Wednesday, September 16, 2026

রাগ ইমনের তৃষ্ণা


 ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:০০০


ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ ভারতীয় রাগসংগীতকে পাশ্চাত্যের বাদ্যযন্ত্রের ভাষায় উপস্থাপন করে বিশ্বসংগীতের পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস খুবই সুন্দর করে তুলে ধরেছেন।

লিংকে গিয়ে ইয়ানী পিয়ানো মুর্ছনা , রাগ ইমন ,রাগ মেঘ, পিয়ানোতে রাগ মালকোশের মুর্ছনা শুনলাম । লেখাটিতে ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রশ্ন উঠে এসেছে ভারতীয় রাগসংগীতের সূক্ষ্ম সৌন্দর্য ও স্বরভাষাকে পাশ্চাত্যের বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে বৃহত্তর বিশ্বশ্রোতার কাছে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়। পিয়ানোতে রাগ ইমন, মেঘ বা মালকোশের স্বররূপ তুলে ধরার এই প্রয়াস সেই দিক থেকে নিঃসন্দেহে আগ্রহের বিষয়।

তবে পিয়ানোতে কোনো নির্দিষ্ট স্বরক্রম বা কয়েক সেকেন্ডের সুরাংশ রাগের সঙ্গে মিলে গেলেই সেটিকে সম্পূর্ণ রাগের পরিবেশনা বলা যায় কী না তা ভাবার বিষয়। রাগের স্বরসংগঠন ছাড়াও তার চলন, পকড়, অলংকার, মীর, সময়ভাব, ন্যাস ও সামগ্রিক রাগধর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখাটির শেষাংশে মীর প্রসঙ্গটি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

একই সঙ্গে, পাশ্চাত্যের যন্ত্রে ভারতীয় রাগের রূপান্তরকে কেবল মূল রাগকে অন্য যন্ত্রে বাজানো হিসেবে না দেখে দুই ভিন্ন সংগীতভাষার মধ্যে একটি সৃজনশীল সংলাপ হিসেবেও দেখা যায়। পিয়ানোর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রাগের আবহ, স্বরচরিত্র ও নান্দনিকতা কতটা বিশ্বস্তভাবে প্রকাশ করা সম্ভব এই অনুসন্ধানই হয়তো এই উদ্যোগের একটি আকর্ষণীয় দিক।

ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে শুরু হওয়া এই প্রয়াস যদি স্বরলিপি, রাগের ব্যাকরণ, বাদ্যযন্ত্রের সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আরও বিস্তৃতভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে তা ভারতীয় রাগসংগীতকে নতুন শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করার একটি সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে।সে জন্য এই উদ্যোগের প্রতি রইল প্রাণঢালা অভিনন্দন ।

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
লেখক বলেছেন: পকড় দিয়ে শুধুই পরিচিতি দিয়েছি। তবে বিস্তারিত পরিবেশনাও সম্ভব।

আমি পিয়ানো সঠিক ভাবে জানি না। শেখার সুযোগ ছিল না। আর এখন সুযোগ আছে কিন্তু মাথা আর কাজ করে না। 

বাদ্য যন্ত্র বিশারদ গণ সেতার -কে গীটারে নিয়ে এসেছেন। সেতারে ঝংকার সৃষ্টির জন্য 'তার' সংখ্যা বেশী। তাই গিটারে ঐরকম ঝঙকার আসে না । কিন্তু যতটুকু সম্মভব তা তুলে ধরে যায়।

আদনান সামীর পিয়ানোতে রাগ সংগীত সবিস্তারে এসেছে। লিংকে ওনার বাজানো রাগ বাগেশ্রীর পরিবেশনা। আদনান সামী ১৯৮৯, রাগ বাগেশ্রী

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৯০


ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ আপনার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তির পাশাপাশি সেতার ও গিটারের বাদনগত পার্থক্য এবং রাগসংগীতকে পিয়ানোতে উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন।  বিশেষ করে সেতারের অধিক তারের কারণে যে স্বাভাবিক ঝংকার তৈরি হয়, গিটারে তা হুবহু পুনর্নির্মাণ করা কঠিন ,এটি বাদ্যযন্ত্রের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে

সম্পর্কিত একটি যথার্থ পর্যবেক্ষণ। তবে একই সঙ্গে গিটারের নিজস্ব টিম্বার ও বাজানোর কৌশল ব্যবহার করে রাগের আবহ কতটা সফলভাবে প্রকাশ করা যায়, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

লিংকসহ আদনান সামীর পিয়ানোয় রাগ বাগেশ্রীর পরিবেশনার উল্লেখটি আলোচনাটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। কারণ, রাগসংগীত সাধারণত মীড়, গমক ও স্বরের সূক্ষ্ম অলংকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, পিয়ানোর মতো নির্দিষ্ট-স্বরের যন্ত্রে সেগুলো অন্যভাবে রূপ দিতে হয়। তাই এখানে সঠিক বা ভুল এর চেয়ে কোন বাদ্যযন্ত্রে রাগের স্বরভাষা কীভাবে নতুনভাবে প্রকাশ পাচ্ছে সেই দৃষ্টিতে শুনলে আলোচনাটি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।

ভাল লাগল বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত দাবি না করে নিজের সাধ্য ও সীমারেখার মধ্যে একটি সংগীত-অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার প্রবনতা দেখে ।

শুভেচ্ছা রইল

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আমার মন্তব্যঃ অনেক ধন্যবাদ আলী ভাই। আমার ইচ্ছা আছে ইমন দিয়ে প্রথমে কাজ করা। যেহেতু ইমন একটু বিস্তারিত শিখেছিলাম। এর ওপর ৮ টি স্টাইলের গীত, গজল, রাগ সঙ্গীতের, ধরণ জানি। আমি তা পিয়ানোতে তুলে ধরবো । হারমোনিয়ামে  কিছু করেছিলাম।  এবার পিয়ানোতে আনতে চাই। 



Monday, September 14, 2026

তাঁত - জান্নাতুল ফেরদৌস

নানু বলতেন, “ছেঁড়া শাড়ির সুতো কখনো দাঁত দিয়ে কাটতে নেই। আর রাইত-বিরেতে ভুল করেও তাঁত ঘরে উঁকি দিতে নেই।” কারন, নানুর মতে, “রাইতে মাকু (তাঁত বোনার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রবিশেষ) যখন একা হাঁটে, তখন জ্বিনেরা কাপড় বোনে। ওই কাপড় মানুষের গায় সয় না।” এহেন কথা শুনে আমরা ভাইবোনেরা বেশ হাসাহাসি করতাম, তবে নানু কখনোই রাগ করতেন না।

নানু মারা গেছেন প্রায় পনেরো বছর হলো। আমি এখন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। দেশের প্রথম সারির একটা ফাস্ট-ফ্যাশন ব্র্যান্ডের প্রোডাকশন হেড। সাভারে আমাদের বিশাল ফ্যাক্টরিতে দিনে লাখ লাখ মিটার কাপড় বোনা হয় অটোমেটিক পাওয়ার লুমে। কানের পর্দা ফাটানো শব্দের ভেতরে হাজার হাজার নিডল আর মাকু মেশিনের নির্দেশে ওঠানামা করে। সুতো আর সিনথেটিক ফাইবার দিয়ে আমরা সস্তায় ফ্যাশন বানাই। এটাই আমার পেশা, এবং আজ, এই লেখাটা লিখতে বসেছি এই কারণেই যে নানু হয়তো সেসময় ঠিকই বলতেন!

ঘটনার শুরু আমার মায়ের একটা পুরোনো বিয়ের শাড়ি থেকে। সত্যিকারের আড়াই প্যাঁচের ঢাকাই মসলিন, প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো, পারিবারিক উত্তরাধিকার। গত বছর আলমারি গোছাতে গিয়ে দেখি শাড়ির পাড়ের কাছটায় সুতো ফেঁসে গেছে, জায়গায় জায়গায় বুনন আলগা। ফ্যাক্টরির এক পুরোনো মাস্টারকে দেখালাম। সে শাড়িটা ছুঁয়েই হাত সরিয়ে নিলো। বলল, “স্যার, এই জিনিসে আমি হাত দিমু না। এইটা মেশিনের কাম না। আপনে সোনারগাঁয়ের পানাম নগরের পেছনের এক গলিতে যান। ‘মাকু ঘর’। রহমত কারিগররে খুঁইজা বাইর করেন। তয় একটা কথা,” মাস্টার একটু থামল, তারপর বললো, “কারিগর মিয়ার কথাবার্তা একটু অন্যরকম। সব কথায় সায় দিয়েন না, আবার সব কথা উড়াইয়াও দিয়েন না।”

পানাম নগরের পুরোনো ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে সেই গলিটা এত সরু যে রোদ ঠিকমতো ঢোকে না। শেওলা ধরা পুরোনো ইট সুরকির দেয়াল, তার ফাঁকে একটা কাঠের দরজা। ওপরে খোদাই করা সাইনবোর্ড: "মাকু ঘর"; প্রোপ্রাইটর: রহমত আলী। নিচে ছোট করে লেখা: "এখানে সুতোয় ভাগ্য বোনা হয়।" "ভাগ্য? কাপড় না বলে ভাগ্য?" মনে মনে হাসলাম। লোকটা কি দরজি নাকি পীর?

ভেতরে ঢুকে মনে হলো পুরোনো দিনের কোনো জাদুকরের ডেরায় ঢুকেছি। বাতাসে মাড় দেওয়া সুতোর গন্ধ, পুরোনো কাঠের গন্ধ আর কেমন একটা স্যাঁতস্যাঁতে আর্দ্রতা। ঘরের মাঝখানে মাটির গর্তে পা রেখে বিশাল এক কাঠের তাঁত। আর তার সামনে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। মাথায় কিস্তি টুপি, গায়ে একটা আধময়লা ফতুয়া। চোখে ছানি পড়া ঘোলাটে দৃষ্টি। কিন্তু হাত দুটো চলছে জাদুর মতো।

আমার পায়ের শব্দে উনি হাত থামালেন। “কেডা?” আমি পরিচয় দিলাম। শাড়ির প্যাকেটটা এগিয়ে দিলাম। উনি প্যাকেট না খুলেই শাড়িটার ওপর হাত রাখলেন। চোখ বন্ধ করে কাপড়ের বুননের ওপর আঙুল বোলালেন, ঠিক যেভাবে অন্ধ মানুষ ব্রেইল পড়ে।

“আহারে,” উনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “এই শাড়ি যে বুনছিল, তার মনে বড় কষ্ট আছিল বাজান।” আমি চমকে উঠলাম। “কষ্ট মানে? এটা তো বিয়ের শাড়ি।” “বিয়ের শাড়ি হইলেই কি মন ভালো থাকে? বুনন দেখো নাই? সুতার টান বড় বেশি। প্রতিটা টানে একটা কইরা দীর্ঘশ্বাস আছিল। এইটা পরলে তো শইল্যে বিষন্নতা আসবো।”

“শাড়ি ঠিক করা যাবে?” আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলাম। “যাবে।” উনি ঘোলাটে চোখে আমার দিকে তাকালেন। “তয় আমি তোমাগো পাওয়ার লুমের মতো জোড়াতালি দিই না। আমি সুতোয় সুতোয় গিঁট দিই না, আমি আত্মায় আত্মায় গিঁট দিই। রাইখা যাও।”

আমি একটু তাচ্ছিল্যের হেসেই বললাম, “কারিগর সাব, আমি নিজেই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। কাপড়ে আত্মা বলে কিছু নেই। লুমের টানা আর পোড়েনের (Warp and Weft) ম্যাথমেটিক্যাল ক্যালকুলেশন আছে। আমাদের ফ্যাক্টরিতে দিনে লাখ মিটার কাপড় বেরোয় একদম জিরো ডিফেক্টে। আর আপনারা হাতে বোনেন বলে সুতোর টেনশন ঠিক থাকে না, কাপড়ে খুঁত থাকে।”

“জানি।” উনি শান্ত গলায় বললেন। “তোমাগো মেশিনে নিখুঁত কাপড় বাইর হয়। তয় মেশিনের কাপড়ে তো জান নাই বাজান। সুতো জিনিসটারে তুমি কি মনে করো? খালি তুলা আর পলিয়েস্টার? সুতো হইলো কাঁপন, সুতো হইলো মেমোরি।”

“মেমোরি?” “হ। তুলা গাছটা যখন মাঠে আছিল, সে রোদ খাইছে, বৃষ্টি খাইছে, মাটির রস খাইছে। তার ভিতরে প্রকৃতির একটা কাঁপন আছে। যখন একজন তাঁতি হাতে মাকু চালায়, তার হাতের ঘাম, তার নিঃশ্বাসের তাল, তার বুকের ধুকপুকানি - সব ওই সুতার ভিতরে গুইঁথা যায়। তুমি যখন হাতে বোনা কাপড় পরো, তুমি আসলে প্রকৃতির কাঁপন আর একজন মানুষের আয়ু পরো। আর মেশিনের কাপড়ে কি পরো? বিদ্যুৎ আর লোহার ঘষানির শব্দ। তোমাগো ফাস্ট ফ্যাশনের কাপড় পইড়া মাইনষের এত চর্মরোগ ক্যান, মাইনষের মেজাজ এত খিটখিটে ক্যান, ভাইবা দেখছো কোনোদিন?”

আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম। উনি শাড়িটা পাশে রাখলেন। “দুনিয়াটা হইলো একটা বিশাল মাকু ঘর। উপরওয়ালা সারাক্ষণ বুনতাছেন। দিন আর রাইত, আলো আর আঁধার এই দুইটা হইলো উনার টানা আর পোড়েন। আমরা সবাই এক একটা সুতো। তুমি কি জানো, প্রতিটা মানুষের একটা নিজস্ব বুননের প্যাটার্ন আছে?”

আমি কিছু বলার আগে ভেতর থেকে এক তরুণী বেরিয়ে এল। হাতে চায়ের কাপ। পরনে একটা সাধারণ সুতির শাড়ি, কিন্তু কি অপূর্ব তার বুনন! মেয়েটার চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত, যেন অনেক পুরোনো কোনো দীঘির জল। “বসেন। দাদাজান ওষুধ খাবেন এখন।” মেয়েটা চা এগিয়ে দিল।

মেয়েটার নাম নূরী। রহমত কারিগরের নাতনি আর এই মাকু ঘরের একমাত্র উত্তরাধিকারী। চা খাওয়ার ফাঁকে নূরী হঠাৎ বলল, “আপনি ফ্যাক্টরিতে যে কাপড় বানান, সেই কাপড় কারা বোনে জানেন?” “মেশিন বোনে। আর ওয়ার্কাররা অপারেট করে।” “না।” নূরীর গলাটা ভারী শোনাল। “অভাবী, ক্লান্ত, ঘুমহীন কিছু মানুষ বোনে। মাসের পর মাস ওভারটাইম করা, মাস শেষে বেতন না পাওয়া কিছু রাগী মানুষ যখন মেশিনের সামনে দাঁড়ায়, তাদের ওই রাগ, ওই ক্লান্তি, ওই অভিশাপ মেশিনের সুতোয় ঢোকে। আপনারা শোরুমে সুন্দর আলো ফেলে সেই কাপড় বেচেন। মানুষ সেই রাগ আর ক্লান্তি গায়ে জড়িয়ে ঘোরে। আর দিন শেষে ভাবে, জীবনটা এত অস্থির লাগে ক্যান!”

আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। একটা মেয়ে, যে কোনোদিন হয়তো ঢাকার বড় শপিং মলে যায়ওনি, সে আমার পুরো ক্যারিয়ারটাকে এক কথায় ধুলোয় মিশিয়ে দিল। যাওয়ার সময় নূরী নিচু গলায় বলল, “একটা কথা। দাদাজানের সব কথা বিশ্বাস করবেন না। তবে, অবিশ্বাসও করবেন না।”

এরপর থেকে আমি প্রায়ই যেতাম। কাজ থাকুক বা না থাকুক। কারিগর কাজ করতেন আর কথা বলতেন। নূরী পাশে বসে চরকায় সুতো কাটত। এক সন্ধ্যায় আমি কারিগরকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি বলেছিলেন সব মানুষের একটা প্যাটার্ন থাকে। মানে কি?” উনি মাকু থামালেন। “দুনিয়ার সব সুতো তো আর এক লগে জোড়া লাগে না। কিছু সুতো আছে, যাদের একসাথে বোনা হওয়ার কথা। যখন সেই দুই সুতো এক কাপড়ে আসে, তখন নকশা পূর্ণ হয়। আর যখন ভুল সুতো একলগে মেশে, তখন কাপড়ে জট পাকায়। মানুষের সম্পর্কগুলাও ঠিক অমন।”

কারিগর একটা পুরোনো কাঠের বাক্স বের করলেন। ভেতরে অদ্ভুত একটা সাদা সুতোর লাটিম। সুতোটা চকচক করছে, যেন রেশম, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কিছু। “আমার দাদাজান এই সুতা বানাইছিলেন। চাঁদের আলো আর পদ্মপাতার শিশির দিয়া। কইতেন, এই সুতায় বোনা কাপড় গায়ে দিলে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। আমি জীবনে ওই সুতায় হাত দিই নাই। কারণ, সব সুতো মানুষের লাইগা না।” “মানে?” “মানে, কিছু বুনন আছে যা রাইতে শুরু হয়। জ্বিনেরা বোনে। যেই কাপড় পরলে মানুষ আর দুনিয়ায় থাকতে চায় না। তারে ডাইকা নিয়া যায়।”

কথাটা শুনে আমার নানুর কথা মনে পড়ে গেল।

ঘটনার ক্লাইম্যাক্স মাস দুয়েক পরের এক বৃহস্পতিবার রাতে। সোনারগাঁওয়ে কাজ শেষ করতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। মাকু ঘরে শাড়িটা আনতে গেলাম। রাত তখন প্রায় বারোটা। গলিটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। শুধু নিস্তব্ধ না, মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবীর শব্দ কেউ মিউট করে দিয়েছে। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর থেকে ভেসে আসছিল একটা ছান্দিক শব্দ। খট... খট... খট... খট।

তাঁত চলছে। খুব দ্রুত। এত দ্রুত কোনো মানুষের হাত চলতে পারে না। আমি সন্তর্পণে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলাম। ঘরের ভেতরে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। আর সেই আলোয় দেখলাম, কাঠের বিশাল তাঁতটা একা একা চলছে। মাকুটা এপাশ থেকে ওপাশ ছুটে যাচ্ছে বাতাসের বেগে। কিন্তু কারিগরের আসনে কেউ বসে নেই। না, কেউ বসে নেই বলাটা ভুল হবে। একটা ছায়ার মতো কিছু বসে আছে। যার কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই, শুধু হাতের মুভমেন্ট বোঝা যাচ্ছে। আর ঘরের চারপাশের সমস্ত মাকড়সা, টিকটিকি এমনকি ইঁদুরগুলো গোল হয়ে বসে সেই বুনন দেখছে। একটা অদ্ভুত গুনগুন শব্দ ভেসে আসছিল। কোনো গান না, শুধু একটা রিদম। যা শুনলে মনে হয়, এই রিদমটাই আমার হার্টবিট হওয়া উচিত। আমার মনে হচ্ছিল দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে যাই, ওই কাপড়ের একটা অংশ হয়ে যাই।

হঠাৎ আমার কাঁধে একটা হাত পড়ল। নূরী। “পিছে ঘোরেন। তাকাইয়েন না।” নূরীর গলা কাঁপছিল। আমি ঘোরের মধ্যে ওর সাথে বেরিয়ে এলাম।

পরদিন কারিগর মারা যান। সকালে উনাকে তাঁতের ওপরেই শোয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। উনার সামনে রাখা ছিল আমার মায়ের সেই শাড়িটা। নিখুঁতভাবে সারানো। আর শাড়ির আঁচলে নতুন করে বোনা একটা ছোট্ট নকশা - একটা মাকু আর একটা পদ্মফুল।

কারিগর আমাকে একটা চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিলেন নূরীর কাছে। “বাজান, মেশিনের শব্দে নিজের গলার আওয়াজ ভুইলো না। সুতো যখন ডাক দেয়, তখন যাইতে হয়। রাইত বারোটার পরে দুনিয়া যখন চুপ হয়, তখন আসল বুনন শুরু হয়। আমি আমার বুনন শেষ কইরা গেলাম। তোমার মায়ের শাড়িতে আমি নতুন একটা সুতো জুইড়া দিছি। ওই সুতো আর নূরীর জীবনের সুতো একলগে বান্ধা। প্যাটার্নটা মিলাইয়া নিও।”

এই গল্পের বাকি অংশে একটা বিয়ে আছে। নূরীর সাথে আমার। আমি এখন আর ফাস্ট ফ্যাশনে কাজ করি না। চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। আমি আর নূরী মিলে নিজস্ব একটা হ্যান্ডলুম ব্র্যান্ড দাঁড় করিয়েছি। আমরা দিনে মাত্র কয়েকটা কাপড় বুনি। কিন্তু প্রতিটা কাপড়ে আমরা সময় দিই, যত্ন দিই।

গত মাসে আমাদের একটা ছেলে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে আনার পর, নূরী তাকে একটা সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দিল। আমি চমকে উঠলাম। এটা সেই সুতো - চাঁদের আলো আর শিশির দিয়ে বোনা সেই জাদুকরী সুতো, যেটা কারিগর সেই রাতে বুনেছিলেন। বাচ্চাটা কাঁদছিল খুব। কিন্তু ওই কাপড়ে জড়ানোর সাথে সাথে সে একদম শান্ত হয়ে গেল। সে এমনভাবে চারদিকে তাকাচ্ছিল, যেন সে সব বুঝতে পারছে। যেন সে তার নিজের প্যাটার্ন চিনে গেছে।

আমি এখন আর রাইতে ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন চার্ট দেখি না। আমি এখন কাপড় বাছি। মানুষ যেমন খাবার বাছে। আপনি গায়ে কি জড়াচ্ছেন তার হিসাব কবে করেছেন শেষবার? যেই কাপড় পরলে ভেতরটা অস্থির লাগে, ঘাম হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়, সেটা স্টাইল হতে পারে, কিন্তু আরাম না। আর যেই কাপড় পরলে ভেতরটা শান্ত হয়, মায়ের হাতের ছোঁয়ার মতো লাগে সেটার দাম লাখ টাকার ব্র্যান্ডের চেয়েও বেশি। প্রকৃতি সারাক্ষণ আমাদের বুনছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কার সুতোয় নিজেদের জড়াচ্ছি।

তবে নানুর নিয়মটা আমি এখনো মানি। রাত বারোটার পর আমাদের ঘরে কেউ সুতো কাটে না। সমস্যা একটাই। মাঝে মাঝে, খুব গভীর রাতে, যখন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে যায়, আমাদের স্টোররুম থেকে একটা শব্দ ভেসে আসে। খট... খট... খট... খট। মাকু একা একা হাঁটে। তবে আমি আর ভয় পাই না। কারণ ততদিনে আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি। কিছু বুনন শেষ হওয়ার নয়।

৬ সেপ্টেমবর, ২০২৬ 

উদয় রহমানের “সুর” থেকে অনুপ্রাণিত!

[N.B. বুনন ~ Matrix]

Thursday, August 13, 2026

যে বয়সে এসে আর কারও অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না- রয়া চৌধুরী

জীবনের একটা সময় আসে—যখন মানুষ আর কাউকে বোঝাতে চায় না যে সে ভালো, সে যোগ্য, সে সফল কিংবা সে সুখী। কারণ তখন মানুষ বুঝে যায়—নিজের মূল্য বোঝার জন্য অন্যের স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই। শুরুতে সবাই validation খুঁজে।কে কী বলল, কে প্রশংসা করল, কে পাশে থাকল, কে তার সাফল্যে খুশি হলো—এসবের ওপর অজান্তেই নিজের আত্মমূল্যকে দাঁড় করিয়ে দেয়। বিশেষ করে অল্প বয়সে, কৈশোরে কিংবা তারুণ্যের শুরুতে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, গ্রহণযোগ্যতা এবং কারও জীবনে বিশেষ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি তীব্র থাকে। তখন মনে হয়—কেউ একজন থাকতেই হবে, যে বুঝবে, আগলে রাখবে, পাশে থাকবে। ভালোবাসাকে তখন অনেক সময় জীবনের পূর্ণতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সময় মানুষকে ভালোবাসার আরেকটি গভীর অর্থ শেখায়।

প্রতিটি মানুষেরই ভালোবাসা প্রয়োজন। সঙ্গ প্রয়োজন। একজন আপন মানুষের প্রয়োজন। মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে বাঁচার জন্য তৈরি নয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, নিজের অস্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে কোনো সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র। প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, চিন্তা, স্বাধীনতা, স্বপ্ন এবং নিজস্ব এক পৃথিবী আছে।

দুটি মানুষ একে অপরকে ভালোবাসতে পারে, অথচ তাদের পৃথিবী একেবারে একই রকম নাও হতে পারে। সঙ্গ মানে একে অপরের অস্তিত্বকে গ্রাস করে ফেলা নয়; বরং পাশাপাশি থেকেও একে অপরের স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করা। যে সম্পর্ক কারও অস্তিত্বের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, যে ভালোবাসা কারও স্বাধীনতা, আত্মসম্মান কিংবা মানসিক শান্তিকে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করে—সেই ভালোবাসা যত গভীরই হোক, তার আশ্রয়ের মূল্য একসময় ফুরিয়ে যায়।

ভালোবাসা কখনো এমন হওয়া উচিত নয় যেখানে একজনকে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে হয়।

ভালোবাসা পাওয়াই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। কখনও কখনও দূরত্বের মধ্যেও ভালোবাসা বেঁচে থাকে। কখনও কাছে না থেকেও কারও জন্য মঙ্গল কামনা করা যায়।
কখনও কাউকে না পেয়েও তার প্রতি অনুভূতিটুকু সুন্দর থেকে যেতে পারে। কারণ সব ভালোবাসার পরিণতি একসঙ্গে থাকা নয়। কিছু ভালোবাসার পরিণতি হয় শান্তভাবে দূরে সরে যাওয়া।
আর আশ্চর্যের বিষয়—সময় পেরোতে পেরোতে মানুষ এটাও বুঝতে শেখে যে, না পাওয়ার মধ্যেও এক ধরনের শান্তি আছে। সব অনুভূতিকে অধিকার করতে হয় না। কিছু অনুভূতিকে শুধু অনুভব করেও বেঁচে থাকা যায়।

আজকের সমাজে এই উপলব্ধিটা আরও জরুরি। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনে তুলনা, প্রতিযোগিতা এবং validation-এর প্রয়োজনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কে কতটা সফল, কে কতটা জনপ্রিয়, কার সম্পর্ক কতটা সুন্দর, কার জীবন কতটা আকর্ষণীয়—মানুষ প্রায় প্রতিদিন অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করছে।

কেউ একটু এগিয়ে গেলে তাকে অভিনন্দন জানানোর পরিবর্তে তার ভুল খোঁজা হচ্ছে। কেউ আলোয় এলে তাকে টেনে নামানোর চেষ্টা হচ্ছে। কারও সৌন্দর্য, প্রতিভা কিংবা সাফল্য অন্য কারও ভেতরে অনুপ্রেরণার বদলে অস্বস্তি তৈরি করছে। কারণ অন্যের সাফল্য অনেক সময় মানুষের নিজের অপূর্ণতাকে সামনে এনে দাঁড় করায়। সেখান থেকেই জন্ম নেয়—হিংসা, অসহিষ্ণুতা, কটাক্ষ, প্রতিযোগিতা এবং অকারণ বিদ্বেষ। আর এই পরিবেশের মধ্যেই মানুষ একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন সে বুঝতে শেখে—সবাইকে কাছে রাখার প্রয়োজন নেই। সব কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সব ভুল বোঝাবুঝি পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। সব সম্পর্ককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। যে সম্পর্ক প্রতিনিয়ত আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, যে সঙ্গ মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়, যে মানুষ অন্যের আনন্দে আনন্দিত হতে পারে না—তার থেকে দূরত্ব তৈরি করা নিষ্ঠুরতা নয়।
কখনও কখনও দূরত্বই আত্মসম্মানের সবচেয়ে শান্ত রূপ। পরিণত বয়সে এসে মানুষ তাই সঙ্গী বেছে নেওয়ার অর্থও নতুন করে বুঝতে শেখে। সঙ্গী মানে এমন কেউ নয় যার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হবে। বরং এমন একজন, যার পাশে থেকেও একজন মানুষ নিজের মতো থাকতে পারে। নির্ভরতা থাকবে, কিন্তু আত্মপরিচয় হারিয়ে নয়। ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু অধিকারবোধে শ্বাসরুদ্ধ করে নয়। সঙ্গ থাকবে, কিন্তু স্বাধীনতার বিনিময়ে নয়। সুস্থ ভালোবাসা মানুষকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও বেশি নিজের মতো হয়ে উঠতে সাহায্য করে। হয়তো এ কারণেই বয়সের সঙ্গে ভালোবাসার সংজ্ঞাটাও বদলে যায়।
একসময় ভালোবাসা মানে মনে হয়—“কেউ আমাকে চাইবে।”
আর একসময় এসে ভালোবাসার অর্থ হয়ে দাঁড়ায়:
“যে মানুষটির সঙ্গে থাকব, তার পাশে থেকেও যেন দুজনেই নিজেদের মতো থাকতে পারি।”
এই পার্থক্যটাই হয়তো পরিণত হওয়ার সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষা।
একটা সময় আসে, যখন মানুষ আর জিজ্ঞেস করে না—
“মানুষ আমাকে কীভাবে দেখছে?”
বরং নিজেকে প্রশ্ন করে—
“আমি নিজেকে কীভাবে দেখছি?”
কারণ শেষ পর্যন্ত কেউ যখন একা থাকবে, তখন তার পাশে থাকবে তার নিজের বিবেক, তার আত্মসম্মান এবং নিজের সঙ্গে তার সম্পর্ক। তখন আর কারও পেছনে ছুটতে ইচ্ছে করে না। কারও স্বীকৃতি ভিক্ষা করতে ইচ্ছে করে না। অকারণ প্রতিযোগিতায় নামতে ইচ্ছে করে না। এমনকি ভালোবাসাকেও আঁকড়ে ধরে রাখতে ইচ্ছে করে না। শুধু মনে হয়—
আমি আমার পথে হাঁটছি।
তুমি তোমার পথে হাঁটো।
তোমার আলো আমার আলো কমায় না,
আর আমার আলো তোমার আলো নিভিয়ে দেয় না।
জীবনটা প্রতিযোগিতা নয়। জীবনটা নিজের ভেতরের মানুষটিকে একটু একটু করে আরও সুন্দর করে তোলার যাত্রা। আর যে মানুষটি একদিন সত্যিই নিজের মূল্য বুঝে ফেলে — সে আর ভিড়ের করতালির জন্য বাঁচে না। সে ভালোবাসে, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে নয়। 
সে সঙ্গ চায়, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের বিনিময়ে নয়।
সে দূরত্ব মেনে নিতে শেখে, না-পাওয়াকেও শান্তিতে গ্রহণ করতে শেখে। এবং শেষ পর্যন্ত—সে নিজের ভেতরের শান্তির জন্য বাঁচতে শেখে।

১৩ই সেপ্টেম্বর,২০২৬

Copy_right_reserved

Friday, August 7, 2026

পুস্তক সমালোচনা

পুস্তক সমালোচনা – জীবনেরে কে রাখিতে পারে, লেখক ফিরোজা হারুন

মহিলা বিষয়ক অনুষ্ঠান – অংগনা, বাংলাদেশ বেতার,ঢাকা

পাঠক – নাজনীন তৌহিদ

রেকর্ডিং ১৬/১১/২০১১, প্রচার ১৮/১১/২০১১

 

মানুষ কেবল যাপিত জীবন নিয়েই ব্যস্ত হয়। হাস-ফাস করা জীবনেও কখনো তার মন গেয়ে ওঠে, নেচে ওঠে। নিজের ভুবনে সে একাকী বিচরণ করতে চায় কিছুক্ষণ।এই ‘একান্ত কিছুক্ষণ’ সময়টাতে সে কোন এক নিঃস্বার্থ বন্ধুকে সাথী হিসাবে খুঁজে নিতে পারে, যে কেবল নিজেকে বিলিয়ে দিতেই জানে। ধারণা করতে পারেন এমন বন্ধু কে? হ্যা, আমি সেই বন্ধুটির কথা বলছিলাম – বই!

বই– ই  আমাদের নিত্যসংগী।আমাদের বন্ধু!

বই-ই হতে পারে নিরানন্দ জীবনের এতটুকু আনন্দের উপকরণ। আর এক্ষেত্রে  সময়োপযোগী বই পারে মনের ক্ষুধা নিবারণ করতে। শ্রোতা বন্ধুদের সবার মনের অবস্থা যেহেতু আমার অজানা,তাই নিত্যকার মতো আমার পছন্দের একটি বই নিয়ে এলাম আজকের আলোচনায়। এটি একটি উপন্যাস।উপন্যাসটির নাম ‘জীবনের কে রাখিতে পারে।’ লিখেছেন ফিরোজা হারুন।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে মম প্রকাশনা থেকে।এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন রফিক উল্লাহ্‌। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা –৬০ এবং এর মূল্য হাতের নাগালে, মাত্র ৪৫ টাকা।

বইটির ভেতরকার বিষয়বস্তু জানবার আগে জেনে নেয়া যাক লেখকের পরিচিতি।

লেখিকা ফিরোজা হারুনের জন্ম ময়মনসিংহ জেলার, ত্রিশাল উপজেলার, হরিরামপুর গ্রামে।লেখাপড়া প্রথমে ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয় এবং কুমুদিনী কলেজ টাঙ্গাইল হতে।এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে ইতিহাসে এম.এ.সম্পন্ন করেন।তারপর ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ফর উইমেন থেকে বি.এড. ডিগ্রী অর্জন করেন।পরবর্তীতে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে সিনিয়র জিওগ্রাফি টিচার হিসাবে শিক্ষকতা করলেও তিনি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাঁর লেখা বেশ ক’টি উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ, ৭১ এর স্মৃতিকথা, গল্প ও প্রবন্ধ সংকলন ও শিশু–কিশোর সংকলন  ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে এবং পাঠক মহলে বেশ সাড়া জাগিয়েছে লেখিকার প্রথম উপন্যাস ‘জীবনেরে কে রাখিতে পারে।’

ফেরা যাক এই উপন্যাসটির বিষয়বস্তুর দিকে। এখানে দু’টি গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। একটির প্রধান চরিত্র একজন নারী যিনি একজন স্ত্রী। অন্য গল্পটির প্রধান চরিত্র একজন পুরুষ, যিনি প্রথম গল্পের নায়িকার স্বামী।লেখিকার ভাষায় গল্পের চরিত্র দু’টি কল্পনা ভিত্তিক তবে বাস্তবতা নির্ভর।  

নায়িকা নীলা সংসার জীবনে আবদ্ধে থেকেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আবিষ্কার করে গেছে মানুষ কখনোই পরিপূর্ণ নয়।জীবনে অনেক পাওয়ার মাঝেও থাকে না পাওয়ার হা হা–কার, যা তাকে কুড়ে কুড়ে ছিঁড়ে ফেলে। তবে এ না পাওয়াকে যে জয় করতে পারে, সেই জয়ী । সেই-ই জীবনের সত্যিকারের স্বাদ পায়।কল্পনা ভিত্তিক গল্প ছেড়ে যদি বাস্তব জীবনে তাকাই,তবু কি দেখব না সুখ খুঁজতে খুঁজতে একসময় অসুখের অসুখে ভুগে জীবনের যবনিকার পতন হয় !এখানেও তাই। সুখ হাতের নাগালে পেয়েও তাকে ছুঁতে পারেনি নীলা। এক হা হা–কার নিয়ে জীবন শেষ হয়ে যায় তার।অন্যদিকে তার স্বামী ইলিয়াস খান স্ত্রীর প্রতি অবিচার করেননি। ভালবেসেছেন। অথচ ভালবাসার কথা বলে তাকে প্রতারিত করতে চাননি। এই অভিব্যক্তি তার দ্বিতীয় গল্পে ফুটে উঠেছে।

উপন্যাসে স্বামী স্ত্রী আর সংসার জীবনের এক জটিল বিষয় ফুটে উঠেছে।যেখানে বিশ্বাস, অবিশ্বাস, মান–অভিমান, পরস্পর বোঝাপড়া কিংবা ভালবাসা, দুঃখবোধ সব কিছুই রয়েছে, যা হয়তো কারো কারো জীবনে চরম বিপর্যয় বয়ে আনে।তবে বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে একে জয় করাই এর মুখ্য বিষয়।গল্পের নীলা চরিত্র খুবই বুদ্ধিদীপ্ত এক নারী চরিত্র। একটি পরিচ্ছন্ন গল্প হিসেবে পাঠক হৃদয়ে গেঁথে যাবে অনায়াসে। হয়ত অনেকে এ গল্পের মাঝে জীবনের সমাধানও খুঁজে পাবেন। আর সে ক্ষেত্রে লেখক তার লেখনিতে সার্থক হবেন তখনই।     

     

মহাজগত বিষয়ে আমার গবেষণায় এআই সহায়তা - ফরিদ আহমেদ চৌধুরী

: কোন কিছু না থাকা শূন্য অসীম ছিল।  কারণ তাতে তাকে সীমা দেওয়ার মত কিছুই ছিল না।  সেই শূন্যে কোন কিছু হতে কোন বাধা ছিল না। কে বাধা দিবে কেউ ত...