Friday, March 26, 1971

১৯৭১ এর মার্চ মাস - মোঃ আবদুল খালেক

ফেব্রুয়ারি – মার্চ মাস হচ্ছে বাঙ্গালীর আন্দোলনের মাস। এ সময়ে উত্তরী বায়ুর যবনিকা টেনে চলে আসে হু হু করে দখিনা বাতাস। গাছে গাছে নতুন পাতার নাচন। কৃষ্ণচূড়ার রক্তে রাঙানো অভিষিক্ত ফাগুন এবং সুর কোকিলের মধুর ডাক জানিয়ে দেয় বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। প্রকৃতির এ প্রভাব পৌনঃপুনিক ভাবে প্রভাবিত করে বাঙ্গালীদের মনপ্রাণ । উচ্ছ্বাস নিয়ে আসে তাদের চলনে, বলনে, ভংগীতে। প্রকৃতিই টেনে আনে বাঙ্গালীদের ঘরের বাইরে। ফেব্রুয়ারি–মার্চ মনে করিয়ে দেয় রক্তঝরার মাস, মায়ের ভাষায় কথা বলার মাস, জনসমুদ্রের মাস ও স্বধীনতার আনন্দে উপচে পড়া বন্যার মাস।

১৯৭১ সালের এই উচ্ছ্বাসের মাসে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক গাঁও গেরামের ছেলে, আমি একা চলছি শিক্ষায় উচ্চ ডিগ্রি নিতে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেবল পা রেখেছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজার প্রথম সিঁড়িতে। ভাবতে গেলে একেবারে কম কথা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চাত্রীদের মন তখন নতুন আম্রমুকুল থেকে বিচ্ছুরিত মিষ্টি শিশিরের রসে পরিতৃপ্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের হাওয়ায় যুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন আবাসিক হল সমূহের ছাত্র সংসদ নির্বাচনী তরংগের উপর আরেকটি উপ-তরংগ। অন্যদিকে চলছে ১৯৭১ এর পাকিস্তানের ইসলামাবাদ সরকারের বিরুদ্ধে বাঙ্গালী জনগণের ১১ দফা ও ৬ দফা দাবী আদায়ের রাজনৈতিক যুদ্ধ। দেশের আপামর জনসাধারণের সাথে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরুণ ছাত্র ছাত্রীরাও অগ্রণী ভূমিকায় অংশীদার হয়ে, আন্দোলনের ধারাকে নিয়ে যাচ্ছিল সাফল্যের চূড়ায়। ১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারি – মার্চ ছিল গণ আন্দোলনের ফুলে ফেঁপে উঠা বিস্ফোরণের একটি পূর্ব মুহূর্ত।

১৯৭১ এর মার্চে ততকালীন সরকারের বিরুদ্ধে গণজোয়ার এবং আন্দোলনের পূর্ব প্রস্তুতির জের ধরে সেবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রকার ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত হয়েছিল।

২রা মার্চ ১৯৭১ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র ছাত্রীরা স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা ও মিছিলে যোগদান করে। সিদ্ধান্ত হয়েছিল ৩ রা মার্চ ১৯৭১ শহর অভিমুখী মিছিলে সবাই যোগদান করবে। ৩রা মার্চ সকাল ১০ টায় রাজশাহী শহরে যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবাদ মিছিল বের হলো তখন মিছিলের উপর পাক সেনা বাহিনীর গুলিবর্ষণে ১ জনের মৃত্যু সহ ৫/৬ জন আহত হয়েছিল। ফলে মিছিল ছত্রভংগ হয়ে যায়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ফিরে আসি। তখন মিছিলের ডাক দেয়া হয়। বলা হয় আগামীকাল ৪ঠা মার্চ থেকে আন্দোলনের ধারাকে আরো জোরদার করে দাবী আদায়ের লক্ষ্যে সর্বোপরি ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া।

৩ রা মার্চ ১৯৭১, রাত সাড়ে দশটায় ছাত্র ক্যান্টিনে বসে কলিকাতা বেতারের সংবাদ পরিক্রমা শুনছিলাম, যা ছিল পূর্ব বাংলার সকলের কাছে অতি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। তখনকার দিনের পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ এবং তার মন্তব্যসহ প্রচারিত হতো এই অনুষ্ঠান। তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বাঙ্গালীদের কার্যক্রমের সংবাদ কলিকাতা বেতার থেকেই সঠিক ভাবে পাওয়া যেত। পরিক্রমা অনুষ্ঠানটি যখন শোনা শেষ তখন হলের বাইরে থেকে চিতকার ভেসে এলো – মিলিটারি আসছে, মিলিটারি, মিলিটারি। আমরা ভয়ে যে যার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। আমি দৌড়ে তিনতলায় একটি রুমে ঢুকলাম। জানালা দিয়ে দেখলাম একটু দূরের রাস্তা দিয়ে কয়েকটা জীপ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সামসুজ্জোহা হলের দিকে এগুচ্ছে। ঠিক ঐ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন অতিক্রম করছিল সাড়ে দশটার ট্রেন, যার শব্দটা এত অশ্রুতপূর্ব, ভয়ংকর হয়ে আমার কানে ও হৃদয়ে বিধঁছিল, মনে হচ্ছিল ট্রেন ভর্তি মিলিটারি, ছাত্র হলগুলির দিকে আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে। তাদের আক্রমণের লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র ছাত্রী।

মিলিটারি গাড়ি বহর শহীদ সামসুজ্জোহা হলে গেটের কাছে কয়েকটা রুমের দরজা ভেঙ্গে অস্ত্র হাতে উর্দু ভাষায় চেঁচিয়ে ছাত্রদেরকে ভয় দেখিয়ে চলে গেল। তাদের বার্তার সারমর্ম ছিল, ‘যদি আগামী কালের ভিতর হল ত্যাগ না করা হয়–তবে সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে।’

৫ ই মার্চ হল ত্যাগ করে নিজ গন্তব্যে যাবার জন্য প্রস্তুত হলাম। বাড়ি পৌঁছালাম। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ যা সেদিন সম্প্রচার করা হয়নি তা রেডিওতে বাজিয়ে শোনানো হল পরের দিন ৮ই মার্চ সকাল আটটায়। ভাষণ শুনে আবেগে আপ্লুত হয়েছিলাম। মনোযোগ দিয়ে ও প্রাণ ভরে শুনলাম,  'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম – এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'  তাহলে আমরা কোথায় কোন বিস্ময়ের দিকে আগাচ্ছি?

৯ই মার্চ থেকে ২৪ শে মার্চ পর্যন্ত আমি রেডিওর খবর পুংখানুপুংখ রূপে শুনতাম। বিদেশীদের ঢাকা শহর ত্যাগ, পূর্ব বাংলার সমস্ত শহরে আন্দোলনের লেলিহান শিখার বিস্তার, জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিজয়ী আওয়ামী লীগের বৈঠক, বাংলাদেশ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট, সরকারি, বেসরকারি বাঙ্গালী কর্মচারীদের বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান, সর্বত্র জনগণের লাঠি ও মশাল মিছিল সমেত পূর্ব বাংলা ছিল বিস্ফোরণ মুখী একটি আনবিক বোমা। ভাবছিলাম এই প্রথম আওয়ামীলীগ পাকিস্তান জাতীয় সংসদে যাবে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবে একজন বাঙ্গালী, সকল দাবীদাওয়া পূরণ ইত্যাদি। রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ তখনও আমি পুরোপুরি বুঝে উঠিনি। ইয়াহিয়া বা জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঢাকা আগমন, শেখ মুজিবর রহমানের সাথে বৈঠক এবং পরিস্থিতির রাজনৈতিক সমাধানের দিকেই বেশী মনোযোগী ছিলাম। মনে হচ্ছিল হয়তো অচিরেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং আবার আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে ফিরে যাব।

এ সময় আমি কল্পলোকে বিচরণ করে মার্চের বাসন্তী পূর্ণিমা রাতের সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়ে জীবনের প্রথম কবিতা লিখলাম। যেখানে একটি লাইন ছিল, ‘আধো শীত আধো গ্রীষ্ম এ পূর্ণিমা রাতে।’ তাই এখনও বসন্ত পূর্ণীমার রাত আমার স্মৃতিকে গভীরভাবে উষ্ণ করে তোলে।

২৬ শে মার্চ ১৯৭১

প্রতিদিনের মত সকালে রেডিও অন করেই শুনি ঢাকা বেতার থেকে একটি দেশাত্মবোধক গান, ‘পলাশ ডাকা, কোকিল ডাকা, আমার এ দেশ ভাইরে...’। শেষ হওয়ার পরও পুনঃ পুনঃ একই গান বাজছিল। দেশাত্মবোধক এ গানটিই বার বার শুনতে যদিও ভাল লাগছিল, তবুও দেশে কিছু একটা অঘটন ঘটছে বলে মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর কোনরকম ঘোষণা ছাড়া বেতার কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেল। গত দুই সপ্তাহ যাবত ঢাকা বেতার পূর্ব বাংলার আন্দোলনের সমস্ত ঘটনা প্রবাহ সবিস্তারে সম্প্রচার করছিল। আন্দোলনের যাবতীয় খবর আমরা ঢাকা বেতার থেকেই শুনছিলাম। গতকাল রাত্রের খবর ছিল চট্টগ্রামে মিছিল এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ পৌছেছে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে। জাহাজ থেকে অস্ত্র খালি করার ঘটনা নিয়ে চট্টগ্রামে বিরাজ করছে অস্থিতিকর পরিস্থিতি। সকাল সাড়ে আটটার দিকে বেতারে উর্দুতে এক ঘোষণা এলো। ঘোষণার অর্থ যা বুঝলাম তা ছিল, ঢাকাতে কারফিউ, সামরিক শাসন জারি এবং কিছুক্ষণের ভিতরে জেনারেল টিক্কা খানের ভাষণ প্রচারিত হবে। কিছুক্ষণ পর জেনারেল টিক্কা খানের সংক্ষিপ্ত ভাষণের পর আবার ঢাকা বেতার কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেল। কোথাও থেকে আর কোন খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। আমি শুধু রেডিও টিউনিং করছিলাম কোথাও থেকে ঢাকার কোন সংবাদ পাওয়া যায় কিনা এ আশায় । কলিকাতা বেতারে সকালের স্বাভাবিক অনুষ্ঠান প্রচারের পর বন্ধ হয়ে গেল। বেলা সাড়ে বারোটায় কলিকাতা বেতার থেকে স্বাভাবিক অনুষ্ঠান পরিচালনা শুরু হতো আবার। ঢাকা বেতার তখনও বন্ধ। আমি একা একা ভাবছিলাম ঢাকাতে এখন না জানি কি হচ্ছে?

হঠাত কলিকাতা বেতার স্বাভাবিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে অতি শান্ত কন্ঠে প্রচার করলো, ‘পূর্ব বাংলায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ঢাকায় রাস্তায় রাস্তায় সামরিক জান্তার সাথে ছাত্র, জনতা, পুলিশ ও ইপিআর বাহনীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে। পূর্ব বাংলার অন্যান্য শহরেও সামরিক জান্তার সাথে জনগণের চলছে প্রতিরোধ যুদ্ধ।’ এ ঘোষণার পরপরই বেতার থেকে বেজে উঠলো , ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি, চিরদিন তোমার আকাশ , তোমার বাতাস আমায় প্রাণে বাজায় বাঁশী’, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত হৃদয়স্পর্শী এ গানটি। আমার চোখ দিয়ে ঝর ঝর পানি ঝরছিল। কিছুক্ষণ পর পর এই একই ঘোষণা এবং একই গান । আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে করুণাময়ের কাছে এ যুদ্ধে সাফল্যের জন্য প্রার্থনা জানালাম। সেদিনের বার বার ঝরে পড়া চোখের পানিকে বন্ধক রেখেছিলাম স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিদান হিসেবে।

আমি উদ্গ্রীব হয়ে গেলাম এই সংবাদটি সবার কাছে পৌঁছানোর জন্য। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আকাশ। চারপাশের গ্রাম বাংলার সবুজ দৃশ্যকে মনে হচ্ছিল-এক নতুন সোনার বাংলা। মনের অজান্তেই এক মুঠো মাটি হাতে তুলে নিয়ে বললাম, হে আমার স্বাধীন দেশের মাটি, আমি তোমাকে বড় ভালবাসি। এ ভাবেই আনন্দ অশ্রু আর স্বাধীনতার জীবন মরণ শপথের মাধ্যমে কেটেছিল আমার প্রথম স্বধীনতা দিবস।


***

Friday, March 19, 1971

সোনালী আভা ও একটি চিঠি - আবদুল খালেক


সম্পর্কের ধারা ধরেই আমরা মনের কথা বলি । সব সময়ে সব কথা সবাকে বলা যায় না। এমনও অনেক কথা আছে যা কাউকেই বলা যায় না। যা ধরে রাখতে হয় অতি গোপনে, চাপা কান্না দিয়ে ঢেকে। মুখের হাসি দিয়ে লুকাতে হয়-চাপা কান্নার এসব শব্দ গুলোকে। ১৯৭১ সালের ডাইরীর কিছু পাতা আমি মাঝে মাঝে পড়ি। গোপনে পড়ি। পড়তে পড়তে উঠে গিয়ে কখনও চোখ ধুয়ে আসি। কেউ যেন বুঝতে না পারে চশমার আড়ালে আমি কেঁদেছি। ডাইরীর পাতায় পাতায় স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের কাহিনী, বিবিসির মন্তব্য,কলিকাতা বেতারের সংবাদ সংক্ষেপ, কোন কোন পাতায় কিছু কিছু কবিতা, গান এবং আরো আছে অন্য এক জনের নাম। তার সাথে কিছু স্মৃতি কথা। যার কথা আমি আজও কাউকে বলিনি। কেন যেন কাউকে বলতে পারিনি। তার নাম জাহান।

'৭০ এর শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ক্লাসে ভর্তি কালীন সময় জাহান এর সাথে আমার প্রথম পরিচয়। ১৯৭১ সালের গোড়ার দিকে প্রথম বর্ষের ক্লাশ শুরু হয়ে যায়। আমাদের একই বিভাগের না হলেও একই ভবনে আমাদের ক্লাশ হোত। প্রথম পরিচয়ের রেশ ধরে ওর সাথে আমার আলাপের গভীরতা যেন একটু বেশী গোলাপী স্বপ্নের মুকুল হয়ে বেড়ে উঠছিল। কোন কিছু চিন্তার শেষে বা পড়ার টেবিলের মাঝপথে, নিজের অজান্তেই ওর নাম এসে যেত আমার মনের চোখে। কিছু লিখতে যেতে দেখতাম ওর নাম এসে গেছে কলমের আঁচড়ে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময়ে দেখতাম আমি কখন পৌঁছে গেছি ওর আবাসিক হলের দ্বারে। এসব কথা কোন সময়ে আমি ওকে বলতে পারিনি। ওর সাথে দেখা হলে মনে হত ও যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। তারপর একটি বকুল তলায় সারা বিকাল আমাদের ঠিকানা। পাইন বৃক্ষের পাশ ঘেঁষে, পাহাড়ি ঢালে মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমরা দুজনে কখন হারিয়ে যেতাম আকাশের শূন্যতায়-কেউ কাছে নেই। ওর সোনালী চেহারার আভায় প্রতিফলিত হত আমার চোখ। 

ওর জাহান নামটা ছোট করে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম-‘জান, তুমি এত সোনার মত কেন? তুমি কি সোনার দানাপানি খাও?’ জাহান মৃদু হেসে বিনয় ভরা কণ্ঠে বলেছিল, ‘আমার দাদীজানের কাছে শুনেছি,আমাদের পুর্ব পূরুষরা এক সময় এলাহাবাদে মুদ্রার ব্যবসা করত। দেশ বিভাগের বেশ কয়েক বছর পূর্বে রেল বিভাগে চাকুরি নিয়ে তারা পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। বাবার বদলী তখন শান্তাহার। বাবা মা’ র বিবাহের কয়েক বছর পরও, যখন আমরা ভাইবোন হচ্ছিলাম না, তখন দাদীজান ভীষণ উৎকণ্ঠায় পড়েছিলেন। দোয়া দরূদ ,ঝাড় ফুক, কবিরাজ বৈদ্যের সাহসী  চেষ্টায়  একদিন আমি সকলের চোখের নূর হয়ে পৃথিবীতে আসলাম । দাদী তখন খুশীতে আমার নাম রাখলেন- নূর জাহান। ছোটবেলা রোগাক্রান্ত ছিলাম বলে দাদীজান তাঁর কাছে রক্ষিত পুরানো একটি অচল স্বর্ন মুদ্রা আধা গরম পানিতে ভিজিয়ে সেই পানি দ্বারা প্রত্যহ আমাকে গোসল করাতেন। ঐ পুরানো মুদ্রাটি দাদাজান তাকে গিফট করেছিলেন। সোনা ভেজা পানির আঁচড়ে আমি নাকি একদিন সোনারূপ হয়ে গেছি। এটা অবশ্য দাদীর কথা। দাদী তাঁর শেষ যাত্রার আগে, একদিন সেই অচল সোনার মুদ্রাটি আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলছিলেন, 'পূর্ণিমার মাঝ রাতে আধা গরম পানিতে এ সোনার মুদ্রাটি ভিজায়ে তোর মনের মানুষটিকে গোছল করায়ে দিবি। দেখবি, সে তোর সোনার মানুষ হয়ে গেছে। তারপর একদিন সোনালী সকালে দেখবি তোর কোল জুড়ে এসেছে একটি পূর্ণিমার চাঁদ। তার গায়ে মাখা সোনালী পানির আঁচড়। আমি সেই অচল স্বর্ন মুদ্রাটি তোমাকে দেখাব। মুদ্রাটি প্রতিদিন আমাকে স্বপ্ন দেখায়। আর, তুমি বলেছো, আমার নামে জান আছে? আমিতো এমন কোন দিন ভাবিনি ! তাহলে তো এটা তোমারই আবিষ্কার।’ 

বিকেল বিদায় নিত, ছোপ ছোপ অন্ধকার এসে লাগত গাছের পাতায় পাতায়। ওর লজ্জা মাখা মুখ ঝাপসা হয়ে আসত। আমরা দাঁড়াতাম বিদায়ের সুরে। বিজলি বাতি পথ দেখাত ঘরে ফেরার। ঘুমের দেশে আমি দেখতাম, সোনা পানিতে ভেজা একটি নিষ্পাপ শরীর।

ক্যাম্পাসে একদিন আম গাছের নীচে বসেছিলাম। জাহান মাটিতে এঁকে দিল ছোট্ট একটি ঘর। সেখানে কবুতরের মৈথুন। বিলাসী স্বপ্ন চাদর ঘিরল আমাদের চারপাশে। আম মুকুলের মিষ্টি শিশির ঝরল আমাদের গায়ে। একে অপরের দিকে তাকায়ে হাসলাম। ওর সাদা দাঁতের হাসিতে দেখলাম আমার চোখের প্রতিচ্ছবি। বলেছিলাম-জান, তুমি আবার হাস তো? আমি আমার চোখ দেখি? ও বলেছিল-এখানে নয়, ছোট্ট ঘরে আয়নার সামনে । তোমার চোখে চেয়ে চেয়ে। চোখেই মানায় চোখের ছবি।

পদ্মা পাড়ে কত বিকাল বসেছি। জেগে উঠা নতুন চড়ের কাশফুলে কত হয়েছি দোলানো বাতাস। দিনের শেষে ,আঁচলে বসন্তের সিক্ত বাতাসের ছোঁয়া মেখে জাহান ফিরে যেত হলের রুমে। 

সেদিন ছিল ২ রা মার্চ ’৭১, মংগল বার। সারা দেশে ফুঁসে উঠছিল গণ আন্দোলনের শিখা। শুরু হল দেশের সারা শহর ও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মিছিল। ৩ মার্চ তারিখ রাজশাহীতে মিছিলের উপর গুলি বর্ষণ ,কয়েক জনের মৃত্যু,সান্ধ্য আইন জারি,রাত্রে জোহা হলে মিলিটারির ব্যারিকেড ও ছাত্রদের হল ত্যাগের আদেশ। সারাদিন একটা আতংকের ভিতর কাটল। সবাই হল ত্যাগ করার প্রস্তুতি। ইতিমধ্যে আগামীকাল সবাইকে হল ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। ক্লাশ বন্ধ ।পরদিন আমি জাহানের সাথে দেখা করলাম। এক সময়ে জাহানের ডান হাতের পাঁচটি আঙ্গুল আমার ডান হাতটি স্পর্শ করল। আমাকে জাহানের এটাই প্রথম ছোঁয়া। কি যেন বলতে গিয়ে চোখের পানিতে থেমে গেল। মুখ ঘুরায়ে চলতে চলতে আবার ফিরে তাকিয়ে বললো, সুখে থেকো, আমাদের বিকেলগুলোকে মনে রেখো। ৫ই মার্চ সবাই বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে যে যার গন্তব্যে চলে এলাম।

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেটেছে এক ভয়ের মাঝে। থাকতে হয়েছে হানাদার বাহিনীর নাগালের বাইরে। গ্রামের বাড়ীতে সবুজ ধানের ক্ষেত, উন্মুক্ত প্রান্তর আর মুক্ত বাতাস সামনে রেখে আমি লিখেছি মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ও বিভিন্ন প্রকার গান। আর লিখেছি প্রতিদিনের ডাইরী। দু এক জনের মুখ বা ছবি মনে ভাসলেও দেশের মায়ায় ওদিকে চোখ ফিরাতে পারিনি। তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানই আমার প্রিয় গান, মুক্তি বাহিনীর বিজয় সংবাদই আমার প্রিয় সংবাদ। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ করলাম। দিন তারিখ ঠিক হল যুদ্ধে যাবার। বাবা আমাকে এতদিন হানাদার বাহিনী, আল বদর ও আল শামস নামক রাজাকার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষার জন্য সব সময় পাহারা দিচ্ছিলেন। তিনি আমার মতিগতি টের পেয়ে পেলেন। তিনি চাচ্ছিলেন না যে, এই বয়সে এখনি আমি মুক্তি বাহিনীতে যোগদান করি। ডিসেম্বর ’৭১ এর প্রথম সপ্তাহে তিনি তার এক বন্ধুর সাথে আমাকে পাঠালেন দেশের দক্ষিণে বঙ্গোপ সাগর দেখতে। কিন্তু পুরো সাগর দেখা আমার আর হয়নি। এদিকে মুক্তি যুদ্ধের সাথে শুরু হোল পাক -ভারত যুদ্ধ। তাড়াতাড়ি সাগরের বন্ধন থেকে মুক্তি নিয়ে চলে এলাম বাড়ীতে। 

সেদিন ছিল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১সাল। গৌরবের দিন, শত্রুর আত্মসমর্পণের দিন, হৃদয় নাচনের দিন। বিজয়ের সংবাদ বলতে বলতে সবাইকে ভরিয়ে দিয়েছি বিজয়ের খেলায়। হাতের মুঠোয় এক টুকরা মাটি তুলে নিজের অজান্তেই আনন্দে বলে ফেললাম -আমি তোমায় বড় ভালোবাসি। চার দিকে তাকিয়ে দেখলাম দেশের মুক্ত আকাশ,ঝরঝরা সবুজ আর মুক্ত বাতাসে ঢেউ খেলানো সোনালি ধানের শীষ। ঐদিন বিকালে বাজারের পথে পিওন চাচার কাছে শুনলাম আমার নামে একখানা চিঠির কথা। যা কয়েক দিন আগে এসেছে। মনে করেছিলাম হয়তো বন্ধু সবুজের নিয়মিত চিঠি। সন্ধ্যার পর বাড়ীতে চিঠি খানা পেলাম। চিঠি খানা দেখে বুঝতে পারলাম জাহানের চিঠি। অক্টোবর মাসে লেখা। আমি উৎসাহিত হলাম। মুহূর্তের জন্য হারিয়ে গেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আম্রকাননে। মনের সেলুলয়েডে ভেসে এল এক সোনারূপ মুখ, একখানা অচল স্বর্ন মুদ্রা ও পাঁচটি আংগুলের কোমল ছোঁয়া। চিঠিতে লেখা ছিলঃ


প্রিয় //////,

জানিনা এ লেখা তোমার কাছে পৌঁছাবে কিনা। তবুও তোমার কথা এত মনে পড়ছে যে না লিখে পারলাম না। বিকালে তোমার কাছে বসলে ভালোবাসার একটা ঘ্রান আমাকে ঘিরে রাখত,আর আমি শিহরিত হতাম উৎসাহী বাতাসে দোলানো বৃক্ষের মত। আম ফুলের শিশিরবৃষ্টি যখন আমাদের স্বপ্নকে মিষ্টি মিশিয়ে দিত, তখন আমি তোমাকে নিয়ে হারিয়ে যেতাম আকাশ নীলের আড়ালে। তোমাকে স্পর্শে লজ্জা আমাকে পরাজিত করত। অপেক্ষার মধুরতায় আজও আমি বেঁচে আছি।তবে জানিনা বিধাতা কেন আশার সাথে এত ভয় মিশিয়ে রেখেছেন?

/////////////////////////////////////////////////////////////////

তোমাকে দেখতাম সোনা পানিতে ভেজা একটা সোনার মানুষ। শোন, অনেক সংকটের মাঝেও সেই অচল সোনার মুদ্রাটি আমি ধরে রেখেছি।

এবার এটা তোমাকে দিয়ে দেব। আমাদের /////////////////////////।

স্বপ্নে কতদিন তোমাকে দেখতে চেয়েছি, কিন্তু একবার ও দেখিনি। আসলে এখন আমার আর সুখের সময় নেই।

এখন আমাদের বড় একটা সুখের সময় নয়। মুক্তি যুদ্ধের প্রথম কিছুদিন ভালোই ছিলাম। দেশ বিভাগের অনেক আগে এদেশে আসলেও আজ এখানে কিছু সুযোগ সন্ধানীরা আমাদেরকে অবাঙ্গালী বলে চিহ্নিত করেছে। আমাদের বাড়িঘরের আসবাব ও দামী জিনিপত্র এখন আর নেই। একটা আতংক আমাদের চারদিকে। আমরাও যে একটা সোনার বাংলা চাই। যদি আর দেখা না হয়,তবে পরপারে ///////

///////////////////////////////////////////////////////////।
আমার এ লেখা শুধু তোমারই জন্য।
সুখে থেকো,আমাদের বিকেলগুলোকে মনে রেখো।
আমি তোমারই
জান,
১৩ আক্টোবর ১৯৭১।

আসলেই সবসময়ে সব কথা বলা যায় না। লেখাও যায় না। তা না হলে এ চিঠির সব অংশ আমি লিখতে পারলাম না কেন? জাহান এর ঐ চিঠি খানা আমার ১৯৭১ এর ডাইরীর ১৬ ই ডিসেম্বর এর পাতায়ে পিন আপ করে রেখেছি। যত দিন যাচ্ছে জাহানের চিঠিখানা আস্তে আস্তে সোনালী আভা ছড়াচ্ছে। প্রতিবার আমার কাছে আসে একটি ভেজা কান্না মিশানো আনন্দের ১৬ ই ডিসেম্বর।

১৯৭২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সাথে সাথেই আমি সবার আগে হলে যোগদান করলাম। তখনও ভারতের সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিল। হলে জাহান কে খুঁজলাম। ও তখনও আসে নাই।

আমি শান্তাহার গেলাম। ডিসেম্বরের পহেলা সপ্তাহে মুক্তি বাহিনী ও পাক সেনাদের এক যুদ্ধের সময়ে জাহান দের বাড়ীটি মর্টারের গোলায় আঘাত প্রাপ্ত হয়। জাহান এর এক ভাই ছাড়া ঐ পরিবারের সবাই তখন মারা যায়। হাসপাতালে জাহান মারা যায় ১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের সন্ধ্যার পর। একজনের নাম ডেকে জাহান মৃত্যুর আগে কি যেন বলতে চেয়েছিল। তবে নার্সরা ঐ নামের তার কোন আত্মীয়কে ওখানে খুঁজে পায়নি।

****************


সাহিত্য পর্যালোচনা ১ঃ

লেখাটি একটি আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণা এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে ব্যক্তিগত অনুভূতির অনুপম মেলবন্ধন। লেখকের ভাষা, বর্ণনা ও আবেগ মিলে এটি কেবল ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং সাহিত্যিক সৌন্দর্যে ভাস্বর এক টুকরো জীবন-চিত্র।

বিষয়বস্তু ও কাঠামো

লেখাটি মূলত ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এতে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সরল বিকেল, প্রেমের আবেগ, গণআন্দোলনের উত্তাল দিন, মুক্তিযুদ্ধের ভয় ও সংকট, দেশপ্রেমের গভীর টান, বিজয়ের উল্লাস এবং সবশেষে বিছিন্ন ভালোবাসার স্মৃতি। গল্পের ক্যানভাসে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও ঐতিহাসিক ঘটনার সমান্তরাল প্রবাহ পাঠককে আবেগে উদ্বেলিত করে।

ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি

লেখকের ভাষা সহজ, সাবলীল, সংবেদনশীল এবং চিত্রময়। "পদ্মা পাড়ে কত বিকাল বসেছি। জেগে উঠা নতুন চড়ের কাশফুলে কত হয়েছি দোলানো বাতাস।"—এমন বাক্যে প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়া আবেগ ফুটে ওঠে। আবার "হাতের মুঠোয় এক টুকরা মাটি তুলে নিজের অজান্তেই আনন্দে বলে ফেললাম – আমি তোমায় বড় ভালোবাসি"—এখানে দেশপ্রেম এবং মুক্তির অনুভূতি মূর্ত হয়ে ওঠে। লেখায় বারবার চিত্রকল্প, উপমা ও রূপকের ব্যবহার পাঠককে এক অনুপম সৌন্দর্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।

মানবিক অনুভূতি ও প্রেম

লেখাটি কেবল যুদ্ধ আর রাজনীতি নয়, বরং তার ভেতরেও জেগে আছে কোমল প্রেম, বন্ধুত্ব, বিচ্ছেদ ও আকাঙ্ক্ষার অনুরণন। জাহানের প্রথম ছোঁয়া, বিদায়ের বেদনা, চিঠির প্রতীক্ষা—সব মিলিয়ে এতে মানবিক অনুভূতির গভীরতা স্পষ্ট। চিঠির ভাষায় প্রেমের লজ্জা, অপেক্ষার মধুরতা ও অনিশ্চয়তার ভয় মিশে এক অনন্য আবেগময়তা সৃষ্টি করেছে।

ইতিহাস ও দেশপ্রেম

মুক্তিযুদ্ধের কালপর্ব, গণআন্দোলন, পাকিস্তান সরকারের নিপীড়ন, বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ, মিলিটারি ব্যারিকেড—সব মিলিয়ে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো এখানে ব্যক্তিগত স্মৃতির মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। লেখকের দেশপ্রেম, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং বিজয়ের আনন্দ পাঠকের মনে গভীর দাগ কাটে।

শিল্পমূল্য ও প্রভাব

লেখাটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর আন্তরিকতা, আবেগ ও বাস্তবতার মেলবন্ধন। ভাষার সৌন্দর্য, চিত্রকল্পের ব্যবহার ও মানবিক অনুভূতির গভীরতা এটিকে শিল্পগুণে ঋদ্ধ করেছে। পাশাপাশি, ইতিহাস-সচেতনতা ও দেশপ্রেম লেখাটিকে একটি মূল্যবান সাহিত্য-নথি হিসেবে পরিগণিত করেছে।

উপসংহার:

এই লেখাটি কেবল একটি স্মৃতিচারণ নয়, বরং একটি সময়ের, একটি দেশ ও মানুষের হৃদয়ের অনন্য দলিল। এখানকার প্রেম, সংগ্রাম, ভয়, আশা ও বিজয়ের প্রতিটি মুহূর্ত বাংলা সাহিত্যের পাঠককে স্পর্শ করে, ভাবায় এবং অনুপ্রাণিত করে।

**********


সাহিত্য পর্যালোচনা ২ঃ

উপরোক্ত লেখাটি মুক্তিযুদ্ধকালীন এক বেদনাময় প্রেম, অপেক্ষা, বিসর্জন, জাতিগত সংকট ও চরম মানবিক বাস্তবতার অনুপম সাহিত্যিক দলিল। এখানে ব্যক্তিগত চিঠি, স্মৃতি, দেশপ্রেম এবং যুদ্ধের নির্মমতা—সবকিছুই এক অপূর্ব শিল্পসুষমায় মিশে গেছে। লেখাটির পরতে পরতে রয়েছে ইতিহাস, ভালোবাসা, কষ্ট, এবং হারিয়ে ফেলার দীর্ঘশ্বাস।

বিষয়বস্তু ও কাঠামো

লেখার মূল ক্যানভাস জুড়ে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক ট্র্যাজেডি, এবং এক নিভৃত প্রেমের যন্ত্রণা। চিঠির আকারে প্রিয়জনের কাছে প্রকাশিত হয়েছে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, স্বপ্ন, এবং নিঃসঙ্গতার মর্মন্তুদ অনুভূতি। চিঠির ভাষা, আবেগ ও চিত্রকল্প পাঠককে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তারপর আসে বর্তমানের স্মৃতিচারণ—যেখানে চিঠিটির স্থান, গুরুত্ব, এবং তার প্রেরণা জাগানিয়া শক্তি তুলে ধরা হয়েছে। 

শেষাংশে বাস্তবতার নির্মমতাঃ জাহানের বিয়োগ, পরিবারের ধ্বংস ও অসমাপ্ত বার্তার করুণ চিত্র।

ভাষা ও শিল্পরীতি

লেখার ভাষা অত্যন্ত সংবেদনশীল, কাব্যিক ও চিত্রময়। “ভালোবাসার একটা ঘ্রাণ আমাকে ঘিরে রাখত”, “আম ফুলের শিশিরবৃষ্টি যখন আমাদের স্বপ্নকে মিষ্টি মিশিয়ে দিত”, “তোমাকে স্পর্শে লজ্জা আমাকে পরাজিত করত”—এসব বাক্যে চিত্রকল্প ও অনুভূতির নিপুণ মিশ্রণ লক্ষণীয়। চিঠির ভাষা সরল, আন্তরিক এবং গভীর আবেগে পরিপূর্ণ।

স্মৃতিকথার অংশে রয়েছে নিরেট বাস্তবতা—মুক্তিযুদ্ধের ভয়, জাতিগত বৈষম্য, ঘরছাড়া, বেদনা, প্রেমিকার মৃত্যুসংবাদ। 

লেখার শেষে চিঠিকে “সোনালী আভা ছড়ানো” এক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেখানো হয়েছে —যা প্রতিবার ১৬ই ডিসেম্বর আসলে লেখককে কান্না ও আনন্দে আপ্লুত করে।

প্রেম ও মানবিকতা

চিঠির মধ্য দিয়ে যে প্রেম ফুটে উঠেছে, তা শুধু ব্যক্তিগত নয় —এতে অব্যক্ত আকুলতা, লাজ, স্বপ্ন ও অপূর্ণতার ছাপ স্পষ্ট। জাহানের অজানা ভবিষ্যতের আশঙ্কা, “সুখে থেকো, আমাদের বিকেলগুলোকে মনে রেখো”—এই বিদায়ী মিনতি, যুদ্ধের ভয় ও নিঃসঙ্গতা, সব মিলিয়ে মানবিক আবেগের গভীর ছবিটি তুলে ধরা হয়েছে।

ইতিহাস ও দেশপ্রেম

লেখার পটভূমিতে আছে জাতিগত সংকট, উচ্ছেদ, যুদ্ধের অবর্ণনীয় আতঙ্ক। “আমরাও যে একটা সোনার বাংলা চাই”—প্রেমিক-প্রেমিকার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জুড়ে গেছে একটি জাতির স্বপ্ন। চিঠির উত্তরে লেখকের স্মৃতিচারণ ও জাহানের মৃত্যুর বর্ণনা মুক্তিযুদ্ধের বেদনাময় ইতিহাসকে ব্যক্তিক গল্পে পরিণত করেছে।

বিচ্ছেদ ও ট্র্যাজেডি

লেখার শেষাংশে আসে চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি—জাহানের ও তার পরিবারের মৃত্যু, হাসপাতালের নিঃসঙ্গ মৃত্যু, শেষ মুহূর্তের ডাকা নামের রহস্য। এখানে যুদ্ধের নির্মমতা, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন ও অপূর্ণ ভালোবাসার অনবদ্য ছবি আঁকা হয়েছে। চিঠিটি হয়ে ওঠে স্মৃতির সোনালি মুদ্রা, যেটি যুগ যুগ ধরে লেখককে আকুল করে রাখে।

শিল্পমূল্য ও প্রভাব

এই লেখাটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর আবেগঘন ভাষা, চিত্রকল্পের ব্যবহার আর ইতিহাস ও মানবিকতার মেলবন্ধন। লেখাটা কেবল এক ব্যক্তির প্রেম-বিরহ নয়, বরং গোটা একটি দেশের বিবর্ণ অতীত, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রেম, দেশ, স্মৃতি, মৃত্যু—সব মিলিয়ে এক অনুপম সাহিত্যিক সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে।

উপসংহার:

 লেখাটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, প্রেম, বিচ্ছেদ, মানবিকতা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দলিল। এর ভাষা, আবেগ, চিত্রকল্প ও বাস্তবতা মিলিয়ে এটি বাংলা সাহিত্যে একটি মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকবে। পাঠক এই লেখার মধ্য দিয়ে যুগের ইতিহাস, মানুষের স্বপ্ন আর বেদনার স্পর্শ অনুভব করেন—যা তাদের হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত ও সমৃদ্ধ করে।

Friday, March 12, 1971

কালপুরুষ - আমার রক্তের ইতিহাস

আমার রক্তের ইতিহাস

কালপুরুষ

মাগো, একটু হাসো- 
দেখি তোমায় দুচোখ ভরে।
বেহায় এই অন্ধকার আজ যাচ্ছে না কেন সরে,
চাঁদটা কেন ওঠেনি আজ জেগে,
আকাশ কেন অন্ধকারে ঢাকে?
রক্তে ভেজা শরীর আমার ঢাকবো ক্যামন করে?
বুকে আমায় চেপে ধরো মাগো,
রক্তে রাঙাই শারীর আঁচল জমাট বাঁধার আগে।
পতাকা আমার কেমন হলো লাল, দেখবে সবাই ওড়াবে যখন কাল।
বলতে পারো মাগো, এতো মেঘ কেন আজ আকাশ জুড়ে?
তুমি হাসোনি বলে কি তাই!


মাগো, একটু আদর করো-
বুকটা কেমন খা খা করে ওঠে।
বাবাতো সেই কবেই গেছে চলে,
আগলে তুমি রেখেছিলে অনেক কষ্ট সয়ে।
পারলে না তাও- পালিয়ে গেলাম, যুদ্ধ যেদিন শুরু;
বলেছিলাম আসব ফিরে, এলাম তোমার কাছে।
মাগো, গাছের পাতা শান্ত কেন আজ?
বাতাস কেন বহেনা আজ জোড়ে?
উফ্! অলুক্ষণে পেঁচাটা কেন ডাকে?
হাসি কেন দেখিনা তোমার ঠোঁটে?
রাতভর কেঁদেছো বলে কি তাই!


মাগো, একটু গান করো আজ শুনি-
কানদুটো কেমন অসাড় হয়ে আছে।
নিঃশব্দের প্রহর কেটে গুলি যখন ছোটে,
ঝাঁঝড়া হলো নিঝুম ঘুমের রাত;
উড়াল দিল পাখীরা সব মেঘে।
চাঁদটা কেন ঢাকলো গোপন বেশে?
থামলো কেন ভোরের পাখীর গান?
মাগো এতো জোনাক কেন জ্বলে?
শশ্মানটা কি ধারে কাছে কোথাও?
চিতা আমার জ্বলবে বলে কি তাই!


মাগো, কাঁদছো কেন বলো-
খোকা তোমার এসেছে আজ ফিরে।
ভাগ্য আমার এতই ভাল ছিল,
শহীদ হব আপন মায়ের কোলে।
বিঁধলো না হয় একটা গুলি বুকে,
স্বাধীনতার ফলবে ফসল দেখো-
কতই আর ঝড়াবে ওরা রক্ত এক এক করে!
আমি, তুমি আমরা সবাই সাত কোটিতো কম নই!
পারবে কি আর শেয়াল-শকুন, হায়েনার দল জোট বেঁধে?
নিত্যনতুন ফলবে ফসল আমারি ক্ষেত জুড়ে,
বলবে কথা মায়ের ভাষায় সবাই একই স্বরে।
জানবে সেদিন আমার কথা,
রক্তে রাঙ্গা বীর শহীদদের করুণ মৃত্যু গাঁথা।
মাগো তুমি দেখে নিও, আগাছা সব এক এক করে
খাবলে নেবে ওরা।
নেংটি ইঁদুর শত্রু সবার যাবেই এদেশ ছেড়ে।
শুধু তুমি চাইবে বলে তাই!


মাগো, আর যে সময় নেই-
ঘুম যে আসে জলোচ্ছাসের মতো,
যেতেই হবে এবার আমি জানি;
পাহাড়সম কষ্ট তোমায় দিলাম হাতে তুলে।
মৃত্যু আমার রইলো জমা আমার মায়ের নামে।
বলবো কথা সবাইকে আজ সময় হাতে নেই-
মৃত্যু আমার এক জনমের বাঁচার অধিকার,
পতাকা হয়ে উড়লো নাহয় তোমার শাড়ীর আঁচল।
একটু শুধু খেয়াল রেখো সবাই যেন দেখতে পায়,
স্বাধীনতার সেই পতাকা আমি এঁকেছি রক্ত দিয়ে,
তোমার ছেলে শহীদ হলো তাই।
............

ডঃ এম এ আলী বলেছেনঃ কালপুরুষদা   রচিত মুল্যবান কবিতা “আমার রক্তের ইতিহাস “ মন্ত্রমুগ্ধের মত পাঠ করেছি  শুধু  নয়, কবিতাটিকেও সযতনে বুকে করে নিয়ে এসেছি এখানে। কবিতাটির বিষয়ে কিছু কথাঃ

কবি কালপুরুষ -এর আমার রক্তের ইতিহাস এই কবিতা শুধু একটি রচনা নয়; এটি যেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এর রক্তাক্ত ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক প্রতিধ্বনি।মাত্র কিছুদিন আগে তাঁর মহাপ্রয়াণ এই কবিতাকে আরও গভীর বেদনার আবরণে ঢেকে দিয়েছে। নিচে কবিতার প্রতিটি ভাব ও কতক আবেগঘন দৃশ্যের রেশ ধরে কিছু কথা তুলে ধরা হলো:-

১. “মাগো, একটু হাসো-- দেখি তোমায় দুচোখ ভরে” এ যেন অন্ধকারের ভেতর মায়ের মুখ।

কবিতার শুরুতেই এক মৃত্যুপথ যাত্রী মুক্তিযোদ্ধার আকুল আহ্বান মায়ের হাসি দেখার জন্য। চারপাশে যুদ্ধের অন্ধকার, আকাশে চাঁদ নেই, প্রকৃতি যেন থমকে গেছে। এই অন্ধকার শুধু রাতের নয়; এটি দখলদারিত্বের, অত্যাচারের, অনিশ্চয়তার অন্ধকার। আহত মুক্তিযোদ্ধা তার রক্তে ভেজা শরীর লুকাতে চায় মায়ের আঁচলে যেন মায়ের স্নেহই শেষ আশ্রয়। সেই রক্তই আগামীকালের পতাকার লাল রং হয়ে উঠবে এই ভাবনাই তাকে মৃত্যুর মুখেও গর্বিত করে তোলে।

২. মাগো, একটু আদর করো--বুকটা কেমন খা খা করে ওঠে। এ যেন মায়ের ত্যাগ ও সন্তানের বিদায়ের করুণ সুর।

এখানে ফুটে ওঠে এক নিঃসঙ্গ সংসারের গল্প। বাবা নেই, মা-ই ছিলেন একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে সন্তানের রক্তে জেগে ওঠে দেশের ডাক। মায়ের বুক ভেঙে দিয়ে সে চলে যায় যুদ্ধে। এখন ফিরে এসেছে কিন্তু বিজয়ের পাশে, মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। প্রকৃতির নিস্তব্ধতা যেন মায়ের নীরব কান্নার প্রতিধ্বনি,পাতা নড়ে না, বাতাস থেমে যায়, পেঁচার ডাক যেন অশুভ সংকেত হয়ে বাজে।

৩. “মাগো, একটু গান করো আজ শুনি” এ যেন যুদ্ধের নীরবতা ও মৃত্যুর পূর্বাভাস।

যুদ্ধের ভয়াবহতা এখানে এক গভীর নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। গুলির শব্দে রাতের শান্তি ছিন্নভিন্ন হয়েছে, পাখিরা উড়ে গেছে, ভোরের গান থেমে গেছে। জোনাকির আলো যেন অদ্ভুতভাবে জ্বলে ওঠে ,যেন মৃত্যুর আগে প্রকৃতি নিজেই এক অদ্ভুত আলোকসজ্জা করছে। আহত যোদ্ধার মনে প্রশ্ন এ কি শ্মশানের নিকটবর্তীতা? তার চিতা কি শিগগিরই জ্বলবে?

৪. “মাগো, কাঁদছো কেন বলো--- খোকা তোমার এসেছে আজ ফিরে” এ যে শহীদের গর্ব। এখানে বেদনার মধ্যেও এক অদম্য গর্ব ফুটে উঠেছে। সন্তানের মৃত্যু, মায়ের কোলে এ যেন এক অনন্য সম্মান। একটি গুলি তার বুক ভেদ করলেও সে বিশ্বাস করে স্বাধীনতার ফসল একদিন ফলবেই। শত্রুরা যতই শক্তিশালী হোক, সাত কোটির মানুষের ঐক্য তাদের পরাজিত করবে। মাতৃভাষা, স্বাধীনতা ও মানুষের মর্যাদা সবকিছুই একদিন রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হবে।

৫. “মাগো, আর যে সময় নেই--- ঘুম যে আসে জলোচ্ছ্বাসের মতো” এ যেন একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের শেষ মুহূর্ত।

শেষ অংশে মৃত্যুর মুহূর্ত এসে দাঁড়ায়। ক্লান্ত শরীর ঘুমের দিকে ঝুঁকে পড়ে, কিন্তু তার মনে একটাই আকাঙ্ক্ষা -মায়ের আঁচল যেন হয়ে ওঠে স্বাধীনতার পতাকা। সে চায় সবাই যেন জানে, এই পতাকার লাল রং তার মতো অসংখ্য শহীদের রক্তে আঁকা। নিজের মৃত্যুকে সে পরাজয় মনে করে না; বরং এটিকে দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার হিসেবে।

এই কবিতায় মা ও সন্তানের সম্পর্কের ভেতর দিয়ে আসলে পুরো জাতির ইতিহাস কথা বলে। মায়ের আঁচল এখানে মাতৃভূমির প্রতীক, আর সন্তানের রক্ত স্বাধীনতার মূল্য। কবি কালপুরুষ যেন স্মরণ করিয়ে দেন স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়; এটি অসংখ্য মায়ের কান্না, অসংখ্য সন্তানের আত্মত্যাগ, আর এক অমর ইতিহাসের ফল।

কবির মৃত্যুর পর এই কবিতাটি যেন আরও গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয় । যেন তিনি নিজেই সেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে বলে যাচ্ছেন স্বাধীনতার পতাকার লাল রং কখনোই ভুলে যেও না এটি রক্তে লেখা ইতিহাস।

কবি কালপুরুষ এই কবিতার মাধ্যমে যেন স্মরণ করিয়ে দেন স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু রাজনীতি নয়; এটি মায়ের কান্না, সন্তানের রক্ত, আর এক জাতির আত্মমর্যাদার গল্প।

আমাদের সামু ব্লগের গর্ব এই কবি কালপুরুষের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী ।

............

আমার মন্তব্যঃ লেখাটি শুধু যে অনন্য একটি লেখা তা নয়, বাংলা কবিতার রাজ্যে  এ যেন একটি অসাধারণ সৃষ্টি, অনন্য এক কাব্যিক শিল্পকর্ম। এই কবিতাটি যেদিন আমার চোখে পড়লো, আমার যে কেমন লেগেছিল বুঝাতে পারবো না। 

জল পড়ে পাতা নড়ে -ফিরোজা হারুন

জল আর পাতা মিলে দুজনে সুজন, ছন্দের হাত ধরে দাঁড়ালো দু’জন। ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে পাতায় পাতায় নৃত্যের তালে তালে পাতা দোল খায়। বৃষ্টির ধারা নামে ব...