১৯৭১ সালের এই উচ্ছ্বাসের মাসে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক গাঁও গেরামের ছেলে, আমি একা চলছি শিক্ষায় উচ্চ ডিগ্রি নিতে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেবল পা রেখেছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজার প্রথম সিঁড়িতে। ভাবতে গেলে একেবারে কম কথা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চাত্রীদের মন তখন নতুন আম্রমুকুল থেকে বিচ্ছুরিত মিষ্টি শিশিরের রসে পরিতৃপ্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের হাওয়ায় যুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন আবাসিক হল সমূহের ছাত্র সংসদ নির্বাচনী তরংগের উপর আরেকটি উপ-তরংগ। অন্যদিকে চলছে ১৯৭১ এর পাকিস্তানের ইসলামাবাদ সরকারের বিরুদ্ধে বাঙ্গালী জনগণের ১১ দফা ও ৬ দফা দাবী আদায়ের রাজনৈতিক যুদ্ধ। দেশের আপামর জনসাধারণের সাথে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরুণ ছাত্র ছাত্রীরাও অগ্রণী ভূমিকায় অংশীদার হয়ে, আন্দোলনের ধারাকে নিয়ে যাচ্ছিল সাফল্যের চূড়ায়। ১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারি – মার্চ ছিল গণ আন্দোলনের ফুলে ফেঁপে উঠা বিস্ফোরণের একটি পূর্ব মুহূর্ত।
১৯৭১ এর মার্চে ততকালীন সরকারের বিরুদ্ধে গণজোয়ার এবং আন্দোলনের পূর্ব প্রস্তুতির জের ধরে সেবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রকার ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত হয়েছিল।
২রা মার্চ ১৯৭১ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র ছাত্রীরা স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা ও মিছিলে যোগদান করে। সিদ্ধান্ত হয়েছিল ৩ রা মার্চ ১৯৭১ শহর অভিমুখী মিছিলে সবাই যোগদান করবে। ৩রা মার্চ সকাল ১০ টায় রাজশাহী শহরে যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবাদ মিছিল বের হলো তখন মিছিলের উপর পাক সেনা বাহিনীর গুলিবর্ষণে ১ জনের মৃত্যু সহ ৫/৬ জন আহত হয়েছিল। ফলে মিছিল ছত্রভংগ হয়ে যায়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ফিরে আসি। তখন মিছিলের ডাক দেয়া হয়। বলা হয় আগামীকাল ৪ঠা মার্চ থেকে আন্দোলনের ধারাকে আরো জোরদার করে দাবী আদায়ের লক্ষ্যে সর্বোপরি ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া।
৩ রা মার্চ ১৯৭১, রাত সাড়ে দশটায় ছাত্র ক্যান্টিনে বসে কলিকাতা বেতারের সংবাদ পরিক্রমা শুনছিলাম, যা ছিল পূর্ব বাংলার সকলের কাছে অতি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। তখনকার দিনের পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ এবং তার মন্তব্যসহ প্রচারিত হতো এই অনুষ্ঠান। তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বাঙ্গালীদের কার্যক্রমের সংবাদ কলিকাতা বেতার থেকেই সঠিক ভাবে পাওয়া যেত। পরিক্রমা অনুষ্ঠানটি যখন শোনা শেষ তখন হলের বাইরে থেকে চিতকার ভেসে এলো – মিলিটারি আসছে, মিলিটারি, মিলিটারি। আমরা ভয়ে যে যার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। আমি দৌড়ে তিনতলায় একটি রুমে ঢুকলাম। জানালা দিয়ে দেখলাম একটু দূরের রাস্তা দিয়ে কয়েকটা জীপ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সামসুজ্জোহা হলের দিকে এগুচ্ছে। ঠিক ঐ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন অতিক্রম করছিল সাড়ে দশটার ট্রেন, যার শব্দটা এত অশ্রুতপূর্ব, ভয়ংকর হয়ে আমার কানে ও হৃদয়ে বিধঁছিল, মনে হচ্ছিল ট্রেন ভর্তি মিলিটারি, ছাত্র হলগুলির দিকে আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে। তাদের আক্রমণের লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র ছাত্রী।
মিলিটারি গাড়ি বহর শহীদ সামসুজ্জোহা হলে গেটের কাছে কয়েকটা রুমের দরজা ভেঙ্গে অস্ত্র হাতে উর্দু ভাষায় চেঁচিয়ে ছাত্রদেরকে ভয় দেখিয়ে চলে গেল। তাদের বার্তার সারমর্ম ছিল, ‘যদি আগামী কালের ভিতর হল ত্যাগ না করা হয়–তবে সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে।’
৫ ই মার্চ হল ত্যাগ করে নিজ গন্তব্যে যাবার জন্য প্রস্তুত হলাম। বাড়ি পৌঁছালাম। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ যা সেদিন সম্প্রচার করা হয়নি তা রেডিওতে বাজিয়ে শোনানো হল পরের দিন ৮ই মার্চ সকাল আটটায়। ভাষণ শুনে আবেগে আপ্লুত হয়েছিলাম। মনোযোগ দিয়ে ও প্রাণ ভরে শুনলাম, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম – এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' তাহলে আমরা কোথায় কোন বিস্ময়ের দিকে আগাচ্ছি?
৯ই মার্চ থেকে ২৪ শে মার্চ পর্যন্ত আমি রেডিওর খবর পুংখানুপুংখ রূপে শুনতাম। বিদেশীদের ঢাকা শহর ত্যাগ, পূর্ব বাংলার সমস্ত শহরে আন্দোলনের লেলিহান শিখার বিস্তার, জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিজয়ী আওয়ামী লীগের বৈঠক, বাংলাদেশ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট, সরকারি, বেসরকারি বাঙ্গালী কর্মচারীদের বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান, সর্বত্র জনগণের লাঠি ও মশাল মিছিল সমেত পূর্ব বাংলা ছিল বিস্ফোরণ মুখী একটি আনবিক বোমা। ভাবছিলাম এই প্রথম আওয়ামীলীগ পাকিস্তান জাতীয় সংসদে যাবে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবে একজন বাঙ্গালী, সকল দাবীদাওয়া পূরণ ইত্যাদি। রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ তখনও আমি পুরোপুরি বুঝে উঠিনি। ইয়াহিয়া বা জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঢাকা আগমন, শেখ মুজিবর রহমানের সাথে বৈঠক এবং পরিস্থিতির রাজনৈতিক সমাধানের দিকেই বেশী মনোযোগী ছিলাম। মনে হচ্ছিল হয়তো অচিরেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং আবার আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে ফিরে যাব।
এ সময় আমি কল্পলোকে বিচরণ করে মার্চের বাসন্তী পূর্ণিমা রাতের সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়ে জীবনের প্রথম কবিতা লিখলাম। যেখানে একটি লাইন ছিল, ‘আধো শীত আধো গ্রীষ্ম এ পূর্ণিমা রাতে।’ তাই এখনও বসন্ত পূর্ণীমার রাত আমার স্মৃতিকে গভীরভাবে উষ্ণ করে তোলে।
২৬ শে মার্চ ১৯৭১
প্রতিদিনের মত সকালে রেডিও অন করেই শুনি ঢাকা বেতার থেকে একটি দেশাত্মবোধক গান, ‘পলাশ ডাকা, কোকিল ডাকা, আমার এ দেশ ভাইরে...’। শেষ হওয়ার পরও পুনঃ পুনঃ একই গান বাজছিল। দেশাত্মবোধক এ গানটিই বার বার শুনতে যদিও ভাল লাগছিল, তবুও দেশে কিছু একটা অঘটন ঘটছে বলে মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর কোনরকম ঘোষণা ছাড়া বেতার কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেল। গত দুই সপ্তাহ যাবত ঢাকা বেতার পূর্ব বাংলার আন্দোলনের সমস্ত ঘটনা প্রবাহ সবিস্তারে সম্প্রচার করছিল। আন্দোলনের যাবতীয় খবর আমরা ঢাকা বেতার থেকেই শুনছিলাম। গতকাল রাত্রের খবর ছিল চট্টগ্রামে মিছিল এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ পৌছেছে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে। জাহাজ থেকে অস্ত্র খালি করার ঘটনা নিয়ে চট্টগ্রামে বিরাজ করছে অস্থিতিকর পরিস্থিতি। সকাল সাড়ে আটটার দিকে বেতারে উর্দুতে এক ঘোষণা এলো। ঘোষণার অর্থ যা বুঝলাম তা ছিল, ঢাকাতে কারফিউ, সামরিক শাসন জারি এবং কিছুক্ষণের ভিতরে জেনারেল টিক্কা খানের ভাষণ প্রচারিত হবে। কিছুক্ষণ পর জেনারেল টিক্কা খানের সংক্ষিপ্ত ভাষণের পর আবার ঢাকা বেতার কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেল। কোথাও থেকে আর কোন খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। আমি শুধু রেডিও টিউনিং করছিলাম কোথাও থেকে ঢাকার কোন সংবাদ পাওয়া যায় কিনা এ আশায় । কলিকাতা বেতারে সকালের স্বাভাবিক অনুষ্ঠান প্রচারের পর বন্ধ হয়ে গেল। বেলা সাড়ে বারোটায় কলিকাতা বেতার থেকে স্বাভাবিক অনুষ্ঠান পরিচালনা শুরু হতো আবার। ঢাকা বেতার তখনও বন্ধ। আমি একা একা ভাবছিলাম ঢাকাতে এখন না জানি কি হচ্ছে?
হঠাত কলিকাতা বেতার স্বাভাবিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে অতি শান্ত কন্ঠে প্রচার করলো, ‘পূর্ব বাংলায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ঢাকায় রাস্তায় রাস্তায় সামরিক জান্তার সাথে ছাত্র, জনতা, পুলিশ ও ইপিআর বাহনীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে। পূর্ব বাংলার অন্যান্য শহরেও সামরিক জান্তার সাথে জনগণের চলছে প্রতিরোধ যুদ্ধ।’ এ ঘোষণার পরপরই বেতার থেকে বেজে উঠলো , ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি, চিরদিন তোমার আকাশ , তোমার বাতাস আমায় প্রাণে বাজায় বাঁশী’, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত হৃদয়স্পর্শী এ গানটি। আমার চোখ দিয়ে ঝর ঝর পানি ঝরছিল। কিছুক্ষণ পর পর এই একই ঘোষণা এবং একই গান । আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে করুণাময়ের কাছে এ যুদ্ধে সাফল্যের জন্য প্রার্থনা জানালাম। সেদিনের বার বার ঝরে পড়া চোখের পানিকে বন্ধক রেখেছিলাম স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিদান হিসেবে।
আমি উদ্গ্রীব হয়ে গেলাম এই সংবাদটি সবার কাছে পৌঁছানোর জন্য। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আকাশ। চারপাশের গ্রাম বাংলার সবুজ দৃশ্যকে মনে হচ্ছিল-এক নতুন সোনার বাংলা। মনের অজান্তেই এক মুঠো মাটি হাতে তুলে নিয়ে বললাম, হে আমার স্বাধীন দেশের মাটি, আমি তোমাকে বড় ভালবাসি। এ ভাবেই আনন্দ অশ্রু আর স্বাধীনতার জীবন মরণ শপথের মাধ্যমে কেটেছিল আমার প্রথম স্বধীনতা দিবস।
***

No comments:
Post a Comment