I.পড়ার সাধারণ অর্থঃ
সাধারণভাবে, পড়া বা Reading হলো লিখিত বর্ণ বা চিহ্ন দেখে তার অর্থ উদ্ধার করার উপায়। পড়া কেবল শব্দ উচ্চারণ নয়, বরং লেখার বিষয়বস্তুর সাথে নিজের চিন্তার যোগ ঘটানো। গফ এবং টানমার (The Simple View of Reading, ১৯৮৬)-এর মতে, পড়া মূলত দুটি জিনিসের ওপর নির্ভর করেঃ
• ডিকোডিং (Decoding): অক্ষর এবং শব্দ চেনা ।
• ভাষার বোধগম্যতা (Language Comprehension) : সেই শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে পারা।
অর্থাৎ, যদি কেউ শব্দ পড়তে পারে কিন্তু অর্থ না বোঝে, তবে তা প্রকৃত 'পড়া' নয় ।
পড়ার পাঁচটি স্তম্ভ (National Reading Panel, ২০০০)
গবেষকদের মতে, সফলভাবে পড়ার জন্য ৫টি দক্ষতা প্রয়োজনঃ
- ধ্বনি চেনা (Phonemic Awareness) : কথার ভেতরের ছোট ছোট শব্দ বা ধ্বনি আলাদা করতে পারা।
- ধ্বনি ও বর্ণের মিল (Phonics ) : কোন বর্ণের উচ্চারণ কেমন হবে তা জানা।
- সাবলীলতা (Fluency) : নির্ভুলভাবে এবং দ্রুততার সাথে পড়া।
- শব্দভাণ্ডার (Vocabulary): শব্দের অর্থ জানা।
- বোধগম্যতা (Comprehension): যা পড়া হচ্ছে তার মূল ভাব বুঝতে পারা।
পড়াকে অনেকে অনেকভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে
ন। যেমন, "পড়া মানে হলো ডানা মেলে ওড়া। আমরা যখন কোনো বই পড়ি, তখন আমরা অন্য কোনো মানুষ হয়ে যেতে পারি, অথবা অন্য কারো চোখ দিয়ে পুরো পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে পারি।" [১]
II. পড়ার সার্বজনীন অর্থ (Universal meaning of reading)
পড়া শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের চারপাশে থাকা অনেক কিছু আমরা ‘পড়তে পারি। যেমন, বইয়ের লেখা, প্রকৃতির বিভিন্ন দৃশ্য, মানুষের আচরণ কিংবা কোনো ছবি। কোনো কিছু পড়ার মাধ্যমে আমরা তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সত্য বুঝতে পারি।
সার্বজনীন পড়ার সহজ ধারণাঃ
সাধারণভাবে বলতে গেলে, কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে সেটা নিয়ে চিন্তা করা এবং তার অর্থ বের করাই হলো পড়া। এটি তিনটি সহজ ধাপে ঘটে :
দেখা ও চেনা: প্রথমে কোনো চিহ্ন (যেমন: একটি শব্দ, আকাশের মেঘ বা কারো হাসি) চোখে দেখে চেনা।
পূর্ব-জ্ঞানের সাথে মিলিয়ে নেয়া: সেই চিহ্নটি দেখে মনে মনে কোনো পরিচিত বিষয়ের সাথে মিলিয়ে দেখা।
বুঝতে পারা: সবকিছু মিলিয়ে সেই জিনিসটির আসল মানে বা অর্থ খুঁজে বের করা।
ধরা যাক, বাইরে বের হব, কিন্তু জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি আকাশে কালো মেঘ। এখানে পড়া হচ্ছে:
১. দেখা ও চেনা (Perception) : জানালার বাইরে আকাশের বড় কালো মেঘ। এটি হলো পড়ার প্রথম ধাপ: চিহ্নটিকে চেনা।
২. মিলিয়ে দেখা (Translation): মনে পড়ল যে, আগে যখনই এমন কালো মেঘ দেখেছি, তখনই বৃষ্টি হয়েছে। মেঘের সাথে বৃষ্টির ধারণাটি মনে মনে মিলিয়ে নেয়া হলো পড়ার দ্বিতীয় ধাপ।
৩. বুঝতে পারা (Interpretation): "এখন বাইরে গেলে ভিজে যাওয়ার ভয় আছে, তাই ছাতা নিতে হবে অথবা এখন যাওয়া যাবে না।" এই যে মেঘ দেখে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া, এটা হলো পড়ার তৃতীয় ধাপ।
একইভাবে, কারও হাসি মুখ দেখে 'পড়তে' পারা যে সে খুশি। ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি দেখে 'পড়তে পারো যে এখন থামা উচিত। এভাবে, আমরা বইয়ের বাইরের জগতকে প্রতিনিয়ত পড়ি!
সার্বজনীন পড়ার সংজ্ঞা
সার্বজনীন 'পড়া' ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকে অনেক সুন্দর সংজ্ঞা দিয়েছেন। সেসব সংজ্ঞার একটা এরকম: “পড়া মানে শুধু বইয়ের অক্ষর দেখে শব্দ উচ্চারণ করা নয়। পড়া হলো আমাদের চারপাশের জগতকে চেনার একটা উপায়। আমরা যখন কোনো কিছু পড়ি, তখন আসলে আমরা আমাদের চারপাশটা কেমন, তা বুঝতে পারি। সহজ কথায়, পড়া মানে হলো চারপাশের সবকিছু বুঝে নিয়ে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা।" [২]
III. 'বিশ্ব পাঠ' বা পৃথিবীকে ‘পড়া' (Reading the World)
সাধারণ অর্থে, 'বিশ্ব পাঠ' বলতে কেবল মুদ্রিত অক্ষর পড়া বোঝায় না; বরং আমাদের চারপাশের বিভিন্ন 'সংকেত' (Signs), প্রকৃতি ও তার নিয়ম-কানুন এবং মানুষ ও তার জীবনব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা। এটি এমন একটি দক্ষতা, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কোনো বিশেষ পরিস্থিতি, মহাজাগতিক নিয়মাবলী, সামাজিক কাঠামো বা পারস্পরিক কথোপকথনের গভীর অর্থ উদ্ধার করতে পারেন। অর্থাৎ, আমাদের চরপাশের আকাশ, রাস্তাঘাট, মানুষের কথা বলা এ সবকিছু আমরা ‘পড়তে পারি।
আমরা ৪টি সহজ ধাপে এটি করতে পারিঃ
• চারপাশের ধরন চেনা (Identifying Patterns): আমরা যখন খেয়াল করি কেন আমাদের শহরের রাস্তাগুলো এভাবে তৈরি করা হয়েছে, কিংবা দোকানে কেন খেলনাগুলো এক জায়গায় সাজানো থাকে—তখন আমরা পৃথিবীকে পড়তে শিখি। এমনকি একটা বিজ্ঞাপন দেখে আমাদের কেন সেটা কিনতে ইচ্ছে করছে, সেই কারণটা বুঝতে পারাও এক ধরণের পড়া।
• পেছনের গল্প বোঝা (Contextual Awareness): আমরা বুঝি যে কোনো ঘটনাই এমনি এমনি ঘটে না। তার পেছনে থাকে মহাজাগতিক নিয়ম-কানুন, পুরনো কোনো ইতিহাস বা আমাদের সমাজের নানা নিয়ম । যেমন, কেন আমরা বিশে দিনে বিশেষ পোশাক পরি, তার পেছনের কারণটা বুঝতে পারা।
প্রশ্ন করতে শেখা (Critical Thinking) : আমরা কোনো কিছু দেখে সরাসরি বিশ্বাস করি না। আমরা মনে মনে প্রশ্ন করি, ‘এটা এমন কেন?” বা ‘এতে কার লাভ?” ইত্যাদি।
• সামাজিক প্রেক্ষাপট (Social Literacy): এমন অনেক নিয়ম আছে যা কোনো বইয়ে লেখা থাকে না, কিন্তু আমরা বড়দের বা বন্ধুদের দেখে শিখে নিই। যেমন, কার সাথে কীভাবে সুন্দর করে কথা বলতে হয় বা অন্য কারো মন খারাপ থাকলে সেটা তার মুখ দেখেই বুঝে ফেলা।
• প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপট (Natural Literacy): এটি হলো প্রকৃতির নিয়ম ও সংকেতগুলোকে বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা। যেমন আমরা অনেক কিছু বই পড়ে নয়, বরং চারপাশ দেখে শিখি। আকাশে কালো মেঘ জমলে বুঝি বৃষ্টি আসতে পারে, গরমে গাছের পাতা শুকিয়ে গেলে বুঝি পানি কম আছে, কিংবা ভোরে পাখির ডাক শুনে বুঝি সকাল হয়ে গেছে। এগুলো হলো প্রকৃতির দেওয়া সংকেত, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে। এটি আমাদের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলতে এবং জীবনের নানা পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। সহজ কথায় বলতে গেলে, আমাদের চারপাশের আকাশ, নদী, পাহাড়, স্কুল, খেলার মাঠ, এমনকি টিভি বা ইন্টারনেটের ভিডিওগুলোও একেকটা ‘বইয়ের মতো। আমরা শুধু তাকিয়ে থাকি না, বরং মন দিয়ে খেয়াল করে বোঝার চেষ্টা করি আসলে সেখানে কী ঘটছে।
IV. বিশ্ব পাঠের কতিপয় ধারণা ( Some dimensions of reading the world)
‘পৃথিবীকে পড়া’ বা বিশ্ব পাঠের ধারণাটি প্রথম পাওয়া যায় পাওলো ফ্রেইরের (১৯৭০) বইয়ে। তার মতে, সাক্ষরতা শুধু শব্দ চিনে নেয়া নয়; বরং এটি সামাজিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা। ফ্রেইরে বলেন যে শিক্ষা এমন হতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু ““শব্দ” নয়, বরং “পৃথিবী”ও পড়তে পারে। এর মাধ্যমে সাক্ষরতা হয়ে ওঠে মানব মনন ও চেতনা বিকাশের উপায়।
ফ্রেইরে মূলত আমাদের সমাজ এবং অধিকার নিয়ে সচেতন হওয়ার কথা বলেছেন। তবে ‘বিশ্ব পাঠা বা পৃথিবীকে পড়ার এই ধারণাটি আরও বড়। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রাকৃতিক জগতকে জানতে পারি এবং বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করতে পারি। প্রকৃতিকে যদি আমরা একটি ‘বই’ হিসেবে দেখি, তবে এর চারপাশের পরিবেশ এবং নানা ঘটনাগুলো হবে একেকটি ‘গল্প' বা ‘পাঠ’। পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা যখন এই চিহ্নগুলো বুঝতে শিখি, তখন মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আরও গভীর হয়।
বিশ্ব পাঠ সম্পর্কিত কিছু ধারণা নিচে আলোচনা করা হলো।
a) শব্দ চেনার বাইরে: সমালোচনামূলক সাক্ষরতা
প্রচলিত সাক্ষরতা মডেল যেমন Simple View of Reading ( Gough & Tunmer, 1986 ) মূলত শব্দ চেনা ও ভাষাগত বোঝার ওপর জোর দেয়। কিন্তু Paige, Rupley, এবং Ziglari (2024) বলেন, বোঝার প্রক্রিয়ায় সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা যুক্ত করতে হবে, যাতে কেবল উপরিভাগের অর্থে সীমাবদ্ধ না থাকে। পৃথিবীকে পড়া মানে হলো লেখা নিয়ে প্রশ্ন করা, লুকানো ধারণা বের করা এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়ন করা। যেমন, অভিবাসন নিয়ে গণমাধ্যমের বর্ণনা বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু শব্দ বোঝা যথেষ্ট নয়; বরং দেখতে হবে কার কণ্ঠ জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে আর কার কণ্ঠস্বর চেপে রাখা হয়েছে।
b) ন্যায় ও অংশগ্রহণ
Guerreiro, Barker, এবং Johnson (2022) আমাদের মনে করিয়ে দেন যে সাক্ষরতা মূল্যায়নে ন্যায় ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিতে হবে। পৃথিবীকে পড়া মানে হলো বোঝা যে সামাজিক বৈষম্য কীভাবে জ্ঞান অর্জন ও উপস্থাপনায় প্রভাব ফেলে। একজন সমালোচনামূলক পাঠক শুধু তথ্য গ্রহণ করেন না; বরং তিনি তা বৃহত্তর ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেন এবং প্রশ্ন করেন—লেখা কীভাবে প্রভাবশালী মতাদর্শকে শক্তিশালী করে বা চ্যালেঞ্জ জানায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি Gay (2018) - এর culturally responsive pedagogy-এর সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিচয় অর্থ তৈরির কেন্দ্রে থাকতে হবে।
c) প্রকৃতিকে পড়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া
প্রকৃতিকে পড়া মানে প্রকৃতির সংকেতগুলো বোঝা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। যেমন, হিমবাহ গলে যাওয়া আমাদের সঙ্কেত দেয় যে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে এবং এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদী ও মহাসাগরে বর্জ্যের স্রোত দেখে আমরা বুঝি, মানবসৃষ্ট দূষণ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ঝুঁকির মুখে। এই ঘটনাগুলোকে প্রকৃতির দেয়া সতর্কবার্তা বা সংকেত। এই সংকেতগুলো বুঝে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াটা হলো বিশ্ব পাঠ।
d) সমালোচনামূলক পড়ার কৌশল
Sun এবং তাঁর সহকর্মীরা (2021 ) দেখিয়েছেন যে পড়ার কৌশলগুলো বোঝার ক্ষমতা বাড়ায়। পৃথিবীকে পড়তে হলে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা, সংযোগ তৈরি করা এবং বিভিন্ন তথ্য একত্রিত করার মতো কৌশল ব্যবহার করতে হবে। এসব কৌশল পড়াকে সক্রিয় প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করে, যেখানে পাঠক বিভিন্ন লেখা ও প্রেক্ষাপট থেকে অর্থ নির্মাণ করে। যেমন, কোন বিষয়ে সরকারি নথি আর স্থানীয় সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা তুলনা করলে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে কথার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক কোথায়।
e) পড়া মানেই কাজ (Praxis)
ফ্রেইরে (1970) বলেন যে পৃথিবীকে পড়া কাজ থেকে আলাদা নয়। সমালোচনামূলক সাক্ষরতা কোনো বিমূর্ত অনুশীলন নয়; বরং এটি হলো praxis। অর্থাৎ, পৃথিবী নিয়ে চিন্তা করা এবং তার পরিবর্তনের জন্য কাজ করা। যখন শিক্ষার্থীরা কোন লেখা সমালোচনামূলকভাবে ব্যাখ্যা করে, তখন তারা সেটিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এবং বিকল্প কল্পনা করতে সক্ষম হয়। পৃথিবীকে পড়া তাই হয়ে ওঠে একটি যৌথ প্রয়াস, যা পারস্পরিক আলোচনা বা সংলাপ ও সামাজিক পরিবর্তনকে উৎসাহিত করে।
এই আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, বিশ্ব পাঠ মানে সাক্ষরতাকে কেবল শব্দ ও বাক্য পড়ে বোঝার দক্ষতা হিসেবে না দেখে, সমালোচনামূলক সচেতনতার পথে নিয়ে যাওয়া। এতে একজন পাঠকের প্রাকৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ, কৌশল প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। ফ্রেইরে যেমন বলেন, শিক্ষা এমন হতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা পৃথিবীকে পড়তে পারে। তারা যেন নিছক তথ্যের নিস্ক্রিয় ভোক্তা না হয়ে পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠে।
:::::::::::::::::::::::::::::::::::
শিক্ষার ‘ব্যাঙ্কিং মডেল’ বা মুখস্থবিদ্যার সংস্কৃতি - আবু সিদ
https://www.somewhereinblog.net/blog/Abu_Sid/30390250
২৮ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪০
লেখাটি মূলত শিক্ষার প্রচলিত ধারনা এবং শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে আলোচনা। পাওলো ফ্রেইরে (Paulo Freire) ১৯৭০ সালে তাঁর বিখ্যাত বই Pedagogy of the Oppressed-এ শিক্ষাদানের প্রচলিত পদ্ধতিকে 'ব্যাঙ্কিং মডেল (Banking model)' বা 'শিক্ষা-জমা পদ্ধতি' হিসেবে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে আমরা এই মডেলটির এক বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাই।
১. শিক্ষক যখন 'দাতা' আর শিক্ষার্থী 'খালি পাত্র'
আমাদের দেশে সাধারণত ক্লাসরুমে শিক্ষককে মনে করা হয় জ্ঞানের একমাত্র উৎস বা 'সবজান্তা'। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের মনে করা হয় একটি 'খালি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট'। শিক্ষক ক্লাসে এসে তথ্য বা নোট দেন (যা ফ্রেইরের ভাষায় 'ডিপোজিট' বা জমা), আর শিক্ষার্থীরা তা মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লেখে। এখানে শিক্ষার্থীর নিজস্ব কোনো চিন্তার জায়গা থাকে না।
২. সৃজনশীলতা ও প্রশ্ন করার অভাব
শিক্ষার্থীরা যখন শুধু সাজানো নোট মুখস্থ করে, তখন তাদের critical thinking বা উপলব্ধি ও বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা লোপ পায়। তারা প্রশ্ন করতে শেখে না যে, ‘এটি কেন এমন?’ বা ‘এটি কি বদলানো সম্ভব?’ এটিই ব্যাঙ্কিং মডেলের নমুনা। বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার বা গাইড বইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এই মডেলকে আরও শক্তিশালী করেছে।
৩. সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব (চুপ থাকার সংস্কৃতি)
ফ্রেইরে বলেছেন, এই মডেলটি সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি হাতিয়ার। যেমন, আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়, ‘বড়রা বা শিক্ষকরা যা বলছেন তাই ঠিক, কোনো পাল্টা প্রশ্ন করবে না।‘ এটি বড় হয়েও আমাদের সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধা দেয়। এই পদ্ধতি মূলত আমাদের এমনভাবে তৈরি করে যেন আমরা অন্যের তৈরি করা সমাজ ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে চলি, কিন্তু তা পরিবর্তনের চেষ্টা না করি।
৪. উত্তরণের পথ: বিশ্ব পাঠ
‘বিশ্ব পাঠ’ হলো পড়ার প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবার একটি উদ্যোগ। কেবল বই পড়ার বদলে পুরো পৃথিবীকে পড়া বা বোঝা, যাতে আমাদের চিন্তা অন্যদের ঠিক করে দেয়া সীমানায় আটকে না থাকে। মানব মনকে বিকশিত হতে দিলে চারপাশের জগতকে আরও গভীরভাবে জানা সম্ভব হয়। এই মুক্ত চিন্তাই আমাদের মনের সঠিক বিকাশ ঘটায় এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও শান্তি বজায় রেখে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়তে সাহায্য করে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
আমাদের দেশে জিপিএ-৫ পাওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যেখানে শুধু তথ্য মাথায় ঢোকানো হয় । এটি হলো ব্যাঙ্কিং মডেল। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা হওয়া উচিত এমন, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু বইয়ের অক্ষর পড়বে না, বরং নিজের সমাজ ও পৃথিবীকে বুঝতে শিখবে এবং তাকে আরও উন্নত করার স্বপ্ন দেখবে।
"ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ