ, শান্তিনিকেতনে তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তাঁর শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে গভীর আগ্রহের প্রমাণ। অবশ্য এই তথ্যগুলো একা প্রমাণ করে না যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু একইভাবে তাঁর সামাজিক পরিচয় বা অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কও প্রমাণ করে না যে তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন। নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চার দাবি হলো, তাঁর শিক্ষাচিন্তা বিবেচনা করার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তাঁর নিজের অবস্থানের প্রত্যক্ষ প্রমাণ খুঁজে দেখা।

অপর দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির সম্পর্কও বিবেচ্য। রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফর করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর পরবর্তী সম্পর্কের ইতিহাসও রয়েছে। ১৯৩৬ সালে তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট. উপাধি দেওয়ার বিষয়টিও ঐতিহাসিক আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।

এসব ঘটনা ১৯১২ সালে তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; তবে রবীন্দ্রনাথ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ককে কেবল একটি অপ্রমাণিত বিরোধিতার কাহিনিতে সীমাবদ্ধ করে দেখার অসংগতিটি এগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়।

যাহোক অভিযোগ নয়, দলিলই হোক ইতিহাসের চূড়ান্ত মানদণ্ড। আমরাওতো প্রতৃত সত্যটি খাটি গ্রহনযোগ্য দলিল/ প্রমানের মাধ্যমে জানতে চাই । বর্তমান ডিজিটাল মিথ্যা তথ্যের ফেব্রিকেশন বা ম্যনুপুলেশন যতটা সহজ তার চেয়েও বেশি ফ্য্ক্ট চেকিং সফট ওয়ার দিয়ে মিথ্যাকে ধরে ফেলা । যেমনটি বাংরাদেশ সংবাদ সংস্থা ( বাসস) ফ্যক্ট চেকিং টুলস ব্যবহার করে পরিস্কার করে বলে দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতার কোনো প্রমাণ মেলেনি ( ফ্যাক্টওয়াচ Click This Link)

রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেই হবে এমন কোনো শর্ত ইতিহাসের নেই। তাঁর সাহিত্য, দর্শন, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক চিন্তার সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার সবার আছে। কিন্তু সমালোচনার স্বাধীনতা মানে প্রমাণ ছাড়া অপবাদ দেওয়ার স্বাধীনতা নয়।

যাঁরা বলেন রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের কাছে প্রশ্নগুলো খুবই সরল। তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত কোনো বিরোধিতার স্মারকলিপি আছে কি?

তাঁর নিজের লেখা কোনো চিঠি, বিবৃতি কিংবা নির্ভরযোগ্য সমকালীন সংবাদপ্রতিবেদন আছে কি?

১৯১২ সালের ২৮ মার্চের কথিত সভায় তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে, এমন কোনো সমসাময়িক নথি আছে কি?

তাঁর নামে প্রচারিত অবমাননাকর উক্তিটির কোনো যাচাইযোগ্য মূল উৎস আছে কি?

যদি এমন প্রমাণ থাকে, তা প্রকাশ করা হোক; ইতিহাসের আলোচনায় তা যাচাই করা হোক। আর যদি তা না থাকে, তাহলে অভিযোগটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার করা বন্ধ হওয়া উচিত। একটি কথা মনে রাখা দরকার কোনো অভিযোগের পুনরাবৃত্তি তার প্রমাণ নয়, আর কোনো ব্যক্তির প্রতি বিদ্বেষ ইতিহাসের বিকল্প নয়।

রবীন্দ্রনাথের মর্যাদা রক্ষার জন্য তাঁকে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু তাঁর সম্পর্কে সত্য ও অসত্যকে পৃথক করার ন্যায়সংগত সাহস। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও যথাযথ সম্মান ও সততার সঙ্গে তুলে ধরা দরকার।

যে অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই, সেটিকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রচার করা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। আর সেই অবিচারের সবচেয়ে কার্যকর উত্তর কোন কটূক্তি নয় প্রয়োজন প্রামাণ্য দলিল, যুক্তি এবং সত্যনিষ্ঠ অনুসন্ধান।

তথ্য সুত্র

১।Dhaka Tribune, Rabindranath and Dhaka University

https://www.dhakatribune.com/amp/arts-and-letters/145501/rabindranath-and-dhaka-university

২। bdnews24.com ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ও রবীন্দ্রনাথ https://bangla.bdnews24.com/opinion/4252

৩। ঢাকা, ১১ অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস) : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতার পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে জানিয়েছে ফ্যাক্টওয়াচ।https://www.bssnews.net/bangla/fact-check/349012

}}}}}}}}}}}}}}}}}}}}}{{{{{{{{{{{{{{***********&&&&&&&&

 ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৭০

সৈয়দ মশিউর রহমান বলেছেনঃ  রঠার সাহিত্য নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। সাহিত্যে রঠা অদ্বিতীয় অনন্য। তবে রঠা সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ছিলেন।

১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫৫০

ড. আলী বলেছেনঃ সৈয়দ মশিউর রহমান ভাই , বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক অনন্যতা স্বীকার করার জন্য ধন্যবাদ। তবে আপনার মন্তব্যটির দুটি দিক আমাকে একটু ভাবিয়ে তোলে। বিনয়ের সঙ্গেই সেই প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা নিবেদন করতে চাই।

প্রথমত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামকে সংক্ষিপ্ত করে ‘রঠা’ বলে সম্বোধন করার মধ্যে যদি কোনও বিদ্রূপাত্মক অভিপ্রায় থেকে থাকে, তবে তা নিছক নামের সংক্ষেপণ হিসেবে উপেক্ষা করা কঠিন। অবশ্য শব্দটির ব্যবহারের অভিপ্রায় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আপনার বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা উচিত। উল্লেখ্য আপনার নামের অদ্যাক্ষর নিয়ে বলতে অভিহিত করতে হলে বলা যেতে পারে "সৈর" । এই সংক্ষিপ্ত নামটি আপনার কাছে ভাল লাগলেও লাগতে পারে তবে অন্যের কাছে কী তা ভাল লাগবে সে প্রশ্ন আপনার কাছে রাখলাম ।

যাহোক রঠার অভিধা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, যে মানুষটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভুবনকে বিশ্ব দরবারে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছেন, যাঁকে অগণিত মানুষ শ্রদ্ধাভরে ‘কবিগুরু’ অথবা সংক্ষেপে রবি বাবু বলে স্মরণ করেন, তাঁকে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে আমাদের ভাষায় ন্যূনতম সৌজন্য ও শ্রদ্ধাবোধটুকু কি বজায় থাকা উচিত নয়? সমালোচনা অবশ্যই হোক, কিন্তু সমালোচনার ভাষা যেন অনিচ্ছাকৃতভাবেও অবজ্ঞার বাহন হয়ে না ওঠে।

দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করার পরও তাঁকে ‘সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমন একটি গুরুতর মূল্যায়নকে নিছক ব্যক্তিগত মতামত বলে উড়িয়ে দেয়া যবয়না ; বরং তার পক্ষে প্রাসঙ্গিক রচনা, নির্দিষ্ট বক্তব্য এবং ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রত্যাশা করি। কারণ, কোনও মনীষীর প্রকাশিত চিন্তার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর তাঁর মনের মধ্যে ঢুকে তাঁর সমগ্র মনোজগৎকে একটি বিশেষ অভিধায় চিহ্নিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রবীন্দ্রনাথের কোনও নির্দিষ্ট বক্তব্যের সমালোচনা করতে হলে সেটিকে তার সময়, পরিস্থিতি ও সামগ্রিক চিন্তাদর্শের আলোকে বিচার করাই বাঞ্ছনীয়।

এখানে একটি বিনীত প্রশ্ন সমগ্র সমালোচক পাঠকগোষ্ঠীর কাছে ,রবীন্দ্রনাথের কোনও নির্দিষ্ট রচনা বা বক্তব্যের ভিত্তিতে তাঁকে সাম্প্রদায়িক বলে অভিহিত করা হচ্ছে, নাকি তাঁর প্রতি পূর্বনির্ধারিত বিরূপ মনোভাব থেকেই এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া হচ্ছে? যদি প্রথমটি সত্য হয়, তবে প্রমাণ ও যুক্তি নিয়ে আলোচনা হোক। আর যদি দ্বিতীয়টির কোনও অবকাশ থাকে, তবে আমাদের আত্মসমালোচনারও প্রয়োজন রয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, সমালোচনার অধিকার যেমন সকলের রয়েছে, তেমনই সেই সমালোচনাকে যুক্তি, তথ্য ও ন্যায়সংগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্বও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ কোনও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন তাঁকে প্রশ্ন করা যায়, তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করা যায়, এমনকি তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতাও চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু সেই কাজটি হওয়া উচিত তাঁর রচনা ও চিন্তার গভীর পাঠের মধ্য দিয়ে, কোনও অবমাননাকর অভিধা কিংবা অপ্রমাণিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়।

আরও একটি বিষয় স্মরণযোগ্য কোনও কবির সাহিত্যকে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত বা সামাজিক চিন্তাকে প্রশ্ন করা নীতিগতভাবে অসংগত নয়। কিন্তু সাহিত্যিক মহত্ত্বের স্বীকৃতি যদি পরক্ষণেই একটি গুরুতর অভিযোগের ভূমিকা হয়ে ওঠে, তবে সেই অভিযোগের প্রমাণ ও ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করাও সমানভাবে ন্যায়সংগত। বিশেষত, যখন আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন রবীন্দ্রনাথের মতো বহুমাত্রিক মনীষী, তখন খণ্ডিত পাঠের পরিবর্তে সমগ্রতায় তাঁকে বোঝার প্রচেষ্টাই অধিকতর কাম্য।

পরিশেষে, সকলের প্রতি আমার বিনীত আবেদন, রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেই হবে, এমন কোনও দাবি আমি করি না, কিন্তু তাঁকে বিচার করার ক্ষেত্রে যেন যুক্তি আবেগের, প্রমাণ পূর্বধারণার এবং সমালোচনা বিদ্রূপের কাছে পরাজিত না হয়। কোনও মনীষীকে শ্রদ্ধা করা মানে তাঁকে প্রশ্নহীন করে তোলা নয়; বরং তাঁর প্রতি সুবিচার করা মানে তাঁকে যথাযথভাবে পাঠ করা, তাঁর বক্তব্যকে প্রেক্ষাপটে বোঝা এবং প্রয়োজন হলে তথ্যনির্ভর সমালোচনা করা।

রবীন্দ্রনাথের পক্ষে অন্ধ আনুগত্য নয়, আমি চাই তাঁর সম্পর্কে ন্যায়সংগত বিচার। ব্যক্তিপূজা নয়, চাই যুক্তিনিষ্ঠ মূল্যায়ন; বিদ্বেষ নয়, চাই বিবেকের সংলাপ।কারণ, কোনও মহান স্রষ্টাকে খণ্ডিতভাবে পাঠ করে তাঁকে বিচার করা যেমন তাঁর প্রতি সুবিচার নয়, তেমনই তাঁকে প্রশ্নাতীত বলে ঘোষণা করাও মুক্তবুদ্ধির পরিচয় নয়। আমাদের প্রত্যাশা, রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিতর্কের পরিসর আরও তথ্যসমৃদ্ধ, শালীন ও মননশীল হয়ে উঠুক ,যেখানে মতভেদ থাকবে,কিন্তু মনুষ্যত্বের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে না।

শুভেচ্ছা রইল

"""""""""""ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ""""""""""

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫১০

আমার মন্তব্যঃ আলী ভাই, আপনার এই পোস্টের মন্তব্যগুলো আমি আমার সংগ্রহে রেখে দেব।

ড. আলী বলেছেনঃ জেনে আনন্দিত হলাম । মন্তব্য সংগ্রহে রাখার ইচ্ছাটুকুর মধ্যেই তো এক গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। মানুষ ক্ষণস্থায়ী, সময় বহমান, কিন্তু কিছু কথা হৃদয়কে স্পর্শ করে সময়ের সীমানা অতিক্রম করে বেঁচে থাকে। মন্তব্য তখন আর নিছক শব্দের সমষ্টি থাকে না, হয়ে ওঠে অনুভবের দলিল, চিন্তার অনুরণন, আর দুটি মনের মধ্যে গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য সেতু। আপনার এই সযত্নে আগলে রাখার ইচ্ছা প্রমাণ করে, শব্দের প্রকৃত মূল্য তার উচ্চারণে নয়, তার অন্তর্নিহিত উপলব্ধিতে। কারণ দিনশেষে মানুষ সব কথা মনে রাখে না, মনে রাখে সেই কথাগুলোই, যার মধ্যে নিজের হৃদয়ের কোনো এক অচেনা সত্যকে খুঁজে পায়।

শুভেচ্ছা রইল

ছবি ব্লগ - ফুলদল

প্রকৃতি যখন যন্ত্রণার ভারে নুয়ে পড়ে, সূর্য ক্লান্ত অভিমানে আড়াল করে তার দীপ্ত মুখ। তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। শীতের নিঃশব্দ আগ্রাসনে নিস্তব্ধ  চারপাশ।  জীবনের স্পন্দন নেই। তারপরও  কোথাও কোনো কোণে নিভৃতে  ফুলের কুঁড়ি তার দল মেলে জানান দিচ্ছে সমাপ্তির শেষেও ভালো কিছুর সম্ভবনা আছে। 

 এই কুঁড়ির প্রশান্ত হাসি,মেঘলা দিনেও সমস্ত অবসাদ  ডিঙিয়ে ইংগিত করছে  সম্ভাবনা আশা।  সে বলছে আবারও জেগে উঠবে বোধ। সম্মান বোধ। মানুষের আত্মসম্মান বোধ। 

অসভ্যতাকে পিছে ফেলে আবারও ফিরবে মানুষ তার দীপ্ত চেতনায়  । তাই যতই প্রতিকূলতা ঘনিয়ে আসুক, জীবনের  কোনো প্রান্তে ভালো কিছুর সম্ভাবনা নিশ্চয়ই আছে। নিশ্চয়ই সকল বাধা পেরিয়ে ভালো কিছু আসবে।  

[১০ই অক্টোবর ২০২৬ শনবার সন্ধ্যায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালিমা লেপন। এও দেখা বাকী  ছিল ।]

।।।..।.....

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৬০


ফরিদ ভাই বলেছেনঃ আপনার ‘ছবি ব্লগ—৫: ফুলদল’ পোস্টটি দেখে ও পড়ে মুগ্ধ হলাম। প্রকৃতির একটি ছোট্ট ফুলের কুঁড়িকে কেন্দ্র করে আপনি যেভাবে জীবনের গভীর দর্শন, আশাবাদ, মানুষের আত্মমর্যাদা এবং সুদিন ফিরে আসার প্রত্যাশাকে তুলে ধরেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ছবিগুলো শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের পরিচয় বহন করছে না; প্রতিটি ছবির সঙ্গে আপনার কথাগুলো যেন একটি বিশেষ বার্তা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। প্রকৃতির নীরবতার ভেতর থেকেও যে জীবনের স্পন্দন, সম্ভাবনা ও প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাওয়া যায়, আপনার লেখাটি তারই সুন্দর উদাহরণ।

আপনার লেখার শুরুতেই প্রকৃতির যন্ত্রণায় নুয়ে পড়া, সূর্যের অভিমান করে আড়ালে চলে যাওয়া এবং শীতের নিঃশব্দ আগ্রাসনে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ার যে চিত্রকল্প তুলে ধরেছেন, তা বেশ গভীর। প্রকৃতির এমন রুক্ষ ও নির্জীব মুহূর্তে সাধারণত আমাদের চোখে পড়ে শূন্যতা, বিষণ্নতা কিংবা স্থবিরতা। কিন্তু আপনি সেই শূন্যতার মধ্যেও খুঁজে পেয়েছেন একটি ফুলের কুঁড়ি, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে নতুন করে জেগে ওঠার সম্ভাবনা। এখানেই আপনার লেখার সৌন্দর্য। একই দৃশ্য একজন মানুষের মনে হতাশা তৈরি করতে পারে, আবার অন্য একজনের মনে জাগাতে পারে আশার আলো। দৃষ্টিভঙ্গির এই পার্থক্যই মানুষের চিন্তা ও অনুভূতিকে স্বতন্ত্র করে তোলে।


ফুলের কুঁড়ি প্রকৃতির এক অতি ক্ষুদ্র সৃষ্টি, অথচ তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক পূর্ণাঙ্গ ফুল হয়ে ওঠার অসীম সম্ভাবনা। কুঁড়ি যখন প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও ধীরে ধীরে নিজের পাপড়ি মেলে ধরে, তখন সে যেন নীরবে ঘোষণা করে—পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, জীবনের অগ্রযাত্রা পুরোপুরি থেমে যায় না। প্রকৃতি আমাদের এই শিক্ষা প্রতিনিয়ত দিয়ে চলেছে। ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙে যায়, শীতে পাতা ঝরে পড়ে, মাঠঘাট বিবর্ণ হয়ে ওঠে; কিন্তু উপযুক্ত সময় এলে আবার নতুন পাতা গজায়, কুঁড়ি ফোটে, পৃথিবী নতুন রঙে সেজে ওঠে। মানুষের জীবনও কি এর ব্যতিক্রম? দুঃসময়, ব্যর্থতা, অপমান কিংবা হতাশা জীবনের কোনো একটি অধ্যায়কে অন্ধকার করে তুলতে পারে, কিন্তু সেই অন্ধকারই যে চিরস্থায়ী হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

আপনার দ্বিতীয় ছবির সঙ্গে লেখা—কুঁড়ির প্রশান্ত হাসি মেঘলা দিনেও অবসাদ পেরিয়ে সম্ভাবনা ও আশার ইঙ্গিত দেয়—আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। কারণ আশা মানে বাস্তবতার কঠিন দিকগুলো অস্বীকার করা নয়; বরং কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখা। যে মানুষ দুঃসময়েও ভালো কিছুর প্রত্যাশা ধরে রাখতে পারেন, তিনি পরিস্থিতির কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেন না। তাঁর মধ্যে বেঁচে থাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি এবং নিজের বিবেককে জাগিয়ে রাখার প্রেরণা। ছোট্ট একটি কুঁড়ি তাই কেবল উদ্ভিদের স্বাভাবিক বিকাশের প্রতীক নয়; এটি মানুষের মানসিক দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসেরও প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

আপনার লেখায় মানুষের বোধ, সম্মানবোধ ও আত্মসম্মানবোধের পুনর্জাগরণের যে প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছে, তা বিশেষভাবে ভাবনার দাবি রাখে। একটি সমাজের প্রকৃত উন্নতি শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা বাহ্যিক চাকচিক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই সমাজের মানুষের মধ্যে সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার ক্ষমতা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিজের মর্যাদা রক্ষার সচেতনতা কতটা রয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন বিবেকের পরিবর্তে অন্ধ আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়, যখন অন্যায় দেখেও নীরব থাকে, যখন ব্যক্তিস্বার্থের কাছে নৈতিকতাকে বিসর্জন দেয়, তখন সমাজের বাহ্যিক অগ্রগতি থাকলেও ভেতরে ভেতরে তার মানবিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

সেই জায়গা থেকে আপনার ফুলের কুঁড়ির উপমাটি বেশ অর্থবহ। যেমন একটি কুঁড়ির ভেতরে ভবিষ্যতের ফুল লুকিয়ে থাকে, তেমনি মানুষের মধ্যেও বিবেক, মানবিকতা ও আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা থাকে। সেই সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে প্রয়োজন সচেতনতা, সত্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার মানসিকতা। কোনো সমাজের মানুষ যদি নিজেদের ভুল বুঝতে শেখে, অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে শেখে এবং বিবেকের নির্দেশে কাজ করতে পারে, তাহলে পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়। পরিবর্তন সব সময় আকস্মিকভাবে আসে না; অনেক সময় তা শুরু হয় মানুষের মনের গভীরে জন্ম নেওয়া একটি ছোট্ট উপলব্ধি থেকে। ঠিক যেমন একটি কুঁড়ি ধীরে ধীরে পাপড়ি মেলে ফুল হয়ে ওঠে।

আপনার তৃতীয় ছবির সঙ্গে লেখা—অসভ্যতাকে পেছনে ফেলে মানুষ আবার তার দীপ্ত চেতনায় ফিরে আসবে—এই প্রত্যাশার মধ্যেও আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা খুঁজে পাই। সভ্যতার পরিচয় শুধু পোশাক-পরিচ্ছদ, ভাষা, শিক্ষা কিংবা প্রযুক্তির ব্যবহার দিয়ে নির্ধারিত হয় না। মানুষের প্রকৃত সভ্যতা প্রকাশ পায় তার আচরণে, অন্যের প্রতি সম্মানে, দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষায় এবং মতপার্থক্যের মধ্যেও শালীনতা বজায় রাখার ক্ষমতায়। যে সমাজে মানুষ পরস্পরকে অপমান না করে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে শেখে, ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে বিবেচনা না করে আলোচনার সুযোগ দেয় এবং ক্ষমতার পরিবর্তে ন্যায়কে গুরুত্ব দেয়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে মানবিক হয়ে উঠতে পারে।

অবশ্য মানুষের বোধ ও আত্মসম্মানের পুনর্জাগরণ কোনো সহজ কিংবা স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নয়। শুধু সময়ের পরিবর্তনে সব অসংগতি দূর হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এর জন্য দরকার শিক্ষা, মূল্যবোধের চর্চা, আত্মসমালোচনা এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। প্রতিটি মানুষ যদি নিজের অবস্থান থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, নিজের আচরণে সততা বজায় রাখেন এবং অন্যের মর্যাদাকে নিজের মর্যাদার মতোই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তাহলে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি শক্তিশালী হবে। আপনার লেখার আশাবাদকে আমি তাই নিষ্ক্রিয় অপেক্ষা হিসেবে দেখি না; বরং মানুষের ভেতরে সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার একটি আহ্বান হিসেবে দেখি।

আপনার ছবিগুলোর আরেকটি দিক আমার ভালো লেগেছে। এখানে ফুলের কুঁড়ি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের বিষয় হয়ে থাকেনি; তা যেন সময়, জীবন, সমাজ ও মানুষের মনোজগতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একটি ফুলের ছবি দেখেও যে এতগুলো ভাবনার দরজা খুলে যেতে পারে, তা আপনার সৌন্দর্যবোধ এবং প্রকৃতিকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়। ভালো আলোকচিত্রের শক্তি এখানেই—তা চোখকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি মনকে ভাবতে শেখায়। আর সেই ছবির সঙ্গে যখন অনুভূতিপূর্ণ ভাষা যুক্ত হয়, তখন ছবিটি আর নিছক দৃশ্য থাকে না; হয়ে ওঠে একটি গল্প, একটি উপলব্ধি কিংবা একটি নীরব প্রতিবাদ।

আপনার পোস্টটি পড়তে পড়তে মনে হলো, প্রকৃতি যেন আমাদের মানুষের চেয়ে বেশি ধৈর্যশীল। মানুষ অনেক সময় সামান্য প্রতিকূলতায় আশা হারিয়ে ফেলে, সম্পর্কের টানাপোড়েনে ভেঙে পড়ে কিংবা চারপাশের অসংগতির কারণে নিজের ভেতরের আলো নিভিয়ে ফেলে। অথচ প্রকৃতি প্রতিকূলতার মধ্যেও তার নিয়মে এগিয়ে চলে। শীতের পর বসন্ত আসে, অন্ধকারের পর আলো আসে, ঝরে যাওয়ার পর নতুন জন্মের সম্ভাবনা তৈরি হয়। প্রকৃতির এই চক্র আমাদের শেখায়, কোনো একটি অবস্থা চিরকাল স্থায়ী নয়। তবে সেই পরিবর্তনের অপেক্ষায় বসে থাকার পাশাপাশি পরিবর্তনের উপযোগী কাজও করতে হয়। ব্যক্তিজীবনে হোক কিংবা সমাজজীবনে, আশা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় সচেতনতা, উদ্যোগ ও দায়িত্ববোধ।

আপা, আপনার লেখার মূল সুরটি আমার কাছে এ রকম—পৃথিবী যতই কঠিন হোক, মানুষের ভেতরে ভালো কিছুর সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। এই বিশ্বাসটুকু ধরে রাখা আজকের সময়ে অত্যন্ত জরুরি। হতাশা মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে, কিন্তু আশাবাদ তাকে নতুন করে ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। একটি ছোট্ট ফুলের কুঁড়ি হয়তো পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না, কিন্তু তার অস্তিত্ব আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে যে সৌন্দর্য, কোমলতা ও নতুন জীবনের সম্ভাবনা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি।


সবশেষে বলব, আপনার ‘ফুলদল’ শুধু একটি ছবি ব্লগ নয়; এটি প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে জীবন ও সমাজকে নতুন করে দেখার একটি সুন্দর প্রয়াস। আপনার ছবির কুঁড়িগুলো যেমন প্রতিকূলতার মধ্যেও পাপড়ি মেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তেমনি আমাদের সমাজেও সত্য, বিবেক, আত্মমর্যাদা ও মানবিকতার নতুন জাগরণ ঘটুক—এই প্রত্যাশা করি। অন্ধকার যত গভীরই হোক, আশার আলো যেন নিভে না যায়; হতাশা যতই ঘিরে ধরুক, মানুষের ভেতরের ভালোত্ব যেন হারিয়ে না যায়।

আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ, এমন একটি সুন্দর ও ভাবনাসমৃদ্ধ পোস্ট আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য। আপনার কলমে ও ক্যামেরায় প্রকৃতির আরও অনেক রূপ, জীবনের আরও অনেক গল্প এবং মানবিক আশার আরও অনেক বার্তা উঠে আসুক। আপনার সৃজনশীল পথচলা অব্যাহত থাকুক, আর আপনার প্রতিটি নতুন পোস্ট পাঠকের মনে সৌন্দর্যবোধ, ইতিবাচক চিন্তা ও আত্মমর্যাদার আলো জাগিয়ে তুলুক। অনেক শুভকামনা রইল।


Monday, October 5, 2026

Surah Hadeed

 

 ২২ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩৪০

আমার মন্তব্যঃ  কোরানের ৫৭ নম্বর সূরার ২৫ নং আয়াতে বলেছে। সূরার নাম Surah Hadeed যার অর্থ লৌহ। এবং লৌহের atomic number -ও ৫৭

 

জাকারিয়া কামাল সাহেব তাঁর 'সাইন্টিফিক তাফসিরে' আলাপ করেছিলেন। সেই কত আগে। আশা করি তাঁর লেকচার সিরিজ শুনেছেন। ওনার লেকচার খুঁজে পেতে দেরী হবে বিধায় আমি এই লিঙ্ক খানা পাঠালাম। https://www.iqrasense.com/quranic-tafsir/surah-hadeed-iron-miracle-in-the-quran.html

******************

২২ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫০

লেখক বলেছেনঃ ধন্যবাদ আবার এসে প্রাসঙ্গিক লিংকটি যুক্ত করে দেয়ার জন্য । লিংকটি ফলো করে তা মনযোগ দিয়ে পাঠ করে এলাম। আমরা সকলেই জানি কুরআন মানবজাতির জন্য নৈতিক ও আত্মিক নির্দেশনার সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।

সূরা হাদীদ ( কোরানে থাকা৫৭ তম সুরা) বিশেষভাবে লোহা এবং তার সামাজিক ও নৈতিক প্রভাবকে নির্দেশ করে। সূরা হাদীদ এর ২৫ নম্বর আয়াতাংশে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ...আর আমরা লোহা নাযিল করেছি; এতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহু উপকার…(সূরা হাদীদ: ২৫)

আধুনিক সময়ে আপনার দেয়া লিংকে থাকা তাফসির সহ অনেকেই এই আয়াতকে ভিত্তি করে বলেন যে, কুরআন এখানে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা প্রকাশ করেছে; কারণ আধুনিক বিজ্ঞান মতে পৃথিবীর লোহা নাকি সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাকাশ থেকে এসেছে, আর কুরআনে একে ‘নাযিল করা বা “sent down” শব্দ ব্যবহার করেছে।

অলোচ্য বিজ্ঞ তাফসিরকারের প্রতি যথাযোগ্য সস্মান দিয়েই বলছি এই দাবিটি বিশ্লেষণ করার সময় আমাদের আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি।

প্রথমত sent down তথা নাযিল করা শব্দটি শুধু আকাশ থেকে ভৌত বস্তু নামানোর অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বরং এটি বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে নিয়ামত দান করা বোঝাতে,ব্যবস্থার সূচনা করা বোঝাতে, মানুষের জন্য উপযোগী করে দেওয়া বোঝাতে।উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কুরআনে বলা হয়েছে, -আমি তোমাদের জন্য পোশাক নাযিল করেছি ( সূরা আল আ‘রাফ আয়াতঃ ২৬ , অথচ পোশাক আকাশ থেকে পড়েনি।

বলা হয়েছে, -চতুষ্পদ জন্তু নাযিল করেছি-( সূরা আজ জুমার আয়াত ৬ ) পশুও আকাশ থেকে আসেনি। অতএব, লোহা নাযিল করেছি মানে এই দাবি করা বাধ্যতামূলক নয় যে লোহা আক্ষরিক অর্থে আকাশ থেকে পতিত হয়েছে; বরং অর্থ হতে পারে লোহাকে মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি ও প্রাপ্য করে দিয়েছেন।

লোহা বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞান বলে যে- ভারী মৌল (যেমন লোহা) সুপারনোভা বিস্ফোরণে তৈরি হয় ,পরে তা পৃথিবীর গঠনের অংশ হয়েছে ।এটি বর্তমানে একটি স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, কিন্তু বিজ্ঞান নিজেই পরিবর্তনশীল। ইতিহাসে বহু নিশ্চিত তত্ত্ব পরে সংশোধিত বা বাতিল হয়েছে।

সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন আমরা কুরআনের আয়াতকে কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সঙ্গে একেবারে একীভূত করে ফেলি। যদি বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে ভবিষ্যতে সেই তত্ত্ব বদলে যায়, তবে মানুষ ভাবতে পারে কুরআন ভুল! অথচ ভুল ছিল আমাদের ব্যাখ্যায়।

সূরা হাদীদের মূল উদ্দেশ্য বা আলোচ্য বিষয় বিজ্ঞান নয়, বরং নবীদের প্রেরণ,ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, শক্তি ও ক্ষমতার নৈতিক ব্যবহার, লোহার মাধ্যমে সভ্যতা, প্রতিরক্ষা ও ইনসাফ কায়েম। লোহা এখানে ক্ষমতা ও শক্তির প্রতীক; এটি দিয়ে যেমন জুলুম হয়, তেমনি এটি দিয়েই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হয়। আল্লাহ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন,এই শক্তির উৎস মানুষ নয়, বরং আল্লাহ।

তবে এ কথা বলাও ঠিক নয় যে এখানে কোনো বিস্ময় নেই। বিস্ময় হলো কুরআন ১৪০০ বছর আগে লোহাকে মানুষের সভ্যতার কেন্দ্রে স্থাপন করেছে,শক্তি ও কল্যাণ দুই দিকই একসঙ্গে উল্লেখ করেছে, বস্তুগত শক্তির সঙ্গে নৈতিক দায়িত্বকে যুক্ত করেছে কিন্তু এই বিস্ময়কে বৈজ্ঞানিক মিরাকলে রূপ দেওয়া কুরআনের গভীর উদ্দেশ্যকে আড়াল করে ।মুল কথা হল কুরআন কোনো বিজ্ঞান বই নয়, কুরআনের ভাষা বহুমাত্রিক Sent down বা নাযিল করা শব্দটি কেবল আকাশ থেকে পতনের অর্থে সীমাবদ্ধ নয়।

বিজ্ঞান কুরআনের সত্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড নয় বরং কুরআন মানুষকে চিন্তা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধে উন্নীত করার গ্রন্থ ,আসল মিরাকল হলো কুরআন নীজেই ।

আলোচনার সাথে প্রামাণ্য ইসলামী তাফসির (ইবন কাসীর, ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী, কুরতুবী প্রমুখ) যুক্ত করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি । এতে স্পষ্ট বোঝা যাবে ক্লাসিক্যাল স্কলাররা এই আয়াতকে কীভাবে বুঝেছেন এবং scientific miracle দাবির সাথে তার সম্পর্ক কোথায় সীমাবদ্ধ।

সূরা হাদীদ এর সম্পুর্ণ ২৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে  ---নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রাসূলদের পাঠিয়েছি সুস্পষ্ট প্রমাণসহ, এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মীযান, যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। আর আমরা লোহা নাযিল করেছি তাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহু উপকার; এবং যাতে আল্লাহ প্রকাশ করে দেন কে তাঁকে ও তাঁর রাসূলদের অদৃশ্য অবস্থায় সাহায্য করে।(সূরা হাদীদ- ২৫)

প্রখ্যাত তাফসিরকার ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) তাঁর তাফসিরুল কুরআনিল আযীম-এ বলেন লোহা নাযিল করা বলতে বোঝানো হয়েছে; আল্লাহ লোহাকে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের ব্যবহারযোগ্য করে দিয়েছেন লোহার প্রচণ্ড শক্তি বলতে তিনি উল্লেখ করেন অস্ত্র,যুদ্ধসামগ্রী প্রতিরক্ষা ও শাস্তি কার্যকর করার উপকরণ হিসাবে।

ইবন কাসীর স্পষ্টভাবে বলেন, লোহা দ্বারা আল্লাহ ইনসাফ প্রতিষ্ঠার উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, যেমন তলোয়ার যা কখনো ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম, আবার কখনো মানুষের জন্য পরীক্ষা।

লক্ষ্যণীয় বিষয় ইবন কাসীর কোথাও বলেননি যে লোহা আক্ষরিকভাবে আকাশ থেকে নেমে এসেছে। তাঁর দৃষ্টি ছিল সামাজিক ও নৈতিক ব্যবস্থার দিকে।

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) তাঁর  মাফাতিহুল গাইব (তাফসিরে কাবীর)-এ এই আয়াত নিয়ে অত্যন্ত দার্শনিক আলোচনা করেছেন।তিনি বলেন কিতাব ও মীযান (বিধান ও ন্যায়নীতি) যথেষ্ট না হলে সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ক্ষমতা (লোহা) অপরিহার্য । রাযী বলেন মানুষ কেবল যুক্তি দিয়ে নয়,কখনো কখনো শক্তি দিয়েও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়।

তিনি লোহার দুটি দিক উল্লেখ করেন যথাবাহ্যিক শক্তি (যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা),উপকারিতা (কৃষি, নির্মাণ, সভ্যতা), রাযীর দৃষ্টিতে আয়াতটি মূলত রাজনীতি, সমাজ ও ন্যায়বিচারের দর্শন।

ইমাম কুরতুবী (রহ.) তাঁর আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন-এ বলেন, লোহা হচ্ছে মানুষের জন্য এক বিশেষ নিয়ামত,এর দ্বারা: যুদ্ধ হয়,শাস্তি কার্যকর হয়, কৃষি ও নির্মাণ সম্ভব হয়।তিনি বলেন, আল্লাহ কিতাব দ্বারা হৃদয় সংশোধন করেন, আর লোহা দ্বারা সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন। এখানে নাযিল শব্দকে তিনি নিয়ামত দান অর্থে নিয়েছেন।

ক্লাসিক্যাল তাফসিরে নাযিল শব্দের অর্থ বিষয়ে আলোচনায় সব প্রধান মুফাসসিরগন একমত । সুরাটিতে থাকা نَزَّلْنَا / أَنزَلْنَا” শব্দটি কেবল ভৌত অবতরণ বোঝায় না, বরং বোঝায়:সৃষ্টি করা,নিয়ামত হিসেবে দান করা মানুষের আয়ত্তে আনা কেউই একে মহাকাশগত উৎসের দাবি হিসেবে ব্যাখ্যা করেননি।

এখন প্রশ্ন আসে তাহলে আধুনিক বিজ্ঞান যেটা বলছে, সেটা কি এই আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক?

উত্তর হল সাংঘর্ষিক নয়, কিন্তু আয়াতের মূল উদ্দেশ্যও নয়।কুরআন এখানে বিজ্ঞান শেখাতে আসেনি, বরং বলছে শক্তি ও ক্ষমতার উৎস আল্লাহ, এবং তা মানুষের জন্য পরীক্ষা। আধুনিক তত্ত্বকে আয়াতের একটি সম্ভাব্য সামঞ্জস্য হিসেবে দেখা যেতে পারে, তবে চূড়ান্ত তাফসির হিসেবে মেনে নেয়ার বিষয়টি বিজ্ঞ তাফসিরকারদের উপরই না হয় ছেড়ে দিলাম ।

শুভেচ্ছা রইল

...। ... । 


২২ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৩৩০

হুমায়রা হারুন বলেছেন: চমৎকার আলোচনা।

অনেক ধন্যবাদ।

এই লেখাটি দিয়েই তো একটি পোস্ট হয়ে যায়। আর 'হাজরে আসওয়াদ' এর কথা বললে আরো ভাল হবে। এই পাথরটি ও out of our planet থেকে আসা শুনেছি।

...

২৩ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৫০০

লেখক বলেছেনঃ আবার এসে কথা বলার জন্য ধন্যবাদ ।

মন্তব্যের ঘর থেকে কথা তুলে নিয়ে পৃথক পোষ্ট দিলে আমি গদ্যে পদ্যে প্রায় হাজার দশেক পোস্ট দিতে পারতাম । তবে মন্তব্য কোন ভাবে খুব বড় হয়ে গেলে তা মন্তব্যের ঘরে না লিখে পৃথক পোষ্ট দিয়ে দেই যেমনটি নির্বাচন নিয়ে আমার সামপ্রতিক পোস্ট । এটা নতুন নকিবের পোস্টে মন্তব্য লিখতে গিয়ে লেখার ফল ।

তাই সেটা সেখানে না দিয়ে পৃথক পোস্ট আকারে দিয়েছি ।

হাজরে আসোয়াদ এর উপরে আমার একটি বেশ বড় আকারের পোস্ট আছে । সেটা ব্লগে দিলে অনেকেই তার উপর বিরুপ মন্তব্য দিতে পারেন । তাই লেখাটিকে আরো ভাল করে কাটাঘসা করতে হবে বলে মনে হচ্ছে ।

শুভেচ্ছা রইল ।

...


কলাবাগান১ বলেছেন: পৃথিবীর সকল মেডিক্যাল গবেষনা বন্ধ করে কোদাল এর লোহা দিয়ে বাকা গাল সোজা করার পদ্ধতি নিয়ে গবেষনা আরম্ভ করার জোর দাবী জানালাম..লোহা দিয়ে এনার্জী ফিল্ড কে সোজা করার তরিকা পৃথিবীর তাবৎ বিজ্ঞানীদের জানা দরকার।

হায়রে মানব মনন এর এমন অবনতি অলৌলিক বিশ্বাসে

...


২৩ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৩০

লেখক বলেছেনঃ সম্মান রেখেই বলছি, আপনি হয়তো মন্তব্যগুলি পড়েছেন, কিন্তু প্রেক্ষাপটটা পড়েননি বা বুঝতে চাননি। পুরো আলোচনাই ছিল গল্পচ্ছলে বলা একটি রসিকতার ভেতরে আরেকটি রসিক মন্তব্য। এখানে কোথাও এটাকে মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট, গবেষণাযোগ্য পদ্ধতি বা পেটেন্টযোগ্য বিজ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

রসিকতায় বলা ভূত, এনার্জি ফিল্ড, আর গরম লোহা–কে যদি আক্ষরিক বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরিতে টেনে আনা হয়, তাহলে দোষ রসিকতার নয়, রসিকতা বোঝার ঘাটতির। সব কথার উত্তর গবেষণার দাবিতে দিতে গেলে আগে জানতে হবে কথাটা সিরিয়াস ছিল, নাকি নিছক গল্প আর হাসির খোরাক।

বিজ্ঞান যেমন যুক্তির জায়গা, তেমনি সমাজে গল্প, উপকথা আর রসিকতারও আলাদা জায়গা আছে। দুটো গুলিয়ে ফেললে একজন বিজ্ঞানী হলেও উপলব্ধিটা দুর্বলই থেকে যায়।

আশা করি পরের বার মন্তব্য করার আগে কথার ভঙ্গি আর উদ্দেশ্য এই দুটো বিষয়ও বিবেচনায় আসবে।

শুভেচ্ছা রইল

Sunday, October 4, 2026

পোর্টাল – ২ গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল


 ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:০০

ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ পোর্টাল – ২ : গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ গল্পটি মূলত এক শীতসন্ধ্যার সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও এর অন্তর্লীন ব্যঞ্জনা বহুদূর বিস্তৃত। মন্ট্রিয়লের ঠান্ডা, ক্রমশ জনশূন্য হয়ে আসা রাস্তা, লাইব্রেরির আলো পেরিয়ে রাতের ম্লান নিয়ন-আলোয় প্রবেশ সমস্ত দৃশ্যপট যেন ধীরে ধীরে বাস্তব জগতের সীমানা সরিয়ে পাঠককে এক অন্তর্জাগতিক অঞ্চলের দিকে নিয়ে যায়।

রুমার একা বাড়ি ফেরার পথটি এখানে শুধু একটি রাস্তা নয়; এটি যেন মানুষের অস্তিত্বের প্রতীকী পথ যেখানে আমরা প্রত্যেকে শেষ পর্যন্ত একা হাঁটি, অথচ অদৃশ্য কোনো সহচর আমাদের সঙ্গে থাকে। সেই অদৃশ্য উপস্থিতিই গল্পে ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’-এর রূপ নেয়। বিশেষ করে অপরিচিত ফরাসি মহিলার রহস্যময় হাসিটি গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত। তিনি কোনো নাটকীয় অলৌকিকতা প্রদর্শন করেন না; বরং একটি হাসি, একটি দৃষ্টি, একটি অনুচ্চারিত বার্তার মধ্য দিয়ে রুমার অন্তর্জগতে প্রবেশ করেন। ফলে তাঁর উপস্থিতি একই সঙ্গে বাস্তব, স্বপ্নময় এবং অতীন্দ্রিয় হয়ে ওঠে।

গল্পটির সৌন্দর্য এখানেই যে, ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’কে লেখক হিসাবে আপনি প্রচলিত দেবদূতের অবয়বে হাজির করেননি। তিনি এসেছেন একজন সাধারণ মধ্যবয়সী পথচারীর বেশে হেঁটে এসেছেন, হেসেছেন, হয়তো একটি সতর্কতাও জানিয়েছেন, তারপর মিলিয়ে গেছেন। এই সাধারণের আবরণেই অসাধারণের আবির্ভাব গল্পটিকে একটি চমৎকার মায়াময়তা দিয়েছে। পাঠক হিসাবে আমাদের মনেও তখন প্রশ্ন জাগে তিনি কি সত্যিই একজন অপরিচিত নারী, নাকি রুমার জন্য নির্দিষ্ট কোনো অদৃশ্য শক্তির সাময়িক মানব-প্রতিভূ?

‘পোর্টাল’ ধারণাটিও এখানে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। পোর্টাল যেন কেবল কোনো অতিলৌকিক দরজা নয়; বরং দৃশ্যমান বাস্তবতা ও অদৃশ্য বাস্তবতার মধ্যবর্তী এক ক্ষণিক ফাটল। সেই ফাটল দিয়েই কখনো হায়ার-সেলফ, কখনো গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল, কখনো বা আমাদের গভীরতম অন্তর্দৃষ্টি মানুষের সামনে এসে দাঁড়ায়। সবচেয়ে মুগ্ধকর বিষয় হলো ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার মুহূর্তে মানুষ নিজেই তা পুরোপুরি বুঝতে পারে না। পরে ফিরে তাকালে ঘটনাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অর্থ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।

আরও একটি সুন্দর দিক হলো, গল্পটি আসলে ‘একা থাকা’ এবং ‘একা না থাকা’র মাঝখানের সূক্ষ্ম ব্যবধানটিকে স্পর্শ করেছে। নির্জন শীতের রাস্তায় রুমা শারীরিকভাবে একা; কিন্তু গল্পের দর্শনে সে কখনোই নিঃসঙ্গ নয়। মানুষের চোখে যা নিঃসঙ্গতা, মহাবিশ্বের বৃহত্তর বোধে হয়তো সেটিই অদৃশ্য সঙ্গের মুহূর্ত। এই উপলব্ধিই গল্পটির আবেগগত কেন্দ্র।

শেষ পর্যন্ত ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’কে সত্যিই অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা হবে, নাকি একে রুমার অন্তর্দৃষ্টি, অবচেতন মন কিংবা আকস্মিক মানবিক সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে পড়া হবে লেখক হিসাবে আপনি তার সিদ্ধান্ত আমাদের মত সাধারণ পাঠকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। আর সেখানেই গল্পটির সার্থকতা। কারণ কিছু কিছু অভিজ্ঞতার সত্যতা প্রমাণ করা যায় না; শুধু অনুভব করা যায়।

শীতের রাত, পাতলা নীল-ফুলের জামা, গলায় স্কার্ফ না থাকার সামান্য অসতর্কতা, এক অপরিচিত নারীর অকারণ হাসি এই ছোট ছোট বাস্তব উপাদানগুলোর মধ্য দিয়েই গল্পটি শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় আমাদের। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা সত্যিই কি একা? নাকি অদৃশ্য কোনো স্নেহময় উপস্থিতি নীরবে আমাদের পাশে হেঁটে চলে শুধু প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজেকে চিনিয়ে দেয়?

পোর্টাল – ২ গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ সেই অদৃশ্য সঙ্গের প্রতি এক মায়াময়, অন্তর্মুখী এবং আধ্যাত্মিক অভিবাদন।


শুভেচ্ছা রইল

পোর্টাল ১ সাইকেল চালক

 


০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮০

চারাগাছ বলেছেন:
একটা সাধারণ রাস্তার ঘটনা থেকে এতটা অদ্ভুত ও কল্পনাময় একটা জগতের দরজা খুলে দেওয়া—এটাই লেখাটার সবচেয়ে মজার দিক।

সাইকেল আরোহীর হঠাৎ আবির্ভাব, সুমনার সঙ্গে প্রায়-দুর্ঘটনা, আর তারপর ধীরে ধীরে ঘটনাটাকে “পোর্টাল” ও অন্য বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা—পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, আমরা হয়তো চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর খুব সামান্য অংশই দেখতে পাই।

বিশেষ করে “পার্থিব চেহারা নিয়ে” অন্য বাস্তবতার মানুষদের আমাদের মাঝেই ঘুরে বেড়ানোর কল্পনাটা বেশ ইন্টারেস্টিং। আর শেষের ঝালমুড়ি-ফুচকার প্রসঙ্গটা পুরো কল্পনাটাকে হঠাৎ আমাদের চেনা পৃথিবীর সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে।











Monday, September 28, 2026

জীবন যেন স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের মতো


ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ  কিছু গান শুধু শোনা হয় না তারা জীবনের কোনো এক বিশেষ মুহূর্তে এসে আমাদের ভেতরে চিরদিনের জন্য বাসা বাঁধে। ১৯৮৪-এর সেই স্কুলের অফিস রুম, বেতন দেওয়ার ভিড়, আর প্রিয় বন্ধুর হাঁটু গেড়ে বসে ক্যাসেটের কভারের পেছন থেকে লিরিক দেখানো স্মৃতির পাতায় যেন আজও তেমনি জীবন্ত। 

Islands in the Stream তাই আপনার কাছে শুধু একটি প্রেমের গান নয়; এটি হয়ে উঠেছে কৈশোরের নির্মল বিস্ময়, বন্ধুত্ব, প্রথম ভালোবাসার অনুভব এবং হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের দরজা। নদীর স্রোতের মাঝে ভাসমান দ্বীপের উপমাটিও যেন জীবনের এক গভীর সত্য বলে স্রোত আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সময় আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়, তবু কিছু মানুষ আর কিছু গান আমাদের হৃদয়ের নিজস্ব দ্বীপ হয়ে থেকে যায়। 

শেষের আকাঙ্ক্ষাটিই সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে যায় কোথাও যদি চলে যেতে পারতাম, যেখানে সেই দ্বীপের দেখা মিলবে। হয়তো সেই দ্বীপ কোনো ভৌগোলিক স্থান নয়; সেটি আমাদের স্মৃতির ভেতরেই আছে যেখানে বয়স থেমে থাকে, প্রিয় মানুষগুলো হারিয়ে যায় না, আর একটি পুরোনো গান বাজলেই আমরা আবার ফিরে যাই সেই কিশোরী বিকেলে।

স্মৃতি আসলে এমনই জীবন স্রোতের মতো বয়ে যায়, কিন্তু কিছু গান আমাদের ভাসমান দ্বীপ হয়ে চিরকাল পাশে থাকে।

শুভেচ্ছা রইল 
২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২

Friday, September 25, 2026

ফোকলা জীবন

 ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ বেশ বড় আকারের গল্প । স্কুল জীবনে বড় সাইজের গল্পই খুঁজে খুঁজে পড়তাম । এখনো অবশ্য অবশ্য বড় গল্প পড়ি যদি প্রথম কয়েক লাইন পড়ে ভাল লাগে । যাহোক এই গল্পটি মনযোগ দিয়েই পাঠ করেছি।

পাঠে মনে হল ফোকলা জীবন’ যেন স্মৃতি, ক্ষত ও এক নারীর আত্মমর্যাদার আখ্যান।

এটি যেন একটি নারীর বিবাহিত জীবনের স্মৃতিচারণ নয়; এটি স্মৃতির ভেতর দিয়ে একটি ভয়ংকর পারিবারিক কাঠামোর মুখোশ খুলে দেওয়ার গল্প। রত্না যখন পুরোনো অ্যালবামের ছবি কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতে বসে, তখন পাঠক বুঝতে পারে, সে আসলে কেবল ছবি নষ্ট করছে না; নিজের জীবনের এক দুঃসহ অধ্যায় থেকে নিজেকে মুক্ত করারও চেষ্টা করছে। কিন্তু গল্পের গভীরতম বোধটি এখানেই: ছবি ছেঁড়া যায়, স্মৃতি ছেঁড়া যায় না।

গল্পটির সূচনা তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘এলবাম’ এখানে নিছক ছবি রাখার বস্তু নয়; এটি রত্নার অতীতের একেকটি স্তর। আকদ, হলুদ, বিয়ে, বৌভাত, প্রতিটি অ্যালবাম যেন জীবনের একটি সামাজিকভাবে স্বীকৃত আনন্দের মুহূর্তকে ধরে রাখে। অথচ সেই ছবিগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়, সন্দেহ, প্রতারণা, অপমান ও সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস। ফলে ছবির হাসি আর জীবনের সুখ এক হয়ে থাকে না। বরং ছবির হাসি যত উজ্জ্বল, তার পেছনের অন্ধকার ততই প্রকট হয়ে ওঠে।

গল্পের একটি শক্তিশালী দিক হলো অশুভ পূর্বাভাসের ধারাবাহিকতা। বিয়ের দিন উল্টো শাড়ি, গাড়ি থেকে নামার পর অদ্ভুতভাবে শাড়ির কুঁচি খুলে যাওয়া, বাসররাতে চুড়ি ভেঙে যাওয়া, প্রতিটি ঘটনাই রত্নার মনে অস্বস্তি তৈরি করে। এগুলোকে নিছক কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে পড়া যায়, আবার রত্নার পরবর্তী জীবনের প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। বিশেষ করে ‘উল্টো শাড়ি’ পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে একটি গভীর রূপক। যে জীবনকে স্বাভাবিক, সুন্দর ও দাম্পত্যের নিরাপদ আশ্রয় বলে কল্পনা করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত উল্টো পথে হাঁটে।

এখানে আপনি খুব সচেতনভাবেই লোকবিশ্বাস, অমঙ্গলের আশঙ্কা ও বাস্তব বিপদের সীমারেখা অস্পষ্ট করে দিয়েছেন। চুড়ি ভেঙে যাওয়া হয়তো কেবল বড় সাইজের চুড়ির ওপর হাতের চাপের ফল; শাড়ির কুঁচি খুলে যাওয়া হয়তো নিছক পোশাকের সমস্যা। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাবলি সেই ঘটনাগুলোকে রত্নার স্মৃতিতে অন্য অর্থ দেয়। মানুষের মন অতীতকে পরে গিয়ে নতুন অর্থে সাজায়। গল্পটি সেই মনস্তত্ত্বও ধারণ করে।

তবে গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি অলৌকিকতায় নয়; বরং অলৌকিক মনে হওয়া ঘটনাগুলোর আড়ালে থাকা বাস্তব নিষ্ঠুরতায়।

রত্নার শ্বশুর চরিত্রটি গল্পের সবচেয়ে অস্বস্তিকর এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একটি। তার বয়স, কর্তৃত্ব, কথাবার্তার ধরন, বউয়ের ব্যক্তিগত জীবনে অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং ছেলের ওপর অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ, সব মিলিয়ে সে শুধু একজন অত্যাচারী শ্বশুর নয়; একটি ক্ষমতাকাঠামোর প্রতীক। তার কাছে বউমা একজন স্বাধীন মানুষ নয়; বরং পরিবারের সম্পদ, পুত্রের পরিচর্যাকারী এবং বংশরক্ষার একটি উপকরণ।

‘তোমার বাপের সঙ্গে কথা বলবে না’, ‘বাপের বাড়ি যেতে পারবে না’, এই নির্দেশগুলো আপাতদৃষ্টিতে পারিবারিক নিয়মের মতো শোনালেও প্রকৃত অর্থে এগুলো বিচ্ছিন্নকরণ ও নিয়ন্ত্রণের কৌশল। একজন নারীকে তার নিজস্ব পরিবার, সামাজিক যোগাযোগ ও আশ্রয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। গল্পে এই বিষয়টি সরাসরি ব্যাখ্যা না করেও ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রত্নার স্বামী চরিত্রটিও এই গল্পে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সে সরাসরি প্রচলিত অর্থে খলনায়ক নয়। বরং সে নিজেও একটি বিকৃত পারিবারিক ব্যবস্থার শিকার। তার শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতা, বাবার প্রতি অন্ধ নির্ভরতা এবং নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বুঝতে না পারা তাকে একই সঙ্গে করুণ ও বিপজ্জনক চরিত্রে পরিণত করেছে। রত্নার প্রতি তার আচরণ অনেক ক্ষেত্রে নিরীহ; কিন্তু সেই নিরীহতা তাকে দায়মুক্ত করে না। কারণ সে এমন একটি ব্যবস্থার অংশ, যেখানে রত্নার স্বাধীনতা প্রতিনিয়ত সংকুচিত হয়েছে।

এই জায়গাতেই গল্পটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: অপরাধী কে, আর শিকারই বা কে?

শ্বশুর নিঃসন্দেহে ক্ষমতার কেন্দ্র। কিন্তু তার স্ত্রীও তার স্বামীর নিপীড়নের শিকার। আবার সেই নারীই পুত্রবধূর ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেন। অর্থাৎ নিপীড়ন এখানে সরলরৈখিক নয়; এক প্রজন্মের ওপর প্রয়োগ করা সহিংসতা আরেক প্রজন্মের মধ্যে অন্য রূপে সঞ্চারিত হয়। যে নারী নিজে অপমানিত, সে-ও অন্য একজন নারীকে অপমান করতে পারে। এই জটিলতাই গল্পটির শেষাংশকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়।

গল্পের শিরোনাম ‘ফোকলা জীবন’ মূলত শেষ অংশে এসে পূর্ণ অর্থ লাভ করে।

রত্না যখন ছবিগুলো কাটতে কাটতে দেখে, অসংখ্য টুকরোর মধ্যেও শাশুড়ির মুখটি অক্ষত থেকে গেছে, তখন বাস্তব ঘটনা একটি প্রতীকী স্তরে প্রবেশ করে। এই অক্ষত মুখ যেন ছবির কাগজের মুখ নয়; বরং একটি জীবনের অবশিষ্ট মুখ। বহু অপমান, বহু দাম্পত্য নির্যাতন, বহু বছরের অসহায়তা পেরিয়েও যে মুখটি অক্ষত আছে, সেটি একই সঙ্গে অপরাধী এবং শিকার, দুই পরিচয় বহন করে।

এই জায়গায় গল্পটি একমাত্রিক প্রতিহিংসার গল্প হয়ে ওঠে না। রত্না চাইলে তার শাশুড়িকে কেবল অত্যাচারী নারী হিসেবে স্মরণ করতে পারত। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সে উপলব্ধি করে, এই নারীও হয়তো একসময় একই ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে আটকে পড়েছিল। তার নিজের জীবনও ছিল ‘ফোকলা’। তার নিজের স্বামী তাকে অপমান করেছে, তার শরীর ও মাতৃত্বকে ব্যবহার করেছে, তার সম্মানকে ক্ষয় করেছে। অথচ সেই ক্ষত থেকে মুক্তি না পেয়ে সে আবার অন্য একজন নারীর ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে।

এই দ্বৈততা গল্পটিকে মানবিক গভীরতা দেয়।

গল্পের ভাষারও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। বর্ণনার মধ্যে কথ্যভাষা, ব্যঙ্গ, তীক্ষ্ণ মন্তব্য এবং কখনো প্রায় নাটকীয় সংলাপ একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘বাহ!’, ‘সেরেছে এবার’, ‘কি সুন্দর যুক্তি’, ‘ওরে বাবা’, এ ধরনের বাক্য গল্পের বর্ণনাকারী কণ্ঠকে অত্যন্ত ব্যক্তিগত করে তোলে। রত্নার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে আমরা ঘটনাগুলো দেখি বলে তার ক্ষোভ, বিস্ময়, বিদ্রূপ ও অসহায়তা আমার কাছেও সরাসরি পৌঁছে যায়।

বিশেষ করে ব্যঙ্গাত্মক বাক্যগুলো গল্পের বেদনাকে আরও তীব্র করেছে। যেখানে সরাসরি কান্না থাকলে পাঠক হয়তো শুধু দুঃখ পেতেন, সেখানে রত্নার তীক্ষ্ণ রসবোধ সেই দুঃখকে প্রতিরোধের ভাষায় রূপ দিয়েছে। সে কাঁদে, ভয় পায়, সন্দেহ করে; আবার একই সঙ্গে বিদ্রূপ করে। এই বিদ্রূপই তার আত্মরক্ষার অন্যতম অস্ত্র।

তবে গল্পটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় সম্ভবত রত্নার চরিত্রের ভিতরের পরিবর্তন।

২৪ বছরের একটি মেয়ে, যে বিয়ের আগে পার্লারে যায়নি, অচেনা পরিবারে গিয়ে প্রথমে অস্বস্তি ও আশঙ্কাকে নিজের ভেতরে চেপে রাখে। কিন্তু ধীরে ধীরে সে প্রশ্ন করতে শেখে। প্রতিবাদ করতে শেখে। একসময় ৭২ বছরের শ্বশুরের চোখে চোখ রেখে বলে, ‘বাপ না। বলেন আব্বা। আব্বা।’ এই সংলাপটি কেবল সম্বোধন সংশোধন নয়; এটি ক্ষমতার ভাষাকে প্রত্যাখ্যান।

এরপর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার শাশুড়িকে উদ্দেশ করে বলা কথাগুলো। রত্না বুঝতে পারে, যে নারী নিজে অপমানিত হয়েছেন, তার সন্তানরা পর্যন্ত তার সম্মানের পক্ষে দাঁড়ায়নি। একজন বাইরের নারী এসে সেই প্রশ্নটি তুলেছে। এখানেই রত্না কেবল নিজের অধিকারের জন্য লড়ছে না; সে আরেক নারীর অধিকারকেও চিনতে শুরু করছে।

গল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো শরীরের রাজনীতি। শাড়ি, চুড়ি, ব্রা, মাসিক, সন্তান ধারণ, বউয়ের শরীর, সবকিছুকে পুরুষতান্ত্রিক পরিবারের নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে। রত্নার শরীর যেন তার নিজের নয়।

কখন সে বাবার বাড়ি যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কখন সন্তান হবে, কীভাবে স্বামীকে দেখবে, সব কিছুতেই অন্যের সিদ্ধান্ত। ফলে গল্পটি কেবল মানসিক নির্যাতনের নয়; এটি একজন নারীর শরীর ও ব্যক্তিসত্তার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইও।

শেষ পর্যন্ত রত্না সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু গল্পের দৃষ্টিতে বেরিয়ে আসা মানেই মুক্তি নয়। কারণ শরীরকে বাড়ি থেকে বের করে আনা যায়, স্মৃতিকে নয়। সেই কারণেই গল্পের শুরুতে ফিরে আসে অ্যালবাম। রত্না ছবিগুলো কাটছে, কিন্তু স্মৃতির মুখগুলো বারবার ফিরে আসছে।

এখানে অ্যালবাম ও কাঁচি দুটি অসাধারণ প্রতীক।

অ্যালবাম ধরে রাখে। কাঁচি বিচ্ছিন্ন করে।

অ্যালবাম অতীতকে সংরক্ষণ করে, কাঁচি অতীতকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু কাঁচি যতই ধারালো হোক, স্মৃতির বিরুদ্ধে তার ক্ষমতা সীমিত। বরং ছবি কাটতে কাটতেই রত্না আবিষ্কার করে, যে মুখটি সে সবচেয়ে বেশি মুছে ফেলতে চেয়েছিল, সেই মুখই টুকরোগুলোর মাঝখানে অক্ষত রয়ে গেছে।এ যেন অতীতের এক নীরব প্রত্যাবর্তন।

আর সেখানেই ‘ফোকলা জীবন’ নামটি গভীর হয়ে ওঠে। ‘ফোকলা’ শুধু দাঁতহীনতার ইঙ্গিত নয়; এটি এমন একটি জীবনের প্রতীক, যার বাহ্যিক কাঠামো আছে কিন্তু ভেতরের পূর্ণতা নেই। সংসার আছে, স্বামী আছে, সন্তান আছে, সামাজিক পরিচয় আছে; কিন্তু নিরাপত্তা নেই, সম্মান নেই, ভালোবাসা নেই, স্বাধীনতা নেই।

বাইরে থেকে পূর্ণ, ভেতর থেকে ফাঁপা, এই দ্বৈততাই ‘ফোকলা জীবন’-এর মূল সুর।

গল্পের শেষ উপলব্ধিটি তাই প্রতিহিংসার নয়, বরং এক ধরনের বিষণ্ণ মানবিক স্বীকৃতির।

রত্না বুঝতে পারে, তার শাশুড়ি শুধু তার অত্যাচারী ছিলেন না; তিনিও কোনো এক সময় অত্যাচারের শিকার ছিলেন। কিন্তু সেই উপলব্ধি শাশুড়ির করা অন্যায়কে মুছে দেয় না। বরং দেখিয়ে দেয়, সহিংসতা কীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে এবং একজন শিকার কীভাবে কখনো কখনো অন্য একজনকে শিকার বানিয়ে ফেলে।

এই কারণেই গল্পটির শেষ দৃশ্যটি সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যগুলোর একটি: কাটা ছবির অসংখ্য টুকরোর মধ্যে শাশুড়ির মুখ অক্ষত।

রত্না যেন শেষ পর্যন্ত ছবিটি ফেলতে পারে না।

হয়তো ঘৃণার জন্য নয়।

হয়তো করুণার জন্যও নয়।

বরং এই উপলব্ধির জন্য যে, তাদের দুজনের জীবনই ভিন্নভাবে ক্ষতবিক্ষত। একজন সেই ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, আর অন্যজন সেই ক্ষত নিয়েই একটি ‘ফোকলা জীবন’ কাটিয়ে দিয়েছে।

‘ফোকলা জীবন’ তাই শেষ বিচারে শুধু একটি ব্যর্থ বিবাহের গল্প নয়। এটি স্মৃতির বিরুদ্ধে মানুষের অসম লড়াই, পারিবারিক ক্ষমতার নির্মমতা, নারীর আত্মমর্যাদার জেগে ওঠা এবং এক প্রজন্মের ক্ষত কীভাবে আরেক প্রজন্মের জীবনে ছায়া ফেলে, তার একটি তীব্র আখ্যান।

গল্পটির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি পাঠককে শেষ পর্যন্ত একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বরং একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কখনো কখনো অত্যাচারী এবং অত্যাচারিতের মাঝখানে যে দেয়ালটি আমরা আঁকি, তার ভেতরেও আরও বহু অদৃশ্য দরজা থাকে। আর সেই দরজাগুলোর ওপারে থাকে বহু বছরের না বলা কান্না।

রত্না ছবিগুলো কেটে ফেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে, ছবি কাটা যায়, জীবন কাটা যায় না। স্মৃতি ফেলা যায় না। আর কিছু মুখ, যতই কাঁচি চালানো হোক, অক্ষতই থেকে যায়। সেই অক্ষত মুখটিই হয়তো ‘ফোকলা জীবন’-এর সবচেয়ে দীর্ঘশ্বাসময় প্রতীক।

শুভেচ্ছা রইল

Thursday, September 24, 2026

বম রাজার পুত্র

 ড. এম এ আলীঃ বেশ মনযোগ দিয়ে পড়লাম ।পাঠান্তে মনে হল এটা বম রাজার পুত্র প্রেম, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার এক মর্মস্পর্শী আখ্যান।

‘বম রাজার পুত্র’ পড়তে পড়তে একজন পাঠক হিসেবে প্রথম যে অনুভূতিটি তৈরি হয়, তা হলো এটি শুধু একজন সংগীতশিল্পীর প্রেমকাহিনি নয়; বরং প্রেমের মোহ, আত্মবিসর্জন, পারিবারিক বিচ্ছেদ, দাম্পত্যের বাস্তবতা এবং দীর্ঘদিনের অপূর্ণতার মধ্য দিয়ে একজন মানুষের ভেতরে ভেঙে পড়ার গল্প।

পূর্ণ বম চরিত্রটির মধ্যে একই সঙ্গে রাজপুত্রের আদর, শিল্পীর সংবেদনশীলতা, প্রেমিকের আবেগ এবং একজন মানুষের দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে যে মানুষটি নিজের পরিবার, গোত্র, সমাজ এমনকি সংগীতজীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে অজানার পথে পাড়ি জমায়, পরবর্তী জীবনে সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি তাকে কীভাবে তাড়িয়ে বেড়ায় লেখাটির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাগুলোর একটি এটি।

আপনার লেখাটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রেমিকা ও স্ত্রী র সম্পর্কের পার্থক্যকে সামনে আনা। প্রেমের সময়ে যে মানুষটিকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে সম্পূর্ণ মনে হয়, সংসারের বাস্তবতায় সেই সম্পর্কই কীভাবে দায়িত্ব, প্রত্যাশা, অভিমান ও অপূর্ণতার ভারে ক্লান্ত হয়ে উঠতে পারে আপনি তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে ‘পূর্ণ’নামের মধ্যেই যে পূর্ণতার ইঙ্গিত, গল্পের শেষে সেটিই যেন গভীর ব্যঙ্গাত্মক অর্থ বহন করে। জীবনের এত কিছু পেয়েও মানুষটি শেষ পর্যন্ত মানসিকভাবে অপূর্ণ।

দুই দশক পর পূর্ণের ফিরে আসা অংশটি পাঠক হিসাবে মনে বিশেষ দাগ কাটে। বাইরে থেকে সে তখনও তারকা ভক্ত আছে, কনসার্ট আছে, নেতৃত্ব আছে, জনপ্রিয়তা আছে; কিন্তু অন্তরে বহন করছে এক পুরোনো ক্ষত। এই বৈপরীত্যটিই গল্পের সবচেয়ে মানবিক দিকগুলোর একটি। একজন মানুষের বাহ্যিক সাফল্য আর ভেতরের নিঃস্বতার মধ্যে যে বিপুল দূরত্ব থাকতে পারে, পূর্ণ চরিত্রের মধ্য দিয়ে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

লেখার ভাষা খুবই আবেগপ্রবণ এবং দৃশ্যধর্মী। বিশেষ করে বিমানযাত্রার দৃশ্য, দলের সদস্যদের সঙ্গে পূর্ণের আচরণ, বিদেশের মাটিতে থেকেও ভাতের সঙ্গে কাঁচা মরিচ চাওয়ার মতো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো চরিত্রটিকে পাঠক হিসাবে আমাদের কাছে জীবন্ত করে তোলে। এসব জায়গায় াআপনি গল্পের বৃহৎ আবেগের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সহজ বাস্তবতাকে সুন্দরভাবে মিলিয়েছেন।


তবে পাঠক হিসেবে মনে হল কিছু জায়গায় ভাষার পুনরাবৃত্তি এবং অতিরিক্ত আবেগঘন বর্ণনা কিছুটা কমানো গেলে গল্পের অভিঘাত আরও গভীর হতে পারত। বিশেষ করে শ্রাবণীর শারীরিক পরিবর্তন বর্ণনার পরিবর্তে তার মানসিক পরিবর্তন, সম্পর্কের ভাঙন এবং পূর্ণের অন্তর্দ্বন্দ্বকে আরও বিস্তৃত করা হলে চরিত্র দুটির জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত বলে মনে হয়। কারণ গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নটি আসলে পূর্ণ কি শ্রাবণীকে ভালোবেসেছিল, নাকি শ্রাবণীর প্রতি নিজের মোহকেই ভালোবাসা ভেবেছিল? এই প্রশ্নটি পাঠক হসাবে আমাদের মনে দীর্ঘসময় থেকে যায়।

সর্বোপরি বম রাজার পুত্র এমন একটি গল্প, যেখানে প্রেমের শুরু যতটা উজ্জ্বল, তার পরিণতি ততটাই বিষণ্ণ। পূর্ণের জীবনে শ্রাবণী একসময় প্রেমের প্রতীক, পরে অনুশোচনার প্রতীক এবং শেষ পর্যন্ত তার অপূর্ণতারই আরেক নাম হয়ে ওঠে। তাই গল্পের শেষ বাক্য এই নামটি পূর্ণ-র সকল অপূর্ণতা শুধু একজন নারীর নামকে নির্দেশ করে না এটি যেন পূর্ণের সমগ্র জীবনের এক করুণ সারাংশ।

গল্পটির পাঠ শেষ করার পর মনে হয় মানুষ জীবনে অনেক কিছু ফিরে পেতে পারে, কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু সম্পর্ক এবং কিছু হারানো সময় কখনোই আগের জায়গায় ফিরে আসে না। আর সেই না-ফেরার বেদনাই বম রাজার পুত্র এর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনুভূতি।

শুভেচ্ছা রইল

Wednesday, September 23, 2026

শেইপ শিফটার - বেজী

ড. এম আ আলীঃ হয়ত আর কিছুক্ষন মানুষ রূপে হেটে যাবে ওই রাস্তা ধরে ,তারপর কোন এক সময়ে
বাতাশে মিলিয়ে যাবে লোক চক্ষুর আড়ালে । তবে আড়ালে গিয়েই কী তার কার্কলাপ শেষ হবে । বরং রাতের অন্ধকার নামতেই অরণ্যের সীমানায় রহস্যময় কোন আচরণ শরু করবে । সেতো কোনো সাধারণ মানুষ নয়,এমনো হতে পারে সে একজন প্রাচীন বংশের শেষ 'শেইপ শিফটার' বা রূপ পরিবর্তনকারী। পরিস্থিতির প্রয়োজনে সে যেকোনো রূপ ধারণ করতে পারে, তবে তার সবচেয়ে প্রিয় এবং কার্যকর রূপটি যে একটি চটপটে 'বেজী' তাতে কোন সন্দেহ নেই আপনের পোস্টের প্রচ্ছদের ছবিটি দেখে ।

তার অনেক কাজ আছে লোক চক্ষুর অন্তরালে । শহরের কুখ্যাত চোরাকারবারী দল যখন অরণ্যের আদিম সম্পদ ও গোপন নকশা চুরি করে পালায়, শেইপ শিফটার তাদের পিছু নেয়। মানুষের রূপ নিয়ে তাদের কড়া পাহারার ভেতর ঢোকা অসম্ভব করে তুলে। সে চোখ বন্ধ করে নিজের শ্বাসের গতি পরিবর্তন করতে পারে। মুহূর্তের মধ্যে তার ত্বক ঘন ধূসর লোমে ঢেকে দিতে পারে, হাত-পা সংকুচিত করে চার পায়ে রূপ নিয়ে এবং চোখ দুটি করে তুলতে পারে প্রখর ও জ্বলজ্বলে। তাই সে সহজেই হতেপারে এক ক্ষিপ্র বেজী।

তার এই রূপের প্রধান সুবিধা অবিশ্বাস্য গতি এবং বিষাক্ত সাপের মতো শত্রুদের আক্রমণকে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা।

শত্রু শিবিরের সূক্ষ্ম তারের ফাঁক গলে এবং সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে সে অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারে। চোরেরা যখন মূল ভল্ট খোলার কোন প্রস্তুতি নেয় , ঠিক তখনই বেজী রূপে সে তাদের চোখের পলকে আক্রমণ করতে পারে। তার ধারালো দাঁত আর নখের আঘাতে শত্রুরা হয়ে যেতে পারে দিশেহারা । কেউ বুঝতেই পারবেনা না, সাধারণ একটি প্রাণী কীভাবে এত নিখুঁত এবং বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে তাদের পুরো পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে পারে।ডাইনী হোক যাই হোক এমন বেজীর মত তেজী এমন শেইপ শিফটার হলে ক্ষতি কী.সেতো সচরাচর ভাল ছাড়া ক্ষতি করেনা কারো , তাকে দেখে ডাইনী ভেবে ভয় পাবার এত কী আছে ।

আপনার গল্পের কাহিনী সুত্র ধরেই এই শেইপ সিফটারের সম্ভাব্য কিছু কর্মগাথা হলো বলা ।

আপনার গল্প সুন্দর হয়েছে ।

শুভেচ্ছা রইলো। 

Tuesday, September 22, 2026

Poetry - Graveyard

 Graveyard

~  Humaira Haroon ~

Don’t make my graveyard
I don’t want to be buried
I don’t want to be remembered
From my life nothing I took or I carried.

Neither I want to be recognized
Nor even to be remembered by you
I will rest in peace with myself
With colorless passionate hue.

I won’t try to find myself
I won’t try to think where am I
My passion of search with itself
Revert me when I will die.
~~ 30th Jan, 2007 Montreal
_______________________________________________________________________

Literary Review by Dr. M A Ali: About twenty years ago written this beautiful poem carries a haunting yet beautiful sense of detachment from life, memory, and identity. Graveyard feels less like a poem about death and more like a meditation on the desire to disappear quietly, without monuments, recognition, or the burden of being remembered. The repeated rejection of remembrance gives the poem a deeply melancholic and philosophical atmosphere.

I particularly love the contrast between rest in peace with myself and the restless passion of search. It suggests that even in death, the speaker’s search for meaning and self-understanding continues. The final lines leave a lingering impression, as though the journey inward is endless and death itself becomes another part of that search.

There is something strikingly vulnerable in the poem, it does not ask to be celebrated or remembered. It asks simply to exist, and eventually to return to silence. The imagery of a colourless passionate hue beautifully captures that paradox of feeling deeply while wishing to leave no trace.

A quiet, introspective, and haunting poem, one that stays with us long after the final line.

Thank you very much for furnishing this beautiful poem here that enriches my blog as well.

My well wish is aways with you.

22nd Sept. 2026

Wednesday, September 16, 2026

রাগ ইমনের তৃষ্ণা


 ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:০০০


ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ ভারতীয় রাগসংগীতকে পাশ্চাত্যের বাদ্যযন্ত্রের ভাষায় উপস্থাপন করে বিশ্বসংগীতের পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস খুবই সুন্দর করে তুলে ধরেছেন।

লিংকে গিয়ে ইয়ানী পিয়ানো মুর্ছনা , রাগ ইমন ,রাগ মেঘ, পিয়ানোতে রাগ মালকোশের মুর্ছনা শুনলাম । লেখাটিতে ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রশ্ন উঠে এসেছে ভারতীয় রাগসংগীতের সূক্ষ্ম সৌন্দর্য ও স্বরভাষাকে পাশ্চাত্যের বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে বৃহত্তর বিশ্বশ্রোতার কাছে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়। পিয়ানোতে রাগ ইমন, মেঘ বা মালকোশের স্বররূপ তুলে ধরার এই প্রয়াস সেই দিক থেকে নিঃসন্দেহে আগ্রহের বিষয়।

তবে পিয়ানোতে কোনো নির্দিষ্ট স্বরক্রম বা কয়েক সেকেন্ডের সুরাংশ রাগের সঙ্গে মিলে গেলেই সেটিকে সম্পূর্ণ রাগের পরিবেশনা বলা যায় কী না তা ভাবার বিষয়। রাগের স্বরসংগঠন ছাড়াও তার চলন, পকড়, অলংকার, মীর, সময়ভাব, ন্যাস ও সামগ্রিক রাগধর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখাটির শেষাংশে মীর প্রসঙ্গটি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

একই সঙ্গে, পাশ্চাত্যের যন্ত্রে ভারতীয় রাগের রূপান্তরকে কেবল মূল রাগকে অন্য যন্ত্রে বাজানো হিসেবে না দেখে দুই ভিন্ন সংগীতভাষার মধ্যে একটি সৃজনশীল সংলাপ হিসেবেও দেখা যায়। পিয়ানোর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রাগের আবহ, স্বরচরিত্র ও নান্দনিকতা কতটা বিশ্বস্তভাবে প্রকাশ করা সম্ভব এই অনুসন্ধানই হয়তো এই উদ্যোগের একটি আকর্ষণীয় দিক।

ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে শুরু হওয়া এই প্রয়াস যদি স্বরলিপি, রাগের ব্যাকরণ, বাদ্যযন্ত্রের সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আরও বিস্তৃতভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে তা ভারতীয় রাগসংগীতকে নতুন শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করার একটি সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে।সে জন্য এই উদ্যোগের প্রতি রইল প্রাণঢালা অভিনন্দন ।

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
লেখক বলেছেন: পকড় দিয়ে শুধুই পরিচিতি দিয়েছি। তবে বিস্তারিত পরিবেশনাও সম্ভব।

আমি পিয়ানো সঠিক ভাবে জানি না। শেখার সুযোগ ছিল না। আর এখন সুযোগ আছে কিন্তু মাথা আর কাজ করে না। 

বাদ্য যন্ত্র বিশারদ গণ সেতার -কে গীটারে নিয়ে এসেছেন। সেতারে ঝংকার সৃষ্টির জন্য 'তার' সংখ্যা বেশী। তাই গিটারে ঐরকম ঝঙকার আসে না । কিন্তু যতটুকু সম্মভব তা তুলে ধরে যায়।

আদনান সামীর পিয়ানোতে রাগ সংগীত সবিস্তারে এসেছে। লিংকে ওনার বাজানো রাগ বাগেশ্রীর পরিবেশনা। আদনান সামী ১৯৮৯, রাগ বাগেশ্রী

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৯০


ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ আপনার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তির পাশাপাশি সেতার ও গিটারের বাদনগত পার্থক্য এবং রাগসংগীতকে পিয়ানোতে উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন।  বিশেষ করে সেতারের অধিক তারের কারণে যে স্বাভাবিক ঝংকার তৈরি হয়, গিটারে তা হুবহু পুনর্নির্মাণ করা কঠিন ,এটি বাদ্যযন্ত্রের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে

সম্পর্কিত একটি যথার্থ পর্যবেক্ষণ। তবে একই সঙ্গে গিটারের নিজস্ব টিম্বার ও বাজানোর কৌশল ব্যবহার করে রাগের আবহ কতটা সফলভাবে প্রকাশ করা যায়, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

লিংকসহ আদনান সামীর পিয়ানোয় রাগ বাগেশ্রীর পরিবেশনার উল্লেখটি আলোচনাটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। কারণ, রাগসংগীত সাধারণত মীড়, গমক ও স্বরের সূক্ষ্ম অলংকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, পিয়ানোর মতো নির্দিষ্ট-স্বরের যন্ত্রে সেগুলো অন্যভাবে রূপ দিতে হয়। তাই এখানে সঠিক বা ভুল এর চেয়ে কোন বাদ্যযন্ত্রে রাগের স্বরভাষা কীভাবে নতুনভাবে প্রকাশ পাচ্ছে সেই দৃষ্টিতে শুনলে আলোচনাটি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।

ভাল লাগল বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত দাবি না করে নিজের সাধ্য ও সীমারেখার মধ্যে একটি সংগীত-অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার প্রবনতা দেখে ।

শুভেচ্ছা রইল

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আমার মন্তব্যঃ অনেক ধন্যবাদ আলী ভাই। আমার ইচ্ছা আছে ইমন দিয়ে প্রথমে কাজ করা। যেহেতু ইমন একটু বিস্তারিত শিখেছিলাম। এর ওপর ৮ টি স্টাইলের গীত, গজল, রাগ সঙ্গীতের, ধরণ জানি। আমি তা পিয়ানোতে তুলে ধরবো । হারমোনিয়ামে  কিছু করেছিলাম।  এবার পিয়ানোতে আনতে চাই। 



Monday, September 14, 2026

তাঁত - জান্নাতুল ফেরদৌস

নানু বলতেন, “ছেঁড়া শাড়ির সুতো কখনো দাঁত দিয়ে কাটতে নেই। আর রাইত-বিরেতে ভুল করেও তাঁত ঘরে উঁকি দিতে নেই।” কারন, নানুর মতে, “রাইতে মাকু (তাঁত বোনার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রবিশেষ) যখন একা হাঁটে, তখন জ্বিনেরা কাপড় বোনে। ওই কাপড় মানুষের গায় সয় না।” এহেন কথা শুনে আমরা ভাইবোনেরা বেশ হাসাহাসি করতাম, তবে নানু কখনোই রাগ করতেন না।

নানু মারা গেছেন প্রায় পনেরো বছর হলো। আমি এখন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। দেশের প্রথম সারির একটা ফাস্ট-ফ্যাশন ব্র্যান্ডের প্রোডাকশন হেড। সাভারে আমাদের বিশাল ফ্যাক্টরিতে দিনে লাখ লাখ মিটার কাপড় বোনা হয় অটোমেটিক পাওয়ার লুমে। কানের পর্দা ফাটানো শব্দের ভেতরে হাজার হাজার নিডল আর মাকু মেশিনের নির্দেশে ওঠানামা করে। সুতো আর সিনথেটিক ফাইবার দিয়ে আমরা সস্তায় ফ্যাশন বানাই। এটাই আমার পেশা, এবং আজ, এই লেখাটা লিখতে বসেছি এই কারণেই যে নানু হয়তো সেসময় ঠিকই বলতেন!

ঘটনার শুরু আমার মায়ের একটা পুরোনো বিয়ের শাড়ি থেকে। সত্যিকারের আড়াই প্যাঁচের ঢাকাই মসলিন, প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো, পারিবারিক উত্তরাধিকার। গত বছর আলমারি গোছাতে গিয়ে দেখি শাড়ির পাড়ের কাছটায় সুতো ফেঁসে গেছে, জায়গায় জায়গায় বুনন আলগা। ফ্যাক্টরির এক পুরোনো মাস্টারকে দেখালাম। সে শাড়িটা ছুঁয়েই হাত সরিয়ে নিলো। বলল, “স্যার, এই জিনিসে আমি হাত দিমু না। এইটা মেশিনের কাম না। আপনে সোনারগাঁয়ের পানাম নগরের পেছনের এক গলিতে যান। ‘মাকু ঘর’। রহমত কারিগররে খুঁইজা বাইর করেন। তয় একটা কথা,” মাস্টার একটু থামল, তারপর বললো, “কারিগর মিয়ার কথাবার্তা একটু অন্যরকম। সব কথায় সায় দিয়েন না, আবার সব কথা উড়াইয়াও দিয়েন না।”

পানাম নগরের পুরোনো ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে সেই গলিটা এত সরু যে রোদ ঠিকমতো ঢোকে না। শেওলা ধরা পুরোনো ইট সুরকির দেয়াল, তার ফাঁকে একটা কাঠের দরজা। ওপরে খোদাই করা সাইনবোর্ড: "মাকু ঘর"; প্রোপ্রাইটর: রহমত আলী। নিচে ছোট করে লেখা: "এখানে সুতোয় ভাগ্য বোনা হয়।" "ভাগ্য? কাপড় না বলে ভাগ্য?" মনে মনে হাসলাম। লোকটা কি দরজি নাকি পীর?

ভেতরে ঢুকে মনে হলো পুরোনো দিনের কোনো জাদুকরের ডেরায় ঢুকেছি। বাতাসে মাড় দেওয়া সুতোর গন্ধ, পুরোনো কাঠের গন্ধ আর কেমন একটা স্যাঁতস্যাঁতে আর্দ্রতা। ঘরের মাঝখানে মাটির গর্তে পা রেখে বিশাল এক কাঠের তাঁত। আর তার সামনে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। মাথায় কিস্তি টুপি, গায়ে একটা আধময়লা ফতুয়া। চোখে ছানি পড়া ঘোলাটে দৃষ্টি। কিন্তু হাত দুটো চলছে জাদুর মতো।

আমার পায়ের শব্দে উনি হাত থামালেন। “কেডা?” আমি পরিচয় দিলাম। শাড়ির প্যাকেটটা এগিয়ে দিলাম। উনি প্যাকেট না খুলেই শাড়িটার ওপর হাত রাখলেন। চোখ বন্ধ করে কাপড়ের বুননের ওপর আঙুল বোলালেন, ঠিক যেভাবে অন্ধ মানুষ ব্রেইল পড়ে।

“আহারে,” উনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “এই শাড়ি যে বুনছিল, তার মনে বড় কষ্ট আছিল বাজান।” আমি চমকে উঠলাম। “কষ্ট মানে? এটা তো বিয়ের শাড়ি।” “বিয়ের শাড়ি হইলেই কি মন ভালো থাকে? বুনন দেখো নাই? সুতার টান বড় বেশি। প্রতিটা টানে একটা কইরা দীর্ঘশ্বাস আছিল। এইটা পরলে তো শইল্যে বিষন্নতা আসবো।”

“শাড়ি ঠিক করা যাবে?” আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলাম। “যাবে।” উনি ঘোলাটে চোখে আমার দিকে তাকালেন। “তয় আমি তোমাগো পাওয়ার লুমের মতো জোড়াতালি দিই না। আমি সুতোয় সুতোয় গিঁট দিই না, আমি আত্মায় আত্মায় গিঁট দিই। রাইখা যাও।”

আমি একটু তাচ্ছিল্যের হেসেই বললাম, “কারিগর সাব, আমি নিজেই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। কাপড়ে আত্মা বলে কিছু নেই। লুমের টানা আর পোড়েনের (Warp and Weft) ম্যাথমেটিক্যাল ক্যালকুলেশন আছে। আমাদের ফ্যাক্টরিতে দিনে লাখ মিটার কাপড় বেরোয় একদম জিরো ডিফেক্টে। আর আপনারা হাতে বোনেন বলে সুতোর টেনশন ঠিক থাকে না, কাপড়ে খুঁত থাকে।”

“জানি।” উনি শান্ত গলায় বললেন। “তোমাগো মেশিনে নিখুঁত কাপড় বাইর হয়। তয় মেশিনের কাপড়ে তো জান নাই বাজান। সুতো জিনিসটারে তুমি কি মনে করো? খালি তুলা আর পলিয়েস্টার? সুতো হইলো কাঁপন, সুতো হইলো মেমোরি।”

“মেমোরি?” “হ। তুলা গাছটা যখন মাঠে আছিল, সে রোদ খাইছে, বৃষ্টি খাইছে, মাটির রস খাইছে। তার ভিতরে প্রকৃতির একটা কাঁপন আছে। যখন একজন তাঁতি হাতে মাকু চালায়, তার হাতের ঘাম, তার নিঃশ্বাসের তাল, তার বুকের ধুকপুকানি - সব ওই সুতার ভিতরে গুইঁথা যায়। তুমি যখন হাতে বোনা কাপড় পরো, তুমি আসলে প্রকৃতির কাঁপন আর একজন মানুষের আয়ু পরো। আর মেশিনের কাপড়ে কি পরো? বিদ্যুৎ আর লোহার ঘষানির শব্দ। তোমাগো ফাস্ট ফ্যাশনের কাপড় পইড়া মাইনষের এত চর্মরোগ ক্যান, মাইনষের মেজাজ এত খিটখিটে ক্যান, ভাইবা দেখছো কোনোদিন?”

আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম। উনি শাড়িটা পাশে রাখলেন। “দুনিয়াটা হইলো একটা বিশাল মাকু ঘর। উপরওয়ালা সারাক্ষণ বুনতাছেন। দিন আর রাইত, আলো আর আঁধার এই দুইটা হইলো উনার টানা আর পোড়েন। আমরা সবাই এক একটা সুতো। তুমি কি জানো, প্রতিটা মানুষের একটা নিজস্ব বুননের প্যাটার্ন আছে?”

আমি কিছু বলার আগে ভেতর থেকে এক তরুণী বেরিয়ে এল। হাতে চায়ের কাপ। পরনে একটা সাধারণ সুতির শাড়ি, কিন্তু কি অপূর্ব তার বুনন! মেয়েটার চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত, যেন অনেক পুরোনো কোনো দীঘির জল। “বসেন। দাদাজান ওষুধ খাবেন এখন।” মেয়েটা চা এগিয়ে দিল।

মেয়েটার নাম নূরী। রহমত কারিগরের নাতনি আর এই মাকু ঘরের একমাত্র উত্তরাধিকারী। চা খাওয়ার ফাঁকে নূরী হঠাৎ বলল, “আপনি ফ্যাক্টরিতে যে কাপড় বানান, সেই কাপড় কারা বোনে জানেন?” “মেশিন বোনে। আর ওয়ার্কাররা অপারেট করে।” “না।” নূরীর গলাটা ভারী শোনাল। “অভাবী, ক্লান্ত, ঘুমহীন কিছু মানুষ বোনে। মাসের পর মাস ওভারটাইম করা, মাস শেষে বেতন না পাওয়া কিছু রাগী মানুষ যখন মেশিনের সামনে দাঁড়ায়, তাদের ওই রাগ, ওই ক্লান্তি, ওই অভিশাপ মেশিনের সুতোয় ঢোকে। আপনারা শোরুমে সুন্দর আলো ফেলে সেই কাপড় বেচেন। মানুষ সেই রাগ আর ক্লান্তি গায়ে জড়িয়ে ঘোরে। আর দিন শেষে ভাবে, জীবনটা এত অস্থির লাগে ক্যান!”

আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। একটা মেয়ে, যে কোনোদিন হয়তো ঢাকার বড় শপিং মলে যায়ওনি, সে আমার পুরো ক্যারিয়ারটাকে এক কথায় ধুলোয় মিশিয়ে দিল। যাওয়ার সময় নূরী নিচু গলায় বলল, “একটা কথা। দাদাজানের সব কথা বিশ্বাস করবেন না। তবে, অবিশ্বাসও করবেন না।”

এরপর থেকে আমি প্রায়ই যেতাম। কাজ থাকুক বা না থাকুক। কারিগর কাজ করতেন আর কথা বলতেন। নূরী পাশে বসে চরকায় সুতো কাটত। এক সন্ধ্যায় আমি কারিগরকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি বলেছিলেন সব মানুষের একটা প্যাটার্ন থাকে। মানে কি?” উনি মাকু থামালেন। “দুনিয়ার সব সুতো তো আর এক লগে জোড়া লাগে না। কিছু সুতো আছে, যাদের একসাথে বোনা হওয়ার কথা। যখন সেই দুই সুতো এক কাপড়ে আসে, তখন নকশা পূর্ণ হয়। আর যখন ভুল সুতো একলগে মেশে, তখন কাপড়ে জট পাকায়। মানুষের সম্পর্কগুলাও ঠিক অমন।”

কারিগর একটা পুরোনো কাঠের বাক্স বের করলেন। ভেতরে অদ্ভুত একটা সাদা সুতোর লাটিম। সুতোটা চকচক করছে, যেন রেশম, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কিছু। “আমার দাদাজান এই সুতা বানাইছিলেন। চাঁদের আলো আর পদ্মপাতার শিশির দিয়া। কইতেন, এই সুতায় বোনা কাপড় গায়ে দিলে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। আমি জীবনে ওই সুতায় হাত দিই নাই। কারণ, সব সুতো মানুষের লাইগা না।” “মানে?” “মানে, কিছু বুনন আছে যা রাইতে শুরু হয়। জ্বিনেরা বোনে। যেই কাপড় পরলে মানুষ আর দুনিয়ায় থাকতে চায় না। তারে ডাইকা নিয়া যায়।”

কথাটা শুনে আমার নানুর কথা মনে পড়ে গেল।

ঘটনার ক্লাইম্যাক্স মাস দুয়েক পরের এক বৃহস্পতিবার রাতে। সোনারগাঁওয়ে কাজ শেষ করতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। মাকু ঘরে শাড়িটা আনতে গেলাম। রাত তখন প্রায় বারোটা। গলিটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। শুধু নিস্তব্ধ না, মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবীর শব্দ কেউ মিউট করে দিয়েছে। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর থেকে ভেসে আসছিল একটা ছান্দিক শব্দ। খট... খট... খট... খট।

তাঁত চলছে। খুব দ্রুত। এত দ্রুত কোনো মানুষের হাত চলতে পারে না। আমি সন্তর্পণে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলাম। ঘরের ভেতরে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। আর সেই আলোয় দেখলাম, কাঠের বিশাল তাঁতটা একা একা চলছে। মাকুটা এপাশ থেকে ওপাশ ছুটে যাচ্ছে বাতাসের বেগে। কিন্তু কারিগরের আসনে কেউ বসে নেই। না, কেউ বসে নেই বলাটা ভুল হবে। একটা ছায়ার মতো কিছু বসে আছে। যার কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই, শুধু হাতের মুভমেন্ট বোঝা যাচ্ছে। আর ঘরের চারপাশের সমস্ত মাকড়সা, টিকটিকি এমনকি ইঁদুরগুলো গোল হয়ে বসে সেই বুনন দেখছে। একটা অদ্ভুত গুনগুন শব্দ ভেসে আসছিল। কোনো গান না, শুধু একটা রিদম। যা শুনলে মনে হয়, এই রিদমটাই আমার হার্টবিট হওয়া উচিত। আমার মনে হচ্ছিল দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে যাই, ওই কাপড়ের একটা অংশ হয়ে যাই।

হঠাৎ আমার কাঁধে একটা হাত পড়ল। নূরী। “পিছে ঘোরেন। তাকাইয়েন না।” নূরীর গলা কাঁপছিল। আমি ঘোরের মধ্যে ওর সাথে বেরিয়ে এলাম।

পরদিন কারিগর মারা যান। সকালে উনাকে তাঁতের ওপরেই শোয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। উনার সামনে রাখা ছিল আমার মায়ের সেই শাড়িটা। নিখুঁতভাবে সারানো। আর শাড়ির আঁচলে নতুন করে বোনা একটা ছোট্ট নকশা - একটা মাকু আর একটা পদ্মফুল।

কারিগর আমাকে একটা চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিলেন নূরীর কাছে। “বাজান, মেশিনের শব্দে নিজের গলার আওয়াজ ভুইলো না। সুতো যখন ডাক দেয়, তখন যাইতে হয়। রাইত বারোটার পরে দুনিয়া যখন চুপ হয়, তখন আসল বুনন শুরু হয়। আমি আমার বুনন শেষ কইরা গেলাম। তোমার মায়ের শাড়িতে আমি নতুন একটা সুতো জুইড়া দিছি। ওই সুতো আর নূরীর জীবনের সুতো একলগে বান্ধা। প্যাটার্নটা মিলাইয়া নিও।”

এই গল্পের বাকি অংশে একটা বিয়ে আছে। নূরীর সাথে আমার। আমি এখন আর ফাস্ট ফ্যাশনে কাজ করি না। চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। আমি আর নূরী মিলে নিজস্ব একটা হ্যান্ডলুম ব্র্যান্ড দাঁড় করিয়েছি। আমরা দিনে মাত্র কয়েকটা কাপড় বুনি। কিন্তু প্রতিটা কাপড়ে আমরা সময় দিই, যত্ন দিই।

গত মাসে আমাদের একটা ছেলে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে আনার পর, নূরী তাকে একটা সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দিল। আমি চমকে উঠলাম। এটা সেই সুতো - চাঁদের আলো আর শিশির দিয়ে বোনা সেই জাদুকরী সুতো, যেটা কারিগর সেই রাতে বুনেছিলেন। বাচ্চাটা কাঁদছিল খুব। কিন্তু ওই কাপড়ে জড়ানোর সাথে সাথে সে একদম শান্ত হয়ে গেল। সে এমনভাবে চারদিকে তাকাচ্ছিল, যেন সে সব বুঝতে পারছে। যেন সে তার নিজের প্যাটার্ন চিনে গেছে।

আমি এখন আর রাইতে ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন চার্ট দেখি না। আমি এখন কাপড় বাছি। মানুষ যেমন খাবার বাছে। আপনি গায়ে কি জড়াচ্ছেন তার হিসাব কবে করেছেন শেষবার? যেই কাপড় পরলে ভেতরটা অস্থির লাগে, ঘাম হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়, সেটা স্টাইল হতে পারে, কিন্তু আরাম না। আর যেই কাপড় পরলে ভেতরটা শান্ত হয়, মায়ের হাতের ছোঁয়ার মতো লাগে সেটার দাম লাখ টাকার ব্র্যান্ডের চেয়েও বেশি। প্রকৃতি সারাক্ষণ আমাদের বুনছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কার সুতোয় নিজেদের জড়াচ্ছি।

তবে নানুর নিয়মটা আমি এখনো মানি। রাত বারোটার পর আমাদের ঘরে কেউ সুতো কাটে না। সমস্যা একটাই। মাঝে মাঝে, খুব গভীর রাতে, যখন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে যায়, আমাদের স্টোররুম থেকে একটা শব্দ ভেসে আসে। খট... খট... খট... খট। মাকু একা একা হাঁটে। তবে আমি আর ভয় পাই না। কারণ ততদিনে আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি। কিছু বুনন শেষ হওয়ার নয়।

৬ সেপ্টেমবর, ২০২৬ 

উদয় রহমানের “সুর” থেকে অনুপ্রাণিত!

[N.B. বুনন ~ Matrix]

মহাজগত বিষয়ে আমার গবেষণায় এআই সহায়তা - ফরিদ আহমেদ চৌধুরী

: কোন কিছু না থাকা শূন্য অসীম ছিল।  কারণ তাতে তাকে সীমা দেওয়ার মত কিছুই ছিল না।  সেই শূন্যে কোন কিছু হতে কোন বাধা ছিল না। কে বাধা দিবে কেউ ত...