Sunday, October 4, 2026

পোর্টাল – ২ গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল


 ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:০০

ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ পোর্টাল – ২ : গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ গল্পটি মূলত এক শীতসন্ধ্যার সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও এর অন্তর্লীন ব্যঞ্জনা বহুদূর বিস্তৃত। মন্ট্রিয়লের ঠান্ডা, ক্রমশ জনশূন্য হয়ে আসা রাস্তা, লাইব্রেরির আলো পেরিয়ে রাতের ম্লান নিয়ন-আলোয় প্রবেশ সমস্ত দৃশ্যপট যেন ধীরে ধীরে বাস্তব জগতের সীমানা সরিয়ে পাঠককে এক অন্তর্জাগতিক অঞ্চলের দিকে নিয়ে যায়।

রুমার একা বাড়ি ফেরার পথটি এখানে শুধু একটি রাস্তা নয়; এটি যেন মানুষের অস্তিত্বের প্রতীকী পথ যেখানে আমরা প্রত্যেকে শেষ পর্যন্ত একা হাঁটি, অথচ অদৃশ্য কোনো সহচর আমাদের সঙ্গে থাকে। সেই অদৃশ্য উপস্থিতিই গল্পে ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’-এর রূপ নেয়। বিশেষ করে অপরিচিত ফরাসি মহিলার রহস্যময় হাসিটি গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত। তিনি কোনো নাটকীয় অলৌকিকতা প্রদর্শন করেন না; বরং একটি হাসি, একটি দৃষ্টি, একটি অনুচ্চারিত বার্তার মধ্য দিয়ে রুমার অন্তর্জগতে প্রবেশ করেন। ফলে তাঁর উপস্থিতি একই সঙ্গে বাস্তব, স্বপ্নময় এবং অতীন্দ্রিয় হয়ে ওঠে।

গল্পটির সৌন্দর্য এখানেই যে, ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’কে লেখক হিসাবে আপনি প্রচলিত দেবদূতের অবয়বে হাজির করেননি। তিনি এসেছেন একজন সাধারণ মধ্যবয়সী পথচারীর বেশে হেঁটে এসেছেন, হেসেছেন, হয়তো একটি সতর্কতাও জানিয়েছেন, তারপর মিলিয়ে গেছেন। এই সাধারণের আবরণেই অসাধারণের আবির্ভাব গল্পটিকে একটি চমৎকার মায়াময়তা দিয়েছে। পাঠক হিসাবে আমাদের মনেও তখন প্রশ্ন জাগে তিনি কি সত্যিই একজন অপরিচিত নারী, নাকি রুমার জন্য নির্দিষ্ট কোনো অদৃশ্য শক্তির সাময়িক মানব-প্রতিভূ?

‘পোর্টাল’ ধারণাটিও এখানে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। পোর্টাল যেন কেবল কোনো অতিলৌকিক দরজা নয়; বরং দৃশ্যমান বাস্তবতা ও অদৃশ্য বাস্তবতার মধ্যবর্তী এক ক্ষণিক ফাটল। সেই ফাটল দিয়েই কখনো হায়ার-সেলফ, কখনো গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল, কখনো বা আমাদের গভীরতম অন্তর্দৃষ্টি মানুষের সামনে এসে দাঁড়ায়। সবচেয়ে মুগ্ধকর বিষয় হলো ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার মুহূর্তে মানুষ নিজেই তা পুরোপুরি বুঝতে পারে না। পরে ফিরে তাকালে ঘটনাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অর্থ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।

আরও একটি সুন্দর দিক হলো, গল্পটি আসলে ‘একা থাকা’ এবং ‘একা না থাকা’র মাঝখানের সূক্ষ্ম ব্যবধানটিকে স্পর্শ করেছে। নির্জন শীতের রাস্তায় রুমা শারীরিকভাবে একা; কিন্তু গল্পের দর্শনে সে কখনোই নিঃসঙ্গ নয়। মানুষের চোখে যা নিঃসঙ্গতা, মহাবিশ্বের বৃহত্তর বোধে হয়তো সেটিই অদৃশ্য সঙ্গের মুহূর্ত। এই উপলব্ধিই গল্পটির আবেগগত কেন্দ্র।

শেষ পর্যন্ত ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’কে সত্যিই অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা হবে, নাকি একে রুমার অন্তর্দৃষ্টি, অবচেতন মন কিংবা আকস্মিক মানবিক সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে পড়া হবে লেখক হিসাবে আপনি তার সিদ্ধান্ত আমাদের মত সাধারণ পাঠকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। আর সেখানেই গল্পটির সার্থকতা। কারণ কিছু কিছু অভিজ্ঞতার সত্যতা প্রমাণ করা যায় না; শুধু অনুভব করা যায়।

শীতের রাত, পাতলা নীল-ফুলের জামা, গলায় স্কার্ফ না থাকার সামান্য অসতর্কতা, এক অপরিচিত নারীর অকারণ হাসি এই ছোট ছোট বাস্তব উপাদানগুলোর মধ্য দিয়েই গল্পটি শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় আমাদের। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা সত্যিই কি একা? নাকি অদৃশ্য কোনো স্নেহময় উপস্থিতি নীরবে আমাদের পাশে হেঁটে চলে শুধু প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজেকে চিনিয়ে দেয়?

পোর্টাল – ২ গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ সেই অদৃশ্য সঙ্গের প্রতি এক মায়াময়, অন্তর্মুখী এবং আধ্যাত্মিক অভিবাদন।


শুভেচ্ছা রইল

1 comment:

  1. আলী ভাই, আপনি যখন বললেন,'গল্পটি আসলে ‘একা থাকা’ এবং ‘একা না থাকা’র মাঝখানের সূক্ষ্ম ব্যবধানটিকে স্পর্শ করেছে।' কথাটি শুনে মনে পড়লো বিদেশে 'একা থাকা' কি কঠিন ব্যাপার। আমাদের মতন যারা ওখানে ছিল, তারা যেন একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়েই একে অপরের কষ্ট বুঝে যেতাম।

    মন্ট্রিয়লে এরকম অস্তিত্বের সাথে মুখোমুখি বেশী রকমেই ঘটেছে, যা টরোন্টতে তেমন একটা দেখিনি। আসলে একেক শহরে এক এক রকম 'এনার্জি ভরটেক্স' ক্রিয়াশীল থাকে। সব 'স্থান' একরকম না - যেমন সব 'সময়' একরকম না।
    তবে ইচ্ছে আছে সব ঘটনা লিখে রাখতে চাই যতক্ষণে, না ভুলে যাই।

    ReplyDelete

মহাজগত বিষয়ে আমার গবেষণায় এআই সহায়তা - ফরিদ আহমেদ চৌধুরী

: কোন কিছু না থাকা শূন্য অসীম ছিল।  কারণ তাতে তাকে সীমা দেওয়ার মত কিছুই ছিল না।  সেই শূন্যে কোন কিছু হতে কোন বাধা ছিল না। কে বাধা দিবে কেউ ত...